মু. শফিকুল ইসলাম
মানুষের জীবন-যাপন, পারস্পরিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, রাজনীতি কিংবা শিক্ষাব্যবস্থা-সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। দৃষ্টিভঙ্গি মানে হচ্ছে কোনো বিষয়কে দেখার দৃষ্টিমাত্র নয়; এটি হলো চিন্তা, উপলব্ধি, মূল্যবোধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি। একটি সমাজের সমষ্টিগত দৃষ্টিভঙ্গিই নির্ধারণ করে সেই সমাজ কেমন হবে-মানবিক না অমানবিক, উন্নত না পশ্চাৎপদ, সাম্যের না বৈষম্যের। তাই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারলে সমাজও বদলে যায়-এ সত্য ইতিহাসে বহুবার প্রমাণিত।
১. দৃষ্টিভঙ্গির শক্তি-পরিবর্তনের প্রথম ধাপ : যে মানুষ নিজের সামর্থ্য, দায়িত্ব ও মানবিকতাকে ভিন্নভাবে উপলব্ধি করতে শেখে, তার আচরণ বদলে যায়। আর যখন একদল মানুষ একই ধরনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে, তখন সেই পরিবর্তন সমাজে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যেমন-একসময় মানুষ বিশ্বাস করত রোগ-ব্যাধির কারণ ‘অশুভ শক্তি’; কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হলো। নারীকে ‘দুর্বল’ থেকে ‘সক্ষম’ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শতাব্দী লেগেছে; কিন্তু এই পরিবর্তনই সমাজকে এগিয়ে দিয়েছে।
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন মূলত অন্তর্দৃষ্টি থেকে শুরু হয়। মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে সমাজ তাকে যেমন গড়ে তোলে, সে-ও তেমনি সমাজকে গড়ে তুলতে পারে-তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপে পরিবর্তনের ছাপ দেখা যায়।
২. নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক উৎকর্ষ : সামাজিক অধঃপতনের মূল কারণ প্রায়ই নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। আমরা দুর্নীতি দেখি, অনিয়ম দেখি, সামাজিক অবিচার দেখি; কিন্তু প্রায়শই তার বিরুদ্ধে দাঁড়াই না। কারণ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অভ্যস্ত হয়ে গেছে-“এটাই নরমাল”, “কিছু করার নেই”। এই নীরবতা সমাজকে আরও দুর্বল করে তোলে।
যেদিন নাগরিকরা ভাববে-‘দুর্নীতি শুধু রাষ্ট্রের ক্ষতি নয়, পরিবারের ভবিষ্যত নষ্ট করে, যেদিন তারা উপলব্ধি করবে’ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা শুধু সরকারের দায় নয়, প্রতিটি মানুষের দায়থ, সেদিন নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই সমাজকে শুদ্ধ করতে শুরু করবে।
উদাহরণস্বরূপ, জাপানিদের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দেশটি বিশ্বে শৃঙ্খলার আদর্শ। সেখানে রাস্তার ময়লা পর্যন্ত মানুষ নিজের দায়িত্ব মনে করে তুলে ফেলে। এটি আইন নয়-দৃষ্টিভঙ্গির ফল। আমাদের সমাজেও এই পরিবর্তন সম্ভব, যদি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নৈতিকতার দিকে ঝুঁকে যায়।
৩. শিক্ষা ব্যবস্থায় দৃষ্টিভঙ্গির ভূমিকা : শিক্ষা কেবল বই পড়া না; শিক্ষা হলো দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের প্রক্রিয়া। কিন্তু আমাদের সমাজে শিক্ষার লক্ষ্য বাণিজ্যিক-ডিগ্রি, চাকরি, আয়। ফলে শিশু বড় হয় প্রতিযোগিতাকে মূল সত্য ধরে নিয়ে। তার দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ হয়ে যায়-মানুষকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে, সহযোগী হিসেবে নয়।
যদি শিক্ষা ব্যবস্থাকে মানবিকতা, সৃজনশীলতা, সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকে নিবদ্ধ করা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীর দৃষ্টিভঙ্গিও বিস্তৃত হবে। সে সমাজের জন্য কাজ করতে আগ্রহী হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এ কারণেই শিক্ষা দিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেÑবই মুখস্থ করায় নয়।
৪. সামাজিক আচরণে দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন : সমাজ কেমন হবে তা নির্ভর করে মানুষের দৈনন্দিন আচরণে। যেমন-রাস্তার ধারে আবর্জনা ফেলা, নারীকে অসম্মান করা, আইন ভেঙে সুবিধা নেওয়া, প্রতিবেশীর সমস্যা দেখে চুপ থাকা। এসব আচরণের পেছনে রয়েছে ভুল দৃষ্টিভঙ্গি-আমি করলে কী হবে?- “এটা তেমন সমস্যা নয়”, সবাই করে ইত্যাদি।
যদি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই-“এটা আমার সমাজ”, “সুবিধা নেওয়ার আগে দায়িত্ব বোঝা জরুরি”, “সমাজের সমস্যা আমারও সমস্যা”-তাহলে আচরণ বদলে যাবে। আর আচরণ বদলালে সমাজও বদলে যাবে।
৫. প্রযুক্তি ব্যবহারে দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন : প্রযুক্তি সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে, আবার ধ্বংসাত্মক প্রভাবও ফেলতে পারে। তরুণদের হাতে স্মার্টফোন-এটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক উভয়ই হতে পারে। সমস্যা ফোনে নয়; সমস্যা দৃষ্টিভঙ্গিতে।
যদি প্রযুক্তিকে শিক্ষার হাতিয়ার, গবেষণার প্ল্যাটফর্ম, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দেখা যায়, তাহলে তা সমাজ গঠনে অসাধারণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু যদি প্রযুক্তিকে অপব্যবহার, বিভ্রান্তি বা নৈতিক পতনের পথ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সমাজ পিছিয়ে পড়বে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের দৃষ্টিভঙ্গিই মূল।
৬. পরিবারে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : সমাজের ক্ষুদ্রতম একক পরিবার। পরিবারে দৃষ্টিভঙ্গিই সামাজিক চরিত্র তৈরি করে। বাবা-মা যদি সন্তানকে শিখিয়ে দেয়-“মানুষকে শ্রদ্ধা করতে হবে”, “বৈষম্য নয়, সমতা মানবধর্ম”, “পরিশ্রমই সাফল্যের চাবিকাঠি”-তাহলে সেই শিশু বড় হয়ে ভালো নাগরিক হবে।
কিন্তু যদি পরিবারে তাকে শিখানো হয়-“টাকার জন্য যেকোনো কিছু করা যায়”, “নারীর কোন মূল্য নেই”, “শক্তিশালী হও মানেই অন্যকে দমন করো”-তাহলে তার দৃষ্টিভঙ্গি সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অতএব, পরিবার থেকেই দৃষ্টিভঙ্গির সংস্কার হওয়া উচিত।
৭. রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি-সমাজ পরিবর্তনের কেন্দ্র: রাজনীতি সমাজকে পরিচালনার প্রধান শক্তি। কিন্তু অনেক দেশে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি জনকল্যাণে নয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থে আবদ্ধ। জনগণ যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে না পারে- “দল নয়, দেশকে প্রাধান্য”-তাহলে গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। একইভাবে নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে- “ক্ষমতা ভোগ নয়, সেবা”-এই উপলব্ধি গ্রহণ করতে পারলে রাজনৈতিক পরিবেশ উন্নত হবে, সমাজও এগোবে।
৮. দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন কোথা থেকে শুরু হবে?
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন শুরু হয় ছোট একটি প্রশ্ন থেকে- “আমার দায়িত্ব কী”? অন্যের উপকারে যেতে আমি কতটা প্রস্তুত? সমাজকে আমি কি দিচ্ছি? ন্যায্যতার পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস আছে কি? মানবিকতা কি আমার জীবনের নীতি? এই প্রশ্নগুলোর সৎ উত্তর দিতে পারলেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন শুরু হবে।
৯. পরিবর্তনের ফল-একটি নতুন সমাজ : যখন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়, তখন সমাজে যে পরিবর্তনগুলো দেখা যায়-তাতে বৈষম্য কমে আসে, নৈতিক মূল্যবোধ জোরদার হয়, আইনশৃঙ্খলা উন্নত হয়, নাগরিকরা দায়িত্বশীল হয়, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন বাড়ে, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা পায়, ফলে একটি নতুন সমাজ গড়ে ওঠে-যেখানে উন্নয়ন হয় মানুষের জন্য, মানুষের দ্বারা।
উপসংহার : পরিবর্তন কখনো বাইরে থেকে আসে না; পরিবর্তন আসে ভিতর থেকে-দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে। চোখের দৃষ্টি সীমিত; কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষমতা অসীম। আমরা যদি সমস্যার চেয়ে সমাধানকে বেশি দেখি, অশান্তির চেয়ে শান্তিকে মূল্য দিই, ভয় নয়-সাহসকে ধারণ করি, এবং সর্বোপরি নিজের ক্ষুদ্র লাভের চেয়ে সমাজের কল্যাণকে গুরুত্ব দিই, তবে সমাজ অবশ্যই বদলে যাবে।
দৃষ্টিভঙ্গি বদলান-দেখবেন পরিবর্তনের ধারা আপনার ভেতর থেকেই সমাজকে নতুনভাবে নির্মাণ করছে।
লেখক : প্রাবন্ধিক।