এডভোকোট সাবিকুন্নাহার মুন্নী

যে কোন আলোচনা বা টকশোতে যেখানেই যাইনা কেন প্রশ্ন শুধু একটাই- “ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াত কেন কোন নারী প্রার্থী দেয়নি?” এই ইস্যু ছাড়া মনে হয় দেশে আর কোন ইস্যু নেই। অথচ ভোটের মাঠে এ নারীদের উপর কি ধরনের সহিংসতা, হুমকি-ধমকি, ফিজিক্যাল অ্যাটাক, সাইবার অ্যাটাক হচ্ছে এগুলো নিয়ে কোন মিডিয়া বা নারী সংগঠনগুলোর মাথা ব্যাথা নেই, প্রশ্ন নেই। অথচ তাদের মুখেই সবচেয়ে বেশি নারী স্বাধীনতার বয়ান শোনা যায়। শত শত কোটি টাকার ঋণ খেলাপিরা জনগণের টাকা আত্মসাৎ করার পরেও কিভাবে নেমিনেশন পেল? শুধুমাত্র একটি দলেই ৩৯ জন ঋণ খেলাপিকে কিভাবে প্রার্থী করা হলো? সুজনের তথ্য মতে বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে ১৬৭ জনই ঋণ গ্রহীতা। বছরে কোটি টাকার বেশি আয় করেন এমন প্রার্থীদের মধ্যে ৫১ জনই বিএনপির। বগুড়ায় এ দলেরই আরেকজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী কমপক্ষে ৬০০ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নিয়ে নির্বাচনী হলফনামায় কি করে তথ্য গোপন করলো?

জনগণের আমানত যারা মেরে খায় তারা জনগণকে কী সার্ভিস দিবে? টিআইবির রিপোর্টে এ পর্যন্ত সংঘটিত সন্ত্রাসের ৯২% কোন্ দলের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। এগুলো নিয়ে মিডিয়ায় তেমন কোন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না। রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের এমডি ও তার স্ত্রী কর্তৃক ১১ বছরের শিশু মোহনা কেন এমন নির্মম নির্যাতনের শিকার হলো?

মিরসরাইয়ে ৭ম শ্রেণির ছাত্রীটি ছাত্রদল নেতা ইমাম হোসেন কর্তৃক গণধর্ষণের শিকার ও গাজীপুরে সাবেক ছাত্রদল নেতা কর্তৃক প্রকাশ্যে নারী ব্যবসায়ীকে কেন কুপিয়ে হত্যা করা হলো? এগুলো নিয়ে মিডিয়ার কোন হৈচৈ নেই। শুধু একটাই প্রশ্ন, জামায়াত কেন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কোন নারী প্রার্থী দিলনা। জামায়াত কেন এবার কোন নারী প্রার্থী দিলনা! আর জামায়াতের নারীরা কেন এমন লোভনীয় অফার নিলনা?

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দল নয়, পরিপূর্ণ ইসলামী আন্দোলনের নাম। একটি আদর্শবাদী আন্দোলোন পরিচালনার মূলভিত্তি হচ্ছে আল কুরআন ও সুন্নাহ্। বাস্তবতা বিবেচনায় কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক দিক অনুসরণ করে ইজমা ও কিয়াসের অবসন রাখা হয়েছে। সে অর্থে ইসলামে যেমন কোন বিষয়ে কোন রিজিডিটি নেই, আবার কোন বিষয়ে চরম পন্থারও সুযোগ নেই। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায় সকলের কাছে যে প্রশ্নটি ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে তা হলো-জুলাই সনদে স্বাক্ষরিত একটি দল হয়েও জামায়াত কেন এবারের নির্বাচনে কোন নারী প্রার্থী দিল না। না দেবার কারণ হিসেবে আমার কাছে। যে যুক্তিগুলো কাজ করেছে সেগুলো হলো-

১। অন্যান্য দলে নারী প্রার্থী দেয়া যত সহজ জামায়াতের পক্ষে পর্যাপ্ত যোগ্য নারী প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি তত সহজ ছিল না। নারী প্রার্থী দেয়া বা না দেয়া, জামায়াতের জন্য উভয় সংকট। নারী প্রার্থী না দিলেও বলা হচ্ছে জামায়াতে নারীদের কোন একসেস দিচ্ছে না। আবার দিলেও একটা গ্রুপের প্রপাগান্ডা ছড়াবে যে, জামায়াত ইসলাম মানে না। ইসলামী দল হয়ে জামায়াত কিভাবে নারী প্রার্থী দিল, জামায়াতের ইসলাম মওদূদীর ইসলাম ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও তা ইসলামে নিষেধ নেই। একটা সময় এমন ছিল পর্দাশীল নারীরা রাজনীতি করতে পারবে না। আজ ইসলাম প্রিয় নারী সমাজের মাঝে রাজনীতি সচেতনতা, এটা জামায়াতেরই ক্রেডিট বলা যায়। অন্যান্য নারীদের জন্য সকল কিছুর একসেস থাকলেও পর্দাশীন নারীদের জন্যই যেন শুধু বার। এ ধরনের সোশিও কালচারাল পরিবেশ তৈরিতে জামায়াত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

২। জামায়াত ১১ দলীয় জোটে নির্বাচন করছে। এ ক্ষেত্রে জোটের বিভিন্ন দলের মাঝে আসন বন্টনের কারণে দলের নারীরা অনেকটা স্বপ্রণোদিত হয়েই জাতীয় স্বার্থে সেক্রিফাইস করেছে।

৩। জামায়াতে যে কোন সিদ্ধান্ত পরামর্শভিত্তিক ও বাস্তবভিত্তিক বিবেচনায় গ্রহণ করা হয়। তাই অন্যান্য দলের মত শুধু নারী কোটা ফিলাপ করাই মূখ্য উদ্দেশ্য নয়। যেহেতু ভোটের মাঠ খুবই কম্পিটিটিভ। তাই জামায়াত এমনভাবে নারী প্রার্থী দিতে চায় যেখানে ১০০% নিশ্চিত জিতে আসবে।

বিগত স্বৈরাচারের সময়ে দমন পীড়নের কারণে জামায়াতের নারী নেতৃত্ব ফ্রন্টে আসার কোন সুযোগ পায়নি। তাই ভোটের মাঠে প্রার্থীর জিতে আসার শর্ত হিসেবে ভোটারের মাঝে যে ব্যাপক পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজন, তেমনি জেতার জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তাসহ প্রচারণার নিরাপদ পরিবেশ। যেটা এখনও তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক সুস্থ পরিবেশ ব্যতিরেকে নির্বাচনে নারীর নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শুধুমাত্র ক্যাম্পেইন করতে গিয়ে সারাদেশে নারীরা যে পরিমান হেনস্তার শিকার হয়েছে বা হচ্ছে, আর নমিনি হলে তো কথাই নেই। রাত বিরাতে একজন নারী প্রার্থীর নির্ভয়ে প্রচারণার কি কোন পরিবেশ আছে?

নির্বাচন ঘনিয়ে আসলো অথচ আমরা নির্বাচনী লেভেল প্লেইং ফিল্ড দেখতে পেলাম না। নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশে কি পরিমান সহিংসতা হচ্ছে তা সচেতন বিবেকবান নাগরিক সমাজ দেখতে পাচ্ছেন।

৪। জামায়াত আভ্যন্তরীণ ডেমোক্রেসির চর্চা করে বলেই নারীদের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত উপর থেকে চাপিয়ে দেয়নি বরং এডভাইজারি কমিটির ম্যাক্সিমাম নারীরা সার্বিক বিচারে এবারের নির্বাচনে নমিনি দেবার ক্ষেত্রে মত দেয়নি।

আমি মনে করি ক্ষমতার রাজনীতিতে এ ঘটনা বিরল। যেখানে অন্যান্য দলে মনোনয়ন বঞ্চিত নারীদের আমরা মিডিয়ার সামনে এসে কাঁদতে দেখেছি, বহিষ্কার হতে দেখেছি। জামায়াতে কোন মনোনয়ন বাণিজ্য নেই। এখানে নারীরা নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে দল ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাস্তবতার আলোকে মতামত প্রদান করেছে। যা এপ্রিসিয়েসন পাবার যোগ্য। জামায়াতের উচ্চতর বডি তাদের মতামতকে সম্মান করেছে।

৫। জামায়াত জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী অন্যতম একটি দল হিসেবে সবার আগে রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের সংস্কার চায়। তাই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হলে জামায়াত জুলাই সনদে বর্ণিত মিনিমাম ৫% নারী অংশগ্রহণই নয় বরং সর্বোচ্চ ৩৩% ই ফিলাপ করবে ইনশাআল্লাহ্!

জামায়াত নারীর প্রতি সংবেদনশীল ও নারীবান্ধব এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবে যেখানে নারীদের অধিকার এ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নারী কন্ঠই উচ্চকিত হবে না, পুরুষেরাও হবেন সহযোদ্ধা ও সহকর্মী।

জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে আগামী ৫ বছরে ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে, যা প্লেটোর ইউটোপিয়া (স্বর্গরাজ্য) নয় বরং বাস্তবায়ন যোগ্য একটি ওয়েলফেয়ার স্টেইট, যেখানে নারী স্বাধীনভাবে নিরাপত্তার সাথে বিচরণ করবে-

টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, / রুপসা থেকে পাথুরিয়া,

আগামী ১২ তারিখে জাতির সে ভাগ্যই নির্ধারিত হবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক : আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক।