মো. মাঈন উদ্দীন

বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব ২০২৪ সালের একটি ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, যার সফল সমাপ্তি ঘটে ৫ আগস্ট। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বর্তমানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

২০২৪ সালের জুন মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এ বিপ্লব জুলাইয়ে পূর্ণাঙ্গ গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, ফলে দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য “জুলাই সনদ” বা “জুলাই সংস্কার সনদ” প্রণয়ন করা হয়েছে। সান্ত্বনার বিষয় হলো জুলাই বিপ্লব ও এর শহীদদের আত্মত্যাগকে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এখন দেশের সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৬) যা ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখের বেশি ভোটার অংশগ্রহণ করবে। প্রায় ১,৯৮১ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

পর্যবেক্ষক হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ সহ অন্তত ১৬টি দেশের ৫৭ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। এখানে একযোগে গণভোট অন্যদিকে তারা তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। নির্বাচনের দিনই ‘জুলাই সনদ’ বা রাষ্ট্র সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি জাতীয় গণভোট (জবভবৎবহফঁস) অনুষ্ঠিত হবে। এখানে হ্যাঁ ভোট ও না ভোট প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়। হ্যাঁ ভোটের মাধ্যমে রচিত হবে আগামীর বাংলাদেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, দেশীয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুনাম সুখ্যাতিসহ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।

গণভোট হলো কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি বা সাংবিধানিক বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া, যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে সেই প্রস্তাবের পক্ষে সম্মতি, যা সাধারণত একটি নতুন বা পরিবর্তিত শাসনব্যবস্থা, বৃহত্তর স্বাধীনতা, সুশাসন বা কাক্সিক্ষত সামাজিক পরিবর্তনের পক্ষে থাকে, যেমন বাংলাদেশে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট। ‘হ্যাঁ’ ভোটের মূল বার্তা হলো ‘হ্যাঁ, আমরা এই পরিবর্তন চাই’ যা গণতন্ত্র, সুশাসন, উন্নয়ন ও জনগণের সার্বভৌমত্বের পক্ষে একটি সুস্পষ্ট রায়। গণভোটের মূল বার্তা হলো জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নয়, জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত নেয়। এখানে জনগণের সার্বভৌমত্বের সরাসরি প্রয়োগ, বিশেষত সংবিধান বা বড় নীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে। গণভোটে সরকার বা কোনো ব্যবস্থার পক্ষে জনমতের বৈধতা নিশ্চিত করা। এই গণভোটের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে দেশের উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে।

গণভোট ও ‘হ্যাঁ’ ভোটের মূল বার্তাহল : রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদানের মাধ্যমে একটি স্থায়ী ও কার্যকর সরকার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য জরুরি। নতুন অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোটকে প্রয়োজনীয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই গণভোটকে জনগণের মতামতের প্রতিফলন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে একটি উন্নত ভবিষ্যতের পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

সাধারণ জনগণের মাঝে যে বার্তা ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো ‘না’ ভোট মানে স্বৈরাচারকে ডাকা, হ্যাঁ ভোট মানে স্বৈরাচার চাই না, সংষ্কার চাই। তবে আপাতত এ ধারণা থাকলেও হ্যাঁ ভোটের পক্ষে কিছুটা যুক্তি রয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর কোন কোন দলের মনের দিক দিয়ে হ্যাঁ ভোটের পক্ষ নিতে কষ্ট হচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের ফল ভোগ করতে চায় কিন্তু হ্যাঁ ভোট দিতে, হ্যাঁ ভোটের পক্ষ নিতে কারো কারো কষ্ট হচ্ছে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতায় গিয়ে কমিটমেন্ট না রক্ষা করারই নজির রয়েছে। তাই এবারের হ্যাঁ ভোটে রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক কিছু সংশোধন করে দিতে পারে।

জনগণকে জানতে হবে বর্তমান সরকার কেবল একটি নির্বাচন দিয়ে বিদায় নেওয়ার মতো সাধারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়; এটি জুলাই অভ্যুত্থানের গণআকাক্সক্ষার ফসল। জুলাই বিপ্লব ও জনসচেতনতা জুলাই বিপ্লব রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে। মানুষকে প্রতিবাদি করেছে। জুলাই বিপ্লব তরুণদের মাযে নতুন গতি সংঞ্চার করেছে। তারা বুঝতে পেরেছে ভোট শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয় নতুন সংস্কৃতি, নতুন দেশ গঠনের সদরদরজা। জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি ভোটের সিদ্ধান্তে প্রতিফলন ঘটাবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মোটিভেশনাও গুরুত্বপূর্ণ। দলগুলো কি সত্যিকারভাবে সংস্কার চায়, না শুধু আগের মত ক্ষমতা চায়! হ্যাঁ ভোটে।

শহীদ ও আহতদের কান্না; জুলাই বিপ্লবে হাজারো শহীদ ও হাজার হাজার আহত ভাই বোনদের ত্যাগ ও কুরবানির অবশ্যই প্রতিফলন ঘটবে। দীর্ঘ সাড়ে ষোলো বছরের স্বৈরাচারী সরকারের দমন পীড়নকে যারা প্রত্যক্ষ করেছে, প্রত্যক্ষ করেছে ভোট হীন নির্বাচন, জুলুম নির্যাতন ও গুমের মত অমানবিক নির্যাতন তারা কি আবার সেরকম স্বৈরাচারী সরকার পুনরায় দেখতে চান! নিশ্চয় না। তাহলে এ নির্বাচন হলো জুলুমের বিরুদ্ধে জবাব দেয়ার নির্বাচন, নতুন মানবিক বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচন। সৎযোগ্য ও দেশপ্রেমিক নেতা বাছাইয়ে নির্বাচন। শোষণ মুক্ত, দূর্নীতি মুক্ত সমাজ বিনির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিপ্লবের প্রত্যাশা পূরণের সুযোগ। এ নির্বাচনে প্রথম ভোট দানের সুযোগ পাচ্ছেন প্রায় ২৫% নতুন তরুন ভোটার। তারাই হবে টার্নিং পয়েন্ট। কারা সরকার গঠন করবে, আগামীর বাংলাদেশ তৈরিতে কারা ভূমিকা রাখবে তা নির্ভর করছে প্রায় তিন কোটির অধিক তরুণ ভোটারদের ওপর।

জুলাই বিপ্লব ও হ্যাঁ -না ভোট: জুলাই সনদ মূলত রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক ও নাগরিক অঙ্গীকারনামা। এতে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

হ্যাঁ ভোট এর মাধ্যমে জুলাই সনদের পক্ষে জনসমর্থন মূল্যায়নের সরাসরি পদ্ধতি।

এ নির্বাচনে হ্যাঁ ভোটকে দেখা হচ্ছে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের প্রতি জনগণের সম্মতির প্রতীক হিসেবে। যারা রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার পক্ষে, তারা তাদের ভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদের দাবিকে সমর্থন জানাবে। না ভোট: জুলাই সনদের প্রতি অনাস্থা বা ভিন্নমত

না ভোটকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে জুলাই সনদের প্রতি অসম্মতি, অনাস্থা কিংবা ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে। কেউ কেউ মনে করেন, বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই ধাপে ধাপে সংস্কার সম্ভব—এই ধারণা থেকেই না ভোটের অবস্থান তৈরি হচ্ছে। এই সরকারের মূল কাজ হলো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো সম্পন্ন করা, যার মধ্যে রয়েছে সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন, সংরক্ষিত নারী আসন বৃদ্ধি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা।

এক ব্যক্তির দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকা এবং দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধান এক না হওয়া। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের ‘কনস্ট্রাকটিভ’ বা গঠনমূলক দায়িত্ব নিতে হবে। ভোটারদের জানার অধিকার রয়েছে, কোন প্রার্থী সংস্কারের পক্ষে এবং কারা এর বিপক্ষে। সে অনুযায়ী তারা তাদের রায় প্রদান করার সুযোগ পাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কার্যত জুলাই সনদের পক্ষে-বিপক্ষে একটি নীরব গণভোটে রূপ নিতে পারে। কারণ ভোটাররা শুধু প্রার্থী নয়, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ পথও বেছে নিচ্ছেন।

হ্যাঁ বা না- যে ভোটই দেওয়া হোক না কেন, তা হতে হবে সচেতন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। ভোটারদের উচিত জুলাই সনদের মূল বক্তব্য, রাজনৈতিক দলের অবস্থান এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করে ভোট প্রদান করা। তবে এক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, জবরদখলবাজ ও স্বৈরাচারী আচরণ কারীদের প্রতিহত করার বিরাট সুযোগ রয়েছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। হ্যাঁ ভোট ও না ভোটের মধ্য দিয়ে জনগণই নির্ধারণ করবে-দেশ কোন পথে এগোবে। এই নির্বাচন তাই শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের নয়, বরং রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার নির্বাচন হিসেবেই বিবেচিত হবে।

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করছে। ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ এখন যে নতুন পথে অগ্রসর হচ্ছে এ নির্বাচন ও গণভোটে সে পথ রেখাকে দৃঢ় করবে, গণমানুষের মতকে প্রাধান্য দিবে, নতুন বাংলাদেশের ভিত্তিকে মজবুত করবে। বাংলাদেশ আজ নতুন ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে। আমাদের সকলের ন্যায়ভিত্তিক আচরণ, সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নির্বাচন কমিশনের লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির মাধ্যমে ন্যায় ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। জনগণকে ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ, মানবিক রাষ্ট্রগঠনে সফল হতে হবে। এটাই সকলের প্রত্যাশা।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার।