আবু রায়হান তানভীর

সাম্প্রতিককালে বাউল ‘আবুল সরকার’ নামক এক শিল্পীর উক্তিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম-গঞ্জে যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা কেবল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার ঘটনা নয়, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও পবিত্র আল কোরআন সম্পর্কে তার কথিত ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং বানোয়াট কটূক্তিটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। আমি মনে করি, পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার জন্য একটি বিশেষ গোষ্ঠী সুযোগ খুঁজছে। এ প্রেক্ষাপটে, আবেগের বশবর্তী না হয়ে প্রজ্ঞা ও কৌশলগত সহিষ্ণুতার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা অপরিহার্য।

গ্রামে-গঞ্জে একতারা-দোতারা বাজিয়ে যে লোকসঙ্গীতের ধারা এরা পরিবেশন করে, তা সাধারণ মানুষের লোকসঙ্গীতের ঐতিহ্যকে বিভ্রান্ত করে। সমালোচকদের মতে, এই ধারার গানের মধ্যে যৌন আবেদনটাই মুখ্য। বাউলরা সংকেতবাহী ‘ভিন্ন ভাষার মাধ্যমে’ সমাজে যৌনতার ইঙ্গিতবাহী চর্চাকে উৎসাহিত করে। বিগত রাজনৈতিক সময়ে মঞ্চ কাঁপানো বিতর্কিত সংসদ সদস্য মমতাজের লোকধারার গানের সঙ্গেও এর সাদৃশ্য পাওয়া যায়, যেখানে যৌন আবেদন মুখ্য বলে সমালোচনা রয়েছে।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম (Emile Durkheim) -এর তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন সমাজে নৈতিক নিয়ম-কানুনের স্বাভাবিক বাঁধন শিথিল হয়, তখন ‘অ্যানোমি’ বা সামাজিক নৈরাজ্য দেখা দেয়। এই বাউলরা তাদের ধর্মবিরোধী সমালোচনা এবং নেশা-যৌনতার প্রসারের মাধ্যমে সমাজে এই ‘অ্যানোমি’ তৈরির মৌলিক ভূমিকা পালন করছে।

এই ধারা কেবল যৌনতার প্রচার করে না, বরং এটি উন্মুক্তভাবে গাঁজা সেবনের বৈধতা প্রদানের চেষ্টা করে। বর্তমান বিজ্ঞানময় আধুনিক সমাজে যেখানে সুস্থতা ও নৈতিকতা কাম্য, সেখানে এই বাউলরা সমাজে যৌনতা ও নেশা ছড়াতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, যা সমাজকে ইসলামী মূল্যবোধ থেকে দূরে রাখে। আবুল সরকারের এই ধরনের বক্তব্য সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, কারণ তিনি মঞ্চে ওঠে ধর্মীয় বিষয়ে কৌতুকময় ভঙ্গিতে ভিত্তিহীন, উল্টাপাল্টা, মনগড়া সমালোচনা করেন, যার কোনো ভিত্তি নেই। এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে গ্রামীণ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ দ্রুত প্রতিবাদ জানাতে পারে না, কারণ তারা ধর্ম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান রাখে না। এই নীরবতা ষড়যন্ত্রকারীদের সুযোগ তৈরি করে দেয়। এই বাস্তবতাই ইঙ্গিত দেয় যে, এই ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের এই ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবকে পুঁজি করে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইছে।

নারী বাউল শিল্পী ‘হাসিনা সরকার’-এর মতো ব্যক্তির প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ‘সিনিয়র বাউলদের একান্তে সময় না দিলে নারী শিল্পীদের সংগীতের সুযোগ দেওয়া হয় না’ এবং তাদের মধ্যে এক ধরনের উন্মুক্ত যৌনাচার চলে। এটি সমাজের চোখে বাউল ধারার শিল্পকে নয়, বরং একটি অবক্ষয়িত জীবনধারা ও শোষণের সংস্কৃতিকেই তুলে ধরে।

বাউলদের বিতর্কিত চর্চাগুলো মূলত তাদের দেহতত্ত্ব (Body Mysticism) এবং গুরুবাদ নির্ভর জীবনদর্শন থেকে উৎসারিত, যা সরাসরি ইসলামের মূল আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিগত দিনে বাউলদের বিরুদ্ধে সমালোচনার প্রধান দিকগুলো ছিল তাদের দার্শনিক অবস্থান এবং ধর্মীয় বিশ্বাস সংক্রান্ত।

ইসলামে যেখানে তৌহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ প্রধান, সেখানে বাউল ধারায় গুরুকে আল্লাহর সমতুল্য বা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী মনে করা হয় (মুরশিদ পূজা)। এই গুরুপূজা বা ‘গুরু তোষামোদ’কে মুসলিম সমাজ শিরক বা আল্লাহ্‌র সঙ্গে অংশীদারিত্ব করার সমান মনে করে।

বাউলরা দেহকে বা সাধকের জীবনধারাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং ইসলামের আনুষ্ঠানিক ইবাদত, যেমন নামাজ, রোজা, হজ, ইত্যাদি অস্বীকার করে। বাউলদের গানে প্রায়শই এই আনুষ্ঠানিক ইবাদতগুলোর ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনা থাকে, যা সাধারণ মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত হানে।

বাউলদের জীবনধারা ও দর্শনের সঙ্গে নাস্তিক্যবাদী বামপন্থী রাজনীতির একটি গভীর আদর্শিক সাদৃশ্য (Ideological Symbiosis) রয়েছে। এই গোষ্ঠীগুলো বাউলদের মতো বিতর্কিত শিল্পীদের ব্যবহার করে ইসলামের আনুষ্ঠানিকতা এবং রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ‘মুক্তচিন্তা’র আড়ালে এরা গাঁজা সেবন ও উগ্র যৌনতাকে প্রশ্রয় দেয়। এই গোষ্ঠীগুলো বাউলদের শুধু গান শোনে না, তাদের সঙ্গে নেশা সেবন করে এবং তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়। যখনই ধর্মীয় উস্কানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়, তখনই এই বামপন্থী নাস্তিক্যবাদী দলগুলো রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাউলদের পক্ষ অবলম্বন করে। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য স্পষ্ট: অপরাধীর গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করে দেশে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা।

জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধছে যে, আবুল সরকারের বিশাল বিত্তের পেছনে সেই ষড়যন্ত্রকারীদের অর্থ যোগানের আলামত রয়েছে। আবুল সরকার একজন সাধারণ শিল্পী হয়েও কীভাবে দ্বিতল বিশিষ্ট বিশাল ভবন ও বিপুল সম্পদের মালিক হলেন- এই প্রশ্নটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, এটি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার (Patronage Politics) একটি উদাহরণ। সমাজবিজ্ঞানে এটি ক্লায়েন্টেলিজম নামে পরিচিত। এখানে এক বিশেষ গোষ্ঠী (প্যাট্রন বা পৃষ্ঠপোষক) তাদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য শিল্পীদের (ক্লায়েন্ট বা আশ্রিত) অর্থ ও সুবিধা দিয়ে থাকে। আবুল সরকারের বিতর্কিত বিত্তের পেছনে ষড়যন্ত্রকারীদের অর্থ যোগানের যে সন্দেহ জনমনে আছে, তা এই রাজনৈতিক অর্থনীতিরই প্রতিফলন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো এই ঘটনার সময়কাল। বিগত সরকারের শীর্ষ নেত্রীর রায়ের পর দেশে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে, তার সুযোগ নিচ্ছে একটি বিশেষ গোষ্ঠী। রাজনৈতিক মহল ও সুশীল সমাজের একটি অংশের আশঙ্কা, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এবং কিছু বামপন্থী নাস্তিক দল পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার জন্য বিভিন্ন সুযোগ খুঁজছে।

আবুল সরকারের মতো কাউকে দিয়ে এমন ধরনের কটূক্তি করানো, যা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের ‘গায়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়’, তা নিঃসন্দেহে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিকল্পনা। এই ধরনের বক্তব্যের কারণে মুসলমানরা নিজেদের জান বাজি রেখে যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত থাকে আর এই অতি-প্রতিক্রিয়া ঘটানোই ষড়যন্ত্রকারীদের মূল লক্ষ্য।

এই রাজনৈতিক ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের সাধারণ মুসলিম সমাজ এবং আলেম সমাজকে অবশ্যই সর্বোচ্চ সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে। আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে, অতি-প্রতিক্রিয়া দেখানোই ষড়যন্ত্রকারীদের ফাঁদ। তাদের লক্ষ্য হলো রাস্তায় বিশৃঙ্খলা, রক্তপাত এবং একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা। আমাদের উচিত, এই উস্কানিকে প্রত্যাখ্যান করে আইনগত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিবাদ জানানো। এই ‘কৌশলগত সহিষ্ণুতা’ (Strategic Tolerance) হবে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।

আলেম সমাজের উচিত, এই মুহূর্তে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে বুদ্ধি খাটিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা। আইনানুগ পথে প্রতিবাদ এবং ধর্মীয় জ্ঞানের মাধ্যমে বাউলদের ভিত্তিহীন সমালোচনার জবাব দেওয়া জরুরি, যাতে তাদের উদ্দেশ্য সফল হতে না পারে। অহিংস প্রতিরোধের নীতি অনুসারে, প্রতিপক্ষের উস্কানির মুখেও শান্ত ও আইনানুগ প্রতিবাদ বজায় রাখলে প্রতিপক্ষের শক্তি দুর্বল হয়। সহিষ্ণুতার নীতি অবলম্বন করে কেবল আইনি ও বুদ্ধিবৃত্তিক পথে প্রতিবাদ জানালে, ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের কাক্সিক্ষত নৈরাজ্যের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।

বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয় এবং আমাদের আলেম সমাজ ও মুসলিম সমাজ দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে শান্তিপূর্ণ, সাবলীল পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দুর্নীতি ও পেশী শক্তির ব্যবহার বন্ধ করাই সমগ্র দেশের আপামর জনসাধারণের একমাত্র প্রত্যাশা।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের স্পষ্ট ভূমিকা বাঞ্ছনীয়। প্রথমত, সরকারের উচিত আবুল সরকারের মতো ব্যক্তিদেরকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ধর্মকে ব্যবহার করে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে। দ্বিতীয়ত, সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো রাজনৈতিক উপাদান এই পরিস্থিতিকে পুঁজি করে নৈরাজ্য সৃষ্টির সুযোগ না পায়। লেখক : প্রাবন্ধিক।