একজন শিশুর হাতে থাকার কথা বই, চোখে থাকার কথা স্বপ্ন, আর মুখে থাকার কথা নিষ্পাপ হাসি। কিন্তু আজ শিশুরা সহিংসতা, অবহেলা আর নৃশংসতার শিকার। শিশুর নরম দেহে এমন নিষ্ঠুরতা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের মূল্যবোধ, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিক শিক্ষার গভীর সংকটের প্রতিফলন। বহু আগে সুকান্ত ভট্টাচার্য শিশুর জন্য নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে যেতে চেয়েছিলেন। তিনি তার কবিতায় শিশুদের আশ্রয়ের জন্য আবেদন করে গিয়েছেন। কিন্তু এখন অবস্থাটা সম্পূর্ণ বিপরীত। এ সমাজ যেন কোমলমতি শিশুদের সহ্যই করতে পারছে না। এ প্রশ্নটা কেবল আমার নয়! এটি সবার, কেন শিশুর প্রতি এই নিষ্ঠুরতা? কোথায় হারিয়ে গেছে মানবিকতা, সহমর্মিতা, স্নেহ-মায়া ভালোবাসা আর মমত্ববোধ। আর কেন-ই বা বড়দের ক্রোধের বিকৃত মানসিকতার বোঝা বহন করতে হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা কতটা অমানবিক তার চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই দেখা যায় শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতার নির্মম ছবি। সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাফিকুর রহমানের বাসায় শিশু গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিওতে দেখা যায়-শিশুটির শরীরজুড়ে আগুনে পোড়া ক্ষত, গলা, মুখ ও হাতে নির্যাতনের মির্মম চিহ্ন। অসহনীয় যন্ত্রণায় সে ছটফট করছে; কন্ঠে শব্দ নেই, চোখে শুধু আতঙ্ক আর অসহায় আর্তনাদ-যেন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে, আমরা কতটা মানুষ হতে পেরেছি?
আমরা এক কঠিন সময় অতিক্রম করছি। কোথাও যেন এতটুক স্বস্তি নেই, যেখানে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে বলা যায় আমরা ভালো আছি। আমরা এখনো মানুষ আছি। আমাদের হৃদয় আছে, কিন্তু সেই হৃদয়ের গভীরে যে ভালোবাসা থাকার কথা, সেখানে যেন ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে হিংস্রতা ও নিষ্ঠুরতা। তা না হলে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সাবেক শীর্ষ পদাধিকারীর ঘরেই একজন শিশু গৃহকর্মী এমন নির্মম নির্যাতনের শিকার হয় কিভাবে? রাষ্ট্রের উচ্চপদে থাকা একজন ব্যক্তির বাসভবন যদি একটি শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় না হয়, তবে সে নিরাপত্তা পাবে কোথায়? যার হাতে ছিল একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব, তাঁর গৃহেই যদি বর্বরতার স্টিম রোলার নেমে আসে একটি শিশুর ওপর, তবে তা নিছক ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর ওপর এক ভয়াবহ প্রশ্নচিহ্ন। ক্ষমতা ও মর্যাদার আবরণ যদি এমন অমানবিকতাকে আড়ালে করে রাখে, তবে আমাদের মূল্যবোধের ভিত যে কতটা নড়বড়ে-তা অনুধাবন করা জরুরি। গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এক অসহায় বাবার আর্তনাদ কাগজে রূপ নেয় মামলার এজাহারে। রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর অধীনে তিনি মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বিথীসহ চারজনকে গ্রেফতার করে আদালতে তোলা হয়। কিন্ত প্রকৃত বিচার যেন শুরু হয় বিচারকের কন্ঠে। বিচারক বলেন,‘বাংলাদেশের জনগণ যাতে জানতে পারে, ভুক্তভোগী যে অবস্থান থেকে এই স্টেটমেন্ট দিয়েছে, আমি তা শোনাচ্ছি।’’ আদালতঘর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তারপর যে বিবরণ উঠে আসে- তা কোনো কল্পকাহিনী নয়, কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়; এটি আমাদের সময়ের নির্মম বাস্তবতা। একটি শিশুর মুখ থেকে গলা পর্যন্ত পোড়ার লম্বা দাগ। কপালে লাঠির আঘাত। হাতে দগদগে ক্ষত। পায়ের রানে খুন্তির ছ্যাঁকা। পিঠজুড়ে অসংখ্য প্রহারের চিহ্ন। খুন্তি দিয়ে মারধর, চোখের ভেতর মরিচের গুঁড়া-যেন যন্ত্রণা আরও গভীর করে তোলার এক নিষ্ঠুর আয়োজন। দিনের পর দিন তাকে বাথরুমে আটকে রাখা হতো। পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না। দীর্ঘ সময় পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পায়ে পচন ধরে যায়। শীতের পুরো সময়েও তাকে দেয়া হয়নি শীতবস্ত্র। ক্ষুধার তাড়নায় সে বাথরুমের টুথপেস্ট খেয়েছে, টয়লেটের পানি পান করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছে। তাকে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল বাথরুম ও তার আশপাশের সংকীর্ণ পরিসরে যেন সে মানুষ নয়, অবাঞ্ছিত কোনো বস্তু। সুযোগ পেলেই বাঁশের লাঠি দিয়ে প্রহার করা হতো। হাসপাতাল থেকে ফেরার পরও তার জ¦র যায়নি, মাথাব্যথা যায়নি। যায়নি আতঙ্ক, যায়নি কান্না। বিচারকের কণ্ঠে যখন এই বিবরণ উচ্চারিত হচ্ছিল, আদালতে উপস্থিত অনেক আইনজীবীর চোখ ভিজে উঠেছিল। কিন্ত প্রশ্ন একটাই- কাঁদলেই কি দায় শেষ? আমরা কি কেবল দর্শক হয়ে থাকব? একটি শিশু যখন গৃহকর্মী হয়, তখন কি সে তার শৈশব হারায়-নাকি আমরা তার শৈশব কেড়ে নিই? এ ঘটনা শুধু একজন শিশুর ওপর নিষ্ঠুরতার দলিল নয়, এটি আমাদের সমাজের বিবেকহীনতার নির্মম সাক্ষ্য।
শিশু সহিংসতা কোনো একক কারণের ফল নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সব স্তরের সম্মিলিত ব্যর্থতার বহি:প্রকাশ। পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব ও বিবাহবিচ্ছেদের জেরে অনেক সময় শিশুরাই হয়ে ওঠে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের লক্ষ্যবস্ত। কোথাও শিশুকে ‘বোঝা’ মনে করে নির্যাতন করা হয়, কোথাও বা নির্মমভাবে হত্যা পর্যন্ত করা হয়। নিকট অতীথে সিলেটে শিশু সামিউল আলম রাজনকে বর্বর নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। মাগুরায় ৮ বছরের এক শিশু বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। শুধু রাজন হত্যা নয়- প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় শিশু নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। কিছুদিন আলোচনা, সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ, তারপর নীরবতা। আর এই নীরবতার ফাঁক গলেই বাড়ছে শিশু নিপীড়নের সংখ্যা।
বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সবখানেই শিশুরা কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ শিশু জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে সহিংস আচরণের শিকার হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্যাতনকারীরা অপরিচিত নয়; বরবং বাবা-মা, নিকট আত্মীয়, শিক্ষক কিংবা প্রতিবেশী-অর্থাৎ যাদের ওপর শিশুর আস্থা থাকা কথা, তারাই হয়ে ওঠে ভয়ের কারণ। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ৯০৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২০২৪ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৫৮০ জন এবং ২০২৩ সালের জানুয়ারি-অক্টোবর সময়ে ছিল ৯২০ জন। ২০২৫ সালে বাড়িতে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ১৮টি; শিক্ষকদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয় ৮১ জন; শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় ৯৯ জন শিশু। পাঁচ বছরের নিচে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১০৬ জন। একই বছরে বিভিন্ন কারণে হত্যা করা হয়েছে ৩৫৯ শিশুকে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৮২ এবং ২০২৩ সালের প্রথম দশ মাসে ছিল ৪২১ জন। এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি ভাঙা শৈশব, একটি আতঙ্কিত চোখ, একটি নীরব কান্না। অথচ দেশের আইন সুস্পষ্ট। কোনোভাবেই কোনো শিশুর ওপর নিষ্ঠুরতা চালানোর সুযোগ নেই। শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি তার হেফাজত, দায়িত্ব বা পরিচর্যার থাকা শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন বা অবহেলা করে এবং এর ফলে শিশুর অযথা দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, কিংবা তার দৃষ্টি, শ্রবণশক্তি বা শরীরের কোনো অঙ্গ-প্রত্যক্ষের ক্ষতি হয় বা মানসিক বিকৃতি ঘটে-তাহলে তিনি অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড, অথবা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। প্রশ্ন হলো-আইন যখন আছে, পরিসংখ্যান যখন ভয়াবহ বাস্তবতা সামনে আনছে, তখনও কেন থামছে না এই সহিংসতা? সমস্যা কি আইনের প্রয়োগে নাকি আমাদের মানসিকতায়?
শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা চালানোর কোনো সুযোগ নেই-না আইনে, না নৈতিকতায়। এমনকি গর্ভধারণী মাতাও শাসনের নামে সন্তানের ওপর নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারেন না। শিশুর প্রতি আচরণ কেমন হবে, তার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে শিশু আইন,২০১৩ এ। এই আইনে শিশুর সুরক্ষা, কল্যাণ ও মর্যাদা রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। পারিবারিক পরিমণ্ডলেও কোনো শিশু যদি নির্যাতনের শিকার হয় তবে সে আইনের আশ্রয় নিতে পারে। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ এর অধীনে শিশুও সুরক্ষা ও প্রতিকার পাওয়ার অধিকারী। অর্থাৎ পরিবার নামের নিরাপদ আশ্রয়স্থলও যদি নির্যাতনের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবে রাষ্ট্র সেখানে নীরব দর্শক নয়। শিক্ষাঙ্গনেও শাস্তির নামে সহিংসতার কোনো স্থান নেই।
২০১০ সালে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও আইন ও সালিস কেন্দ্র (আসক) এর দায়ের করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি প্রদানে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পরবর্তীতে সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিতকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করে। ফলে আইনি ও নীতিগত উভয় দিক থেকেই শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অতএব ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত, মানবিক ও সাহসী নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শিশুর প্রতি যেকোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। আইন শুধু কাগজে থাকলেই চলবে না-তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই সময়ের দাবি। শিশুর নিরাপত্তা মানেই জাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষা- এটাই হোক রাষ্ট্র ও সমাজের অঙ্গীকার।