মুহাম্মদ খায়রুল বাশার
বর্তমান বিশ্বের একক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অহমিকা ও দর্পচূর্ণ করে কি শেষ পর্যন্ত আমেরিকা ও ইসরাইলের অন্যায়ভাবে চালিয়ে দেয়া অসম যুদ্ধে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জয় হতে যাচ্ছে?
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন একটি বড় সামরিক হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার আশায় আপাতত সেই পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের অনুরোধে তিনি হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। এসব উপসাগরীয় দেশ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল আবার হামলা চালালে ইরান পাল্টা আক্রমণ করতে পারে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প লেখেন, ইরানের বিরুদ্ধে ১৯ মে মঙ্গলবার বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কারণ, তেহরান তার প্রস্তাবিত সমঝোতা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তবে বর্তমানে ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলায় হামলা স্থগিত করা হয়েছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যদি গ্রহণযোগ্য কোনো চুক্তি না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ‘যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের সামরিক হামলা’ চালাতে প্রস্তুত থাকবে।
হোয়াইট হাউসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, আলোচনায় ‘খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি’ হয়েছে।
তার ভাষায়, ‘ইরানকে বোমা না মেরেও যদি সমাধান সম্ভব হয়, তাহলে আমি খুশি হব।’
এদিকে ইরান বারবার ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে দেশটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক তেল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বেড়ে গেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই নিশ্চিত করেছেন যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মাথার ওপর পুরস্কার ঘোষণার বিষয়ে আলোচনা করছে ইরান। সোমবার (১৮ মে) বৃটেনের সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ তাদের অনলাইন প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, পশ্চিমা এই দুই নেতাকে হত্যার জন্য ৫ কোটি ইউরো প্রস্তাব করা একটি বিল নিয়ে দেশটির পার্লামেন্টে ভোটাভুটির কথা রয়েছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা ব্যবস্থা’ শিরোনামে এই বিলটি তৈরি করেছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে অতর্কিত হামলা শুরু করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। দেশ দুইটির যৌথ হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির কয়েক ডজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও নেতা নিহত হন। এরই প্রতিশোধ হিসেবে এমন পদক্ষেপ নিতে চলেছে ইরান। এনিয়ে আজিজি জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি চালানো হামলার জন্য ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অ্যাডমিরাল ব্রাড কুপার দায়ী।
তাদের অবশ্যই ‘পাল্টা ও সমপরিমাণ পদক্ষেপের’ মুখোমুখি হতে হবে। এ ছাড়া পৃথক ঘোষণায় কমিশনের সদস্য মাহমুদ নাবাভিয়ান বলেন, যে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে জাহান্নামে পাঠাবে তার জন্য পুরস্কার ঠিক করতে পার্লামেন্টে শিগগিরই ভোট হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ইরানে যদি আবার হামলা হয় তবে ‘ধ্বংসাত্মক’ জবাব দেয়া হবে।
আগের খবর অনুযায়ী, অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের সামরিক অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রে। অভিযানের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়েছে জানিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ৫ মে হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দিয়েছেন। তার এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে একতরফাভাবে যুদ্ধ থেকে সরে আসার ঘোষণা দিলো আমেরিকা। একই দিন তেহরানের সাথে একটি শান্তিচুক্তি প্রায় চূড়ান্ত জানিয়ে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন সামরিক অভিযান প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানে কোনো নতুন সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরান ইস্যুতে নতুন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হোক তা আমরা চাই না। আমরা শান্তির পথই পছন্দ করি। আমাদের প্রেসিডেন্ট একটি চুক্তি চান। তিনি বলেন, ইরানের পারমানবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত প্রশ্নগুলোর সমাধান আলোচনার মাধ্যমেই করা হবে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আমেরিকা কি প্রকারান্তরে পরাজয় মেনে নিয়েছে। বিশ্লেষকদের অভিমত হলোÑ যুদ্ধে ব্যাপক ব্যয়, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি, মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর চাপ, দেশের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধবিরোধী চাপ এবং ইরানের সাহসী, দৃঢ় ও অনমনীয় অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনকে যুদ্ধ থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে।
২০১২ সালের প্রথম দিকে ওয়াশিংটন ডিসির উড্রো উইলসন আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে বক্তৃতা দেয়ার সময় হেনরি কিসিঞ্জার জোর দিয়ে বলেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো স্পষ্ট প্রস্থান কৌশল ছাড়াই যুদ্ধে প্রবেশ করেছে এবং প্রায়শই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার অল্প সময়ের মধ্যেই বেরিয়ে আসার পথ খুঁজেছে। তিনি আফগান সংঘাতকে একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং অজেয় যুদ্ধের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও এমন একটি সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল যা তার দ্বিতীয় দশকে প্রবেশ করেছিল। এই যুদ্ধ শেষ হতে আরো এক দশক সময় লেগেছিল, যার ফলে আমেরিকার জন্য চরমভাবে অপমানজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। ভিয়েতনাম এবং ইরাকে ও তারা একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। নাইন-ইলেভেনের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আমেরিকা আফগানিস্তানে তার দীর্ঘতম যুদ্ধটি শুরু করেছিল। আবার ইরাকে নন-বিধ্বংসী অস্ত্র থাকার ডবধঢ়ড়হ ড়ভ গধংং উবংঃৎঁপঃরড়হ (ডগউ) মিথ্যা অজুহাতে দেশটিতে মার্কিন আগ্রাসন শুরু করা হয়েছিল। শুরু থেকেই উভয় যুদ্ধে জেতা অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল, তবুও প্রতারণার মাধ্যমে ব্যর্থতাগুলোকে আড়াল করা হয়েছিল। প্রায় দুই দশক ধরে, মার্কিন নেতারা এই যুদ্ধগুলোর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছেন। আফগানিস্তান থেকে লজ্জাজনকভাবে সরে আসার মাত্র পাঁচ বছর পর আমেরিকা ইরানের সাথে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে আরেকটি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে এবং অতীত থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেনি। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিভ্রান্তিকর দাবির মতোই, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অতিরঞ্জিত বয়ান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের উপর হামলা শুরু করতে প্ররোচিত করেছিল।
তবে কয়েক সপ্তাহের পাল্টা বোমা হামলার মাধ্যমে ইরান তার শক্তিমত্তা প্রদর্শন করেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরাইলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গৌরব হিসেবে খ্যাত দুর্ভেদ্য আইরনডোম ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ইসরাইল ও আমেরিকার কাছে যেটি ছিল অকল্পনীয় ইরান সেটিই বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছি। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া অন্যায় ও অসম যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিয়েছে খোদ ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফল স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাডিজ-সিএসআইএস। সংস্থাটির রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় প্রায় ২৩০ কোটি থেকে ২৮০ কোটি ডলার সমমূল্যের মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোহা ইনস্টিটিট ফর গ্রাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক ওমর আশুর আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে সামরিক সরঞ্জাম ও লোকবল হারানোর খবর প্রচার করতে চাইবে না। কারণ এতে আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে চড়াদাম দিতে হতে পারে। তিনি মনে করেন, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জিতলেও কৌশলগতভাবে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল।
ইরান যুদ্ধ আমেরিকার সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করেছে। ইরানের অস্ত্রসজ্জিত ড্রোনের ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যেটি কার্যকরভাবে আরো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে সকল প্রমাণিত হয়েছে। মার্কিন-ইসরাইল জোটের হাতে ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হলেও ইরানের স্বল্পমূল্যের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তির দর্পকে সফলভাবে প্রতিহত করেছে।
মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধবিমানের অবিরাম বোমা বর্ষণে সৃষ্ট ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও ইরান তার প্রতিপক্ষের উৎপাদিত অস্ত্রের খরচের মাত্র ভগ্নাংশ মূল্যে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। পেন্টাগনের মতে, এই সঙ্ঘাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছেÑ যা পুনরায় পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। জানা গেছে, এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে আমেরিকার ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে, প্রায় ৩৫ হাজার ডলার মূল্যের সস্তা ড্রোনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের মাধ্যমে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছে, যার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করা হয়েছে। কোনো হামলা বা বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ইরানের হাতে থাকা প্রধান প্রতিশোধমূলক অস্ত্রটি অপসারণ করতে পারবে না। ইরান আমেরিকান প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ডাটা সেন্টারগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছেÑ যার ফলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এটি একটি চাতুর্যপূর্ণ কৌশল যেটি একটি অসম যুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করতে সক্ষম হয়েছে। ইরানের বন্দরগুলোতে আমেরিকার অবরোধ ইরানের উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে পারলেও, দেশটি এখনো একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সহ্য করতে সক্ষম। প্রণালী দিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রহরায় থাকা তেল ট্যাঙ্কারগুলোতে ড্রোন হামলা চালিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে অচল করে দেয়ার ক্ষমতা ইরানের এখনো আছে। ট্রাম্প বারবার স্থলবাহিনী মোতায়েনের হুমকি দিলেও এটি যে একটি বড় ভুল হতে পারে তা সম্ভবত ইতোমধ্যেই উপলব্ধি করেছেন। এই ভুল করলে এটি ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতার চেয়েও আমেরিকান বাহিনীর জন্য আরো বড় অপমানের কারণ হবে। একজন ক্রমবর্ধমান অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট কি সেই ঝুঁকি নেবেন। আমেরিকা কোনো যুদ্ধে এখনকার মতো এতটা বিচ্ছিন্ন আগে কখনো ছিল না। এবারের যুদ্ধে তার পশ্চিমা মিত্ররা যোগ দিতে সরাসরি অস্বীকার করেছে, কারণ তাদের অনেকেই এই যুদ্ধকে অবৈধ বলে মনে করে। ইরান যুদ্ধ আমেরিকার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব ব্যবস্থাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ভেঙে দিয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে এবং পশ্চিমা জোটে ফাটল বাড়তে থাকায় এই পরিস্থিতি আর পাল্টানো যাবে না বলে মনে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলোÑ যুদ্ধের সময় দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ট্রাম্পের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে জনগণের ক্রমবর্ধমান কড়া নজরদারি। ওয়াশিংটন পোস্ট এবিসি নিউজ-ইপসোসর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ৫৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক তীক্ষèতার অভাব ট্রাম্পের রয়েছে এবং ৫৫ শতাংশ বলেছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের যোগ্য নন। একটি সংঘাতময় সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ মানসিক তীক্ষèতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তি থাকা সত্যিই উদ্বেগজনক। তবে ট্রাম্প এই উদ্বেগগুলোতে এবং সেই সাথে আমেরিকান ও বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধের বিরূপ প্রভাবকেও উড়িয়ে দিয়েছেন। এই যুদ্ধ শুরুর সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এর বিরোধিতা ছিল প্রবল। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে আমেরিকান এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। জ্বালানির দাম বাড়া এবং মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাÑ সব মিলিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সামাজিক অসন্তোষ আরো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ইরান এই অন্যায় যুদ্ধের স্থায়ী অবসান চায়। উভয় দেশ যুদ্ধ বন্ধ ও বিস্তারিত আলোচনার একটি কাঠামো তৈরি করতে এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক (এমএইউ) সইয়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। এসকিউজ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর দু’পক্ষ এবারই চুক্তির সবচেয়ে কাছে রয়েছে। শান্তি প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত পাকিস্তানের একটি সূত্র রয়টার্সকে সমঝোতা স্মারক সইয়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ অবসানে দেশ দু’টি এখন সমঝোতার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা এবং তেহরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হত্যা করা হয়েছে। বর্তমান নেতা মুজতবা খামেনিও মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। ইরানের সাড়ে তিন হাজার মানুষ নিহত, বহু আহত। লেবাননেও অনেক মানুষ হতাহত হয়েছে। ইসরাইল এবং আমেরিকারতেও জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সর্বোপরি এই যুদ্ধে অর্থনীতি স্থবির ও গোটা বিশ্বে টালমাটাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধের অবসান ঘটুক, বিশ্বে শান্তি ফিরে আসুক এবং আমেরিকা ও ইসরাইলের বাগাডম্বর ও অন্যায় বাড়াবাড়ির পরিসমাপ্তি ঘটুকÑ এটিই সবার কামনা।
লেখক : সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, বিএফইউজে।