মুসফিকা আন্জুম নাবা
সময় চলমান ও গতিশীল। এর গতি কোনভাবেই রুদ্ধ করার সুযোগ নেই বরং তা চলে আপন গতিতে নিজ কক্ষপথে। তাই সময়কে চমলান মানবজীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি ও ইতিহাসের দর্পন হিসাবে উল্লেখ করা হয়। বস্তুত, সময় হলো অস্তিত্বের একটানা অগ্রগতি, যা একপ্রকার অপ্রত্যাবর্তনীয় ধারাবাহিকতায় অতীত থেকে শুরু করে বর্তমান অতিক্রম করে ভবিষ্যৎ-এর দিকে প্রবাহিত হয়। সময় সমস্ত ধরনের ক্রিয়া, বয়স ও কারণ-ফল সম্পর্ক নির্ধারণ করে। এটি বিভিন্ন পরিমাপের একটি মৌলিক উপাদান, যা ঘটনাবলীকে ক্রম বিন্যাস করতে, ঘটনাগুলোর স্থায়িত্বকাল তুলনা করতে এবং পরিবর্তনের হারকে ভৌত বাস্তবতা অথবা চেতনার অভিজ্ঞতার মধ্যে নির্ণয় করতে ব্যবহৃত হয়। সময়কে প্রায়শই তিনটি স্থানীয় মাত্রার পাশাপাশি চতুর্থ মাত্রা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সময় মূলত সরলরেখায় প্রবাহিত বিভিন্ন পর্বে মাপা হয়, যা ক্ষুদ্রতম থেকে বৃহত্তম ক্রমানুসারে সাজানো। মানবজীবনের ব্যবহারিক স্তরে সময় নির্ধারণ করা হয় ঘড়ি ও পঞ্জিকা/ক্যালেন্ডার দ্বারা, যেখানে ২৪ ঘণ্টায় একটি দিন এবং পৃথিবীর জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গতির সাথে সম্পর্কিত ৩৬৫ দিনে একটি বছর ধরা হয়। বৈজ্ঞানিকভাবে সময়ের পরিমাপের ব্যপ্তি প্ল্যাঙ্ক সময় (ক্ষুদ্রতম) থেকে শুরু করে কোটি কোটি বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্বাস করা হয়, পরিমাপযোগ্য সময়ের সূচনা ঘটেছে মহাবিস্ফোরণর সাথে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে, যা মহাবিশ্বের কালক্রমে অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে সময়কে সাধারণ আপেক্ষিকতার মাধ্যমে স্থানের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত স্থানকালের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে সময়কে প্রসারিত বা সংকুচিত করা সম্ভব, যা গতি বা কৃষ্ণগহ্বরের মহাকর্ষীয় টানের প্রভাবে অন্য পর্যবেক্ষকের তুলনায় দ্রুত বা ধীরে প্রবাহিত হতে পারে। তবে এটি কেবলমাত্র আপেক্ষিক গতিবেগ বা চরম মহাকর্ষীয় অবস্থাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মানবসভ্যতার ইতিহাস জুড়ে সময় ধর্ম, দর্শন, এবং বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়। সময় নির্ণয় বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এবং নৌপরিচালনা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশে মৌলিক ভূমিকা পালন করেছে। সামাজিক জীবনেও সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম এটি অর্থনৈতিক দিক থেকে মূল্যবান এবং ব্যক্তিগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ প্রতিদিনের সীমিত সময়ের প্রতি সচেতনতা এবং মানবজীবনের স্থায়িত্বকাল উভয় ক্ষেত্রেই সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
বস্তুত, সময় শব্দটি অনেক ছোট্ট। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে বহুমাত্রিকতা। মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান অনুসঙ্গ হলো সময়। সকল ধর্ম, শাস্ত্র ও দর্শনে সময়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সময়কে বিভিন্ন আঙ্গিকে মূল্যায়ন করার সুযোগ রয়েছে। শুধু যদি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয় তাহলে, মানুষের আয়ুষ্কাল সীমিত। আর জীবনের সকল কর্মকাণ্ড’র কেন্দ্রবিন্দুই সময়। ফলে পবিত্র কুরআনের বহুসংখ্যক আয়াতে এসছে সময়ের প্রতি প্রাধান্য ও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা। সময় আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি। সময়ের সমুন্নত মর্যাদা বোঝাতে গিয়ে বহু আয়াতে মহাকালের শপথ করে আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন ‘শপথ রাতের যখন ওটা আচ্ছন্ন করে’। (সূরা লাইল)
আবার অন্য আয়াতে বলছেন ‘আর তিনি তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন রাত ও দিনকে এবং সূর্য ও চাঁদকে এবং তারকাসমূহও তাঁর নির্দেশে নিয়োজিত। নিশ্চয় এতে অনেক নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য যারা বুঝে।’ (সূরা নাহল)। এ আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা করলে সহজেই অনুমেয় আমাদের জন্য সময় কতটা মূল্যবান। সময় সদাবহমান, মূহুর্ত পার হলে হারিয়ে যায় অতীতের অজানা ঠিকানায়। কেউ সময় অতিবাহিত করলে তা আর ফিরে পাবে না। সময়ের বিষয়ে রাসূল (সা:) নিজেও সর্তক থেকেছেন। বিশ্বনবী (সা:) বলেছেন, দু’টি নিয়ামত এমন রয়েছে যে ব্যাপারে অধিকাংশ লোক প্রতারিত হয়। তা হলো সুস্থতা ও অবসর সময়। শুধু তাই নয় রাসুল (সা.) বরাবর কয়েকটি বিষয়কে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম তোমার মৃত্যু আসার আগেই তোমার জীবনের গুরুত্ব দাও। কারণ মানুষ সময়ের সমষ্টি। একদিন চলে যাওয়া মানে জীবনের ক্ষুদ্র অংশের বিদায়। সময়ের প্রতি উদাসীনতার কারণে, আমাদের সমাজচিত্রে সময় জ্ঞানের গুরুত্ব দিন দিন কমে আসছে। বাস্তবতার নিরীখে দেখা যায়, ঘণ্টা পর ঘণ্টা ফেসবুক, ইউটিউব, গেম, মোবাইল ফোনে কিংবা অন্যান্য বিনোদনে নিজেদের সময় নষ্ট করছে। এতে করে যেমন সময় ব্যয় হচ্ছে অনর্থক কাজে। অন্যদিকে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক জীবনে ব্যাপক কুপ্রভাব বিদ্যমান। অলসতা করে কাজ ফেলে রেখে পরে করবো, অগোছালো কাজ, অতিরিক্ত চিন্তা করে আমাদের সময় ক্ষয় করছি। তরুণ প্রজন্মে অবক্ষয়ের কারণে অবসরকে অবহেলায় বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করে। এভাবেই আমাদের জীবনটা দুর্বিষহ হচ্ছে অনায়াসে। জীবনের নানা ক্ষেত্র ব্যর্থতায় পরিপূর্ণ। শুধুমাত্র সময়ের প্রতি অবহেলা করার জন্য। মানুষের সুখ-দুঃখ, দুর্দশা, সুস্থতা-অসুস্থতা একথাই সবকিছুই সময়ের মতো মূল্যবান নয়। মানবশিশু জন্মকাল আযান দেয়া আর জানাযার নামাযকে তার মৃত্যু পর্যন্ত বিলম্বিত করা এক কথায় প্রমাণ করে যে, জীবনকাল তার অতি সংক্ষিপ্ত যেমন আযান থেকে নামায এর মধ্যবর্তী ব্যবধান। জীবন যে সংকীর্ণ ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের এ কবিতা অংশ থেকে উপলদ্ধি করা যায়। ইতিহাসে যত ব্যক্তি স্বর্ণাক্ষরে নাম লিখেছেন, তাদের জীবন পর্যালোচনা করলে একটা বিষয় সবচেয়ে বেশি যাওয়া যায় তা হলো: সময়ের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব। সময়কে প্রাধান্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন। তাদের এ কঠোর সময়ানুবর্তিতার কারণে জীবনের সফলতা পেয়েছে। মানবসভ্যতাকে দিয়েছেন অনেক কিছু। নিজেরাও স্থান করে নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।
মূলত, সময় ও সময়ানুবর্তিতা মানবজীবনের অতিগুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। তাই প্রত্যেকেরই উচিত সময়কে গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের সবকিছু সম্পাদন এবং নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণ করা। এসব বিষয় আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। আর উপলদ্ধি করায় সময় অপসৃয়মান। এ সম্পর্কে ইমাম ইবনে কাইয়িম (রহ.) বলেছেন, ‘সময়ের ব্যাপারে ছাড়ের প্রবণতা আত্মঘাতি’। আবার ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেছেন, ‘আমি সুফিদের সান্নিধ্যে ছিলাম। তাদের থেকে আমি দু’টি কথা ছাড়া কিছুই শিখিনি। তাদের একটি কথা হলো, সময় হলো তরবারি। তুমি তাকে না কাটলে সে তোমাকে কেটে ফেলবে’। তার এ বক্তব্যটি মহামূল্যবান এবং সকল মানুষের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়।
বস্তুত, সময় ক্ষেপণের কারণে সর্বদিক থেকে ক্ষতির সম্মুখীন আমরা। এর সঠিক ব্যবহার না করলে জীবনে পরাজয় আসে। আল্লাহ তা’আলা সূরা আসরে এর মধ্যে সময়ের শপথ করে মানব জাতির ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কথা বলেছেন। নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে সময়ের শৃঙ্খলা করেছেন। এ থেকে স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায় যে, সময় যা মানুষ লাভ করে তা অমূল্য। এর সঠিক মূল্যায়নকারী ও যথার্থ ব্যবহারকারী অসাধ্য সাধন করতে পারে। আর যে অবমূল্যায়ন করে কিংবা উদাসীন, হেলায়-খেলায় যে তা কাটিয়ে দেয় সে মূলত নিজেরই অধঃপতন ডেকে আনে। এর উত্তম ব্যবহার জীবনে সফলতা, উৎপাদনশীলতা ও পরিপূর্ণতা নিয়ে আসে। যা ব্যক্তিগত বিকাশ ও অর্থপূর্ণ জীবনের একমাত্র চাবিকাঠি। এতে করে দুনিয়া ও পরকাল উভয়কালে কাক্সিক্ষত অবস্থান নিশ্চিত হবে।
বাস্তব সময়ের অপব্যবহার দ্বীনের ক্ষতি করছে এমন নয়, আমাদের ছাত্রজীবন, অর্থনীতি, সুযোগেরও ভবিষ্যত পঙ্গু করে দিচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে দ্ররিতায় নিমজ্জিত করছে। কারণ প্রত্যেক জিনিসের নিদিষ্ট সময় থাকে, ফুরিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না। সময় নষ্টের কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না। আমাদের জীবন প্রতিনিয়ত সংক্ষিপ্ত থেকে সংক্ষিপ্ততর হয়ে আসছে। অনেক মানুষই সাধারণত সুস্থ ও অবসরের সময়ের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। ফলে অসুস্থ বা ব্যস্ত হয়ে পড়লে তার কাছে সময়ের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি হয়। আবার ইসলামে মানুষের অনর্থক কাজে সময় ব্যয় করার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কাজেই যখনই অবসর পাও ইবাদতের কঠোর শ্রমে লেগে যাও। এবং নিজের রবের প্রতি মনোযোগ দাও।’ (সূরা ইনশিরাহ)
তাই একজন মুসলিমের সবচেয়ে বেশি সময় জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। অন্যান্য জাতি যেখানে নিজেদের জাতির আত্মউন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সেখানে অনেক মুসলিম অবলীলায় নিজের জীবনের অমূল্য সময়টুকু নষ্ট করছে। সময়ের প্রতি অনূভূতি না জাগার কারণে আমাদের দ্বীন ও দুনিয়া থেকে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছি। এ বিষয়ে হযরত আলী (রা.) বলেছেন ‘ধ্বংস তার জন্য, যার আজকের দিনটা গতকালের চেয়ে ভালো হলো না’। অতএব, সময়কে মূল্য না দিলে সময়ও মূল্য দেয় না। সময়ের মূল্য অনুধাবন করা পরিপূর্ণ জীবনের জন্য অপরিহার্য। অতীতের জন্য আপসোস করে তা আর ফিরে আসবে না। তাই এর জন্য আক্ষেপ করা অনুচিত। এতে বর্তমান সময়ও প্রভাবিত হয় বরং অতীতের গ্লানি মুছে, নতুন করে এখন থেকেই পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করা এবং জীবনের প্রতি মুহূর্তে নিজেদের কাজ-কর্মে হিসাব কষা উচিত। অন্যথায় আমাদের জীবনের লক্ষ ও উদ্দেশ্য বরবাদ হয়ে যাবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজ, জয়পুুরহাট।