বস্তুত, রাষ্ট্র একটি তত্ত্বগত ধারণা মাত্র। সরকার রাষ্ট্রের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য (concrete) রূপ। রাষ্ট্রের ইচ্ছা সরকারের মাধ্যমেই প্রকাশিত এবং কার্যকর হয়। তাই সরকার ও রাষ্ট্র সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘The word government’, judged by its philological derivation, apparently has a close affinity to the rudder or steering of a ship’. মূলত ‘হাল’ ব্যতীত যেমন নাবিকের পক্ষে জাহাজ চালানো সম্ভব হয় না, ঠিক তেমনিভাবে সরকার না থাকলে জনজীবন বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং সুষ্ঠুভাবে কোন কাজই তাদের দ্বারা সম্ভব হয় না। রাষ্ট্রও সফল ও সার্থক হয়ে ওঠে না।

আধুনিক রাষ্ট্র ও সরকার একে অপরের শুধু পরিপূরকই নয় বরং অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্র সরকার ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এসব সূত্র ধরেই মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটেছে। তবে ব্যত্যয়টা বোধহয় আমাদের পিছু ছাড়ছে না। জাতি হিসাবে কেন জানি আমরা পশ্চাদমুখী হয়ে পড়ছি এবং সে ধারা এখনো সক্রিয়ই রয়েছে। জাতীয় সম্পদ রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও সে দায়িত্ব পালনেও আমরা সফলতা দেখাতে পারিনি। নাগরিকরাও সঠিক কাজটা করতে পারছি না। দেশে শুধু সম্পদের অপচয় ও লুটপাটই হয়েছে বা হচ্ছে এমন নয় বরং বিদেশে অর্থপাচার হয়েছে বা হচ্ছে দেদারছে। কোনভাবেই এর লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে পতিত স্বৈরাচারি আমলে এ প্রবণতা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল। যা রীতিমত আঁতকে ওঠার মত। এক্ষেত্রে সুইস ব্যাংকে অর্থপাচার বেশ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের লজ্জাজনক পতনের পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও আমরা এ অশুভ বৃত্ত থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারিনি। যা আমাদের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়।

ফ্যাসিবাদের পতনের পর দেশের সার্বিক পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হলেও দেশ থেকে অর্থপাচারের লাগাম টানা যায়নি। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বছর ২০২৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে ২৩ গুণ। এতে ব্যাংকটিতে আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরে ১৯ জুলাই এ তথ্য জানিয়েছে সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সাল শেষে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশের নামে পাওনা রয়েছে ৫৯ কোটি ৮২ লাখ সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ফ্রাঁ ১৫০ টাকা ধরে) যার পরিমাণ ৮ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা। ২০২৩ সাল শেষে যার পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৬৪ লাখ ফ্রাঁ। এখনকার বিনিময় হার ধরলে যার পরিমাণ ৩৯৬ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের নামে থাকা অর্থের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৩ গুণ। ২০২২ সাল শেষে বাংলাদেশের কাছে সুইজারল্যান্ডের দায় ছিল ৫ কোটি ৮৪ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা প্রায় ৮৭৬ কোটি টাকা।

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে দায়ের মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা, আমনাতকারীদের পাওনা এবং পুঁজিবাজারে বাংলাদেশের নামে বিনিয়োগের অর্থ রয়েছে। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশের বেশি বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা, যা বাণিজ্য কেন্দ্রিক অর্থ বলে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে থাকা অর্থের একটি অংশ পাচার করা সম্পদ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক বছর ধরে সুইজারল্যান্ড বার্ষিক ব্যাংকিং পরিসংখ্যান প্রকাশ করছে। বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বা বিএফআইইউ সুইজারল্যান্ডের এফআইইউর সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগও করেছিল। কিন্তু ব্যক্তির তালিকা সম্বলিত কোনো তথ্য তারা দেয়নি। সুইজারল্যান্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, অবৈধভাবে কেউ অর্থ নিয়ে গেছে এমন প্রমাণ সরবরাহ করলে তারা তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান যদি নিজের বদলে অন্য দেশের নামে অর্থ গচ্ছিত রাখে, তাহলে তা সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশের নামে থাকা পরিসংখ্যানের মধ্যে আসেনি। একইভাবে সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা মূল্যবান শিল্পকর্ম, স্বর্ণ বা দুর্লভ সামগ্রীর আর্থিক মূল্যমান হিসাব করে এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অনেক দেশের নাগরিকই মূল্যবান সামগ্রী সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকের ভল্টে রেখে থাকেন। যা আমাদের জন্য মোটেই সুখবর নয়।

মূলত, সুশাসনের অনুপস্থিতি ও আইনের প্রায়োগিক দুর্বলতার কারণেই আমাদের দেশের অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণহীন। ফলে নাগরিকরা রাষ্ট্রের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এজন্য স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার কম দায়ী নয়। এমতাবস্থায় মুখ থুবরে পড়েছে দেশের সুশাসন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি। ফলে আমাদের দেশ এখন অপরাধ ও অপরাধীদের রীতিমত অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে পতিত ফ্যাসিবাদ আমলে তা একেবারে তলানীতে এসে ঠেকেছিলো। জুলাই বিপ্লবের পর সে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হলেও অতীত বৃত্ত থেকে এখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক অপরাধ সংক্রান্ত এক পরিসংখ্যান থেকে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ১৩ মাসে খুনের হার বেশি বলে মনে হলেও এর আংশিক কারণ হলো শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে সংঘটিত কমপক্ষে ১, ১৩০টি খুনের ঘটনায় গণঅভ্যুত্থানের পরে অর্থাৎ ৬ আগস্ট, ২০২৪ সালের পর থেকে এই বছরের আগস্টের মধ্যে মামলা দায়ের হয়েছে। অনেক হত্যা মামলা পূর্বে ক্ষমতাসীন দলের সন্ত্রাসীদের হুমকির কারণে দায়ের করা যায়নি, পুলিশকেও মামলা নিতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। সরকার পরিবর্তনের পরেই এসব তথ্য সামনে এসেছে এবং মামলাগুলো রেকর্ড করা হয়েছে।

বিগত বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে অনেক ধরনের অপরাধের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হলেও এর আংশিক হচ্ছে এখন মানুষ রাজনৈতিক প্রভাবশালী অপরাধীদের বিরুদ্ধেও সহজে মামলা করতে পারছে। ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা আগে ভুক্তভোগীদের মামলা করতে বাধা দিত, বিশেষ করে যদি অপরাধীরা তাদের দলের কর্মী হয়। শেখ হাসিনার আমলে অপরাধের তথ্য কম দেখানো হতো। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা নিতেও পুলিশ অনিচ্ছুক ছিল। পরিসংখ্যান মতে, ডাকাতির ঘটনা ১,৪০৫ (২০২৪) থেকে কমে ১,৩১৪ (২০২৫) হয়েছে, তবে ২০২৩-এর প্রথম ছয় মাসের তুলনায় এখনও বেশি। এর কারণ হলো, সমস্ত ডাকাতির ঘটনা এখন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ ছাড়াই থানায় রেকর্ড করা হচ্ছে। থানাগুলোর মধ্যে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যার কারণে নাগরিকরা ভয় বা দ্বিধা ছাড়াই অপরাধের অভিযোগ করতে পারছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন, ২০০২ এর অধীনে অপরাধের সংখ্যা ১,২২৬ (২০২৪) থেকে কমে ৬৫১ (২০২৫) হয়েছে। দাঙ্গার ঘটনাও ১২৫ (২০২৪) থেকে কমে ৫৯ (২০২৫) হয়েছে। চুরির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে: ৮,৬৫২ (২০২৪) ৬,৩৫৪ (২০২৫)।

উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রিপোর্ট করা সহিংস অপরাধ বৃদ্ধি পেলেও সাধারণ অপরাধ নিম্নমুখী প্রবণতার দিকে ঝুঁকছে, যা উন্নত আইন প্রয়োগ এবং সঠিকভাবে মামলা রুজুর প্রক্রিয়া উভয়ের দিকেই ইঙ্গিত করে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে খুন এবং কিছু অপরাধের বৃদ্ধি কেবল সহিংসতার বৃদ্ধি নয় বরং দীর্ঘদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা মামলাগুলো অবশেষে দায়ের হওয়ার প্রতিফলন। গত ১৩ মাসে রেকর্ড করা মামলার মধ্যে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালে সংঘটিত হত্যার ঘটনাও রয়েছে।

মূলত, রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ভয় ছাড়াই এখন ভুক্তভোগীরা রিপোর্ট করতে পারছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে কোনো নাগরিককে নিরুৎসাহিত করেন না বা বাধা দেন না। কয়েকটি ক্যাটাগরিতে, বিশেষ করে চুরির ঘটনা প্রকৃতপক্ষে কমেছে যা আইনশৃঙ্খলার উন্নতির পাশাপাশি স্বাধীনভাবে মামলা দায়ের করার পরিবেশকে ইঙ্গিত করছে। তবে একথা সত্য যে, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিদায়ের পর দেশের অপরাধপ্রবণতা কিছুটা কমে আসলেও আত্মতুষ্টিতর মত পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। তবে সার্বিক দিক বিবেচনায় মন্দের ভালো বলা যেতেই পারে।

আমাদের দেশের রূঢ় বাস্তবতায় এক শ্রেণির লোক নির্যাতক আরেক শ্রেণির লোক নির্যাতিত হওয়ার জন্যই জন্ম নিয়েছে। এসব অতীতে হয়েছে, এখনও হচ্ছে এবং আগামী দিনেও হবে এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণে রাখতেই রাষ্ট্রের সক্রিয়তা, আইন ও সাংবিধানিক শাসন প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র অপরাধের প্রতিবিধান করতে পুরোপুরি সফলতার পরিচয় দিতে পারেনি বলে জনশ্রুতি রয়েছে। অথবা যাদের ওপর এ দায়িত্ব অর্পিত তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না বলে অভিযোগটাও বেশ জোরালো। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ক্রিয়তা, উদাসীনতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব ও বিচারহীনহার সংস্কৃতির কারণেই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদীর ওপর হামলার ঘটনা সে কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। কারণ, এখন পর্যন্ত মূল হামলাকারীদের আটক করা সম্ভব হয়নি। এমনকি জনশ্রুতি রয়েছে যে, হামলাকারীরা নির্বিঘ্নে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে গেছে। আর আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী তাদেরকে জামাই আদরে রেখেছে। অতীতে এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে অপরাধীদের শাস্তির তেমন একটা নজীর দেখা যায় না। তাই এসব অপরাধী ও সমাজবিরোধীরা এখন প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে রাষ্ট্র ও সরকারের কার্যকারিতা।

সংবিধানের প্রস্তাবনায় (Preamble) বলা হয়েছে, ‘........Pledging that it shall be a fundamental aim of the State to realize through the democratic process a socialist society, free from exploitation- a society in which the rule of law, fundamental human rights and freedom, equality and justice, political, economic and social, will be secured for all citizens’. অর্থাৎ ..আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রে অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।

সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘The state shall not discriminate against any citizen on grounds only of religion, race, caste, sex or place of birth’. অর্থাৎ ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র কোন বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না’। কিন্তু শ্রুতিকটু হলেও এসব ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য যৎসামান্যই বলতে হবে।

মূলত, গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য। প্রাগৈতিহাসিককালে তা ‘প্রকৃতি রাজ্য’ হিসাবে পরিচিত ছিল। অতীতের অনেক চিন্তাবিদের ন্যায় রুশোও শুরু করেছেন স্বপ্নের ‘প্রকৃতির রাজ্য’ থেকে। হব্স এবং লকের মত তিনিও বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র সৃষ্টি হবার পূর্বে মানুষ প্রাকৃতিক অবস্থায় বসবাস করতো। তবে তা হবসের প্রকৃতি রাজ্যের অনুরূপ ছিল না। তা ছিল অনেকটা লকের অঙ্কিত প্রাকৃতিক অবস্থার ন্যায়। রুশোর মতে ‘প্রকৃতি রাজ্য’ ছিল পৃথিবীতে স্বর্গের মত স্বপ্নময়। মানুষ ছিল সুখী, আনন্দবিহ্বল এবং পরিপূর্ণ। মানুষের জীবন ছিল সৎ, স্বাভাবিক এবং সুন্দর। প্রাকৃতিক অবস্থায় কোন কৃত্রিমতা, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ছাপ ছিল না; ছিল শুধু সুখ ও সম্প্রীতি। মানুষ সুখী, সহজ, সরল এবং সততার জীবনে অভ্যস্ত ছিল। রুশোর প্রকৃতি রাজ্যের বর্ণনা দিয়ে অধ্যাপক ডানিং (Dunning) বলেন, (‘In the natural men are to be found the elements of perfect happiness. He is independent, contented and self-sufficing.’) অর্থাৎ প্রাকৃতিক মানুষের মধ্যেই ছিল পরিপূর্ণ সুখের উপাদানগুলো। সে ছিল স্বাধীন, পরিতুষ্ট এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ।

অন্তত, আমাদের দেশের আর্ত-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং দেশে সুশাসন ও আইনের শাসনের দুর্বলতায় মানুষ বোধ হয় সে রুশোর স্বপ্নের ‘প্রকৃতি রাজ্যে’র কথাই বারবার স্মরণ করছে। যে সভ্যতা, রাষ্ট্র ও সরকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করতে পারছে না, সে সভ্যতাকে অসার ও অপ্রয়োজনীয় মনে করার যথেষ্ট কারণও আছে। কারণ, বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা অপরাধ ও অপরাধীদের প্রতিবিধান করতে খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারছে না। বিশেষ করে আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে। ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন’-এর ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন যৎসামান্যই বলতে হবে।

এমতাবস্থায় দেশের মানুষ রুশোর সে ‘প্রকৃতি রাজ্য’ এর কথা বেশি বেশি স্মরণ করছেন বলেই মনে হয়। যে রাজ্যের মানুষরা ছিল স্বাধীন, পরিতুষ্ট এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। আর সে স্বপ্নের প্রকৃতি রাজ্যই তো এখন অধিকার বঞ্চিত মানুষের আরাধ্য!

তবে একথা সত্য যে, মূল্যবোধ কেন্দ্রিক, আদর্শিক ও ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাই পারে সকল প্রকার বৈষম্যের বিলোপ ও মানুষের সকল প্রকার অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করতে। মানবরচিত কোন মতবাদের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ সম্ভব নয়।

www.syedmasud.com