মমতাজ উদ্দিন আহমদ
মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত ধারণা, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের বিবর্তনের ইতিহাস। সভ্যতা কেবল স্থাপত্য, প্রযুক্তি বা ভৌত উন্নতির নাম নয়; এটি মানুষের চিন্তা, নৈতিকতা, জ্ঞানচর্চা, সামাজিক সংগঠন এবং আধ্যাত্মিক অন্বেষণের সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামি সভ্যতা ও আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা-দুটি শক্তিশালী ধারার মুখোমুখি অবস্থান মানবচিন্তার ভিন্ন দুই দিগন্তকে উন্মোচিত করে। একদিকে ধর্মনির্ভর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনব্যবস্থা, অন্যদিকে কথিত যুক্তিনির্ভর ভৌত অগ্রগতির আধুনিকতা-এই দ্বৈততা আজকের বিশ্ববাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
১. উৎপত্তি ও দর্শনের ভিত্তি : ইসলামি সভ্যতার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে তৈহীদবাদ, নৈতিক শুদ্ধতা এবং জ্ঞান চর্চা ও অন্বেষণের ওপর। কোরআন ও সুন্নাহ এই সভ্যতার মূল দার্শনিক অবলম্বন, যেখানে জ্ঞান, ন্যায়, সাম্য ও মানবকল্যাণকে সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইসলামি সভ্যতা মানুষের বাহ্যিক উন্নতির পাশাপাশি আত্মিক পরিশুদ্ধিকে অপরিহার্য মনে করে।
অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার মূল উৎস রেনেসাঁ, এনলাইটেনমেন্ট এবং বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। এখানে ধর্মীয় কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হয়ে মানববুদ্ধি, যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশ্চাত্য দর্শনে ব্যক্তি স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং বস্তুজগতের জ্ঞান অর্জনই প্রধান চালিকাশক্তি।
২. জ্ঞান ও বিজ্ঞানে অবদান : ইসলামি সভ্যতা মধ্যযুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ রচনা করেছিল। বাগদাদের বায়তুল হিকমা থেকে আন্দালুসিয়ার কর্ডোভা—গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন ও ভূগোলে মুসলিম পণ্ডিতদের অবদান ছিল যুগান্তকারী। আল-খারেজমির বীজগণিত, ইবনে সিনার চিকিৎসাবিজ্ঞান, ইবনে রুশদের দর্শনচর্চা ইউরোপের নবজাগরণের ভিত রচনা করে।
পাশ্চাত্য সভ্যতা শিল্পবিপ্লবের পর প্রযুক্তি, শিল্পায়ন ও আধুনিক বিজ্ঞানে অসাধারণ অগ্রগতি সাধন করে। তথ্যপ্রযুক্তি, মহাকাশ বিজ্ঞান, চিকিৎসা প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে এই অগ্রগতি প্রধানত বস্তুজগতের নিয়ন্ত্রণ ও সুবিধা বৃদ্ধিতে কেন্দ্রীভূত।
৩. নৈতিকতা ও জীবনদর্শন : ইসলামি সভ্যতায় নৈতিকতা কেবল সামাজিক বিধান নয়; এটি আধ্যাত্মিক দায়বদ্ধতা। ব্যক্তি ও সমাজের প্রতিটি কর্মকাণ্ড আল্লাহর কাছে জবাবদিহির চেতনায় নিয়ন্ত্রিত। পরিবার, প্রতিবেশী, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এখানে গভীরভাবে প্রোথিত।
পাশ্চাত্য সভ্যতায় নৈতিকতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানবিক চুক্তি ও আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। ব্যক্তি স্বাধীনতা এখানে প্রধান্য পায়, তবে এই স্বাধীনতা কখনো কখনো আত্মকেন্দ্রিক ভোগবাদে রূপ নেয়। ফলে পরিবারভিত্তিক সামাজিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ার অভিযোগও কম নয়।
৪. সমাজ ও সংস্কৃতির কাঠামো : ইসলামি সভ্যতায় মসজিদ, মাদরাসা ও পরিবার সমাজজীবনের কেন্দ্রবিন্দু। সংস্কৃতিতে ধর্মীয় উৎসব, সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিল্পকলার মধ্যেও নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গ সুস্পষ্ট। এটি এক ধরনের সমন্বিত জীবনব্যবস্থা—যেখানে দুনিয়া ও আখিরাত পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক।
পাশ্চাত্য সভ্যতায় সংস্কৃতি অধিকতর বহুমাত্রিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা, ফ্যাশন ও গণমাধ্যমে সৃজনশীলতার বিস্তার ঘটেছে, তবে একই সঙ্গে ভোগবাদ ও বাণিজ্যিকতার প্রবণতাও প্রবল। এখানে বৈচিত্র্য ও উদারতা যেমন শক্তি, তেমনি মূল্যবোধের স্খলন আলোচিত সমালোচিত।
৫. বর্তমান সংকট ও সম্ভাবনা : ইসলামি বিশ্ব আজ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শিক্ষা ঘাটতির মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবু নৈতিকতা, পরিবারব্যবস্থা ও আধ্যাত্মিক চেতনার শক্ত ভিত এখনও টিকে আছে, যা পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা বহন করে। পাশ্চাত্য বিশ্ব প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর হলেও মানসিক চাপ, পরিবেশ বিপর্যয়, একাকীত্ব ও মূল্যবোধের সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। ভৌত উন্নতির শিখরে দাঁড়িয়েও আত্মিক শূন্যতা তাদের নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
উপসংহার : ইসলামি সভ্যতা মানুষের অন্তর্লোককে শুদ্ধ করতে চায়, পাশ্চাত্য সভ্যতা বাহ্যজগতকে রূপান্তরিত করতে চায়। একটিতে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার দীপ্তি, অন্যটিতে যুক্তি ও প্রযুক্তির প্রাধান ্য। প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব তখনই, যখন এই দুই ধারার মধ্যে সংঘর্ষ নয়, বরং সৃজনশীল সমন্বয় ঘটে-যেখানে বিজ্ঞান মানবতার সেবায় নিয়োজিত হবে এবং নৈতিকতা উন্নয়নের দিশারি হয়ে উঠবে। মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ হয়তো এই দুই আলোর মেলবন্ধনেই সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান।