চিকিৎসা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু এ অধিকার সমানভাবে সবার জন্য নিশ্চিত নয়। যাদের অর্থবিত্ত আছে, তারাই মুলত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে। আর যাদের নেই, তাদের ভাগ্যে সরকারি হাসপাতালেও জায়গা জোটে না। অসংখ্য মানুষ বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে। আবার বহু পরিবার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে। এ বৈষম্য শুধু হৃদয়বিদারক নয়; একটি সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। সংবিধান নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দেয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ (ক) অনুযায়ী রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবে কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে তাই দেখার বিষয়। আমাদের দেশে মূলত দু’ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা বিদ্যমান- সরকারি ও বেসরকারি। ১৮ কোটি মানুষের দেশে সরকারি হাসপাতাল যেখ নে সাত শতাধিক, সেখানে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা প্রায় কয়েক হাজার। বেসরকারি হাসপাতাল মানুষের কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে যখন বাণিজ্যে রূপ নেয় তখন দুঃখ লাগে। সরকারি হাসপাতালে সঠিকভাবে চিকিৎসা সেবা পাওয়া গেলে মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে ছুটতো না। যদিও সরকারি হাসপাতাল দরিদ্র মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করে। কিন্তু জনবল সংকট, চিকিৎসকের স্বল্পতা, অতিরিক্ত রোগীর উপচে পড়া ভিড়, শয্যা সংকট, ওষুধের ঘাটতি ও সীমাহীন ভোগান্তির ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালমুখী। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অধিকাংশই চিকিৎসার নামে গলাকাটা ফি আদায় করছে। সেখানে চিকিৎসার আগে হিসাব, পরে মানবিকতার স্থান। একটি সাধারণ পরীক্ষা, একটি অস্ত্রোপচার কিংবা কয়েক দিনের চিকিৎসার খরচ এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে যে মধ্যবিত্ত পরিবারও আজ দিশেহারা। অনেকে চিকিৎসার খরচ জোগাতে জমি বিক্রি করছে, ঋণের বোঝা নিচ্ছে, আবার কেউ কেউ অর্থাভাবে প্রিয়জনকে চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এ বাস্তবতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য মোটেও সুখকর নয়।

চিকিৎসার মূল দর্শন সেবা, মুনাফা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব- চিকিৎসাকে সাশ্রয়ী করা, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং বেসরকারি খাতে সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্যখাতকে শুধুমাত্র বাজারের নিয়মে ছেড়ে দিলে সবার ভাগ্যে চিকিৎসা সেবা জুটবে না। সুতরাং সাশ্রয়ী চিকিৎসা সেবার স্বার্থে প্রয়োজন সকল ওষুধের দাম কমানো, সকল পরীক্ষার ফি কমানো, হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়ানো, সকল হাসপাতালে ইমার্জেন্সি সার্ভিস ২৪ ঘন্টা চালু রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করা। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন ব্যতীত রাষ্ট্র কখনো সত্যিকারের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে না। সাশ্রয়ী চিকিৎসা মানে নিম্নমানের চিকিৎসা নয়; বরং মানসম্মত, নিরাপদ ও নাগালের মধ্যে থাকা স্বাস্থ্যসেবাকে বুঝায়। ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ যেন অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়- এটাই একটি মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয়। চিকিৎসা যদি কেবল ধনীদের জন্য সংরক্ষিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সামাজিক ন্যায়ের ধারণাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সুতরাং সময় এসেছে- চিকিৎসাকে দয়ার বিষয় নয়; বরং মানুষের ন্যায্য অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার।

বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশ মানুষ নিজের পকেট থেকে বহন করে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এ অতিরিক্ত ব্যয়ের ফলে প্রতিবছর লাখো মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একটি গুরুতর অসুস্থতা শুধুমাত্র একজন মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে না ক্ষান্ত থাকে তা কিন্তু নয়, একটি পরিবারকেও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। সরকারি হাসপাতালে একটি পরীক্ষর জন্য যুদ্ধ করতে হয়। আর বেসরকারি হাসপাতালে একই পরীক্ষার জন্য তিন-চারগুণ খরচ গুণতে হয়। বেসরকারি হাসপাতালগুলো ইচ্ছে করলে সাশ্রয়ী মূল্যে রোগীদের সেবা দিতে পারে। কিন্তু দেয় না। অধিকাংশই অর্থের পেছনে ছুটে। হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিক করার সময় মানবতার কথা বলে, গরীব অসহায় রোগীদের চিকিৎসার কথা বলে, বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প করে, জনগণের দোড়গোড়ায় চিকিৎসা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তারা ভুলে যান মানবিকতার কথা, ভুলে যান সেবার কথা। শুধুমাত্র ছুটে বাণিজ্যের পেছনে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট ও অতিরিক্ত বিল আদায়-সব মিলিয়ে রোগী যেন এক অসহায় ভোক্তা। আইন আছে, নীতিমালা আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। ফলে কিছু মানুষ এর মাশুল দিচ্ছে নিজের জীবন ও স্বপ্ন দিয়ে।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICESCR) এর অনুচ্ছেদ ১২ অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের সর্বোচ্চ অর্জনযোগ্য শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য লাভের অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশ এ চুক্তির স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। ফলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সাশ্রয়ী ও প্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদি সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রক্ষা করতে চায় তাহলে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ব্যাপারে সোচ্চার ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। যেন বিনা চিকিৎসায় কারও জীবন বিপন্ন না হয়। একটি গ্রামের কথা ধরা যাক। প্রসববেদনায় কাতর এক নারীকে গভীর রাতে নিতে হলো জেলা সদর হাসপাতালে। ভাঙা রাস্তায় কিংবা ট্রলারে নদী পার হয়ে ভাড়া করা অ্যাম্বুলেন্সে। এ যাত্রার খরচ একটি দরিদ্র পরিবারের এক মাসের আয়ের সমান। হাসপাতালে পৌঁছে শয্যা নেই, ডাক্তার নেই-শেষমেশ বাধ্য হয়ে যেতে হয় বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখানে-চিকিৎসা নয়, আগে অগ্রিম টাকা পরিশোধ করতে হয়। জীবন তখন হিসাবের খাতায় বন্দী।

দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। তাদের প্রধান ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সেগুলোর চিকিৎসা মান কেমন তা কারো অজানা নয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালগুলোর অবস্থা মোটেও সন্তোষজনক নয়। অভিযোগ আছে হাসপাতাল আছে, চিকিৎসক নেই। চিকিৎসক আছে-সরঞ্জাম নেই। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও নার্স রয়েছেন। কিন্তু সঠিক তদারকির অভাবে এসব হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা মানুষ পাচ্ছে না। অনেকে অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। এমন খবরও চোখে পড়ে। ২০১৯ সালের ২৩ জুন কুড়িগ্রামে এক অন্তঃসত্ত্বা নারী কেবল সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে মারা যান। সরকারি হাসপাতালে শয্যা ও ব্যবস্থা না থাকায় এবং বেসরকারি ক্লিনিকে অগ্রিম অর্থ দিতে না পারায় তিনি চিকিৎসাবঞ্চিত হন। দ্বিতীয় ঘটনাটি মানিকগঞ্জে ঘিওর উপজেলার মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার ৩ হাজার টাকা বিল দিতে না পারায় এক শিশুকে আটকে রেখে বিনা চিকিৎসায় মেরে ফেলার অভিযোগ উঠেছিল। নিহত শিশু রেদোয়ান (দেড় বছর) মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার ফলসাটিয়া বকচর গ্রামের মো. সোহেলের ছেলে। নিহতের স্বজনরা জানান, শনিবার দিনগত রাত ২ টার দিকে শ্বাসকষ্টজনিত কারণে দেড় বছরের শিশু রেদোয়ানকে মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানে কোনো রকম চিকিৎসা না দেওয়ায় রেদোয়ানের অবস্থা সংকটাপন্ন হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার্ড করে কর্তব্যরত চিকিৎসক। রেফার্ড করলেও ৩ হাজার টাকা বিলের জন্য রোগী ও স্বজনদের আটকে রাখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আটক থাকা অবস্থায় কোনো রকম চিকিৎসা না পেয়ে বেলা ১২টার দিকে মৃত্যু হয় রেদোয়ানের- এ মৃত্যুগুলো কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু যা রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতার ফসল।

আমাদের দেশে কিডনি ও ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। তবে এর চিকিৎসাব্যবস্থা এখনো অপ্রতুল। চিকিৎসা ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় বেশির ভাগ রোগী প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসার বাইরে থাকছে। অর্ধেকের বেশি রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি করে ক্যান্সার সেন্টার থাকা দরকার। সে হিসেবে বাংলাদেশে ১৭০টি ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র থাকা দরকার। কিন্তু আছে মাত্র ২২টি। যার বেশিরভাগই ঢাকায় অবস্থিত। ফলে সারা দেশের দরিদ্র রোগীরা চিকিৎসার জন্য সরকারের জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আসে। ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালে সারা বছর রোগীর ভিড় থাকে। সহজে এই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা পাওয়া যায় না। অনেক রোগীকে বিশেষ কোনো থেরাপি বা সার্জারির জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। এসব পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা কষ্ট লাঘব করার জন্য প্রতিটি জেলা শহরের উন্নতমানের হাসপাতাল গড়ে তোলা প্রয়োজন। যেন গরীব অসহায় মানুষগুলো ভালো চিকিৎসা পরিষেবা লাভ করতে পারে। এদেশের মানুষ রাষ্ট্রের বোঝা নয়; তারা এ দেশের সম্পদ। তাদের জীবন যদি টাকার অঙ্কে মাপা হয় তবে সংবিধানের মানবিক আত্মাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই আজ স্পষ্টভাবে বলতে হয়-সাশ্রয়ী চিকিৎসা কোনো দয়া নয়, বরং এটি মানুষের ন্যায্য অধিকার। আর এ অধিকার নিশ্চিত করাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া প্রয়োজন।

লেখক : প্রাবন্ধিক।