বাসস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু আজ তা বাণিজ্যের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা। এখানে বাসা ভাড়া দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। অধিকাংশ বাড়িওয়ালা আইনের তোয়াক্কা না করেই যেনতেন উপায়ে বাসা ভাড়া বাড়াচ্ছে। ঢাকায় একটি পরিবার আগে বাসা খোঁজে, পরে জীবন সাজায়। মাসের বেতন পাওয়ার আগেই ভাড়ার টাকা আলাদা করে রাখতে হয়- যেন বাড়িওয়ালার কথা শুনতে না হয়। এরপর শুরু হয় সংসারের অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের হিসাব। একটি সাধারণ ফ্ল্যাটের জন্য একজন চাকরিজীবী ভাড়াটিয়াকে আয়ের অর্ধেকেরও বেশি ব্যয় করতে হয়। বাসা ভাড়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও সার্ভিস চার্জ সবই-ভাড়াটিয়ার কাঁধে। অথচ বিনিময়ে ন্যূনতম সেবাটুকুও নিশ্চিত নয়। লিফট আছে কিন্তু নষ্ট, পানি আছে কিন্তু অনিয়মিত, নিরাপত্তা অনিশ্চিত বাসা নিতে গেলে ভাড়াটিয়াদের সামনে হাজির হয় নানা প্রশ্ন-পরিবারে কয়জন সদস্য, কী করেন, কখন বাসায় ফেরেন, অতিথি বেশি আসে কি না ইত্যাদি। এসব প্রশ্ন ও বৈষম্য মানবিক ও আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। অর্থাৎ ভাড়াটিয়ার সুযোগ-সুবিধা প্রায় শূন্যের কোঠায়। কিন্তু বছর না ঘুরতেই আসে বাসা ভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ। অনিয়ন্ত্রিত ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে কথা বললে বা প্রতিবাদ করলে একটাই উত্তর শোনা যায়- ‘‘পছন্দ না হলে অন্য বাসা দেখুন’’।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২ লাখ। বর্তমান সময়ে এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকার জনসংখ্যা ৫ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহরে পরিণত হবে। রাজধানী ঢাকার মোট বাসিন্দাদের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। অথচ তাদের বাসস্থানের সুরক্ষা নেই। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। ভাড়াটিয়ার অধিকার কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ফলে মালিক-ভাড়াটিয়া সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে শক্তি ও দুর্বলতার অসম সমীকরণে। প্রতি বছরই বাড়িওয়ালারা একতরফাভাবে ভাড়া বাড়িয়ে যাচ্ছেন। নতুন বছরের আগমনে বাড়িওয়ালাদের মনে আনন্দের দোলা লাগে। অন্যদিকে বছরের শুরুতেই ভাড়া বাসায় থাকা লাখো ভাড়াটিয়া মনে ভাড়া বাড়ার আতংক ভর করে। বাড়িভাড়া সংক্রান্ত আইন থাকলেও এর প্রয়োগ না থাকায় ভাড়াটিয়ারা কার্যত অসহায়। সুতরাং এখনই জরুরি ভিত্তিতে ঢাকামুখী জনস্রোত নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। কারণ রাজধানী ঢাকায় যারা ভাড়া বাসায় থাকেন তারা ইচ্ছে করলেই যখন তখন বাসা ছাড়তে পারে না। বাসা ছাড়ার আগে নতুন বাসা খুঁজতে হয়, বাসা ওঠার আগে অগ্রিম টাকা দিতে হয়। অগ্রিম টাকা না দিতে পারলে বাসা পাওয়া যায় না। এ যেন এক অন্তহীন দৌড়। এ যন্ত্রণা বাড়িওয়ালারা না বুঝলেও ভাড়াটিয়ারা ঠিকই টের পান।
ঢাকার বাসা ভাড়ার সংকট নিছক কোন বাজার সমস্যা নয়; এটি আইন প্রয়োগে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার জ¦লন্ত উদাহরণ। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ অনুযায়ী বাড়িওয়ালা নিয়ন্ত্রকের লিখিত আদেশ ছাড়া এক মাসের বেশি অগ্রিম বা জামানত নিতে পারবেন না। বাড়িওয়ালাকে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে লিখিত চুক্তি করতে হবে এবং ভাড়ার রশিদ দিতে হবে। হঠাৎ করে বাসাভাড়া বৃদ্ধি করা যাবে না, ভাড়া বাড়াতে হলে নির্দিষ্ট সময় আগে নোটিশ দিতে হবে। অবৈধভাবে ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করা যাবে না; যৌক্তিক কারণ এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। আইনে আরও বলা আছে- ভাড়াটিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পানি, বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব অপরাধের জন্য কোন বাড়িওয়ালাকে শাস্তির মুখোমুখি করা হয়েছে এমন খবর শুনা যায়নি। ঢাকার বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন যেন কাগুজে অলংকারে পরিণত হয়েছে। কোনো নোটিশ ছাড়াই ভাড়া বাড়ানো, একমাসের ভাড়ার নামে তিন-চার মাসের অগ্রিম নেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে লিখিত রসিদ ছাড়াই মালিক ভাড়া আদায় করেন। কোনো নোটিশ বা যৌক্তিক কারণ ছাড়াই হঠাৎ ভাড়া বাড়িয়ে দেন। অধিকাংশ বাসা ভাড়া হয় মৌখিক চুক্তিতে। ফলে এখানে ভাড়াটিয়া আইনী অধিকার সুরক্ষিত হয় না। বাড়িওয়ালার ইচ্ছেমতো উচ্ছেদ করে দেন। আইনের কোন তোয়াক্কা করেন না। প্রতিবাদ করলেই ‘‘পছন্দ না হলে বাসা ছেড়ে দিন’’ এ চিত্রই এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। অথচ জরিপ অনুসারে ঢাকার অন্তত ৮০ শতাংশ ভাড়াটিয়া তাদের আয়ের ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ এবং ক্ষেত্রবিশেষে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ি ভাড়ার পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হন। এ প্রবণতা এভাবে অব্যাহত থাকলে ভাড়াটিয়ার জীবনে দুঃসহ যন্ত্রণা আরও বাড়বে।
মালিকপক্ষ বাসা ভাড়া বাড়াবে, এটাই স্বাভাবিক! তবে আইন মেনে তা করা প্রয়োজন। আমরা দেখি গ্যাসের দাম, বিদ্যুতের দাম ও পানির দাম সরকার বাড়ালেই বাড়িওয়ালারা বিনা নোটিশে বাসা ভাড়া বাড়িয়ে দেন। মালিকপক্ষ বাসা ভাড়া দিয়ে আয় করেন। কিন্তু সরকারকে রাজস্ব দিতে নারাজ। শতভাগ রাজস্ব সঠিকভাবে দেন এমন মালিক পাওয়া মেলা ভার। সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো-বাসা ভাড়া বাড়ে, কিন্তু সেবার মান বাড়ে না। পানির সমস্যা, লিফট বিকল, নিরাপত্তাহীনতা কোনো কিছুই মালিক পক্ষ থেকে সমস্যার সমাধান করা হয় না। এমনকি ভাড়াটিয়া বাসায় উঠার পর সকল ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী নষ্ট হয়ে গেলে ভাড়াটিয়াকে ব্যয় বহন করতে হয়। মালিকপক্ষ কিছুই ঠিক করে দেয় না। বাসার যত প্রকারের ব্যয় আছে তা সব ভাড়াটিয়াকে বহন করতে হয়। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে একটি কমন উত্তর আসে-‘‘পোষলে থাকুন, না পোষলে চলে যান।’’
রাজধানী ঢাকা বাসা ভাড়া বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ। সারাদেশ থেকে কর্মসংস্থানের আশায় মানুষ ঢাকামুখী। এতে আবাসনের তুলনায় জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাড়িওয়ালা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছে। কারণ এগুলো দেখার কেউ নেই। ভেজাল বিরোধী অভিযান চালিয়ে সরকার যেভাবে জরিমানা আদায় করে সেভাবে যদি বাসা ভাড়ার বিষয়টি দেখার জন্য অভিযান পরিচালনা করতেন তাহলে বাসাভাড়ার নৈরাজ্য কিছুটা হলেও কমতো।
মালিক ও ভাড়াটিয়ার সম্পর্ক যাতে অবনতি না ঘটে, সে লক্ষ্যে সরকার ১৯৯১ সালে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করেছিল। এমনকি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ অর্থদণ্ডের বিধান থাকা সত্ত্বেও বাসা ভাড়ার নৈরাজ্য কমছে না। অথচ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা আছে। বাড়িওয়ালারা যে পরিমাণ ভাড়া আদায় করেন, সে অনুযায়ী রাজস্ব কর দেন কি না- সে বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন। প্রয়োজন পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বকেয়া আদায়ের মতো অভিযান পরিচালনা করা, যেন ভাড়াটিয়াদের অধিকার সুরক্ষিত হয়। পাশাপাশি বাসাভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে রাজধানী ঢাকা শুধু বসবাসের অযোগ্য শহরেই তকমা বয়ে বেড়াবে। বাসা ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে সরকার উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে, এমনটিই ভাড়াটিয়াদের প্রত্যাশা।
লেখক : প্রাবন্ধিক।