॥ সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা ॥
ছাত্রজীবনে মাদরাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সবর পদচারণা ছিলো আমার। ক্যাম্পাসের সবুজ চত্বরে দাপিয়ে বেড়িয়েছি দীর্ঘ সময়। অর্জিত হয়েছে নানাবিধ বিচিত্র ও জটিল অভিজ্ঞতা। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার হাতেখড়ি। এরপর শিক্ষক বাবার হাত ধরেই হাতিগাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতাম। বয়স ছিলো খুবই কম। কোন কোন সহপাঠিনী আমাকে কোলে উঠিয়ে হাসিঠাট্টা করতো। এ বিষয়ে এগিয়ে ছিলো বিলকিস। ক্লাস থ্রীতেই দফারফা। সোলাইমান আর অপেক্ষা করতে পারেন নি। একদিন টুপি-শেরওয়ানীতে এসে হাতে হাত রেখেছিলেন রানী বিলকিসের। পোলট্রি মুরগীর মত নাদুস-নুদুস রানীর বয়স কম হলেও যৌবনের দীপ্তি ছিলো খুবই স্পষ্ট। এরপর বিলকিসের আর কোন খোঁজ-খবর পাইনি। হয়তো এতোদিনে সে রীতিমত বুড়ি হয়ে গেছে। নাতি-নাতনীরও হয়তো হয়েছে বিয়ে-থা।
‘রমনী’ ছিলো এক বন্ধু। ‘ বেডা’র নাম ‘রমনী’ হলো কী করে তা কখনো বোধগম্য হয়নি আমার। যাহোক স্কুলে আসার সময় নানা ধরনের খাবার-দাবার নিয়ে আসতো রমনী কান্ত। বেশ ভোজন বিলাসী। মৌসুমী ফল থাকতো তার আইটেমে। আখের সময় নিয়ে আসতো আখ। সে ক্লাসে একমাত্র হিন্দু শিক্ষার্থী। বন্ধুরা যাতে তার কাছে কিছু চাইতে না পারে সে জন্য সব ফল ও আখে কামড় বসিয়ে দিতো অবলীলায়। সম্পদ রক্ষার অভিনব এবং কার্যকরী কৌশল। ওর সাথে অবশ্য বেশিদিন থাকা হয়নি। বছর কয়েক আগে ওর খোঁজ নিয়েছিলাম। শুনেছি বেটা বজ্জাত আর দেশে নেই। গাট্টিগুট্টি নিয়ে একেবারে গো-মাতার দেশে দেশান্তরি হয়েছে। এতোদিনে আমার চেয়ে বেশী বুড়ো হয়েছে। হয়তো অযোদ্ধার রাম মন্দিরে বনে গেছে ভক্ত-পুঁজারী।
এরপর পা রেখেছিলাম কড়ই আলীয়া মাদরাসায়। আব্বার অজান্তেই কাজিন শামসুজ্জানের হাত ধরে শুধুই কায়েদা হাতেই হাজির হয়েছিলাম উত্তরবঙ্গের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানে। প্রথম দিনেই মুখোমুখি হয়েছিলাম উর্দু শিক্ষক মরহুম মাওলানা মোকছেদুর রহমান (রাহি.)-এর। উর্দু কোন হরফের সাথে তখনো পরিচয় ঘটেনি। কিন্তু উস্তাদজী আমাকে উর্দু কী পহলী কিতাব খুলে প্রথম দিনেই অঙ্গুল ধরিয়ে আবৃতি করালেন, ‘কুচ লেখ-পর, মুঝে আম দো, কাল বুথথা, কিছি কো দুখ না দো’। এটিই ছিলো আমার উর্দু জবানের প্রথম পাঠ। উস্তাদজীর পাঠের মর্মানুযায়ি কিছু লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছি, ঘনিষ্ঠজনদের কাছে আম চাওয়ার অভ্যাসও ছিলো বা এখনো আছে, সব মঙ্গলবারের পর তো বুধবারই হয় এতে কোন ব্যত্যয় নেই এখনো; আর কারো কখনো উপকার করতে না পারলেও জ্ঞাতসারে কারো ক্ষতি করিনি বা দুঃখ দিইনি। দু’এক দিন পর তিনি আমাকে পড়িয়ে দিলেন, ‘মসলি পানি মে টরহি হ্যাঁয়’। এরপর ‘কালেজ কী লারকিয়া বরি চালাক হুতি হ্যাঁয়’-কলেজের ছাত্রীরা খুব বুদ্ধিমতি-চতুর হয়। অর্থটা শুনে হেসেছিলাম গাল ভরে। কলেজে ভর্তি হলেই মেয়েরা বুদ্ধিমতি হয়ে যায়। তাহলে ছেলেরা নয় কেন ? রহস্যটা আমার কাছে আজো রহস্য রয়ে গেছে।
উস্তাদজীর তালীমে আমি অতিদ্রুতই উর্দু ভাষা মোটামোটি শিখে ফেলি। মাদরাসায় ‘তালিমুল ইসলাম’ নামে উর্দুতে ফিকহের কিতাব পড়া হতো। পরীক্ষায় খাতায় অন্যরা বাংলায় লিখলেও আমি লিখতাম উর্দুতে। যাহোক ক্লাস নাইনে এসে ইংরেজী পড়তে গিয়ে উর্দু বাদ দিতে হয়। আর তখনই উর্দুর সাথে আমার সখ্যতায় ভাটির টান পড়ে। এখন সবকিছু ভুলতে বসেছি। মুখে খুব একটা জোর না থাকলেও উর্দু কিতাব পড়লে মোটামোটি বুঝতে পারি।
আব্বা প্রথমে আমাকে মাদরাসায় পড়াতে খুব একটা রাজি ছিলেন না। আমি খেয়ালীপনার বসেই নিজের ইচ্ছায় মাদরাসায় ভর্তি হয়েছিলাম। কিছুদিন যাওয়ার পর আমি আর মাদরাসায় পড়তে চাইনি। তখন আব্বা আর মাদরাসা ছাড়াতে রাজি হননি। ফলে আমাকে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাদরাসায় থেকে যেতে হয়েছে।
আগেই উল্লেখ করেছি যে, আমি ক্লাসের সবচেয়ে কমবয়সী শিক্ষার্থী ছিলাম। আমার সব সহপাঠিরই আমার সাথে বয়সের বড় ব্যবধান ছিলো। আমার ইমিডিয়েট বড় কাজিন লিলির বড় বোন আরেক কাজিন মনোয়ারার সাথে পড়তাম। আমার চেয়ে বয়সে ৫ বছরের বড় সাইফুল ইসলাম মুকুল পড়তেন আমার এক ক্লাস নিচে। সুলতান মাহমুদ সহপাঠি ছিলো। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় তার বাবা মাওলানা মজিবর রহমান শহীদ হোন। মাহমুদের ইমিডিয়েট ছোট ভাই রমজান আলী, তার ছোট মাহবুব আলী এবং তার ছোট সুলতানুর রেজা। আমার জন্ম ১৯৭১ সালে। তাহলে সুলতান মাহমুদের সাথে আমার বয়সের ব্যবধানটা সহজেই অনুমেয়। এক প্রতিবেশী আনিছুর রহমান আমার চেয়ে ১০ মাসের ছোট। কিন্তু লেখাপড়ায় ৪ বছরের জুনিয়র।
ক্লাসে এসব বয়স্ক বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিয়ে আমি খুব একটা সুবিধা করতে পারতাম না। বান্ধবীরাও কান ধরে টানাটানি করতো। সব সময় উত্যক্ত করতো এই বলে যে, আমারও তাদের মতো বয়স হলেও বামন হয়ে আছি; বয়স অনুযায়ী বড় হইনি; হওয়ার সুযোগও নেই। বন্ধু আব্দুল গাফফার (মরহুম) রহস্য করে আমাকে ‘বল্টু’ বলে ডাকতো। কারণ, আমার আকৃতি তাদের চেয়ে অনেক ছোট। আমার বিষয়ে সকলের অনুভূতির নির্যাসটা হলো, আমি ক্লাসের বনসাঁই; বামন প্রকৃতির মানুষ। বয়স অনুযায়ী শরীরের প্রবৃদ্ধি ঘটেনি; ঘটবেও না। বিষয়টি আমার কাছে বেশ বিব্রতকরই মনে হতো। একটা অপ্রাপ্তি কাজ করতো আমার মধ্যে। তবে আমি এখন ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার স্বাভাবিক মানুষ। কিন্তু যারা আমার উচ্চতা ও শারীরিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে হাসিঠাট্টা করতো তাদের অনেকেরই উচ্চতা আমার চেয়েও কম।
আগেই উল্লেখ করেছি যে, আমার বয়স্ক সহপাঠিদের সাথে খুব একটা সুবিধা করতে পারতাম না। খেলাধূলা বা দুষ্টুমীতেও সবসময় পিছিয়ে। ছোট বলে সাথেও কেউ সাথে নিতে চাইতো না; সব সময় এড়িয়ে চলতো। বেশ অসহায় বোধ করতাম আমি। তাই ক্লাসে প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়ার সুযোগ কখনো পাইনি। তবে তৃতীয় হয়েছি। ক্লাসে সব সময় প্রথম ও দ্বিতীয় হতো আজিজুল হক ও শফিউল্লাহ। অস্বচ্ছল পরিবারের আজিজুলের বাড়ী নওগাঁ জেলায়। জায়গীর থাকতো জলাটুল গ্রামের পাইক পাড়ায়। বন্ধু আবু মূসার চাচার বাড়ী। ঘুমাতো একই ঘরে। শফিউল্লাহর বাড়ী কড়ই; মাদরাসার গ্রামেই। ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে রসিক বা ফাজিল প্রকৃতির ছিলো আবু মূসা। বড় বেশি কথা বলার অভ্যাস ছিলো এ বাচালের। চটুল কথা বলতেও ছিলো বেশ পারদর্শী। বন্ধু-বান্ধবীদের বিনোদন দিতে সে ছিলো খুবই করিৎকর্মা। পরিচিত ছিলো ফাজিল মূসা নামে।
সে সময় মাদরাসার ‘আজিজুত ত্বলেবীন’ নামের আরবী গ্রামার (কাওয়ায়েদ) গ্রন্থ পরা হতো। উর্দু ভাষার গ্রন্থটি মূলত সরফ বা শব্দের রূপান্তর (Transformation of words) বিষয়ক। গ্রন্থটিতে আবরী শব্দগুলো কীভাবে কালের বিবর্তনে রূপান্তিত (তালিল) হয়ে বর্তমান বা আধুনিক রূপ ধারণ করেছে, সে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন, আরবি শব্দ ‘ক্বালা’র রূপান্তর সূত্র, ‘ক্বালা আসল মে কাওলা থা। জো জামানা গুজাসতা সে মুতাআল্লক হো, ‘ওয়াও’ গেরা গিয়া। ক্বালা হুয়া’। আবু মূসার তালিল হলো, ‘কানা আসল মে চোখাল (চক্ষুষ্মান) থা। জো জামানা গুজাসতা ছে মোতাআল্লক হো, এক চোখ গেরা গিয়া; কানা হুয়া’। আবু সাঈদ নামে এক খুবই সাদামাটা-হাবাগোবা বন্ধু ছিলো আমাদের। বন্ধুরা তাকে আবু সাঈদ খুদরী (প্রখ্যাত সাহাবী) নামে সম্ভোবন করে উত্যক্ত করতো। পড়াশোনায় খুব সুবিধা করতে না পারলেও কিছু চটুল ও হাবাটে কথা বলতে অভ্যস্ত ছিলো। তার ভুলভাল কথায় আমরা সবাই হেসে দিতাম। সে কখনো ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ বলতে পারতো না বরং বলতো ‘রয়েল বেঙ্গল টাঙ্গাইল’। স্থানীয় তেঘরা গ্রামের আবু সাঈদ নামে আরেক বন্ধু ক্লাস ফোরেই কার্য সম্পাদন ও বৈরাগ্যবাদ ত্যাগ করে বেশ ধরেছিলো ইলেট্রিশিয়ানের। পড়াশোনারও যবনিতাপাত সেখানেই। আইয়ুব নামে এক বন্ধু ছিলো। বগুড়ার গোকুলে বাড়ী। বজ্জাতিতে মূসার চেয়ে কোন অংশেই কম ছিল না। দূরন্তপনায়ও তার জুরি মেলা ভার।
আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো আলাউদ্দীন (মরহুম)। একই গ্রামে বাড়ী। বয়সের ব্যবধানও ছিলো বেশ। তার ছোট বোনকে এখনো ফুফু আম্মা বলে সম্বোধন করি। উনি আমাকে নাম ধরে ডাকেন। কিন্তু তার বড় ভাই আমার ক্লাসমেট। অত্যন্ত খেয়ালী গোছের হলেও খুবই সহজ-সরল মানুষ ছিলো মরহুম আলাউদ্দীন। যখন যা চাইতো তাই করতো। দরাজ কন্ঠে গান গাওয়া তার বিশেষ বৈশিষ্ট ছিলো। ইসলামী, ছায়াছবি, নজরুল-রবীন্দ্র সঙ্গীত, আঞ্চলিক-ভাটিয়ালি, আধুনিক, হিন্দি-উর্দু কোন গানেই তার সমকক্ষ কেউ ছিলো না তখন। বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ তাকে সুর সম্রাট মিয়া তানসেন বলে ডাকতো। কোন বিষয়ের শিক্ষক ছুটিতে থাকলেই বেঞ্চ বাজিয়ে সূরেলা কন্ঠে একক সঙ্গীত পরিবেশন করতো উস্তাদ আলাউদ্দীন। দরাজ কন্ঠের সূরের যাদুতে মুখরিত হয়ে উঠতো তালাত মাহমুদের গান ‘তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে’। আবার কখনো মোহাম্মদ রফীর ‘দুনিয়াকে রেখওয়ালে’ হিন্দি গান। অবসরটা কাটিয়ে যেতো বিনোদনের মধ্য দিয়ে। এজন্য সময় সময় থাকে শিক্ষকদের হাতে শাস্তির সম্মুখীন হতে হতো। কিন্তু এতে কোন পরওয়া ছিলো না তার।
আব্দুল হাকিম ছিলো আরেক বন্ধু। কিন্তু ওর সাথে আমার কখনোই বনীবনা হতো না। প্রায় সময় উত্তক্ত করার চেষ্টা করতো। কোন কোন সময় মেরেও বসতো। কিন্তু আমি ছোট হওয়ায় সে সবের কোন প্রতিকার করতে পারতাম না। একদিন সামনের বেঞ্চে বসাকে কেন্দ্র করে একটা বড় ধরনের ঝামেলা হয়েছিলো আমার সাথে। ওর দাবি সে যখনই আসুক সামনের বেঞ্চ তাকে ছেড়ে দিতে হবে। সুবিধা করতে না পেরে ইটের ছোট একটা টুকরা ওর দিকে ছুড়েছি। কপালে আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত হয়েছিলো আব্দুল হাকিম। শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছিলাম সেদিন। হাতেপায়ে ছোট হওয়ায় ইংরেজি শিক্ষকের তিরস্কারের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান হয়েছিলো। তবে একটা অপরাধবোধ আজও পীড়া দেয় আমাকে; রয়েছে একটা মর্মযন্ত্রণাও।
কারো সাথে না পারলেও আমি রুহুল আমীনের সাথে কিছুটা সুবিধা করতে পারতাম। বয়স ও আকার আকৃতিটা কিছুটা কাছাকাছি ছিলো। তাই চুন থেকে পান খসলেই দু’জন মারামারি করে বসতাম। আবার ঘনিষ্ঠতাও ছিলো তার সাথেই বেশি। সে শুধু আমার সাথেই হাতিহাতি করতো না বরং একবার প্রতিবেশীর সাথে মারামারিতে মাথাটা চৌচির করে ভর্তি হয়েছিলো হাসপাতালে। সে সুযোগটাই সে কাজে লাগিয়েছিলো যথাযথভাবে। নার্স আয়েশাকে ঘরে তুলেছিলো সে সুবাদেই। সাপেবর হয়েছিলো তার মাথা ফাটার ঘটনা।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের এদের সকলের সাথে ব্যবচ্ছেদ ঘটেছিলো আমার। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানিকরা আমার মন থেকে কখনো বিস্মৃত হয়নি। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে আজিজুলের মত মেধাবী সহপাঠি আমি কখনো পাইনি। ক্লাসে পড়া বুঝিয়ে দেওয়া বা প্রশ্ন করে কেউ তাকে বিব্রত করেছে এমন ঘটনা আমার মনে পড়ে না। লজিং থেকে অতিকষ্টে লেখা পড়া করতো সে। হঠাৎই সে ক্লাস থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলো। হার মানতে হয়েছিলো দরিদ্রতার কাছে। জীবন-জীবিকার তাগিদেই অতি আল্প বয়সেই তাকে কর্মমুখী হতে হয়েছিলো। শুনেছি সে ক্বারীয়ানা প্রশিক্ষণ নিয়ে কৈশরেই মাদরাসায় ক্বারী পদে চাকুরি নিয়েছিলো জীবন-জীবিকার তাগিদেই। নক্ষত্রের পতন হয়েছিলো এভাবে। শফিউল্লাহ ক্লাস থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো খুব কাছাকাছি সময়েই। একদিন স্থানীয় কুড়াল পুকুরে তাকে রিক্সভ্যান চালাতে দেখে বিস্মিত ও কষ্ট পেয়েছিলাম। গামছা দিয়ে বারবার মাথার ঘাম মুছতে দেখেছি। দরিদ্রতা তাকে নিয়েছিলো দৃশ্যপটের অন্তরালে।
পরিণত জীবনে আব্দুল গাফফার হয়েছিলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। কিন্তু দুনিয়ার ভিসার মেয়াদটা বেশীদিন ছিলো না। ট্রেন-মোটর সাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলো সে। একদিন ঢাকার পপুলার হাসপাতালে রুগী দেখতে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে পরিচয় হয়েছিলো বন্ধু আব্দুল হাকিমের মেয়ের সাথে। ঢাকা হোম ইকনোমিকস কলেজের শিক্ষার্থী। মেয়ের বর্ণনায় জেনেছি সে একটা কলেজে অধ্যাপনা করতো তখন। পরিচয় হয়েছে এক সরকারি প্রাইমারীর শিক্ষিকার সাথে। কিন্তু তারও দুনিয়ার জীবনটা দীর্ঘায়িত হয়নি। একদিন খবর পেয়েছিলাম সেও আর নেই। বন্ধু মোয়াজ্জেম হোসেনও দুনিয়ার সফর শেষ করেছে অতি অল্প বয়সেই।
লোক মুখে শুনেছি বন্ধু আনিছুর রহমান এখন মাদরাসা অধ্যক্ষ, মিজানুর রহমান ও আব্দুর রাজ্জাক সোনার মাদরাসা সুপার, হাবিবুর রহমান, রেজাউর করিম ও সুলতান মাহমুদ অধ্যাপক, আইয়ুব আলী বগুড়ার নট্রামস-এ চাকুরি, আবু মূসা ও আবুল খায়ের রীতিমত সংসারী, মাহফুজুর রহমান বিশ^বিদ্যাল অধ্যাপক, রেজাউল করিম ডাক্তার সহ বন্ধু-বান্ধব বিভিন্ন সম্মানজনক পেশায় রয়েছে। কেউ কেউ আবার দুনিয়ার সফর শেষ করেছে।
আলাউদ্দীন যখন মারা যায় তখন আমি ফ্যাসিবাদী তা-বে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে। খবরটা পেয়েছিলাম লৌহ গারদের অভ্যন্তরেই। নিজেকে সামাল দিতে পারিনি। গারদের মধ্যেই কেঁদেছি দীর্ঘ সময় ধরে। জেল থেকে মুক্তির পর যখন আলাউদ্দীনের কববের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি তখন দু’চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে আমার। ধরে রাখতে পারিনি চোখের পানি। মহাপ্রভূর কাছে প্রার্থনা করেছি জান্নাতে তার আ’লা মাকামের জন্য। মুখ থেকে নিসৃত হয়েছে, আল্লাহুম্মাগফির লি হাইয়্যিনা ও ওয়া মায়্যিতিনা.....!
এসব মানিকদের অনেকেই হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। কেউ মৃত্যুজনিত কারণে, আবার কেউ জীবন পরিক্রমায়; জীবন-জীবিকর তাগিদে। কিন্তু এরা সকলেই স্মৃতি-স্মরণে চির আম্লান; চিরভাস্বর!
www.syedmasud.com