আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এর আগে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট হয়নি। এবারের নির্বাচন ও গণভোট শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়-এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুর্বণ সুযোগ। এ সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য ‘হ্যাঁ’কে জয়যুক্ত করা প্রয়োজন। হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে। আর যদি ‘হ্যাঁ’ পরাজিত হয় তাহলে জিতে যাবে স্বৈরতন্ত্র, হেরে যাবে গণতন্ত্র। তাই ভোটের ঐতিহ্যকে আবার ফিরিয়ে আনার জন্য শঙ্কা দূর করা একান্ত জরুরি। বাংলাদেশে এর আগে যে কয়টি জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছিল- সে ধারাবাহিতকতা রক্ষা করা যায়নি। এবার সেই সুযোগ এসেছে। ভোটের মাঠে সহিংসতা বাড়লে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, ভোটে অংশগ্রহণ কমে যায়, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব হলেও বিশ্বমঞ্চে আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানো যায় না। শ্রীলংকার মতো সুষ্ঠু ভোটের রোল মডেল বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করার সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে শুধু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যর্থ হবে বিষয়টি এমন নয়! বাংলাদেশ ফিরে যাবে আবার ফ্যাসিবাদের আঁতুড়ঘরে।

এই নির্বাচন কেবল ভোটের লড়াই নয়- এটি দেশের গণতন্ত্রের শিকড়ের পরীক্ষা। প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার, যার মধ্যে ৫ কোটি তরুণ। দেশের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ সংখ্যক তরুণ সরাসরি ভোট প্রদান করবে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী আমেজটি সর্বত্র উৎসবমুখর। ফলে দেশের মানুষের মধ্যে বিরাট উৎসাহ ও উদ্দীপনা বিরাজ করছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জও স্লোগান আর গানের আওয়াজে মুখরিত। বড়দের সাথে পাল্লা দিয়ে শিশুরাও ভোট উৎসব উদযাপন করছে, মিছিলে শামিল হচ্ছে। ভোট উৎসব যেন আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেও শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন- নির্বাচন সিস্টেমের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। মানুষের আস্থা ফিরিয়ে কেন্দ্রে নিয়ে আসা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে- এই বিশ্বাস স্থাপন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ (সূত্র : ১০ আগস্ট. ২০২৫, বণিক বার্তা) নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ভোটের মাঠে ভয়, সংঘর্ষ ও রক্তপাতের ঘটনা বাড়ছে। ‘‘যার কিছুটা নমুনা পাওয়া যায় টিআইবির রিপোর্টে- জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ মাসে দেশে মোট ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫৫০টি বা ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ ঘটনায় বিএনপির সম্পৃক্ততা ছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। (সূত্র: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, প্রথম আলো)’’ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা ও হত্যার মতো জঘন্য ঘটনাগুলো সংবাদের শিরোনাম। সম্প্রতি বাবার কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে (মাওলানা মোহাম্মদ রেজাউল করিম) এক শিশুর নিষ্পাপ চোখের পানি পুরো দেশবাসীকে ব্যথিত করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে বিশ্বাবাসীও সেই নিষ্ঠুরতার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর একটি দলের নেত-নেত্রীরা যেন জংলীদের মতো ভিন্নমতের প্রার্থীর সমর্থকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সামান্য তুচ্ছ ঘটনায় একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন সেই দৃশ্যটি দেখছিলাম তখন মনের অজান্তেই চোখের কোণে পানি এসে গেল- যে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করে কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়। কারণ যার যায় সেই-ই জানে বিচ্ছেদ কতটা নিষ্ঠুর, কতটা নিঃশব্দে বুকের ভেতরটা ভেঙে দেয়। সন্তানের কাঁধে বাবার নিথর দেহ- এ ভার কেবল ওজনের নয়, এ ভার জীবনের, স্মৃতির ও নির্ভরতার। বাবাহারা সন্তানেরাই কেবল বুঝতে পারে, সেই ভার কতটা অসহনীয়। বাবার স্বাভাবিক মৃত্যু যেখানে মেনে নিতে বুক ছিঁড়ে যায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, সেখানে রাজনৈতিক কারণে একটি প্রাণ ঝরে যাওয়া- তা কি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায়? প্রশ্নটা শুধু একটি মৃত্যুর নয়, প্রশ্নটা মানবিকতার, রাষ্ট্রের, সমাজের ও বিবেকের। এই শোক শুধু একটি পরিবারের নয়; এই শোক আমাদের সবার- যদি আমাদের ভেতরে সামান্য মানববোধ থাকে।

পুরো দেশ যখন শান্তিপূর্ণ ভোটের প্রত্যাশায় তাকিয়ে তখন ২৮ শে জানুয়ারি শেরপুরে-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে। এ ঘটনায় শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মাওলানা মোহাম্মদ রেজাউল করিম নিহত হন। এটি কোনো রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়, এটি একটি নগ্ন হত্যাকাণ্ড। এই মৃত্যুর নিন্দা জানানোর মতো কোনো ভাষা আমার জানা নেই-কারণ কিছু মৃত্যু শুধু শোক নয়, বিবেককেও আঘাত করে। যারা এই অপরাধ ঘটিয়েছে- তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধী পরিচয়টাই মুখ্য। চেয়ার বসার মতো তুচ্ছ ও নগণ্য একটি বিষয় নিয়ে একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয়া কোনো সভ্য সমাজ বা সভ্য রাজনীতির কাজ হতে পারে না। যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তারাও কারও না কারও সন্তান। তাদেরও ঘরে আছে, ছেলেমেয়ে, বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বজন। তাহলে কীভাবে তারা আরেকটি পরিবারের বুক শূন্য করতে পারল? কীভাবে একটি সন্তানের মাথা থেকে বাবার ছায়া কেড়ে নেয়ার নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নিতে পারল? এই হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যারা এই নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত তাদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক। ন্যায়বিচার শুধু নিহতের পরিবারের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও সমাজকে রক্ষা করার জন্য অপরিহার্য। কারণ রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো নির্বাচন, কোনো রাজনীতি, কোনো গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না।

রাজনীতিতে বিরোধ থাকবে- এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু তাই বলে প্রতিপক্ষের মানুষকে হত্যা করতে হবে? এ কেমন রাজনীতি? এ কেমন ভোট? আমরা তো এমন ভোট চাইনি। হাসিনার শাসনামলের নিষ্ঠুরতার অবসান হওয়ার পর সাধারণ মানুষ আশা করেছিল, হত্যার রাজনীতি, খুনোখুনি আর রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি বন্ধ হবে। কিন্ত বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা-সহিংসতা বন্ধ হয়নি, বরং নতুন রূপে, নতুন ব্যানারে তা চলমান রয়েছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩ মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫) দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১৬০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৫০ জন। শুধু বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই নিহত হয়েছেন ৮৫ জন, আহত হয়েছেন ৫ হাজার ১৭ জন। (সূত্র: প্রথম আলো, ১৪ অক্টোবর ২০২৫) আওয়ামী লীগের শাসনামলে যেমন দলীয় কোন্দলে নিজ দলের নেতাকর্মীরাই আহত ও নিহত হতো, ঠিক একই কায়দায় এখন বিএনপির দলীয় কোন্দলেও নেতাকর্মীরা প্রাণ হারাচ্ছে-যা নিঃসন্দেহে গভীরভাবে দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির ভাষ্য অনুযায়ী এর আগের শেষ আটটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতায় প্রায় ৬৪৭ জন মানুষ নিহত হয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত আটটি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতা ও প্রাণহানি ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই নির্বাচনে সহিংসতায় প্রাণ হারান ২৪৮ জন। এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে নিহত হন ৪৯ জন, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ৫১ জন, একই বছরের জুনের নির্বাচনে ৪৫ জন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ২১ জন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৪২ জন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৬১ জন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৩০ জন। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘটিত ৮১৬টি সহিংস ঘটনায় ৩১৭ জন নিহত এবং ১৮ হাজার ১০১ জন আহত হয়েছেন। পরিসংখ্যানগুলোর স্পষ্টভাবে দেখায়- নির্বাচন মানেই আমাদের রাজনীতিতে এখনো রক্ত, লাশ আর আতঙ্কের গল্প। গত ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টনে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর হত্যাকারীরা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। বগুড়া-৬ সদর আসনে ভোটের দিন ভোট কেন্দ্রে গেলে জামায়াত কর্মীদের পা কেটে নেওয়ার হুমকি দিয়েছে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা। চুয়াডাঙ্গা ১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর অনুসারী এক নেতা প্রকাশ্যে নারীদের হিজাব এবং অন্তর্বাস ছিঁড়ে ফেলার হুমকি দিয়েছে। এমন খবর যখন প্রকাশিত হয় তখন সহজে অনুমেয় ভোটের পরিবেশ কেমন হবে? এক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা যায়নি। এ ধরনের ঘটনা গ্রামে গঞ্জে অহরহ ঘটছে। এগুলো আমাদের নির্বাচনী রাজনীতিতে সহিংসতার একটি ধারাবাহিক ও ভয়ংকর চিত্র। প্রশ্ন থেকেই যায়- এই রক্তপাতের দায় কে নেবে? আর কবে আমরা এমন একটি নির্বাচন দেখতে পাব, যেখানে ব্যালট বাক্সে ভোট পড়বে, কফিনে নয়?

রাজনীতির ভাষা হওয়া উচিত ছিল পারস্পরিক সহনশীলতা। একের অপরের অধিকার ও মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো সেই ভাষা আজ প্রায় বিলুপ্ত। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-নেত্রীরা ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় পর্যন্ত রাজনীতির ময়দানে টেনে এনেছেন। এখান থেকেই জম্ম নিয়েছে প্রতিহিংসার রাজনীতি, ঘৃণার চাষাবাদ। এই বিকৃত রাজনৈতিক চর্চাই ধীরে ধীরে নির্বাচনী উৎসবকে রক্তাক্ত সংঘাতে রূপ দিয়েছে। এই দুষ্টচক্র থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মানসিকতার আশু ও মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিরোধ থাকবে। কিন্তু সেই বিরোধের কারণে মানুষ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। এসব ঘটনা প্রমাণ করে আমরা ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে গেছি; মতের ভিন্নতা সহ্য করার ক্ষমতাও হারিয়েছি। নির্বাচনী সহিংসতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পক্ষপাত নয়, কোনো রাজনৈতিক আনুগত্য নয়- আইনের চোখে সবাই সমান- এমন দৃশ্যই দেশবাসী দেখতে চায়। কারণ ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতা ছাড়া শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও টেকসই গণতন্ত্র কোনোটিই সম্ভব নয়। লেখক : প্রাবন্ধিক