বাবরি মসজিদ। মসজিদের একটি সাধারণ পরিচয় আমরা হৃদয়ে লালন করে থাকি। তবে বাবরি মসজিদ নানা কারণেই আলাদা। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে এই মসজিদটি ধ্বংসের নিন্দনীয় কাহিনী। হিন্দুত্ববাদী উগ্রতাকে দমন না করে সরকার ও প্রশাসন নি¤œমানের চাতুর্য প্রদর্শন করেছে। ভোটের কাঙ্গাল রাজনৈতিক দলগুলোও নৈতিক মানদ-ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। প্রহসনের এমন পরিবেশে উগ্রহিন্দুরা উৎসাহিত হয়েছে এবং যা করার তা-ই করেছে। ৩৩ বছর আগে কংগ্রেসের শাসনামলে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় ভারতে গণতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির হৃৎপি-ে যে আঘাত হানা হয়েছে, তার বিষফল ভোগ করতে হচ্ছে এখন দেশটিকে। কংগ্রেস সে সময় তার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল। সেই ব্যর্থতার সূত্র ধরেই বিজেপি এগিয়ে গেছে এবং বিজয়ী হয়েছে।

বিপরীতে কংগ্রেসের রাজনীতি হয়েছে ¤্রয়িমান। হিন্দুত্ববাদী উগ্রতাকে আশ্রয় করে নির্বাচনে পরপর বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে মোদির বিজেপি সরকার। তবে মোদির বিজয় হলেও পরাজয় হয়েছে ভারতের। রাজনীতিবিদরা ভারতের সংবিধানের মর্যাদা রক্ষায় সমর্থ হয়নি। বৈচিত্র্যের ঐক্যের বদলে দেশটিতে এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিভক্তি ও হিংসার পরিবেশ। এমন পরিবেশে কোনো দেশ শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে কী? সাম্প্রদায়িক উগ্রতার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ক্ষুণœ হয়েছে ভারতের মর্যাদা।

কংগ্রেসের নরসিমা রাও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন ১৯৯১-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। তার আমলেই ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হামলায় ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয়। মোগল স¤্রাট বাবরের শাসনামলে ভারতের উত্তর প্রদেশে অযোধ্যায় এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। কোনো অপশক্তির হামলায় মসজিদের কাঠামো হয়তো ধ্বংস করা যায়, কিন্তু মসজিদের মর্যাদা এবং এর প্রতি মানুষের পবিত্র যে ভালোবাস-তা কি কখনো ধ্বংস করা যায়? ধ্বংস করা যায় না বলেই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ৩৩তম বর্ষপূর্তিতে এবার একই নামে নতুন একটি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে।

বাবরি মসজিদ প্রতিষ্ঠা ও ধ্বংসের ইতিহাস আছে, এখন এ নামে নতুন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েও নতুন ইতিহাস রচিত হতে চলেছে। ৬ ডিসেম্বর শনিবার মুর্শিদাবাদের বহরমপুর মহকুমার রেজিনগর গ্রামে নুতুন ‘বাবরি মসজিদ’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ডেবরা থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচিত পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার সদস্য হুমায়ুন কবীর। মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন নিয়ে বিতর্কের জেরে অবশ্য তার দলীয় পদ স্থগিত করে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দলটি। মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে ৬ ডিসেম্বর শনিবার সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায় রেজিনগর গ্রামে। এদিকে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে নিরাপত্তা জোরদার করে পুলিশ। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে নতুন বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ঘোষণা দেন হুমায়ুন কবীর। এর জেরে ‘সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’ করার অভিযোগে তৃণমূল কংগ্রেসে তার সদস্যপদ স্থগিত করা হয়। এমন পদক্ষেপে প্রশ্ন জাগে, মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ কি সাম্প্রদায়িকতা দোষে দুষ্ট কোনো উদ্যোগ? তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় কি মন্দিরে যান না? দ্বিচারিতা থেকে ভারতের রাজনীতি কখন মুক্ত হবে তা কে জানে। উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ নিয়ে সাম্প্রদায়িক বিরোধ চলে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। হিন্দুত্ববাদীদের মতে, এ স্থানে হিন্দু দেবতা রাম-জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার স্মরণে এখানে একটি স্মৃতি মন্দির ছিল। মোগল স¤্রাট বাবরের আমালে মন্দিরটি ধ্বংস করে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। তবে হিন্দুত্ববাদীদের এমন কাহিনীর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করা হয়নি। ফলে প্রশ্ন জাগে, শুধুমাত্র কারো বয়ানের কারণে কি শত শত বছরের ঐতিহাসিক একটি মসজিদকে সন্ত্রাসী কায়দায় ধ্বংস করা যায়? এভাবে শুধু উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি, ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ চেতনাকেও ধ্বংস করা হয়েছে ভারতে। এখানে আরো প্রশ্ন জাগে, ভারতে মোগল স¤্রাট বাবরের জায়গার কি কোনো অভাব ছিল একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য? আর বিচক্ষণ স¤্রাট বাবর কি জানতেন না যে, পুরনো স্থাপনা ভেঙে কিছু নির্মাণের চাইতে নতুন স্থাপনা নির্মাণের কাজটি সহজ ও সাশ্রয়ী। ইতিহাস এ কথারও সাক্ষী দেয় যে, বাবর কোনো সাম্প্রদায়িক শাসক ছিলেন না। উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর দীর্ঘদিন স্থানটি নিয়ে আইনি লড়াই চলে। ২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট ওই জায়গা মন্দির তৈরির জন্য বরাদ্দের রায় দেয়। এসময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উগ্রহিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদি, যার শাসন এখনো অব্যাহত রয়েছে ভারতে। আদালত অবশ্য মুসলমানদের ক্ষতিপূরণের জন্য ভিন্ন জায়গায় মসজিদ তৈরি করে দেওয়ার আদেশ দেয়। আদালতের রায় অনুসারে বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির তৈরি হয়। ২০২৪ সালে মন্দিরটির উদ্বোধন করা হয়। তবে আদালতের আদেশ অনুযায়ী মসজিদ নির্মাণের কাজটি কিন্তু শুরু হয়নি। এটাই হলো ভারতের হিন্দুত্ববাদী শাসকদের বৈশিষ্ট্য।

ভারতে উগ্ররাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন হবে কিনা, তা নিয়ে শংকা রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে, বিজেপিকে নিয়েই এ শংকাটা বেশি। আদালত তো মুসলমানদের ক্ষতিপূরণের জন্য ভিন্ন জায়গায় মসজিদ তৈরি করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু সেই রায় কার্যকর হয়নি। এখন যখন মুসলমানরা মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করলো, তখন সেই বহরমপুরেই অযোধ্যার রামমন্দিরের অবিকল মন্দির তৈরির ঘোষণা দেয়া হলো। মসজিদের বিপরীতে রামমন্দির নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন জেলার বিজেপি নেতা শাখারভ সরকার। এমন আচরণে কি কোন ধর্মবোধ কাজ করে, নাকি এখানে রয়েছে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও হিংসার রাজনীতি? এদিকে মধ্যপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, মুর্শিদাবাদের মসজিদ থেকে একেকটি ইট খুলে নিয়ে যাবেন তিনি। আর মসজিদ নির্মাণের উদ্যোক্তা হুমায়ুন কবির বলেছেন, মসজিদ ধ্বংস করতে এলে ছাড় দেওয়া হবে না। পশ্চিমবঙ্গে যে ৩৭ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে, তারা জীবন দিয়ে আমাদের নতুন বাবরি মসজিদ রক্ষা করবে।

হুমায়ুন কবীর ভুল বলেননি। মুর্শিদাবাদের বাবরি মসজিদ নিয়ে মুসলিম জনমনে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমএলএ হুমায়ুন কবীর বলেছেন, ২৫ বিঘা এলাকা নিয়ে মসজিদ চত্বর গড়ে উঠবে। সেখানে কলেজ, হাসপাতাল, গেস্টহাউস ও সভাকক্ষ থাকবে। মসজিদ নির্মাণে ৩০০ কোটি টাকার বাজেট ধরা হয়েছে বলে জানান হুমায়ুন কবীর। মসজিদ নির্মাণে মুক্তহস্তে দান করতে এগিয়ে আসছেন মুসলমানরা। ইতিমধ্যে এক শিল্পপতি দিয়েছেন ৮০ কোটি রুপি। প্রস্তাবিত মসজিদটির জন্য দানের ঢল নেমেছে। এগারটি দানবাক্স রাখা হয়েছিল। দুইদিনেই সেগুলো ভরে গেছে পুরোপুরি। রোববার বিশেষ মেশিন দিয়ে দানের টাকা গোনা শুরু হয়। চারটি বাক্স আর একটি বস্তা মিলিয়ে পাওয়া গেছে ৩৭ লাখ ৩৩ হাজার রুপি। শুধু নগদ নয়, অনলাইনেও আসছে দান। কিউআর কোড স্ক্যান করে এসেছে ৯৩ লাখ রুপি। দানের টাকায় ব্যাংকের পাঁচটি একাউন্টও লিমিট ক্রস করেছে। এখন নতুন একাউন্ট খুলতে হবে। দানের পরিমাণ ধারণার চাইতেও বেশি হচ্ছে। এটাতো শুরুর চিত্র। ভবিষ্যতে দানের মাত্রা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ উপস্থিত হয়ে ছিলেন। তাঁদের শাহী বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়েছিল। সবকিছুই অভূতপূর্ব-দানে, আপ্যায়নে এবং আবেগে। কোনো জাতিকে, ধর্মসম্প্রদায়কে জুলুম-নির্যাতন ও বঞ্চনার মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া যায় কিন্তু দাবিয়ে রাখা যায় না। সঠিক সময়ে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটবেই। মুর্শিদাবাদে নতুন বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন তা আবার উপলব্ধি করা গেল।

মানব সভ্যতার মন্দ ূদিক হলো বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িক উগ্রতা। শুধু ভারতে নয়, পৃতিবীর বিভিন্ন দেশে এসব লক্ষ্য করা যায়। সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে এসব চলতে পারে না। প্রিয় এই পৃথিবীটাকে মানুষের বসবাসযোগ্য রাখতে হলে, আমাদের অবশ্যই বর্জন করতে হবে বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার মতো অপতৎপরতাকে। শুধু মুখে নয়, আচরণেও আমাদের হতে হবে বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত। এখানে আত্মসমালোচনা প্রয়োজন, প্রয়োজন আত্মশুদ্ধিও। মহান ¯্রষ্টার আদেশ-নিষেধের বিষয়টিও এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক।