বস্তুত, কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র যখন অবক্ষয়ে প্রান্তিকতায় নেমে যায়, তখন বিপ্লব বা পরিবর্তন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে। এ বিপ্লব নানা নামেই হতে পারে। যেমন, আমাদের দেশে ১৯৭১ সালের মুক্তি সংগ্রাম, ১৯৭৫-এর পট পরিবর্তন, ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু ২০২৪ সালে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে সে স্বাধীনতা আরো গতিশীল ও পরিশীলিত হয়েছে।
সভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থান এসেছে মানুষের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও সমতার চিরন্তন আকাক্সক্ষা থেকে। সে ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই মাসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ মাসেই বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয়বারের মতো তাদের অধিকার, মর্যাদা এবং স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বপ্ন পুনরুদ্ধারে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের জুলুম-নির্যাতন, দমন-পীড়ন, গুম, খুন, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে এ আন্দোলনে দেশের আপামর জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাথমিক আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে জুলাই মাসে তা রূপ নেয় ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে এক সর্বজনীন গণঅভ্যুত্থানে। শেষ পর্যন্ত পতন ঘটে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের। সে ইতিহাসে রক্তের অক্ষরে লেখা হয় শত-সহস্র শহীদের আত্মত্যাগ। বহু মানুষ তাদের হাত-পা, দৃষ্টি কিংবা জীবনযাপনের সক্ষমতা হারিয়ে আজও বয়ে বেড়াচ্ছে সেই বিপ্লবের ক্ষতচিহ্ন।
জুলাই বিপ্লবের কোনো একক নায়ক বা মাস্টারমাইন্ড ছিল না-এটি ছিল জনগণের সার্বজনীন আন্দোলন। ছাত্র-জনতার যুগপৎ এ বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিল। এমন এক বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেছিল, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করবে, সকল ক্ষেত্রে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং শাসক গোষ্ঠীর জবাবদিহীতা থাকবে জনগণের কাছে।
মানুষ চেয়েছিল পুরোনো, দুর্নীতিগ্রস্ত ও দমনমূলক রাজনীতির পরিবর্তে এক নতুন ব্যবস্থা যেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে জনগণের সরকার, থাকবে না রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, প্রশাসনে থাকবে স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিতা। তারা আশা করেছিল এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার, যেখানে ঘুষ, দুর্নীতি, হত্যা, গুম-খুনের মতো অপসংস্কৃতি চিরতরে বিলুপ্ত হবে। রাষ্ট্র একবিংশ শতাব্দীর চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাবে।
এ নতুন ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হবে তরুণ প্রজন্মের আকাক্সক্ষা, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের শক্তি। অস্থির বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করবে দক্ষিণ এশিয়ায় এক উদীয়মান শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। উন্নত পররাষ্ট্রনীতি, ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাবে টেকসই উন্নয়নের পথে। তথ্য-প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে গড়ে উঠবে একটি মানবিক, সাম্যভিত্তিক ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ। তবে জাতীয় অনৈক্য ও রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে সে বিপ্লব হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যা অনভিপ্রেত ও অনাকাক্সিক্ষত।
নানাবিধ কারণেই বিপ্লব ব্যর্থ হতে পারে। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের অভাব বিপ্লব ব্যর্থতার অন্যতম মূল কারণ। দার্শনিক হান্না আরেন্ট (Hannah Arendt) বলেছেন, ‘সবচেয়ে উগ্র বিপ্লবীও বিপ্লবের পরের দিনই রক্ষণশীল হয়ে ওঠে।’ অর্থাৎ, বিপ্লবের পর যদি পুরনো প্রশাসনিক ও ক্ষমতার কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে, তবে নতুন শাসকরাই ধীরে ধীরে পুরনো দমননীতির অংশে পরিণত হয়। দ্বিতীয়ত, নেতৃত্ব ও জনগণের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বিপ্লবের প্রাণশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। সমাজ মনোবিজ্ঞানী ফ্রান্ত্জ ফ্যানন Franty Fanon) এবং শিক্ষাচিন্তাবিদ পাওলো ফ্রেইরে (Paulo Freire) উল্লেখ করেছেন যে, বিপ্লব ব্যর্থ হয় যখন নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দূরে সরে যায় এবং নতুন ক্ষমতাবান শ্রেণি পুরনো শোষণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতা বিপ্লবের ফল সীমিত করে। চতুর্থত, আদর্শিক বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রায়ই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ঐক্যের ভাঙন ঘটায়। ক্ষমতার ভাগাভাগি, ব্যক্তিস্বার্থ ও মতবিরোধ আন্দোলনের মূল উদ্দেশকে ক্ষীণ করে দেয়। ফলে যে ঐক্য একসময় পরিবর্তনের চালিকাশক্তি ছিল, সেটিই পরে দুর্বলতার কারণ হয়। উল্লেখিত বিষয়গুলো সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কেন বিপ্লব ব্যর্থ হয় এ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বিষয়গুলোকে যদি বাংলাদেশের বিপ্লব পরবর্তী সময়ের সঙ্গে মূল্যায়ন করা যায়, তাহলে এক হতাশাজনক চিত্রই আমাদের সামনে ভেসে উঠবে।
ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর চব্বিশের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনূস। মানুষ বিশ্বাস করেছিল-ড. ইউনূসের হাত ধরেই শুরু হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন এবং জন্ম নেবে ‘নতুন বাংলাদেশ’। ড. ইউনূস সে প্রত্যাশার প্রেক্ষিতে একদল উপদেষ্টা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন। উপদেষ্টা পরিষদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাব ছিল স্পষ্ট; অনেক সদস্যই দলীয় সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন, যার ফলে জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিট ও আদর্শ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সর্বোপরি উপদেষ্টাদের অনেকেই একসময় এনজিও, উন্নয়ন সংস্থা বা একাডেমিক খাতে সক্রিয় ছিলেন। উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই নানারকম বিতর্ক ও গুঞ্জন ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ড. ইউনূস অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত পছন্দের মানুষদের নিয়োগ দিয়েছেন, যার ফলে প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকে গেছে। অনেক উপদেষ্টা এনজিও সংশ্লিষ্ট, আবার অনেকেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসন বা রাজনৈতিক বাস্তবতায় অভিজ্ঞ নন। কারো কারো বিরুদ্ধে জুলাই চেতনাবিরোধী হওয়ার অভিযোগও বেশ জোরালো। যা জুলাই বিপ্লবের চেনতাকে কিছুটা হলেও ম্লান করে দিয়েছে।
বিপ্লব এমনিতেই হয় না বরং এ জন্য অনেক ত্যাগ ও কুরবানীর প্রয়োজন হয়। এর ফলাফলও হয় ইতিবাচক। কিন্তু বিপ্লব ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেয়। এক্ষেত্রে আমরা ফরাসী বিপ্লবের কথা উল্লেখ করতে পারি। বস্তুত, ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব শুরু হয়, যা সামাজিক অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের আহ্বানের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। এ বিপ্লবের ফলে রাজতন্ত্রের অবসান এবং ফ্রান্সের শাসক হিসেবে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থান ঘটে। বিপ্লবের উত্তরাধিকারের মধ্যে রয়েছে গণতান্ত্রিক নীতি এবং সংস্কার যা ইউরোপ এবং তার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।
১৭৮৯ সালে শুরু হওয়া এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল কেবল ফ্রান্সেই নয়, ইউরোপ এবং তার বাইরেও অসংখ্য সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব ফেলেছিল। ১৭৮০-এর দশকের শেষের দিকে, ফরাসি রাজতন্ত্র পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল। আমেরিকান বিপ্লবে এর অংশগ্রহণের ফলে রাজা লুই ষোড়শের শাসন দেউলিয়া হয়ে পড়ে এবং ধনী ও ধর্মযাজকদের উপর কর আরোপ করে তহবিল সংগ্রহ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। বছরের পর বছর ধরে খারাপ ফসল এবং মৌলিক পণ্যের ক্রমবর্ধমান দাম গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্রদের মধ্যে সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি করে। ইতিমধ্যে ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী একটি নিরঙ্কুশ রাজতান্ত্রিক শাসনের অধীনে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির দাবি জানাতে থাকে। ১৭৮৯ সালে রাজা তার আর্থিক সংস্কারের জন্য সমর্থন আদায়ের জন্য এস্টেট-জেনারেলের একটি সভা আহ্বান করেন-যাজক, অভিজাত এবং বুর্জোয়াদের একটি উপদেষ্টা সংস্থা যা ১৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডাকেননি। সে বছরের মে মাসে যখন প্রতিনিধিরা একত্রিত হন, তখন তারা প্রতিনিধিত্ব কীভাবে বন্টন করবেন তা নিয়ে একমত হতে পারেননি।
দীর্ঘ তিক্ত বিতর্কের পর, রাজা প্রতিনিধিদের সভাকক্ষ থেকে তালাবদ্ধ করে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এর প্রতিক্রিয়ায়, তারা ২০ জুন রাজকীয় টেনিস কোর্টে মিলিত হয়, যেখানে অভিজাতদের সমর্থনে, নিজেদেরকে জাতির নতুন শাসক সংস্থা, জাতীয় পরিষদ ঘোষণা করে এবং একটি নতুন সংবিধান লেখার প্রতিশ্রুতি দেয়। যদিও লুই ষোড়শ নীতিগতভাবে এ দাবিগুলির সাথে একমত হয়েছিলেন, তবুও তিনি সারা দেশে সৈন্য মোতায়েন করে এস্টেট-জেনারেলকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র শুরু করেন। এতে কৃষক এবং মধ্যবিত্ত উভয়ই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই, একটি জনতা প্রতিবাদে বাস্তিল কারাগারে আক্রমণ করে এবং দখল করে নেয়, ফলে দেশব্যাপী সহিংস বিক্ষোভের ঢেউ ওঠে।
১৭৮৯ সালের ২৬ আগস্ট, জাতীয় পরিষদ মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণাপত্র অনুমোদন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মতো, ফরাসি ঘোষণাপত্রে সকল নাগরিকের সমান অধিকার, সম্পত্তির অধিকার এবং স্বাধীন সমাবেশের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল, রাজতন্ত্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা বিলুপ্ত করা হয়েছিল এবং প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, লুই ষোড়শ দলিলটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান, যার ফলে আরেকটি ব্যাপক জনরোষের সূত্রপাত হয়।
দু’বছর ধরে, ষোড়শ লুই এবং জাতীয় পরিষদ অস্বস্তিকরভাবে সহাবস্থান করেছিল, কারণ সংস্কারক, উগ্রপন্থী এবং রাজতন্ত্রবাদীরা রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য লড়াই করছিল। ১৭৯২ সালের এপ্রিলে পরিষদ অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ফ্রান্সের জন্য তা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়, কারণ অস্ট্রিয়ার মিত্র প্রুশিয়া এ সংঘাতে যোগ দেয়; উভয় দেশের সৈন্যরা শীঘ্রই ফরাসি মাটি দখল করে নেয়।
অষ্ট্রিয়া-প্রুশিয়ান যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হতে থাকে, ফরাসি সরকার এবং সমাজ সামগ্রিকভাবে অস্থিরতায় ডুবে যায়। জাতীয় পরিষদে, রাজনীতিবিদদের একটি উগ্র দল নিয়ন্ত্রণ দখল করে এবং সংস্কার বাস্তবায়ন শুরু করে, যার মধ্যে একটি নতুন জাতীয় ক্যালেন্ডার এবং ধর্ম বিলোপ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৭৯৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে, জ্যাকবিনদের বিরোধীদের উপর সহিংস দমন-পীড়নের এক তরঙ্গের সময় হাজার হাজার ফরাসি নাগরিক, যাদের অনেকেই মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ছিলেন তাদের গ্রেপ্তার, বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যাকে সন্ত্রাসের রাজত্ব বলা হয়।
১৭৯৫ সালের ২২ আগস্ট, জাতীয় পরিষদ একটি নতুন সংবিধান অনুমোদন করে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা সহ একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী চার বছর ধরে, ফরাসি সরকার রাজনৈতিক দুর্নীতি, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, দুর্বল অর্থনীতি এবং ক্ষমতা দখলের জন্য উগ্রপন্থী ও রাজতন্ত্রবাদীদের চলমান প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। ফরাসি জেনারেল নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। ১৭৯৯ সালের ৯ নভেম্বর, সেনাবাহিনীর সহায়তায় বোনাপার্ট জাতীয় পরিষদকে উৎখাত করেন এবং ফরাসি বিপ্লবের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
পরবর্তী দেড় দশক ধরে, তিনি ইউরোপের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে ফ্রান্সকে সামরিক বিজয়ের ধারাবাহিকতায় নেতৃত্ব দিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষমতা সুসংহত করতে সক্ষম হন, ১৮০৪ সালে নিজেকে ফ্রান্সের সম্রাট ঘোষণা করেন। তার রাজত্বকালে, বোনাপার্ট বিপ্লবের সময় শুরু হওয়া উদারীকরণ অব্যাহত রাখেন, এর নাগরিক কোড সংস্কার করেন, প্রথম জাতীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, জনশিক্ষা সম্প্রসারণ করেন এবং রাস্তাঘাট ও নর্দমার মতো অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেন।
নেপোলিয়নের ইউরোপ বিজয় এ ধারণাগুলি সমগ্র মহাদেশে ছড়িয়ে দেয়, একই সাথে রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাবকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে, যা অবশেষে ১৮০৬ সালে ভেঙে পড়ে। এটি ১৮৩০ এবং ১৮৪৯ সালে ইউরোপ জুড়ে পরবর্তী বিদ্রোহের বীজ বপন করে, রাজতান্ত্রিক শাসনকে শিথিল বা শেষ করে যা শতাব্দীর শেষের দিকে আধুনিক জার্মানি এবং ইতালির সৃষ্টির দিকে পরিচালিত করে, পাশাপাশি ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বীজ বপন করে। তাই আমাদের জুলাই বিপ্লবকে স্থায়িত্ব দিতে আরো অনেক পথ পারি দিতে হবে। আর এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জাতীয় ঐক্যের কোন বিকল্প নেই।
প্রায় ১৬ বছরের অপশাসন-দুঃশাসনের পর এক অনিবার্য বাস্তবতায় ২০২৪ সালে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয়েছে। আমরা অশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম যে, এ বিপ্লবের মাধ্যমে আমাদের দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্র চিরতরে বিদায় নিয়েছে। বিষয়টিকে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্যই রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বিভিন্ন কমিশন গঠন করা হয়। গঠিত কমিশন রাজনৈতিক দল, অংশীজন ও সাধারণ মানুষের মতামত গ্রহণ করে জুলাই সনদ প্রণয়ন করে। এ সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট অধ্যাদেশও জারি করা হয়। আমরা আশায় বুক বেধেছিলাম যে, এ বিষয়ে জাতীয় ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হবে এবং একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকবে।
আমাদের চরম দুর্ভাগ্য যে, রাজনৈতিক বিভাজন ও জাতীয় অনৈক্যের কারণে আমাদের বিপ্লব হাতছাড়া হওয়ার নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে জাতীয় ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি হলেও বড় একটি দল এক্ষেত্রে রহস্যজনক অবস্থান গ্রহণ করে। ফলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয় এবং দেশ আবার পুরনো নেতিবাচক বৃত্তে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পরে। তবে আশার কথা হচ্ছে, বিলম্বে হলেও তারা বাস্তবতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ইতোমধ্যেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন তারা। তাদের এ বিলম্বিত উপলদ্ধি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে জনগণ তাদের কাছে আরো ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে।
আজ ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার তথা জুলাই সনদ ইস্যুতে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমরা আশা করবো অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা এবং সকল নাগরিকের নির্বিঘ্নে ভোট দান নিশ্চিত করবে। আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে গণরায়ের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা। আজকের নির্বাচনে যারা বিজয়ী হবেন তারা সরকার গঠন করে জনগণের কাছে নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করবেন। আরা যারা বিরোধী দলে থাকবেন, তারা সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে সরকারকে সফল ও সার্থক করে তুলবেন। সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হবে জুলাই চেতনার ভিত্তিতে। জাতি এক স্বপ্নিল প্রভাতের প্রত্যাশায়!
www.syedmasud.com