মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নির্বাচন। আর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রাণ হলো জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ। কিন্তু যখন ক্ষমতাসীন সরকার পূর্ণ মেয়াদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বদলে প্রশাসক নিয়োগের পথ বেছে নেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে-এ কি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ?
বাংলাদেশের সংবিধান স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার কথা বলেছে। সিটি কর্পোরেশন সে কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরগুলোর একটি। সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গঠনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালনার কথা স্পষ্ট। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইনেও মেয়র ও কাউন্সিলরদের নির্বাচনের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব এখানে নীতি, প্রশাসক ব্যতিক্রম। এখানে জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচন করে। এ প্রক্রিয়া শুধু প্রতিনিধিত্বের বৈধতা দেয় না, বরং জবাবদিহিতার কাঠামোও নিশ্চিত করে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি জানেন, পাঁচ বছর পর তাঁকে আবার জনগণের মুখোমুখি হতে হবে। প্রশাসক জানেন, তাঁর জবাবদিহি জনগণের কাছে নয়, নিয়োগকর্তার কাছে।
প্রশ্ন হলো-ক্ষমতায় থেকেও কেন নির্বাচন এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা? যদি সরকার জনপ্রিয় হয়, যদি জনগণের প্রতি তাদের সত্যিই আস্থা থাকে, তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভয় থাকার কথা নয় বরং স্থানীয় নির্বাচন ক্ষমতাসীনদের জন্য জনসমর্থন যাচাইয়ের একটি সুযোগ হতে পারত। কিন্তু যখন সে পথ এড়িয়ে প্রশাসনিক নিয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দাঁড় করানো হয়, তখন সেটি গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। নির্বাচন এড়িয়ে পূর্ণ মেয়াদে প্রশাসক নিয়োগ একটি ভিন্ন বার্তা দেয়-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সংকুচিত করার বার্তা।
ইতিহাস বলে, স্থানীয় সরকারকে দুর্বল করা মানে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে শক্তিশালী করা। পাকিস্তান আমলে ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ কাঠামো যেমন কেন্দ্রীয় শাসনকে সুবিধা দিয়েছিল, তেমনি পরবর্তী সময়েও দেখা গেছে-স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর না রেখে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রবণতা রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি গণতন্ত্রের শিকড় দুর্বল করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় সরকারকে গণতন্ত্রের ‘স্কুল’ বলা হয়। এখান থেকেই জাতীয় নেতৃত্ব তৈরি হয়, নীতিনির্ধারণে তৃণমূলের অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়। নির্বাচনের বদলে প্রশাসক বসানো মানে সেই স্কুল বন্ধ রাখা। এতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কমে, নতুন নেতৃত্বের বিকাশ থেমে যায় এবং নাগরিক অংশগ্রহণ সীমিত হয়। প্রশাসক নিয়োগের পক্ষে যুক্তি হতে পারে-আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, বা অন্য কোনো প্রশাসনিক জটিলতা। কিন্তু এগুলো সাময়িক কারণ হতে পারে, স্থায়ী বিকল্প নয়।
গণতন্ত্রের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নয়, বৈধতায়। আর বৈধতার উৎস নির্বাচন। স্থানীয় সরকার সেই বৈধতার সবচেয়ে নিকটবর্তী স্তর-যেখানে নাগরিক সরাসরি ভোট দিয়ে তাঁর নগরের অভিভাবক নির্বাচন করেন। সেই জায়গায় যদি পূর্ণ মেয়াদে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়, তবে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক-এটি কি সাময়িক প্রশাসনিক সমাধান, নাকি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিফলন?
গণতন্ত্রে নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি জনগণের আস্থা নবায়নের উৎসব। সে উৎসব থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা মানে তাদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা। স্থানীয় সরকারে নির্বাচন না দিয়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের ওপরই অনাস্থা বাড়াতে পারে।
সবশেষে প্রশ্ন একটাই-ভোট কি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে ক্ষমতায় থেকেও সরকার নির্বাচনের ময়দানে নামতে চাইছে না? যদি তাই হয়, তবে সেটি কেবল রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি গণতান্ত্রিক আত্মবিশ্বাসের সংকট।
গণতন্ত্র টিকে থাকে আস্থার ওপর। আর আস্থা জন্মায় অংশগ্রহণ থেকে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিকল্প প্রশাসক নয়-বিকল্প কেবল নির্বাচনই।
গণতন্ত্রের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নয়, বৈধতায়। আর বৈধতার উৎস নির্বাচন। স্থানীয় সরকার সেই বৈধতার সবচেয়ে নিকটবর্তী স্তর-যেখানে নাগরিক সরাসরি ভোট দিয়ে তাঁর নগরের অভিভাবক নির্বাচন করেন। সে জায়গায় যদি পূর্ণ মেয়াদে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়, তবে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক-এটি কি সাময়িক প্রশাসনিক সমাধান, নাকি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিফলন?
প্রশাসক হতে পারে অন্তর্বর্তী সমাধান, কিন্তু পূর্ণ বিকল্প নয়। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ থাকলেও সেটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে ব্যবহার করা আইনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ স্থানীয় সরকার কেবল প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্র। নির্বাচন মানেই অনিশ্চয়তা। ফলাফল পূর্বনির্ধারিত নয়। প্রশাসক মানে নিশ্চিত নিয়ন্ত্রণ। এ দুইয়ের মধ্যে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মানসিকতার ইঙ্গিত দেয়।
প্রশাসনিক জটিলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা সীমানা পুনর্নির্ধারণ-এসব যুক্তি কখনো কখনো সামনে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব সমস্যা কি অমীমাংসিত ও দীর্ঘমেয়াদি? যদি নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে, তবে নির্বাচন আয়োজন তার দায়িত্ব। সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন স্থগিত রাখা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী।
গণতন্ত্র কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন। যে সরকার জনগণের ওপর আস্থাশীল, সে নির্বাচনকে ভয় পায় না। বরং নির্বাচনকে নিজের কাজের মূল্যায়নের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনীহা তাই রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রশ্নও তুলে দেয়।
স্থানীয় সরকারে পূর্ণ মেয়াদে প্রশাসক নিয়োগ হয়তো প্রশাসনিকভাবে সুবিধাজনক। কিন্তু গণতান্ত্রিকভাবে এটি দুর্বল সমাধান। স্থানীয় সরকার গণতন্ত্রের ভিত্তি। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে ওপরের কাঠামোও টেকসই থাকে না।
ভোট কেবল ক্ষমতার বৈধতা দেয় না; এটি জনগণের মর্যাদা নিশ্চিত করে। সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নয়, প্রয়োজন নির্বাচন। কারণ গণতন্ত্রের বিকল্প প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নয়—গণতন্ত্রের বিকল্প আরও গণতন্ত্র।
লেখক : সাংবাদিক।