মো: রাসেল হোসাইন
নিতান্তই একজন গৃহবধূ ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া সেখান থেকে হলেন সাবেক তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার, মা তৈয়বা মজুমদার। খালেদা জিয়ার বাবা ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে দেশ ভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। তার আদি বাড়ি ফেনীতে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা মরহুম প্রেসিডেন্ট ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।
১৯৮১ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়াকে রাজনীতির অঙ্গণে আসতে হয়। রাজনীতির চৌকাঠ মাড়াতে হবে কোনোদিন হয়তো সে কথা কল্পনাতেও ছিল না। বিএনপির চেয়ারপার্সন হিসেবে টানা প্রায় ৪১ বছর দায়িত্ব পালন করছেন খালেদা জিয়া । ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগদান করেন খালেদা জিয়া। তিনি ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন।
বিএনপির নেতৃত্ব নেয়ার পর ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলনের সূচনা করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের জোট এরশাদ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তবে খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তে বিএনপির জোট নির্বাচনে অংশ না নিয়ে নয় বছর রাজপথের আন্দোলনে থাকায় খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’ এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। তৎকালীন এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়াকে তিনবার গ্রেপ্তার হতে হয়।
পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সব দলের অংশ গ্রহণে নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন। এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান তিনি। খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার এবং ২০০১ সালে জোটগতভাবে নির্বাচন করে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। কর্মসংস্থানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে তার সরকারের সিদ্ধান্তগুলো ছিল বৈপ্লবিক। দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালুর মাধ্যমে দেশের নারীশিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আসে। এই কর্মসূচি নারীদের কর্মজীবন ও সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও এটি একটি সফল ‘রোল মডেল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানি-বণ্টনের সমস্যা উত্থাপন করেন যাতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অংশ পায়। ১৯৯২ সালে তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হলে সেখানে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যা উত্থাপন করেন এবং পরে মিয়ানমার সরকার ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি করে।
১৯৭৭ সালে তার স্বামী জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি হিসেবে জাতীয়ভাবে পরিচিত হন। আর পরবর্তীতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশের সরকারপ্রধান হন। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র নারী, যিনি একই সঙ্গে ‘ফার্স্ট লেডি’ এবং পরে ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। ১৯৭৫ সালের পর দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু ছিল। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে বেগম খালেদা জিয়া দ্বাদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনেন। রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা বহাল রেখে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুযোগ থাকলেও তিনি সংসদকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরিয়ে দেনÑ তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রেকর্ড হলো তিনি জীবনে কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং প্রতিটি আসনেই বিজয়ী হন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভিন্ন ভিন্ন এতগুলো আসন থেকে নির্বাচন করে শতভাগ সাফল্যের নজির আর কারও নেই। একসময় দেশের নির্বাচনী আইনে একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন। সেই সুযোগে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন) ও ২০০১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি করে মোট ১৫টি আসনে দাঁড়িয়ে সবকটিতেই জয় পান। অর্থাৎ তিনি টানা তিন নির্বাচনে পাঁচ আসনে জয়ের বিরল ‘হ্যাটট্রিক’ করেন। আইন পরিবর্তনের পর ২০০৮ সালে তিনি তিনটি আসনে প্রার্থী হয়ে তিনটিতেই নির্বাচিত হন।
খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের ওপর বড় ঝড় আসে ২০০৭ সালের এক-এগারোর পর। সে সময় সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে। খালেদা জিয়া, তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় বিএনপিকে ভাঙার, খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার নানা চেষ্টা করা হয়। সেনাসমর্থিত ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়াকে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘদিন কারাবাসের পর তিনি আইনি লড়াই করে সবকটি মামলায় জামিন নিয়ে মুক্তি পান। কারাগারে থাকাকালে তাকে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি যেতে অস্বীকার করেন। পরে খালেদা জিয়া নিজেই বলেন, ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নাই, এটাই (বাংলাদেশ) আমার ঠিকানা। এই দেশ, এই দেশের মাটি-মানুষই আমার সবকিছু। কাজেই আমি দেশের বাইরে কোথাও যাব না।’
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তিনি ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হন। এরপর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুক্তি পান খালেদা জিয়া। ৭ আগস্ট রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির এক সমাবেশে খালেদা জিয়া একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও বক্তব্য দেন। গণ-অভ্যুত্থানে তরুণদের স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আসুন, ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়, ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।’
দেশের স্বার্থে সমমনা বা বিপরীত মতাদর্শের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে কার্পণ্য ছিল না বেগম খালেদা জিয়ার। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ৭দলীয়,৪দলীয়, পরবর্তী সময় ২০দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন, যা দেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে আছে।
বেগম খালেদা জিয়া শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি নন, নিজ কর্মগুণে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে উঠেছেন দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে। শেষ জীবনে এসে তিনি দল-মতনির্বিশেষে সবার কাছে সম্মান ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে মহাকালের সমাপ্তি ঘটিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
লেখক : প্রাবন্ধিক।