জাফর আহমাদ

সমাজ সংসারে যারা ভদ্র-মার্জিত ও রুচিশীল ব্যক্তি তাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা অহংকার করে না,সমাজে বুক ফুলিয়ে চলে না। গর্বিত স্বৈরাচারী ও বিপর্যয়কারীর মতো নিজের চলার মাধ্যমে নিজের শক্তি প্রকাশ করার চেষ্টা করে না। বরং তাদের চালচলন হয় সুন্দর, মার্জিত ও সৎস্বভাব সম্পন্ন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “রহমানের (আসল) বান্দা তারাই যারা পৃথিবীর বুকে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং মূর্খদের সালাম বলে এডিয়ে যায়।” (সুরা ফুরকান : ৬৩) নম্রভাবে চলার মানে দুর্বল ও রুগীর মতো চলা নয় এবং একজন প্রদর্শন অভিলাষী নিজের বিনয় প্রদর্শন করার বা নিজের আল্লাহ ভীতি দেখাবার জন্য যে ধরনের কৃত্রিম চলার ভংগী প্রদর্শন করে সে ধরনের কোন চলাও নয়। নবী (সা:) নিজে চলার সময় এমন শক্তভাবে পা ফেলতেন যেন মনে হতো উপর থেকে ঢালুর দিকে নেমে যাচ্ছেন। হযরত উমার (রা:) সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছে, তিনি এক যুবককে দুর্বলভাবে হেঁটে যেতে দেখে তাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি অসুস্থ। সে বলল, না। তিনি ছড়ি উঠিয়ে তাকে ধমক দিয়ে বলেন, শক্ত হয়ে সবল ব্যক্তির মতো চলো। এ থেকে জানা যায়, নম্রভাবে চলা মানে, একজন ভালো মানুষের স্বাভাবিকভাবে চলা। কৃত্রিম বিনয়ের সাহায্যে যে চলার ভংগী সৃষ্টি করা হয় অথবা যে চলার মধ্যে দিয়ে দীনতা ও দুর্বলতার প্রকাশ ঘটে তাকে নম্রভাবে চলা বলে না।

মানুষের চলার মধ্যে এমন কি গুরুত্ব আছে যে কারণে আল্লাহর সৎ বান্দাদের বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ প্রসংগে সর্বপ্রথম এর কথা বলা হয়েছে। এ প্রশ্নটিকে যদি একটু গভীর দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে বুঝা যায় যে, মানুষের চলা শুধুমাত্র তার হাঁটার একটি ভংগীর নাম নয় বরং এটি হয় তার মন-মানস, চরিত্র ও নৈতিক কার্যাবলীর প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। একজন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তির চলা, একজন গুণ্ডা ও বদমায়েশের চলা, একজন স্বৈরাচারী ও জালেমের চলা, একজন অত্মম্ভরী অহংকারীর চলা, একজন সভ্য-ভব্য ব্যক্তির চলা, একজন দরিদ্র-দীনহীনের চলা এবং এভাবে অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের লোকদের চলা পরস্পর থেকে এত বেশী ভিন্ন হয় যে, তাদের প্রত্যেককে দেখে কোন ধরনের চলার পেছনে কোন ধরনের ব্যক্তিত্ব কাজ করছে তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। কাজেই আয়াতের মূল বক্তব্য হচ্ছে, রহমানের বান্দাদের তোমরা সাধারণ লোকদের মধ্যে চলাফেরা করতে দেখেই তারা কোন ধরনের লোক পুর্ব পরিচিত ছাড়াই আলাদাভাবে তা চিহ্নিত করতে পারবে।

এতজন ভদ্র-মার্জিত ও সৎ স্বভাব সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব আল্লাহর আনুগত্য তাদের মানসিকতা ও চরিত্র যেভাবে তৈরী করে দিয়েছে তার প্রভাব তাদের চালচলনেও সুস্পষ্ট হয়। একজন ব্যক্তি তাদের দেখে প্রথম দৃষ্টিতে জানতে পারে, তারা ভদ্র, ধৈর্যশীল ও সহানুভূতিশীল হৃদয়বৃত্তির অধিকারী, তাদের দিক থেকে কোন প্রকার অনিষ্টের আশঙ্কা করা যেতে পারে না। তারা ক্ষমতাবান হয়েও তারা ক্ষমতাগর্বী ও অহংকারীর মতো আচরণ করে না। কারণ আল্লাহ এমনটি করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যমীনে দম্ভভরে চলো না। তুমি না যমীনকে চিরে ফেলতে পারবে, না পাহাড়ের উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারবে।” (সুরা বনী ইসরাইল : ৩৭) কুরআনের এই ঘোষণার ফলে মদীনা তাইয়্যেবার ইসলামী রাষ্ট্রের সাধারণ প্রজাবৃন্দ থেকে সকল শাসক, গভর্ণর ও সিপাহসালার জীবনধারা বদলে গিয়েছিল। তাঁদের জীবনে ক্ষমতাগর্ব ও অহংকারের ছিঁটেফোটাও ছিল না। এমনকি যুদ্ধরত অবস্থায়ও কখনো তাদের মুখ থেকে দম্ভ ও অহংকারের কোন কথাই বের হতো না। তাদের ওঠা বসা, চাল চলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, ঘর বাড়ী, সওয়ারী ও সাধারণ আচার-আচরণের নম্রতা ও কোমলতা দেখা যেতো। যখন তারা বিজয়ীর বেশে কোন শহরে প্রবেশ করতেন তখনও দর্প ও অহংকার সহকারে নিজেদের মানুষের মনে ভীতি বসিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন না।

সমাজের যারা ভদ্র, মার্জিত ও রুচিশীল তারা নিজেদের চাল-চলনে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করেন। অতি নম্রতা ও অতি উগ্রতার মাঝে তারা মধ্যম পন্থার অনুসরণ করেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“নিজেদের চলনে ভারসাম্য আনো এবং নিজের আওয়াজ নীচু করো। সব আওয়াজের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ আওয়াজ হচ্ছে গাধার আওয়াজ।” (সুরা লোকমান : ১৯) এখানে দ্রুত চলা বা ধীরে চলার মধ্যে মধ্যম পন্থা অবলম্বনের কথা বলা হয়নি। অর্থাৎ এ কথা বলা হয়নি যে, “দ্রুতও চলো না এবং ধীরেও চলো না বরং মাঝারি চলো।” সত্যিকারার্থে ধীরে বা দ্রুত চলার মধ্যে কোন নৈতিক গুণ বা দোষ নেই এবং এ জন্য কোন নিয়মও বেঁধে দেয়া যায় না। কাউকে দ্রুত কাজ করতে হলে সে দ্রুত ও জোরে চলবে না কেন। আর যদি নিছক বেড়াবার জন্য চলতে থাকে তাহলে এ ক্ষেত্রে ধীরে চলায় ক্ষতি কি। মাঝারি চালে চলার যদি কোন মানদণ্ড থেকে থাকে, তাহলে প্রত্যেক অবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাকে একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত করা যায় কেমন করে। আসলে এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রবৃত্তির এমন অবস্থার সংশোধন যার প্রভাবে চলার মধ্যে দম্ভ অথবা দীনতার প্রকাশ ঘটে। বড়াই করার অহমিকা যদি ভেতরে থেকে যায় তাহলে অনিবার্যভাবে তা একটি বিশেষ ধরনের চাল-চলনের মাধ্যমে বের হয়ে আসে। এ অবস্থা দেখে লোকটি যে কেবল অহংকারে মত্ত হয়েছে, এ কথাই জানা যায না, বরং তার চাল-চলনের রং ঢং তার অহংকারের স্বরূপটিও তুলে ধরে। ধন-দৌলত, ক্ষমতা-কর্তৃত্ব, সৌন্দর্য, জ্ঞান, শক্তি এবং এ ধরনের অন্যান্য যতো জিনিসই মানুষের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করে তার প্রত্যেকটির দম্ভ তার চাল-চলনে একটি বিশেষ ভঙ্গি ফুটিয়ে তোলে। পক্ষান্তরে চাল-চলনে দীনতার প্রকাশ ও কোন না কোন দূষণীয় মানসিক অবস্থার প্রভাবজাত হয়ে থাকে। কখনো মানুষের মনের সুপ্ত অহংকার একটি লোক দেখানো বিনয় এবং কৃত্রিম দরবেশী ও আল্লাহ প্রেমিকের রূপ লাভ করে এবং এ জিনিসটি তার চাল-চলনে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে। আবার কখনো মানুষ যথার্থই দুনিয়া ও তার অবস্থার মোকাবেলায় পরাজিত হয় এবং নিজের চোখে নিজেই হেয় হয়ে দুর্বল চালে চলতে থাকে। হযরত লোকমান আ: এর উপদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে, নিজের মনের এসব অবস্থার পরিবর্তন করো এবং একজন সোজা-সরল-যুক্তসঙ্গত ভদ্রলোকের মতো চলো যেখানে নেই কোন অহংকার ও দম্ভ এবং কোন দুর্বলতা, লোক দেখানো বিনয় ও ত্যাগ।

আল্লাহর রাসুল (সা:) এর সাথীগণ ছিলেন সবচেয়ে ভদ্র, মার্জিত ও রুচিশীল ব্যক্তিত্ব। তাঁদের রুচি কোন পর্যায়ে গড়ে উঠেছিল তা একটি ঘটনাটি থেকে অনুমান করা যেতে পারে। হযরত উমর (রা:) একবার এক ব্যক্তিকে মাথা হেঁট করে চলতে দেখলেন। তিনি তাকে ডেকে বললেন,“মাথা উঁচু করে চলো। ইসলাম রোগী নয়।” আর একজনকে তিনি দেখলেন যে কুঁকড়ে চলছে। তিনি বললেন,“ ওহে জালেম! আমাদের দীনকে মেরে ফেলছো কেন।’ এ দু’টি ঘটনা থেকে জানা যায় হযরত উমর (রা:) এর কাছে দীনদারীর অর্থ মোটেই এটা ছিল না যে, পথ চলার সময় রোগীর মতো আচরণ করবে এবং অযথা নিজেকে দীনহীন করে মানুষের সামনে পেশ করবে। কোন মুসলমানকে এভাবে চলতে দেখে তাঁর ভয় হতো, এভাবে চললে অন্যদের সামনে ইসলামের ভুল প্রতিনিধিত্ব করা হবে এবং মুসলমানদের মধ্যেই নিস্তেজ ভাব সৃষ্টি হয়ে যাবে।

এমনি ঘটনা হযরত আয়েশা (রা:) এর ব্যাপারে একবার ঘটে। তিনি দেখলেন একজন লোক কুঁকড়ে মুকড়ে রোগীর মতো চলছে। জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে? বলা ইনি একজন কারী অর্থাৎ কুরআন অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা করেন এবং শিক্ষাদান ও ইবাদাত করার মধ্যে মশগুল থাকেন। এ কথা শুনে হযরত আয়েশা (রা:) বললেন, উমর (রা:) ছিলেন কারীদের নেতা। কিন্তু তার অবস্থা ছিল, পথে চলার সময় জোরে জোরে হাঁটতেন। যখন কথা বলতেন, জোরে জোরে বলতেন। যখন মারধর করতেন খুব জোরেশোরে মারধর করতেন।” চাল-চলন ভঙ্গী ও আওয়াজের এক ধরনের নিম্নগামিতা ও উচ্চগামিতা এবং কঠোরতা ও কোমলতা হয়ে থাকে স্বাভাবিক ও প্রকৃত প্রয়োজনের খাতিরে। হযরত লোকমানের নসীহাতের অর্থ এ নয় যে, এ পার্থক্যটা উঠিয়ে দিয়ে মানুষ সবসময় একই ধরনের নীচু স্বরে ও কোমল ভঙ্গীমায় কথা বলবে আসলে আপত্তিকর বিষয়টি হচ্ছে অহংকার প্রকাশ, ভীতি প্রদর্শন এবং অন্যকে অপমানিত ও সন্ত্রস্ত করার জন্য উদ্ধত ভাব ও গলা ফাটিয়ে কথা বলা। যারা ভদ্র, মার্জিত ও রুচিশীল তাদেরকে ইসলাম তাদের মানসিকতা ও চরিত্র এমনভাবে তৈরী করে দেয় যে, তার প্রভাব তাদের চালচলনেও সুস্পষ্ট হয়। এক ব্যক্তি তাদের দেখে প্রথম দৃষ্টিতে জানতে পারে, তারা ভদ্র, ধৈর্যশীল ও সহানুভুতিশীল হৃদয়বৃত্তির অধিকারী, তাদের দিক থেকে কোন প্রকার অনিষ্টের আশঙ্কা করা যেতে পারে না। তারা নিরেট ভদ্র ও মার্জিত স্বভাবের লোক।

লেখক : ব্যাংকার ও ইসলামী চিন্তাবিদ।