রিশাদ আহমেদ

ঢাকার ব্যস্ততম বিজয়নগরে রোদেলা দুপুরে, জুমার নামাজের পর ঘটে যাওয়া হামলার দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় যে সাহসিকতার সঙ্গে বিপদও কতো ঘনিষ্ঠ। ওসমান হাদীর ঘাড় ও চোয়ালকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলী চালানো হয়-কোনো সাধারণ হুমকি নয়, বরং প্রাণনাশের চেষ্টা। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি ভিক্টোরি সাইন দেখান, যেন বলছেন, “গুলী করে দেহ ছিদ্র করা যায়, কিন্তু আদর্শকে হত্যা করা যায় না।” এই দৃশ্য শুধু তার ব্যক্তিগত সাহসিকতার পরিচায়ক নয়, বরং বিপ্লবীদের ‘হার না মানা’ মানসিকতার প্রতীক।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তার প্রার্থিতা এই হামলার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। পল্টন-মতিঝিল এলাকা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তার জনপ্রিয়তা এবং ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র হিসেবে অবস্থান তাকে অনেকের চোখে শত্রুতে পরিণত করতে পারে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করে যে আদর্শিক অবস্থান তিনি নিয়েছেন, তা সহজে মেনে নেবে না কেউ। একটি গোষ্ঠী বিজয়নগরের রাজপথে ঝরা রক্ত কি তবে নতুন কোনো যুদ্ধের ডাক দিচ্ছে, তা ভাবতে বাধ্য করে।

জুলাই বিপ্লবের পর যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান থেকে সরকার বা প্রশাসন কতটা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তা স্পষ্ট নয়।

পুরনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থার ছায়া এখনও কি প্রশাসনের কোষে থেকে যাচ্ছে, নাকি নতুন সুবিধাবাদী গোষ্ঠী তাদের পায়তারা চালাচ্ছে, তা আলোচনার বিষয়। এর আগেও ছোটখাটো হামলার ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সেগুলোর বিচার হয়নি। তাই এই হামলা কি সেই বিচারহীনতার চূড়ান্ত রূপ, তা বলা যেতে পারে।

ওসমান হাদীর বক্তৃতার ধরণ এবং স্পষ্টবাদী বক্তব্য তার প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তিনি কখনো রাজপথে বা টকশোতে আপস করেন না। তার কণ্ঠ রোধ করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে নিঃশব্দ করা নয়, বরং পুরো প্রতিবাদী প্রজন্মকে বার্তা দেওয়া-“চুপ থাকো, নইলে পরিণতি খারাপ হবে।” এ কারণেই তার ওপর হামলার ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, এটি আদর্শের বিরুদ্ধে আঘাত।

রাজপথের এই রক্তঝরা ঘটনা সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মানুষ এখন প্রশ্ন করছে, কোন রাজনৈতিক মহল এ ধরনের পরিকল্পিত হামলার পেছনে থাকতে পারে। রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব এবং রাজনৈতিক সহিংসতার পুনরাবৃত্তি এই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। তাই জনগণ চায় অবিলম্বে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে খুনিদের গ্রেপ্তার করতে হবে। ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শুধুমাত্র বাক্য নয়, এটি বাস্তবে দেখতে চায় ছাত্র-জনতা।

এজন্য সমাধানের পথও স্পষ্ট। প্রশাসনকে এখন দ্রুত এবং স্বচ্ছভাবে কাজ করতে হবে। শুধু তৎপরতা নয়, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বিচারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা ছাড়া জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। একজন ওসমান হাদীকে গুলী করে থামানো গেলেও তার আদর্শ বা ‘ইনকিলাব’-এর স্লোগান থামানো যাবে না।

ওসমান হাদীর ওপর হামলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ কেবল রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়, এটি সাহসিকতার লড়াই। যদি এই রক্ত বৃথা যায় বা বিচার না হয়, তবে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ব্যর্থ হওয়ার পথে যাবে। তাই এখন সময়ের দাবি, সতর্কবার্তার এবং আহ্বানের-যাতে প্রতিটি বিপ্লবী মনে রাখে, আদর্শকে হত্যা করা যায় না, এবং নতুন যুদ্ধের ডাক যে রাজপথে এসেছে তা নিশ্চয়ই কেউ নীরবে দেখবে না।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।