আমাদের দেশে চেতনার ব্যবসা চলেছে দীর্ঘকাল ধরে। স্বাধীনতা পরবর্তীতে এ ব্যবসা শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের দাবিদারই এ ব্যবসার অনুঘটক। মূলত, নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস চরিতার্থ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্যই অভিসন্ধিকেই বানানো হয় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনা। স্বাধীনতার চেতনা বলতে মূলত বাংলাদেশর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও মূল্যবোধকে বোঝানো হয়, যা একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, শোষণমুক্ত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের অনুপ্রেরণার অংশ। এ চেতনা শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, বরং মানুষের মৌলিক অধিকার, সাম্য ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার আকাক্সক্ষা। বস্তুত, স্বাধীনতা হলো একটি এমন বিশেষণ, যা একটি জাতি, দেশ বা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ অবস্থান বোঝায়; যেখানে তাদের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা ও ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব থাকবে। তবে স্বাধীনতা কোনো অর্থেই দায়িত্বহীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা নয়।

স্বাধীনতা সুদীর্ঘ বিপ্লব; এর উদ্দেশ্য হলো আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও সার্বভৌমত্ব অর্জন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু থেকেই জাতীয় স্বাধীনতার উদ্দেশ্যেই ছিল। স্বায়ত্তশাসনও এক ধরনের স্বাধীনতা, যেখানে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে থাকে এবং নিজের কর্তৃত্বও বজায় রাখতে সক্ষম হয়। ১৭৭০-এর দশকে শুরু হয়ে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৮২০ এর দশক পর্যন্ত চলে। তখন রাজকীয় দুর্গের পতন ঘটে এবং আমেরিকা স্বাধীন হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলস্বরূপ উসমানীয় সাম্রাজ্য ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং এর ফলে বলকান অঞ্চলে অনেক স্বাধীন দেশের জন্ম হয়। এরপর ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলো থেকে ৭০টি নতুন রাষ্ট্র স্বাধীনতা পায়। মূলত, স্বাধীনতা প্রত্যেক জাতির জন্যই আরাধ্য। তাই স্বাধীনতা সংগ্রামের কীর্তিগাথা ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমাদের স্বাধীনতাও জাতীয় জীবনের বড় অর্জন। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তির স্বপ্ন বহুল চর্চিত বিষয়। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ অর্থ যে সব আদর্শ আমাদের বীর জনতাকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদের প্রাণোৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তবে পরিতাপের বিষয়, ১৯৭১ সালে রণাঙ্গনের সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসকদের যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, শোষণ থেকে মুক্ত হয়েছি ঠিকই কিন্তু কাক্সিক্ষত মুক্তি আজও মেলেনি। আমাদের রাজনীতি ও অর্থনীতি এখনো বিদেশি প্রভূর ওপর নির্ভরশীল। দুর্নীতি আজও আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে রয়েছে। এসবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে পতিত আওয়ামী স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠী। আর এদের স্বৈরাচারি ও ফ্যাসি মানসিকতার কারণেনই আমাদের আইন, বিচার ও সমাজব্যবস্থা এখনো দুর্নীতি, অনিয়ম, অবিচার, স্বজনপ্রীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থি। স্বাধীনতার পর থেকেই দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বহু আইন, বিধি-বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২-এর সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ নামক যে বিষবৃক্ষ আমদানি করা হয়েছে, তা কোনোক্রমেই দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি ও তাহজীব-তামুদ্দনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মূলত, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শাসকগোষ্ঠী আমাদের জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষা, প্রত্যাশা ও মূল্যবোধকে মূল্যায়ন করা হয়নি বরং মহল বিশেষ নিজেদের চাওয়া-পাওয়া ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাশষকেই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনা বানিয়ে বিরোধী মতকে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি হিসাবে চিত্রিত করেছে। এক্ষেত্রে ভিন্নমতকে পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী চেতনা হিসাবে আখ্যা দিয়ে অপশাসন-দুঃশাসন চালানো হয়েছে। বিদেশি প্রভূর হস্তক্ষেপের কারণে সংবিধানকে বলপূর্বক নাস্তিক্য ও ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন আওয়ামী লীগ। এভাবেই সদ্য স্বাধীন দেশ ও শিশুরাষ্ট্র প্রকৃত মুক্তির পথ হারিয়েছে। ফলে স্বাধীনতার স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি; সুফলগুলোও ঘরে তোলা যায়নি। মূলত, স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার মুক্তস্বাধীন সত্তা ত্যাগ করে ভারতীয় গোলামির জিঞ্জিরকেই আলিঙ্গন করা নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার প্রধান অনুষঙ্গ বানিয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সাথে একের পর এক নানাবিধ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন করেছে। এসব চুক্তি ছিলো সম্পূর্ণ একপাক্ষিক। আমাদের জাতীয় স্বার্থের সাথে-এর কোন দূরতম সম্পর্কর্ ছিলো। যার প্রমাণ পাওয়া যায় পতিত আওয়ামী নেত্রীর আত্মস্বীকৃতি থেকে। তিনি অবলীলায় বলেই ফেলেছিলেন, ‘আমরা যা দিয়েছি, ভারত তা কখনোই ভুলবে না’।

মূলত, সাম্য, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও বৈষম্যহীন সমাজই ছিলো মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মূল চেতনা। এসব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আমারা ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। কিন্তু-এর একটি দল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বানাতে মোটেই কসুর করেনি বরং এর যথেচ্ছ অপব্যবহার করা হয়েছে। কথিত চেতনায় মাত্রাতিরিক্ত অপপ্রয়োগ ও অপব্যবহারের কারণে অধিকাংশ মানুষের কাছে তা আবেদন হারিয়ে বিরক্তির অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। এমনকি মহল বিশেষের মওকা ও মতলববাজির কারণে শব্দ দু’টি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। মূলত, আওয়ামী লীগাররা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বড় লাভজনক বাণিজ্যে পরিণত করেছিলো। অবস্থার এমন অবনতি হয়েছিলো যে, কারো মধ্যে কোন আদর্শ বা মূল্যবোধের দরকার ছিলো না বরং শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করলেই আর কিছু প্রয়োজন হতো না। এ চেতনা বিক্রি করে হাজার হাজার কোটি টাকা ইনকাম করে বিদেশে পাচারের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে ফোকলা করে ফেলা হয়েছে। সরকারদলীয় নেতাকর্মীরাসহ একশ্রেণির মূল্যবোধহীন আমলা ব্যাপক অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে বিদেশে বেগম পাড়া বানিয়েছেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা তার ষোল বছরের অপশাসন-দুঃশাসনে এ ‘চেতনা’ যথেচ্ছ অপব্যবহার করে দর্নীতি-লুটপাট, ঘুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, জুডিশিয়াল কিলিং এবং আয়নাঘরের জুলুমকে দেশে ও বিদেশে বৈধতা দিয়েছেন।

পর পর তিনটি ভুয়া নির্বাচনের পর তথাকথিত ইসলামী জঙ্গী ও মৌলবাদ ঠেকানোর গল্প ফেরি করেই আওয়ামী নেত্রী বিশ্বকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছেন। এ তকমা দিয়েই শত শত নিরীহ ও ধর্মপ্রাণ মানুষকে হত্যা করে দেশকে রীতিমত বধ্যভূমিতে পরিণত করা হয়েছিলো। দেশকে বানানো হয়েছিলো ভীতিকর ও আতঙ্কের জনপদে। জুলুম, নির্যাতন, হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, গুম, অপহরণ, গুপ্তহত্যা ও আয়না ঘরে নির্যাতনের মাধ্যমে কার্যত দেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিলো। জনমতে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হলেও তা সংগঠিত করার মত কোন রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। ফলে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ পরিসরে দেশে অপশাসন-দুঃশাসন, দুর্নীতি-লুন্ঠন চালাতে সক্ষম হয়েছিলো। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ অপরাধ এমন পর্যায়ে পৌঁছিলো যে, সাবেক প্রধান বিচারপতি মরহুম হাবিবুর রহমান তদানীন্তন সরকারকে বাজিকরের সরকার হিসাবে আখ্যা দিয়েছিলেন। সে সরকারের চুরি-ডাকাতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিলো যে, আওয়ামী লীগ মানেই চোর বলে আখ্যা দিয়েছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক মরহুম এবিএম মূসা। দেশের সর্বোচ্চ আদালত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে রীতিমত রং হেডেড আখ্যা দিয়েছিলেন। এ রং হেডেড নেত্রীর দ্বারাই আমরা শাসিত ও নির্যাতিত হয়েছি দীর্ঘ কাল।

তবে ইতিহাসের দায় থেকে আওয়ামী লীগ রেহাই পায়নি বরং এক অনিবার্য বাস্তবতায় জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী মাফিয়াতন্ত্রীদের পতন হয়েছে। যা ইতিহাসের নির্মম পরিণতি হিসাবেই বিবেচনা করা হয়। আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা দম্ভভরে বলে আসছিলেন যে, তাদের পতন ঘটানোর মত ক্ষমতা করো নেই বরং তারা ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু তাদের সে স্বপ্নবিলাস ছাত্র-জনতা কোনভাবেই সফল ও স্বার্থক হতে দেয় নি বরং জুলাই বিপ্লব হাসিনা-ভারতের দালালদের একাত্তরের নামে চেতনার ব্যবসাকে রীতিমত কবর দিয়েছে। ফলে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে দলের শীর্ষ নেত্রীসহ সকল মন্ত্রী-এমপিকে। বিচারপতি, আমলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা সর্বোপরি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও পালিয়ে গেছেন বা আত্মগোপন করেছেন। এমনকি বায়তুল মোকাররাম জাতীয় মসজিদের খতিবকে পর্যন্ত পালাতে হয়েছে। যা বিশ্ব ইতিহাসের এক নজীরবিহীন ঘটনা।

মূলত, আওয়ামী লীগ কর্তৃক একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথিত চেতনার ন্যারেটিভকে গত ৫৪ বছর ধরে এ জাতিকে এমনভাবে গেলানো হয়েছে যে, আওয়ামী পরবর্তী সময়ে অতিপ্রগতিশীল তাদের প্রতিপক্ষরাও এখন এর অপব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। আসলে এরা এখন আওয়ামী লীগের দোসর হয়ে দেশ ও জাতিকে বিভক্তকারী আত্মঘাতী পুরনো খেলায় মেতে উঠেছেন। বিষয়টি আওয়ামী লীগ যেমন ক্ষমতায় টিকে থাকার অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত করেছিলো, ঠিক তেমনিভাবে অন্যরাও কথিত এ চেতনাকে ক্ষমতার যাওয়ার হাতিয়ার বানিয়েছে। তবে তাদেরকে উপলব্ধি করা উচিত যে, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও যখন মৌলিক অধিকারের জন্য হাজার হাজার মানুষকে রক্ত দিয়ে রেজিম চেঞ্জ করতে বাধ্য করে, তখন একাত্তরের উদ্দেশ্যমূলক বয়ান হাজির করে ‘স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ ন্যারেটিভ’ বর্তমান বাস্তবতায় আদৌ দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নয় বরং এটি এখন জনগণের কাছে রীতিমত প্রত্যাখাত হয়েছে। যার বাস্তব প্রমাণ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল। নতুন প্রজন্ম তাদের উক্ত বয়ান ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে।

মূলত, বিগত প্রায় ১৬ বছরের শাসনকালে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের যে বয়ান তৈরি করেছে এসবের সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দূরতম সম্পর্ক নেই। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা কখনো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ কিংবা চেতনা হতে পারেননি। সচেতন মুক্তিযোদ্ধারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নয়। তখনকার সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার সে চেতনাকে শুধুই অপব্যবহার করেছে, বাস্তবায়নের কোনো চেষ্টা করেনি। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে হেন অপকর্ম নেই যা করেনি।

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বাস্তবায়নে নামকাওয়াস্তে নেওয়া হয় বিভিন্ন প্রকল্প। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখিয়ে লুটপাট করা হয়েছে হাজার কোটি টাকার অর্থ। মূলত ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি ব্যবহার করে হরিলুটের এসব ঘটনা ঘটেছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন সভা-সেমিনার। এ সমস্ত সভা-সেমিনারের মাধ্যমে লুট করা হয় এসব টাকা। বিগত ৫৪ বছরে অসংখ্যবার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংশোধন করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩ লাখের অধিক হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে এ ৩ লাখে মধ্যে অধিকাংশ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। এ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে পত্রিকায় বার বার শিরোনাম হয়েছে। ১৯৭১ সালের আসল মুক্তিযোদ্ধারা এ অভিযোগ উত্থাপন করেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক সংসদ সদস্যরা ও পদ-পদবি বৃদ্ধি এবং মন্ত্রী হওয়ার লোভে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন। যাদেরকে ঐ এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারগণ আসল মুক্তিযোদ্ধার খেতাব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে ১৯৭১ সালে যাদের বয়স ৪-৫ বছর তাদেরকে ও মুক্তিযোদ্ধা সনদ প্রদান করা হয়েছে।

সাবেক সরকারের মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযুদ্ধ সনদ বাণিজ্য করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে তিনি প্রায় ২৫০০০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার কাছে সনদ বিক্রি করেছেন। এ পঁচিশ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ বিক্রি করে তিনি হাজার কোটি টাকা নিজের পকেটে ঢুকিয়েছেন। সাবেক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক শুধু ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ বিক্রি করে ক্ষান্ত হননি, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা টেম্পারিং করে সনদ নিয়েছেন নিজেও। অথচ ভারতে প্রশিক্ষণ নেয়া ৫১ হাজার মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় এবং ১৯৮৬ সালের গেজেটে নাম নেই আকম মোজাম্মেল হকের। এ ব্যাপারে ২ বছর আগে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ফ্ল্যাট নিয়ে জালিয়াতীর কথাও কারো অজানা নয়। ঢাকার মিরপুরে পুলিশ কমিউনিটি হলের পাশে ৫০ বিঘা জমির উপর গড়ে তোলা হয়েছে একটি আবাসন প্রকল্প। বিজয় রাকিন সিটি ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মিত ৮৭০টি ফ্ল্যাটের অর্ধেকই আওয়ামী লীগ নেতা, মন্ত্রী, এপি ও প্রভাবশালীদের দখলে। এর মধ্য সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদুল আলম ও তার স্বজনদের নামে আছে ৭০টি ফ্ল্যাট। এসব নিজেদের কবজায় রাখতে পতিত সরকারের এমপি-মন্ত্রীসহ প্রশাসনের অনেককে তিনি ফ্ল্যাট দিয়েছেন। তারা নানা কায়দায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রশাসনের প্রভাবশালীদের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়েছে। যা পতিত সরকারের দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

আওয়ামী শাসনামলে যে চেতনা ব্যবসা হয়েছে এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত। এর মাধ্যমে জাতিকে বিভক্ত করা হয়েছে তার প্রমাণ মেলে গত বছর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও জাতীয় নিরাপত্তা ভাবনা’ বিষয়ক আলোচনা সভায় এক নেতার বক্তব্য থেকে। তার ভাষায়, স্বাধীনতা নিয়ে বক্তব্য দিয়ে জাতিকে আর বিভক্ত করা যাবে না। তিনি আরো বলেছেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বাণিজ্য হয়েছে এবং প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মানুষকে বিভক্ত করা হয়েছে’। মূলত, এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদীরা দেশে অবাধে জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে। দেশকে প্রতিবেশী দেশ ভারতের করদ রাজ্যে পরিণত করেছিলো। এমনকি আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে দেশকে অপরাধ, অপরাধী ও লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হয়েছিলো। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো উক্ত নেতা এখন আওয়ামী লীগের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে। যা অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত।

জুলাই বিপ্লবের পর আশা করা হয়েছিলো যে, দেশে স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়েছে। দেশে আগামীতে যাতে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ আবির্ভূত না হয়, সে জন্য রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এ সংস্কার কার্যকর করার জন্য জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই এ বিষয়ে জাতীয় ঐক্যমত জরুরি হলেও মহল বিশেষ নতুন করে স্বৈরাচারি হয়ে ওঠার হীন মানসিকতায় সংস্কার ও জুলাই সনদের বিরোধীতা করছেন। তাদের বিবেচনায় কোন কিছুর প্রয়োজন নেই বরং একটি যেনতেন নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের হাতে ক্ষমতা গেলেই একেবারে কেল্লা ফতেহ। এজন্য আওয়ামী অপশাসন-দুঃশাসনের সহায়ক শক্তি ভারতের সাথে গাটছাড়া বাধার অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা উচিত দেশে নতুন করে স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার কোন সুযোগ নেই। মূলত, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে দেশে একটি মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে। এ পরিবর্তনের জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে প্রায় ২ হাজার মানুষকে। আর স্বৈরাচারি-ফ্যাসিবাদীদের নেপথ্যে শক্তি যুগিয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। তাই এদেশে আজাদী প্রিয় জনগণ ভারতীয়দের নতুন কোন প্রতিভূদের ক্ষমতায় পাঠাবে না। মূলত আধিপত্যবাদ বিরোধী প্রেরণায় আমাদের জাতীয় জীবনের মূল প্রেরণা। তাই এদেশে যে রাজনৈতিক শক্তি যত আধিপত্যবাদ বিরোধী সে শক্তিই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। মূলত, এটিই বাস্ততবতা।

তাই আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে আধিপত্যবাদ বিরোধী নতুন এক বাংলাদেশ যেখানের আইন ও সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকবে। দলমত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকারের নিশ্চয়তা থাকবে। সে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে জাতিকে আজ ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

www.syedmasud.com