মুন্সী আবু আহনাফ
আমেরিকা ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু করা যৌথ সামরিক অভিযানটি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারায় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথ হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে। দ্রুত পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছে ইরানও। তেহরান বলেছে, তারা ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোসহ ওই অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার ‘প্রতিশোধ’ নিতে ইরান এখন পর্যন্ত মার্কিন ঘাঁটি-স্থাপনায় এবং ইসরাইলে হামলা অব্যাহত রেখেছে। ফলে ইরানের এই প্রতিরোধ হামলা ভূরাজনীতির হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে ইরানের অবস্থান আরও সুদৃর করতে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধে প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই ওয়াশিংটনের প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে বলে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) জানায়। এই হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে প্রায় ৯০ কোটি ডলার?। যুদ্ধে ইরানের নৈতিক সাহসিকতার মূল কারণ হলো; ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনের সমর্থন। ইরান ইসরাইলকে একটি ‘অবৈধ রাষ্ট্র’ হিসেবে গণ্য করে। মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে এবং পবিত্র আল-আকসা মসজিদ মুক্ত করার অঙ্গীকার থেকে তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়। ইরান একাই সাহসিকতার সাথে লড়াই করার প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকগণ বলেন, তারা প্রাচীন আর্যদের বা অ্যারিয়ান (Aryan) বংশধর। আধুনিক ‘ইরান’ (Iran) শব্দটির উৎপত্তিই হয়েছে প্রাচীন ফারসি শব্দ ‘আর্যনাম’ (Aryanam) থেকে, যার অর্থ হলো “আর্যদের ভূমি”। প্রাচীন থেকে আধুনিক কালের ইরান সম্পর্কে জানতে জন ম্যালকমের লেখা ইরান: আ শর্ট হিস্ট্রি (Iran: A Short History) এবং ((The History of Persia) বই দু’টি পড়তে পারেন। আমরা এই প্রবন্ধে জানানের চেষ্টা করবো ইরান জাতির সাহসিকতার আদি উৎস কোথায়? যদিও ইরানের সামরিক ইতিহাস ও বীরত্বের উৎস কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটি হাজার বছরের ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আধুনিক ভূ-রাজনীতির এক সংমিশ্রণ।
এক. ইরান মূলত মালভূমি এবং পাহাড়ঘেরা দেশ (যেমন জ্যাগ্রোস পর্বতমালা)। আদি ইতিহাস বলে, এই দুর্গম পাহাড়ই ইরানিদের প্রাকৃতিক যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলেছে। তাদের ভূখণ্ড দখল করা সবসময়ই কঠিন ছিল, যা তাদের মধ্যে একটি ‘অপরাজেয়’ মানসিকতা তৈরি করেছে। ইরানের শৌর্যের আদি ও প্রধান ভিত্তি হলো একিমেনিড সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০-৩৩০)। সম্রাট সাইরাস (Cyrus the Great) এবং প্রথম দারিয়ুস এমন এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন যা তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল। ইরানিরা আদি আর্য জাতির (Aryan Heritage) একটি শাখা। প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ ছিল যাযাবর এবং লড়াকু। প্রতিকূল আবহাওয়ার সাথে লড়াই করে টিকে থাকার জন্য তাদের নিয়মিত ঘোড়সওয়ারি এবং ধনুর্বিদ্যা চর্চা করতে হতো। গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস লিখেছেন, “পারস্যের যুবকদের তিনটি জিনিস শেখানো হতো: ঘোড়ায় চড়া, তীর চালানো এবং সত্য কথা বলা।” প্রাচীন পারস্যের ইতিহাসকে আধ্যাত্মিক ও সাহিত্যিক রূপ দিয়েছেন কবি ফেরদৌসী তার ‘শাহনামা’ মহাকাব্যে। এতে বর্ণিত রুস্তম ও সোহরাবের মতো বীরদের বীরত্বগাথা কেবল গল্প নয়, বরং ইরানিদের মানসপটে সাহসিকতার একটি স্থায়ী মানদণ্ড তৈরি করে দিয়েছে। প্রতিটি ইরানি শিশুর কাছে রুস্তম হলো শৌর্যের আদি আদর্শ। আদি ইরানে অমর বাহিনী (The Immortals) পারস্যের এই অভিজাত ১০,০০০ সৈন্যের বাহিনী ছিল সে সময়ের অপরাজেয় শক্তির প্রতীক। কোনো একজন সৈন্য মারা গেলে সাথে সাথে অন্য একজনকে সেই জায়গা দেওয়া হতো, যাতে বাহিনীর সংখ্যা কখনো ১০ হাজারের কম না হয়। এটি শত্রুর মনে ত্রাস সৃষ্টি করত। গ্রিক ও রোমানদের সাথে দীর্ঘ লড়াইয়ের এক সাহসিকতার ইতিহাস আছে ইরানীদের। প্রাচীন ইরানের পরবর্তী দুই শক্তিশালী সাম্রাজ্য পার্থিয়ান এবং সাসানীয় শত শত বছর ধরে তৎকালীন পরাশক্তি রোমান সাম্রাজ্যের সাথে সমানে সমানে লড়াই করেছে। পার্থিয়ান শট (Parthian Shot) ছিল এক অনন্য সামরিক কৌশল। ঘোড়ায় চড়ে পিছু হটার ভান করে হঠাৎ ঘুরে গিয়ে নির্ভুলভাবে তীর ছোড়া। এই কৌশল আজও সমরবিদ্যায় সাহসিকতা ও বুদ্ধির প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত।
দুই. ১৯৩৫ সালের পূর্বে ইরান ‘পারস্য’ নামে পরিচিত ছিলো। এই পারস্য বা ইরানকে ২০০ বছরের মতো শাসন করেছিলো ‘সাফাবিদ’ রাজবংশ। তাদের পতনের পর ‘কাজার’ রাজবংশ ১৭৮৫ থেকে ১৯২৫ পর্যন্ত ইরানকে শাসন করে। ১৯২৫ সালের ব্রিটিশদের সহায়তায় কাজার রাজ বংশের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান হয় এবং ক্ষমতায় বসে ব্রিটিশ অনুগত রেজা শাহ পাহলভি। রেজা শাহ পাহলভি ১৯২৫ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ইরানের ক্ষমতায় ছিলো কিন্তু অভ্যন্তরীন গন্ডগোলে ক্ষমতা তার পুত্র মোহাম্মদ রেজা পাহলভির নিকট হস্তান্তর করে পদত্যাগ করে। এই মোহাম্মদ রেজা পাহলভির সময়ে ইরানে প্রচুর তেলের খণি আবিষ্কার হয় এবং আমেরিকা ও ব্রিটিশদের বিশেষ সুযোগ সুবিধা দিতে থাকে মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। কিন্তু মাঝখানে ঝামেলা তৈরি করে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক নামে এক ভদ্রলোক যিনি তার দেশে আমেরিকা ও ব্রিটিশদের এতো সুযোগ সুবিধা দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেয় এবং ১৯৫১ সালে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই তিনি ইরানি তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করেন যার ফলশ্রুতিতে আমেরিকা ও ব্রিটিশরা তার উপর ক্ষুব্ধ হন। আমেরিকা আর ব্রিটিশরা ক্ষুব্ধ হলে যেটা করে তাই করলো; তা হলো CIA এবং SIS মিলে মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে একটি সেনা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করে সফল হয় এবং ১৯৫৩ সালে তাকে গ্রেফতার করে। যদিও তখনও মূল ক্ষমতা মোহাম্মদ রেজা পাহলভির কাছেই ছিলো তারপরও মোহাম্মদ মোসাদ্দেক কিছু ঝামেলা সৃষ্টি করায় তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ১৯৫৩ সালে মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাতে সিআইএ-র ভূমিকা নিয়ে লেখা স্টিফেন কিনজারের শ্রেষ্ঠ বই হলো অল দ্য শাহ’স মেন (All the Shah's Men)। এরপর এই মোহাম্মদ রেজা পাহলভির হাত ধরে ইরানে পশ্চিমা সংস্কৃতি ব্যাপক আকার ধারণ করে; এমনকি ইরানকে একটি সেকুল্যার রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অপপ্রয়াস চালায় রেজা শাহ পাহলভি; যার দরুন ইরানের জনগণ ব্যাপক অসন্তুষ্ট হয়। ১৯৭৫ সালের দিকে রেজা শাহ পাহলভি ইরানের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তাদের সমর্থকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। শেষমেশ ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্ব ইসলামি বিপ্লব হয় এবং পৃথিবীর ৩য় রাষ্ট্র হিসেবে ইরান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র রূপে আবির্ভূত হয়। এরপর যে ইরানকে আমেরিকা ও ব্রিটিশরা এতো আদর করতো তাদের ব্যবসা বাণিজ্য ইরান থেকে গুটিয়ে ফেলতে হয় এবং যেই তেল আগে কম মূল্যে পাওয়া যেতো সেই তেল বেশি মূল্যে কিনতে হয়। আমেরিকা ও ব্রিটিশরা এতে ব্যাপক রাগ করে এবং বিভিন্ন সময়ে ইরানে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া শুরু করে। সেজন্য ইরানের অর্থনীতি খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। এই আমেরিকা বিভিন্ন সময়ে ইরানে গণ-অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করলেও বারবার ব্যর্থ হয়। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাদের মূল শত্রুতে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত তাকে শহীদ করার মাধ্যমে তাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের কিছুটা প্রশমন হয়। ইরানের আধুনিক রাজনৈতিক বিবর্তনের ওপর এরভান্দ আব্রাহামিয়ানের লেখা দুটি মাস্টারপিস বই ইরান বিটুইন টু রেভোলিউশনস (Iran Between Two Revolutions) এবং এ হিস্ট্রি অফ মডার্ন ইরান (A History of Modern Iran)|। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের রাষ্ট্রীয় দর্শনে আমূল পরিবর্তন আসে। আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরান “না পূর্ব, না পশ্চিম” (Neither East, nor West) নীতি গ্রহণ করে। এছাড়াও বিপ্লব পরবর্তী ইরানি মানুষের জীবনকে খুব সহজ ও হৃদয়স্পর্শীভাবে ফুটিয়ে তুলেছে মারজান সাত্রাপি তাঁর এই উপন্যাসে পারসেপোলিস (Persepolis)। বিপ্লব পরবর্তী নারীদের জীবন ও সংগ্রামের চিত্র আজার নাফিসির অন্যন্য বই রিডিং লোলিটা ইন তেহরান (Reading
Lolita in Tehran)।
তিন. সরাসরি বিশাল যুদ্ধের চেয়ে ইরান ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ (Asymmetric Warfare) বা প্রক্সি যুদ্ধে বেশি দক্ষ। তারা ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার যুদ্ধ এবং ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিতে ব্যাপক উন্নতি করেছে। এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তাদের বড় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার আত্মবিশ্বাস জোগায়। ইরান এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে টিকে থাকার লড়াই প্রতিদিনের অংশ। তাদের ভূখণ্ড রক্ষায় জনগণের তীব্র জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম একটি বিশাল ভূমিকা পালন করে। আধুনিক সময়ে ইরান নিজেদের একটি ‘প্রতিরোধের শক্তি’ হিসেবে গড়ে তুলেছে। জেনারেল কাসেম সোলেইমানির মতো নেতাদের আদর্শ এবং মার্কিন বা পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মানসিকতা তাদের সামরিক শক্তিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। প্রাচীন পারস্যের গৌরব, ইসলামের আত্মত্যাগের শিক্ষা এবং আধুনিক বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিকূলতাই ইরানের বীরত্বের মূল উৎস। ইরান একা লড়ছে না; তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে যা ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নামে পরিচিত। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং গাজার হামাস এই গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ইরান তার শত্রুদেশের সীমানার খুব কাছে নিজের প্রভাব বজায় রাখে। এটি তাদের এক ধরনের ‘ডিটারেন্স’ (Deterrence) বা প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানের মূল অস্ত্র তাদের ক্ষেপণাস্ত্র। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ ও সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্রের বহর রয়েছে ইরানের হাতে। ইরানের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ব্যালিস্টিক এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের বহরটি এমনভাবে তৈরি যে দেশটির হাতে অত্যাধুনিক বিমানবাহিনী না থাকলেও তেহরানকে দূর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা দেয়।
চার. ইরানি কর্মকর্তারা দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে তাঁদের প্রতিরোধব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হিসেবে উপস্থাপন করেন। এর একটি কারণ দেশটির দুর্বল বিমানবাহিনী। ইরানের বিমানবাহিনীর হাতে থাকা যুদ্ধবিমানগুলো বেশ পুরোনো। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে এবং ভবিষ্যতে দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতায় সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। তেহরান এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের একটি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দুই থেকে আড়াই হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। এর অর্থ, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে এবং তার বাইরেও পৌঁছাতে সক্ষম। বিস্তৃত সমীক্ষা অনুযায়ী, ইরান ভূমি ও জাহাজ লক্ষ্য করে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে সক্ষম। ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে সুমার, ইয়াআলি, কুদস সিরিজ, হোভেইজেহ, পাভেহ ও রা’আদ। সুমার ক্ষেপণাস্ত্র আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে। ইরানের হাতে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলো ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। একসঙ্গে বিবেচনা করলে ইরানের মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরাইল, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন অবকাঠামোতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে এবার। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতা দিয়ে উড়ে যায়। ফলে সেগুলো ভূপ্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে যেতে পারে। এ সুবিধার কারণে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা এবং সেটিকে অনুসরণ করা প্রায়ই কঠিন হয়ে যায় বিশেষত যখন এগুলো ড্রোন বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে একযোগে ছোড়া হয়, তখন আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থা অতিরিক্ত চাপে পড়ে যায়। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা মূলত আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতেই করা হয়েছে।
পাঁচ. ইরানের হাতে থাকা আরেকটি বড় অস্ত্র ড্রোন। এটি ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় ধীরগতির, কিন্তু দামে সস্তা এবং একবারে অনেকগুলোকে উৎক্ষেপণ করা যায়। একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন ঢেউয়ের মতো আঘাত হানতে ব্যবহার করা যায়। একটার পর একটা ড্রোন যখন আসতে থাকে, তখন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া ড্রোন হামলার মাধ্যমে বিমানবন্দর, বন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সতর্ক অবস্থায় রাখা যায়। ক্ষেপণাস্ত্রের বেলায় যেটা সম্ভব নয়। বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুদ্ধ গভীর হয়, তবে ড্রোন ব্যবহার করে হামলার কৌশল আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষে মূল প্রশ্ন হলো; ইরান কতক্ষণ পর্যন্ত আঘাত সহ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম থাকবে। তেহরান দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কয়েকটি অংশকে শক্তিশালী করতে কাজ করেছে। তারা দেশজুড়ে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, লুকানো ঘাঁটি এবং সুরক্ষিত উৎক্ষেপণকেন্দ্র তৈরি করেছে। এই নেটওয়ার্কের কারণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতাকে দ্রুত দুর্বল করা কঠিন হবে। ইরানের প্রতিরক্ষা যুদ্ধ কেবল ভূমিতেই সীমাবদ্ধ নয়; উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালি ইরানের কৌশলগত যুদ্ধে এক বড় হাতিয়ার। নৌপথে বিশ্ববাণিজ্যের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের নামে যদি রেডিও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়, তাহলেই তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হরমুজ প্রণালির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, এতে খরচ বাড়বে। পাশাপাশি যুদ্ধের ঝুঁকিবিমার খরচ বাড়াবে। সব মিলিয়ে পণ্য পরিবহনের খরচ অনেক বেড়ে যাবে। বিপ্লবী গার্ড বলেছে, তারা তিনটি মার্কিন ও ব্রিটিশ তেলের ট্যাংকারে হামলা করেছে।
পরিশেষে, রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটে মধ্য প্রাচ্যের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. এইচএ হেলার বলছেন, প্রথাগত যুদ্ধ চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইলকে পরাজিত করার চেষ্টা এখন আর করছে না ইরান, তবে এই সংঘাতকে তারা দীর্ঘায়িত করে, অঞ্চলের নানা দিকে ছড়িয়ে দিয়ে এবং অর্থনৈতিকভাবে বহুমূল্য করতে চাইছে। ইরান প্রথাগত যুদ্ধে জিততে পারবে না, তবে তাদের কৌশল হলো অন্যপক্ষের কাছে জয়টা যাতে অর্থের দিক থেকে বহুমূল্য আর অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, বলছিলেন মি. হেলার। পারস্য সাম্রাজ্য থেকে সাসানিয়ান রাজবংশ, ইসলামি ইরান, মধ্যযুগীয় সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং এর ঐতিহাসিক বহমান ধারা, অভিজ্ঞতা ইরানকে এক শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছে। মার্কিন-ইসরাইলের হামলা, মিসাইল, ড্রোন বা তল্পিবাহক সরকার বসানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে। ইরানিরা তাদের দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অনুভূতিতে দৃঢ়, যা হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মূলে নিহিত। অনেকে বলছেন এই যুদ্ধে ইরান বেশিদিন টিকতে পারবে না। হতে পারে, সামরিক সংঘাতে তারা প্রবল চাপে পড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কেন টিকে থাকবে না? যদি একটি জাতি নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংকল্পে অটল থাকে, তবে তার সাময়িক সব ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি পরাজয়ে রূপ নেয় না, বরং তার টিকে থাকাই একসময় বিজয় সুনিশ্চিত করে। অতীতে ইরান কখনো মাথানত করেনি, এবারও করবে না।