প্রিয় স্বদেশের কত কিছুই না গ্রথিত হয়ে আছে আমাদের উপলব্ধির সাথে। এ প্রসঙ্গে প্রকৃতির কথা, নৃতত্ত্বের কথা বলতে পারি। বলতে পারি ইতিহাস এবং আনন্দ-উৎসবের কথাও। আরও অনেক বিষয় আছে। দেশ তো শুধু ভূখ-ের নাম নয়, বরং মানুষই মূল বিষয়। মানুষের বোধ-বিশ^াস ও আশা-আকাক্সক্ষার রূপময় প্রকাশ ঘটে দেশে। তাই দেশ আমাদের কাছে এত প্রিয়। দেশের জন্য আমরা যুদ্ধ করতে পারি, জীবন দিতে পারি।

দেশের কথা ভাবতে গেলে পৃথিবীর কথাও ভাবতে হয়, ভাবতে হয় মহান ¯্রষ্টার কথাও। মহান ¯্রষ্টা মানববান্ধব করে সৃষ্টি করেছেন আমাদের প্রিয় পৃথিবীকে। চারদিকে কত নেয়ামত, যেন মানুষের জীবন সহজ-সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানে প্রশ্ন জাগে, আল্লাহ তো মানব-বান্ধব করে পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছে কিন্তু মানুষ কি পৃথিবীর সাথে বান্ধবের মত আচরণ করছে? করছে না বলেই তো আজ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যে সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বায়ুদূষণ ও জলবায়ু সংকটে মানুষ দিশেহারা। দিশা তো ছিল, কিন্তু মানুষ ভ্রষ্ট পথের পথিক হলো কেন? এর পেছনে রয়েছে ভুল দর্শন, ভুল রাজনীতি এবং ভ্রান্ত বিশ^ব্যবস্থার অবদান। এতসব ভ্রান্তির কারণে বর্তমান সভ্যতায় মানুষে-মানুষে, দেশে-দেশে শুধু আস্থার সংকটই সৃষ্টি হয়নি, একে অন্যকে নিশ্চিহ্ন করার মত মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতাও অব্যাহত রয়েছে। এমন বাস্তবতায় তৃতীয় বিশ^যুদ্ধের হাতছানি দিচ্ছে বর্তমান বিশ^ব্যবস্থা। এখানে এ কথাও বলে রাখা ভালো যে, বর্তমান বিশ^ব্যবস্থায় বিজ্ঞান-প্রযুক্তির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের আণবিক বোমার স্থান এখন দখল করেছে পারমাণবিক বোমা, যেন ধ্বংসযজ্ঞ আরো দ্রুত সম্পাদন করা যায়।

দেশের কথা বলতে গিয়ে পৃথিবীর প্রসঙ্গ এসে গেল, এখন আবার দেশে ফিরে যাই। আসলে মৌলিক কাজগুলো, সময়ের কাজগুলো দেশেই শুরু করতে হয়। মানসম্পন্ন ভালো কাজগুলোর একটা স্বাভাবিক প্রভাব আছে। এই প্রভাব দেশের কাজকে আন্তর্জাতিক করে তুলতে পারে? তাই সভ্যতার বর্তমান সংকটে বিভিন্ন দেশের মানুষ যদি নিজেদের কাজগুলোকে মানবিক মর্যাদায় বিশ^জনীন করে তুলতে পারে, তাহলে পৃথিবীতে সৃষ্টি হতে পারে কাক্সিক্ষত এক নতুন বাতাবরণ। প্রিয় স্বদেশে এখন রমযানের আবহ বিরাজ করছে। মানুষ এখন দিনে পানাহার ত্যাগ করে সংযমের সিয়াম পালন করছে। রাত জেগে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছে। মানুষ এভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ¯্রষ্টার বান্দা হওয়ার চেষ্টা করছে। প্রকৃত বান্দা হওয়ার জন্য প্রয়োজন তাকওয়ার গুণ। সিয়াম তা অর্জনে সাহায্য করে থাকে। এ জন্যই বলা হয়ে থাকে সিয়ামের লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন। বলছিলাম, প্রশ্নবিদ্ধ বর্তমান সভ্যতায় মানুষ যেন নিজেদের ভালো কাজগুলোকে মানবিক মর্যাদায় বিশ^জনীন করে তুলতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান সময়ে মুসলিমরা সিয়াম-কিয়াম করলেও ‘তাকওয়ার’ চেতনায় কতটা সমুন্নত অনেকের কাছেই রমজান এক আনন্দ-উৎসবের মাস। অনেকেই বিষয়টাকে ‘রিচ্যুয়াল’ তথা প্রথা-প্রচলনের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। এগুলো এক ধরনের বিভ্রান্তি, যা মুসলমানদের লক্ষ্যচ্যুত করেছে। সভ্যতায় অবদান রাখতে হলে মুসলমানদের রমযানের পবিত্র মাসে শুধু উপবাস নয়, তাকওয়ার গুণে সমৃদ্ধ হতে হবে। তাকওয়া হলো সার্বক্ষণিক এমন এক সূক্ষè পারমাণবিক চেতনা, যা মানুষকে অন্যায়-অপরাধ পরিহার করে ন্যায়ের ঝান্ডাকে উড্ডীন রাখতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। তাকওয়ার চেতনা মানুষকে ¯্রষ্টার বান্দায় পরিণত করে এবং বান্দা সবসময় হারাম তথা অন্যায় কাজ পরিহার করে চলে। এমন বান্দার অপেক্ষায় আছে আজ প্রিয় স্বদেশ এবং গোটা বিশ^। এমন বাস্তবতায় এখন কিছু কথা বলবো প্রিয় সদেশের স্বজনদের উদ্দেশ্যে।

ঈদ মোবারক। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সবাইকে জানাই ঈদ শুভেচ্ছা। ঈদ মুসলিম জীবনে শুধু আনন্দ-বিনোদনের বিষয় নয়, ঈদের সাথে জড়িয়ে আছে পবিত্র চেতনা ও দায়িত্ববোধ। ঈদ তো আসলে তাদের জন্যই, যারা পবিত্র কুরআনের বার্তা উপলব্ধি করে রাসূল (স.)-এর সুন্নাহ মোতাবেক মাহে রমযানে সিয়াম পালনে সফল হয়েছেন। সিয়াম শুধু উপবাসের নাম নয়, সিয়ামের লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন। শুধু ‘খোদাভীতি’ শব্দ দিয়ে তাকওয়ার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা যায় না। তাকওয়ার ব্যাঞ্জনা আরও গভীর ও ব্যাপক। আমরা বর্তমানে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, রাষ্ট্রিক ও বৈশি^ক পরিম-লে যেসব সমস্যা ও সংকট লক্ষ্য করছি, তার সমাধানও কিন্তু তাকওয়ার মধ্যে নিহিত। কেউ কেউ ভাবতে পারেন, হয়তো বেশি বলা হয়ে গেল। কিন্তু মহান ¯্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতার চেতনায় যারা ঘর-সংসার থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, তাদের উজ্জ্বল উদাহরণগুলো পর্যালোচনা করলে হয়তো আমরা বাস্তবভিত্তি খুঁজে পাব। হযরত ওমর (রা.) কোন চেতনায় বলেছিলেন, ‘আমার বোঝা আমিই বহিব সোজা’। কোন চেতনায় রাষ্ট্রের শাসক হওয়ার পরেও নিজেই খাদ্যশস্যের বোঝা বহন করে নিরন্ন দরিদ্র নাগরিকের ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন? সেটা কি তাকওয়ার চেতনা নয়? এ চেতনা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, স্বয়ং আল্লাহ সিয়ামের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন- আশা করা যায় এর মাধ্যমে তোমরা তাকওয়া অর্জনে সক্ষম হবে।

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর যখন উদার আকাশে শাওয়ালের চাঁদ ওঠে, তখন মুসলিম সমাজে আনন্দের ধারা বয়ে যায়। এটাই স্বাভাবিক এবং সঙ্গত। কিন্তু ঈদের পরে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক এবং বৃহত্তর পরিম-লে যখন অনাকাক্সিক্ষত এবং অনৈতিক ঘটনা লক্ষ্য করা যায় তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা সিয়াম ও ঈদের বার্তা গ্রহণে কতটা সক্ষম হয়েছি? পবিত্র রমযান মাসে আমরা যাকাত ও ফেতরা প্রদানের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের প্রতি কর্তব্য পালনের যে শিক্ষা পাই, তা সারা বছর অব্যাহত থাকে না কেন? রমযানের রোজা তো আমাদের সংযম, জবাবদিহিতা ও মানবিকবোধের উন্মেষ ঘটিয়ে দরদী-সমাজ গঠনের চেতনা জাগ্রত করে। সেই চেতনা রমযান ও ঈদের পরে অব্যাহত রাখতে আমরা সমর্থ হচ্ছি না কেন? এমন আত্মসমালোচনা আমাদের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।

সিয়াম ও কিয়ামের মাস রমযান আমরা অতিক্রম করেছি। সিয়াম ও কিয়াম আমাদের চিন্তা-চেতনা ও জীবন-যাপনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে, তা আজ আমাদের বিবেচনা করে দেখতে হবে। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস যাদের কপালে জুটেছে; যারা এ মাসে ¯্রষ্টার আদেশ-নিষেধ পালনে সক্ষম হয়েছেন, শাওয়ালের ঈদের চাঁদ তো তাদের জন্য আনন্দের বার্তাই বহন করে এনেছে। কিন্তু আনন্দের এ বার্তার মধ্যে উন্নত ও পবিত্র জীবন-যাপনের লক্ষ্যে যে দায়দায়িত্ব বহনের নির্দেশনা রয়েছে তাও আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উপলব্ধি, অন্বেষা ও কর্মতৎপরতার ঘাটতি থাকলে আমাদের ঈদ নিছক আনন্দ উৎসবের স্থূল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হতে পারে। যারা সিয়াম সাধনা করেছেন, রাতের দীর্ঘ কিয়ামে ¯্রষ্টার বাণীকে স্মরণ করেছেন, সিজদায় অবনত হওয়ার মাধ্যমে আনুগত্য প্রকাশ করেছেন, তাদের ঈদ তো শুধু আনন্দ উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। আমরা যদি আসলেই সিয়াম ও ঈদের বার্তাকে ধারণ করার মত যোগ্যতা অর্জন করে থাকি, তাহলে ঈদ পরবর্তী সময়ে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিম-লেও তার ইতিবাচক প্রভাব আশা করতে পারি। এমন আশা কতটা পূরণ হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, সিয়াম ও তাকওয়াসমৃদ্ধ মানুষের অপেক্ষায় আছে স্বদেশ এবং পৃথিবী। সায়েমদের কাক্সিক্ষত তৎপরতায় পৃথিবী আবার প্রাণবন্ত হোক। আনন্দ-উৎসবে সবাই বলুক ‘ঈদ মোবারক’।