॥ সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা ॥

কোন প্রচলিত নিয়ম মেনে বিপ্লব হয় না বরং প্রয়োজনের তাগিদে সময় ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বিপ্লব সংগঠিত হয়ে থাকে। বস্তুত, সমাজ বা রাষ্ট্র যখন নানাবিধ নেতিবাচক বৃত্তে আটকা পড়ে, তখন সে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন, পরিমার্জন বা সংস্কারের জন্য একটি বিপ্লবের আবশ্যকতা দেখা দেয়। এ বিপ্লব রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক উভয় পরিসরেই হতে পারে। কোন সমাজে যখন অবক্ষয়ের সয়লাব, মূল্যবোধের অনুপস্থিতি, মানবিক মূল্যবোধের বিচ্যুতি, অন্যায্যতা, মানুষের অধিকার হরণ, জুলুম-নিপীড়নের তা-ব, সুশাসন ও আইনের শাসনের বিচ্যুতি ঘটে, যখন সে অশুভ বৃত্ত থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লবের আবশ্যকতা দেখা দেয়। এমন নির্মম বাস্তবতায় সে সমাজ বা রাষ্ট্রে বিপ্লবীদের আবির্ভার ঘটে। তিনি বা তারা তাদের কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে হয়ে উঠেন বিপ্লবী তথা পরিবর্তন বা সংস্কারের অগ্রনায়ক। তারা লক্ষ্যে পৌঁছতে সফল বা বিপ্লব সংঘঠনে ব্যর্থ হলেও তারা মানুষের কাছে বিপ্লবী হিসাবে স্বীকৃতি পান। যারা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হন তাদেরকে চড়া মূল্যও দিতে হয়। এমনকি তাদের প্রাণ দিয়েও ত্যাগের নজরানা পেশ তাদের করতে হয়। দৃশ্যত তাদের বিফল বা ব্যর্থ মনে হলেও বিপ্লবীরা কখনো ব্যর্থ হন না বরং ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। যেমন ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় ও বরণীয় হলেন শহীদ শরীফ ওসমান হাদী।

ভারতীয় উপমহাদেশে অনেক বিপ্লবীর আবির্ভাব ঘটেছে। এদের মধ্যে সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভী, শাহ ইসমাইল শহীদ, মাওলানা কাসেম নানুতুবি, মাহমুদ হাসান দেওবন্দি, হুসাইন আহমদ মাদানি, উবায়দুল্লাহ সিন্ধি, হাকিম আজমল খাঁ, হাজী শরিয়তুল্লাহ, হাজী ইমদাদল্লাহ মোহাজেরে মক্কী, মাওলানা আলাউদ্দিন, মাওলানা মুহম্মদ আলী জওহার, শওকত আলী, ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি, মীর নিসার আলী তিতুমীর, আসফাকউল্লা খান, কাজী নজরুল ইসলাম, বাহাদুর শাহ জাফর, ফকির মজনু শাহ ও শমসের গাজী প্রমূখের নাম উল্লেখ করা যায়। সর্বশেষ এ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন শহীদ ওসমান হাদী (রাহি.)। এরা সকলেই তাদের লক্ষে পুুরোপুরি সফল না হলেও তারা ইতিহাসের পাতায় বিপ্লবী হিসাবে স্থান করে নিয়েছেন।

বস্তুত, ‘বিপ্লব’ (জবাড়ষঁঃরড়হ) বলতে বোঝায় কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক ও আমূল পরিবর্তন, যা প্রায়শই জনগণের বিদ্রোহ, গণ-আন্দোলন এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক বা সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যাপক গণসমর্থিত কার্যক্রম দ্বারা চালিত হয়, যার লক্ষ্য একটি নতুন, ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা। ফরাসি বিপ্লব বা রাশিয়ান বিপ্লবের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি এর উদাহরণ, যা সরকার বা শাসনব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। একজন বিপ্লবী এমন একজন ব্যক্তি যিনি সরাসরি বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও, বিশেষণ হিসাবে ব্যবহার করা হলে, বিপ্লব শব্দটি এমন একটি বিষয়কে বোঝায় যা মানুষের চিন্তা-চেতনায় অদম্য প্রেরণার বিস্ফোরণ ঘটায়।

শতাব্দীর পর শতাব্দী বাংলার মাটিতে উপনিবেশবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চলেছে। এ লড়াইয়ের ইতিহাসের এক বড় অংশ আমাদের অজানা রয়ে গেছে। তার মধ্যে আমাদের উপমহাদেশের রাজনীতি বারংবার সাম্প্রদায়িকতা নামের দুষ্ট ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় আমাদের ইতিহাসচেতনায় বহু বিপ্লবীর ইতিহাস প্রায় মুছেই গেছে। মূলত, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আ¤্রকাননে মীর জাফরের বিশ^াসঘাতকতায় ইংরেজদের সাথে পাতানো যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর এ উপমহাদেশে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হতে থাকে। এ ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত ছিলেন বাংলার বর্ণ হিন্দুরাও। সর্বশেষ ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের ব্যর্থতার মাধ্যমে শেষ মোঘল স¤্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের পতনের পর ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার শেষ সুর্যটুকুও অস্তমিত হয়। হিন্দুরা এটি আশির্বাদ মনে করলেও ক্ষমতাচ্যুত মুসলমানরা তা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেন নি বরং তারা ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। প্রায় ক্ষেত্রেই তা ব্যর্থ হলেও তাদের এসব লড়াই ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের মূল জীবনী শক্তি হিসাবে কাজ করেছে।

শামসের গাজী (১৭৫৭-৬০) : মারাঠা বর্গীহানা ও পলাশীর লড়াইয়ের পরে নবাবের শাসন দুর্বল হয়ে গেলে বাংলায় আমলা ও সামন্তপ্রভূদের মধ্যে ব্যাপক শোষণের প্রবণতা দেখা যায়। এ সময় রোনাবাদ পরগণার চাকলাদার শামসের গাজী ত্রিপুরা রাজ্য, বর্মীমগ ও ব্রিটিশদের বসানো ক্রীড়নক নবাবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। কিছু যুদ্ধে সাফল্য পেলেও তিনি ধরা পড়েন ও মৃত্যুদ-ে দ-িত হন। তিনি আজও ভাটির বাঘ নামে পরিচিত।

আবু তোরাব চৌধুরী (১৭৬৭) : মেঘনা মোহনার সন্দ্বীপ দ্বীপে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের তাঁবেদার গোকুল ঘোষাল, বিষ্ণুচরণ বসুর মত দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাদের ব্যাপক শোষণ ছিল। এমতাবস্থায় সাবেক জমিদার আবু তোরাব চৌধুরী বিদ্রোহ করেন। তাঁকে দমন করতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ক্যাপ্টেন নলিকিনকে পাঠায়। আবু তোরাব চৌধুরী এ যুদ্ধে শাহাদাৎ বরণ করলেও চাষীরা ১৭৬৯-এ আবার বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন।

ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ : পলাশী, চুঁচুড়া আর বক্সারের যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার কার্যত শাসকে পরিণত হয়। নবাব ছিলেন নামমাত্র শাসক। এর জন্য দুর্নীতি চরমসীমায় পৌঁছলে বাংলায় বিভীষিকাময় দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। এ সময় মজনু শাহের ফকিররা সন্ন্যাসীদের সাথে মিলে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। জমিদার পরিবারের সন্তান মতি সিংহ গিরি তাঁর শিষ্যত্ব বরণ করেন। মুসা শাহ, চেরাগ আলি শাহ, পরাগল শাহ, করিম শাহ, মাদার বক্স, জারি শাহ ও রওশন শাহের মতো অন্যান্য ফকিররাও এই বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। এ বিদ্রোহ দমন হলেও কোম্পানী রাজ দুর্নীতিদমনের জন্য বেশ কিছু সংস্কার আনে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এ বিদ্রোহের ইতিহাস বিকৃত করে ‘বন্দে মাতরম’ খ্যাত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস লেখেন।

মহরম বিদ্রোহ (১৭৮২) : শ্রীহট্টে ১৭৮২ সালের ডিসেম্বরে ৮ মহরম ইংরেজদের বিরোধীতা করায় সৈয়দ পীরজাদা, সৈয়দ মহম্মদ মাহদী ও সৈয়দ হাদীর মতো নেতাসহ ৪ জন শহীদ হন। বিদ্রোহীরা ব্রিটিশদের অনুগত দেওয়ান মানিকচাঁদকে মেরে ফেললে, শ্রীহট্টের সুপারিন্ডেটেট তাঁদের মোকাবিলা করতে অগ্রসর হোন। লিন্ডসের সামনেই বিদ্রোহীদের নেতা পীরজাদা ইংরেজ রাজত্বের অবসান ঘোষণা করেন। লিন্ডসে অসিযুদ্ধে হেরে গেলেও ইংরেজ অনুগত কানুনগো মাসুদ বখতের পাঠানো জমাদার লিন্ডসেকে একটা পিস্তল এগিয়ে দেন। এ পিস্তল দিয়ে পীরজাদাকে খুন করেন। এ জমাদারও এ লড়াইয়ে নিহত হন বলে মনে করা হয়। লিন্ডসে তাঁর পরবর্তী জীবনে বেশ কিছু মৃত্যুর হুমকি পেতে থাকেন এবং শ্রীহট্টে ১৭৮৬ সালে রাধারাম ও ১৭৯৯ সালে আগা মহম্মদ খানের নেতৃত্বে বিদ্রোহ হয়।

রংপুর বিদ্রোহ (১৭৮৩) : ব্রিটিশরা পানিপথ থেকে আগত দেবী সিংকে সামন্তপদে বসালে আমজনতার ব্যাপক ভোগান্তি শুরু হয়। এ অবস্থায় নূরুদ্দীন বাকের জং বা নূরুলদীন ১৭৮৩ সালে ব্রিটিশ কালেক্টর গুডল্যান্ডের কাছে প্রতিবাদ জানান। ফল না হওয়ায় কাকিনা, ফতেহপুর, ডিমলা, কাজিরহাট, টেপা সহ রংপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিদ্রোহ হয়। কৃষকরা নূরুদ্দীনকে নবাব ঘোষণা করেন। গুডল্যান্ডের অনুরোধে লেফটেন্যান্ট ম্যাকডোনাল্ড এ বিদ্রোহ দমনে এগিয়ে আসেন। বেশ কয়েকবার ব্যর্থ হয়ে ১৭৮৩ সালের ২২এ ফেব্রুয়ারী বিদ্রোহীদের শক্তঘাঁটি পাটগ্রামে ছদ্মবেশে লুকিয়ে এসে হামলা চালিয়ে নুরুদ্দীনকে আহত করে বন্দি করেন। এ যুদ্ধে নুরুদ্দীনের নায়েব দয়াশীল নিহত হন। কিন্তু এরপরেও কৃষকরা কর দিতে অস্বীকার করে প্রতিরোধ চালিয়ে যান।

পাগলপন্থী বিদ্রোহ : ১৮২৪ সালে পাগলপন্থী বিদ্রোহ শুরু হয়। উত্তর ও পূর্ববঙ্গে এ আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। করম শাহ ও টিপু শাহ এ বিদ্রোহের নেতা ছিলেন। এ বিদ্রোহ ১৮৩৩ সালে স্তিমিত হয়ে আসে।

ফরায়েজি আন্দোলন (১৮৩১-৭০) : ফরায়েজি আন্দোলন প্রথমে ধর্মীয়-সামাজিক সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু কোম্পানী ও অনুগত অভিজাতমহল থেকে এ আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ফলে তারা শোষকশ্রেণির সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। হাজী শরিয়তুল্লাহ এবং আব্দুল আজিজ এ আন্দোলনের নেতা ছিলেন। তাঁদের সংগ্রামকে হাজি শরিয়তুল্লাহর পুত্র পীর মহসীন বা দুদু মিয়া ও মহম্মদ আলাউদ্দীন বা নোয়া মিয়া এগিয়ে নিয়ে যান। দুদু মিয়া তৎকালীন হিন্দু জমিদারের বিরুদ্ধে লড়াই করে কারাবরণ করেন। তারপরও অন্যায় ও অসত্যের কাছে নতিস্বীকার করেন নি।

মীর নিসার আলী তিতুমীর ১৮৩১ : সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর স্থানীয় জমিদারের লাঠিয়াল ছিলেন। তিনি হজ্বে গিয়ে মহম্মদ ইবন আব্দুল আজিজের আদর্শের ও সৈয়দ আহম্মদ বেরেলভির সাথে পরিচিত হন। হিন্দু জমিদারদের অত্যধিক কর আদায় এবং ধর্মপালনে বাধাপ্রয়োগে স্থানীয় মুসলিমরা ক্ষুব্ধ ছিল। তিতুমীর এসময় দেবনাথ রায় ও কৃষ্ণদেব রায়ের মতো জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। তিনি ডেভিস ও আলেকজান্ডারদের মতো সেনাপতিদের পরাজিত করেন। এমতাবস্থায় চারজন ম্যাজিস্ট্রেটকে তিতুমীরকে দমনের জন্য পাঠানো হয়। এঁদের মধ্যে নদীয়ার ম্যাজিস্ট্রেট স্মিথ ১৮৩১ সালের ১৭ নভেম্বর বারোঘরের কাছে পরাজিত হন। তারপরের দিন বারাসতের কাছে নারকেলবাড়িয়া গ্রামে কোম্পানীর সেনারা তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা ঘিরে ফেলে। সে রাতে তাদের রুখে দিলেও পরের দিন কয়েকঘন্টার মধ্যে বাঁশের কেল্লা ভেঙে পড়ে কামানের গোলায়। শহীদ হোন তিতুমীর। তাঁর সাথী গোলাম মাসুমকে বাঁশের ভাঙা কেল্লার সামনেই ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। বাকিদের দীর্ঘ কারাবাস হয়।

গাজী ইমামুদ্দীন : বেরেলভির সৈয়দ আহমদ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দিলে অনেক বাঙালি তাতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ইমামুদ্দীন যিনি সৈয়দ আহমদ বেরেল্ভির অভিযানের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা ব্রিটিশ অধিকৃত অঞ্চলের বাইরে গিয়ে এক নিরাপদ স্থানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেন। কিন্তু তাঁদের দল মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা অবস্থায় বর্তমান পাক-আফগান সীমান্তের কাছে ১৮৩১ সালে বালাকোটে শিখ সেনাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। ইমামুদ্দীন এ সংঘর্ষে প্রাণে বেঁচে যান যদিও শেখ মেঘুর মতো অনেক বাঙালি নিহত হা। ইমামুদ্দীন বাংলায় ফিরে এসে তাঁর ধর্মীয়-সামাজিক কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যান।

ঢাকার সিপাহী বিদ্রোহ : ১৮৫৭ সালে ভারতের অন্যান্য অংশে সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হলে ভারতীয় সিপাহীদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সিপাহীদের একটা অংশ অস্ত্রসমর্পণ করতে অস্বীকার করেন এবং আন্টাঘর ময়দানের কাছে তাঁরা প্রতিরোধ চালিয়ে যান। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তাঁরা পরাজিত হন। আন্টাঘর ময়দানের নাম হয় ভিক্টোরিয়া পার্ক যার এখনকার নাম বাহাদুর শাহ পার্ক। বিদ্রোহীদের কবর পরিচিত হয় গোর-এ-শহীদ নামে পাতলু শাহ ঢাকায় মহাবিদ্রোহের আরেক নেতা ছিলেন।

চট্টগ্রামের সিপাহী বিদ্রোহ : রজব আলি খান বৃটিশ কোম্পানীর ফৌজে হাবিলদার ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। ব্রিটিশরা এ বিদ্রোহ দমন করে কিন্তু রজব আলি তাঁর সাথীদের নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হোন। ব্রিটিশরা কোনওদিন তাঁকে ধরতে সফল হয়নি।

সুন্দরবন বিদ্রোহ : ১৮৬১ সালে খুলনার বাদাবনে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন রহিমুল্লাহ। তিনি উপনিবেশবাদী সামন্তপ্রভু ও নীলকরসাহেবদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। তিনি ব্রিটিশ সেনাপতি ডেনিস হেলিকে পরাজিত করেন। তাতে হেলির সর্দার লাঠিয়াল রামধন মালো নিহত হয়। তিনি এক অস্থায়ী পরিখা বানিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। কিন্তু ১৮৬১ সালের ২৫এ নভেম্বর এক বিশাল শত্রু বাহিনীর হাতে পরাজিত ও নিহত হোন।

মালদা ষড়যন্ত্র মামলা : নীলকর সাহেবদের জোরজুলুম বাংলার চাষীদের মনে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি করে। এমতাবস্থায় মালদায় ফরায়েজী নেতা রফিক ম-ল ও খুলনায় কাদের মোল্লার নেতৃত্বে বিদ্রোহ শুরু হয়। ব্রিটিশরা রফিক মন্ডলকে গ্রেফতার করে আন্দামানে দীপান্তরিত করে।

শহীদ ওসমান হাদী : শহীদ ওসমান হাদী বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানের এক অতি আলোচিত নাম। তিনি জুলাই আন্দোলনে ঢাকার রামপুরা অঞ্চলের সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন। জুলাই বিপ্লব সফল হলে তিনি দেশের স্বাধীনতা, স্বার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অখ-তা রক্ষা এবং ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদ মুক্ত ইনসাফভিত্তিক এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করে এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। কিন্তু ১২ ডিসেম্বর তিনি নির্বাচনী প্রচারকালে দুরবৃত্তদের দ্বারা গুলীবিদ্ধ হন এবং ১৮ ডিসেম্বর রাতে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন।

কিছু বিরুদ্ধবাদীরা এসব বিপ্লবী কর্মকা-কে সাম্প্রদায়কতার প্রলেপ দেয়ার চেষ্টা করে এসেছে। তবে তাদের দাবি কোন সত্যতা ও যৌক্তিকতা ছিলো না। এসব বিপ্লবীরা সব সময় মানুষের অধিকার ও ন্যায়-ইনসাফের কথা বলে গেছেন। সমাজে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হলে ধর্ম, বর্ণ , গোত্র, মত ও পথ নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে এবং তারা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে লক্ষ্যেই অবিচল ছিলেন। শহীদ ওসমান হাদী তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যেতে পারেন নি। কিন্তু আমাদের মধ্যে যে ইনসাফের চেতনা ও দেশাত্মবোধের প্রদীপ জ¦ালিয়ে গেছেন, তা কখনোই নির্বাপিত হবে না।www.syedmasud.com