জীবনকে সংশোধিত করতে অনেক কাজ করার সুযোগ হয় পবিত্র রমযানে। তাই অনেকে অধিক সওয়াবের আশায় এ মাসেই যাকাত আদায় করে থাকে। পবিত্র রমযানে সাদাকাতুল ফিতরা আদায় করার কর্তব্য। সে সাথে যাকাত ও অন্যান্য দান সদকা এ মাসে করতে পারলে সত্তরগুণ সওয়াব পাওয়া যায়। আর পবিত্র রমযান মাসে গরীবদের জন্য ধনীদের উপর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব করা হয়েছে। ইসলামে ধনী-গরীব সকলে সমান। দুই ঈদের সময় শুধু ধনীরা আনন্দ-উল্লাস উপভোগ করবে তা ইসলাম কখনোই সমর্থন করেনি। ধনীদের পাশাপাশি গরীবরাও যেন আনন্দ করতে পারে সে জন্য ইসলামী শরীয়তে ঈদুল ফিতরে ধনীদের উপর সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা পরিশোধ করা ওয়াজিব করেছে। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) মুসলমানদের প্রত্যেক গোলাম, স্বাধীন ব্যক্তি, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সবার উপরে সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা:) সাদাকাতুল ফিতরের এ দান ধনীদেরকে ঈদুল ফিতরের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগেই বণ্টন করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেন গরীব মিসকিনরা এ সাদকা দ্বারা ঈদবস্ত্র ও মিষ্টি খাদ্য ক্রয় করে ঈদের খুশিতে অংশীদার হতে পারে। এবারের মাথাপিছু সর্বনিম্ন ফেতরা ১১০ টাকা, সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮০৫ টাকা।
সাদাকাতুল ফিতর : সাদাকাহ অর্থ দান করা, প্রদান করা। আর ফিতর অর্থ ভঙ্গ করা। দীর্ঘ একমাস রোজাব্রত পালন করার পর ঈদের দিন সকালে খাবার গ্রহণের মাধ্যমে ত্রিশ দিনের গড়ে উঠা ঐতিহ্যকে ভেঙে পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে আসার যে প্রয়াস তাই ফিতরা, আর এ সিয়াম পালন করতে যে ছোটখাট অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে যাওয়া একেবারেই স্বাভাবিক। এ ত্রুটি-বিচ্যুতিকে যেন রোজার শেষের প্রথম দিনেই ঝেড়ে মুছে ফেলা যায় তার জন্য যে দান নির্ধারিত করা হয়েছে তাই সাদাকাতুল ফিতর। এ দানের মাধ্যমে দীর্ঘ সিয়াম পালনে কোন ঘাটতি থাকলে তাকে পরিশুদ্ধ করে সকল রোজা আল্লাহ পরিপূর্ণ করে দিবেন। অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, রোজার মাসের শেষ দিকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা অবশ্য কর্তব্য।
সাদাকাতুল ফিতর কার উপর ওয়াজিব এ বিষয়ে ইমামদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত পরিলক্ষিত হয়। ইমাম শাফেয়ী, আহমদ ও মালেক (রহ:)-এর মতে, যে ব্যক্তি নিজ ও নিজ পরিবারের লোকজনের জন্য এক দিনের অন্ন-বস্ত্রের খরচাদি ছাড়াও সাদাকাতুল ফিতরের সমমূল্য সম্পদের মালিক তার উপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে। এ জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা শর্ত নয়। তাদের যুক্তি হলো- সাদাকাতুল ফিতর সংক্রান্ত যতো হাদীস এসেছে তা সবই আম বা ব্যাপক। এসব হাদীসে নেসাব পরিমাণ মালের মালিক হতে হবে এমন শর্ত উল্লেখ নেই। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানিফা (রহ:)-এর মতে, যে ব্যক্তি ঈদের দিন পারিবারিক খরচাদি ছাড়াও নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকেন, তার উপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। তাদের দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর হাদীস, লা সাদাকাতা ইল্লা আন জাহরে গানিয়্যীন” অর্থাৎ গনী বা ধনী ছাড়া অন্যের উপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব নয়। ধনীদের পক্ষ থেকে দান করা সাদাকাতুল ফিতরই উত্তম দান। তাদের মতে- গনী বা ধনী বলা হয় যিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, সুতরাং সাদাকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রে মালে নাসী ও হাওলানুল হাওল বা এক বছর নেসাব পরিমাণ মাল অব্যাহতভাবে থাকা শর্ত নয়। বরং যে পরিমাণ মালের উপর যাকাত ওয়াজিব হয় ঈদের দিন সকালে সে পরিমাণ মাল থাকলেই সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে। ইমাম আবু হানিফা ও সাহেবাইনের মতে প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। তাদের যুক্তি হলো- আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, সাদাকাতুল ফিতর হলো গরীবের হক এবং তা আদায়কারী নারী ও পুরুষ সকলের উপর ওয়াজিব।
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল (সা:) রোজাকে অপ্রয়োজনীয় ও অশ্লীল কথাবার্তা ও কার্যকলাপ থেকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য এবং মিসকীনদের কিছু খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য যাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন। (আবু দাউদ, ইবনে মাজা, বায়হাকী) অন্য হাদীসে রয়েছে : ‘তাদের আজকের দিনে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরা থেকে অমুখাপেক্ষী রাখ’ (বায়হাকী, দারু কুতনী) আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল (সা:) প্রত্যেক গোলাম, স্বাধীন, পুরুষ, মহিলা, ছোট-বড় সকল মুসলমানের ওপর এক ছা খেজুর বা এক ছা যব যাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন এবং তা লোকেরা ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বেই আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। (বুখারী, মুসলিম) আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা যাকাতুল ফিতর বের করে দিতাম এক ছা খাদ্য আথবা এক ছা যব আথবা এক ছা খেজুর আথবা ছা কিসমিস। (বুখারী)
যাকাত : যাকাত ফরজ হওয়ার পেছনে অসংখ্য হিকমত রয়েছে। যেমন, সম্পদ উপার্জনের যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে অনেক তারতম্য রয়েছে। আর এ তারতম্য কমিয়ে ধনী-গরিবের মাঝে ভারসাম্য আনার জন্য মহান আল্লাহ যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ দেখা যায় কিছু মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়ছে, অর্থ-কড়ি ও ভোগ-বিলাসে মত্ত আছে এবং প্রাচুর্যের চূড়ান্ত শিখরে অবস্থান করছে আর কিছু লোক দারিদ্য্র সীমার একেবারে নিচে অবস্থান করছে। মানবেতর জীবন যাপন করছে। আল্লাহ এ ব্যবধান দূর করার জন্যই তাদের সম্পত্তিতে যাকাত ফরজ করেছেন। যাতে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান কমে যায় এবং ধনী দরিদ্রের বৈষম্য দূর হয়। অন্যথায় দেশে বা সমাজে হিংসা- বিদ্বেষ, ফিতনা-ফাসাদ ও হত্যা-লুণ্ঠন ছড়িয়ে পড়বে। বিঘ্নিত হবে সামাজিক শৃঙ্খলা ও স্থিতি । এছাড়া যাকাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো, যাকাত মানুষকে কৃপণতা থেকে বিরত রাখে। মানুষকে পরোপকারী, অন্যের ব্যথায় সমব্যথী, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহমর্মী হতে সাহায্য করে। অধিকাংশ দেশেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় যাকাত দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সহায়তা করে দারিদ্র্য দূর করতে।
যাকাত আদায়ের মাধ্যমে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি পায়। ভাবমর্যাদা অক্ষুন্ন থাকে এবং আত্মমার্যাদা ও সম্মানবোধ বৃদ্ধি পায়। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে দূরত্ব কমে আসে। তাদের মাঝে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের সেতুবন্ধন রচিত হয়। দূর হয় পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ। কারণ গরীবরা যখন ধনীদের সম্পদ দ্বারা উপকৃত হয় এবং তাদের সহানুভূতি লাভ করে, তখন তাদের সহযোগিতা করে এবং তাদের স্বার্থ ও সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট হয়। যাকাত আদায় করলে আল্লাহ তা‘আলা ধন-সম্পদ এবং ধন-সম্পদের বরকত বাড়িয়ে দেন। যেমন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, ‘সদকা করার কারণে কখনো সম্পদ কমে না।’ দান-খয়রাত করলে সম্পদের পরিমাণ কমলেও সম্পদের বরকত কমে না।
যাকাত একটি সমাজ বা দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও গতিশীলতাকে স্বাভাবিক রাখার নিশ্চয়তা বিধান করে। যাকাত ভিত্তিক অর্থব্যবস্থাই বর্তমান অর্থব্যবস্থার সব প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি ও নানাবিধ সমস্যার যুৎসই সমাধান।
যাকাত নামক এ ইবাদতে মালি বা অর্থনৈতিক ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর অনুগ্রহ ও রহমতকে ত্বরান্বিত করে। কুরআনে করিমে ইরশাদ হয়েছে, যাকাত আদায় করা আল্লাহর সাহায্য লাভের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। (সূরা আ’রাফ: ১৫৬)
যারা যাকাত আদায় করে না তাদের ব্যাপারে কঠোর শাস্তির সংবাদ এসেছে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- আল্লাহ যাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং তারপরও তারা কার্পণ্য করে, তারা যেন এই কৃপণতাকে নিজেদের জন্য ভালো মনে না করে। না, এটা তাদের জন্য অত্যন্ত খারাপ। কৃপণতা করে তারা যা কিছু জমাচ্ছে তাই কিয়ামতের দিন তাদের গলার বেড়ী হবে। পৃথিবী ও আকাশের স্বত্বাধিকার একমাত্র আল্লাহরই। আর তোমরা যা কিছু করছো, আল্লাহ তা সবই জানেন। (সূরা আলে ইমরান: ১৮০)
আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা‘আলা যাকে সম্পদ দিয়েছেন অথচ সে তার যাকাত আদায় করে না, কিয়ামত দিবসে তার সম্পদকে দুই চোখ বিশিষ্ট বিষাক্ত সাপে পরিণত করা হবে। তারপর সাপটিকে কিয়ামতের দিবসে তার গলায় জড়িয়ে দেয়া হবে। সাপ তার দুই মুখে দংশন করতে করতে বলতে থাকবে, আমি তোমার বিত্ত, আমি তোমার গচ্ছিত সম্পদ।’ (বুখারী)
যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে। পাঁচ ধরনের সম্পদকে যাকাতের নিসাবের মধ্যে গণ্য করা হয়। সাড়ে সাত তোলা পরিমাণ সোনা (৮৫ গ্রাম) বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা (৫৯৪ গ্রাম) পরিমাণ রূপা থাকলে অথবা সমপরিমাণ নগদ অর্থ ব্যাংকে জমা অথবা ব্যবসার কাজে এক বছর অতিক্রম করলে ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে। গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে প্রথম ৩০টির জন্য ১ বছর বয়সী ১টি বাছুর দিতে হবে। এর ঊর্ধ্বের হার ভিন্ন ভিন্ন। ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে প্রথম ৪০টির জন্য ১টা এবং পরবর্তী ১২০টির জন্য ২ টা ছাগল/ ভেড়া যাকাত দিতে হবে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে উট ও ঘোড়া পালন করলে তারও যাকাত আদায় করতে হবে। কৃষি উৎপন্ন পণ্যসামগ্রীর উপর ওশর ফরয হবে।
মিল ফ্যাক্টরির দালান-কোঠা ও মেশিনের উপর যাকাত নেই। মিল-ফ্যাক্টরির মওজুদ কাঁচামাল ও উৎপন্ন দ্রব্যের যাকাত দিতে হবে। কোম্পানির শেয়ার, ব্যবসার মাল ও সোনা-রূপা মিলিয়ে নিসাব পরিমাণ অর্থ হলে যাকাত দিতে হবে। বছর শেষে ব্যবসার মূলধন ও লাভ মিলিয়ে মোট টাকার উপর যাকাত দিতে হবে। যৌথ মালিকানাধীন মিল-ফ্যাক্টরির প্রত্যেক শেয়ারের মূল্য যদি নিসাব পরিমাণ হয়, প্রত্যেককে আলাদাভাবে যাকাত দিতে হবে। কারো নিকট নিসাব পরিমাণ অর্থ সম্পদ আমানত রাখলে যিনি আমানত রাখলেন, তাকেই যাকাত দিতে হবে। কেউ কাউকে নিসাব পরিমাণ ্ঋণ দিলে ঋণদাতাই যাকাত দেবেন, ঋণগ্রহীতা নয়। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা উঠানোর পর যাকাত দিতে হবে। পেছনের বছরগুলোর যাকাত দিতে হবে না। অলঙ্কারের মধ্যে পাথর থাকলে সেই পাথরের যাকাত নেই। খাদ অলঙ্কারের ওজনের মধ্যে শামিল। খাদসহ ওজন করে মূল্য নির্ধারণ করে যাকাত দিতে হবে। অলংকার বিক্রয় করতে গেলে যে টাকায় বিক্রয় করা যাবে সেই টাকার হিসেবে যাকাত দিতে হবে। রেডিও, টেলিভিশন, সেলাই মেশিন, ওয়াশিং মেশিন, মোটর সাইকেল, গাড়ি, আসবাবপত্র ও কাপড়-চোপড়ের ওপর যাকাত নেই।
যে মাসে নিসাব পূর্ণ হবে পরবর্তী বছর সেই মাসে যাকাত ফরয হবে। অলঙ্কারের মালিক যদি স্ত্রী হন তাহলে তাকেই যাকাত দিতে হবে। স্বামী যদি স্ত্রীর পক্ষ থেকে যাকাত দেন তাহলে স্ত্রীর যাকাত আদায় হয়ে যাবে। যাকাত আদায়ের জন্য নিযুক্ত কর্মচারীর বেতন যাকাতের অর্থ থেকে দেয়া যাবে। অন্য কোন ব্যক্তিকে কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে যাকাত দেয়া যাবে না। যাকাত আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অন্যতম ইবাদত। ইনকাম ট্যাক্স সরকার কর্তৃক ধার্যকৃত একটি ট্যাক্স। ইনকাম ট্যাক্স দিলে যাকাত আদায় হবে না। পৃথকভাবে যাকাত দিতে হবে। কাউকে যাকাতের টাকা দেয়ার সময় একথা বলার প্রয়োজন নেই যে, এইগুলো যাকাতের টাকা। উপহার উপঢৌকন রূপেও তা দেয়া যাবে। দেয়ার সময় যাকাতের নিয়ত করলেই যাকাত আদায় হবে।
যাকাতের সম্পদ যেখানে ব্যয় হবে : আল্লাহ তাআলা যাকাত ব্যয়ের খাতগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। যাকাতের সম্পদ ব্যয়ের খাত মোট আটটি- এক. গরিব-ফকিরÑ যাদের নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই। দুই. মিসকিনÑ যাদের কোনো সম্পদ নেই। তিন. ইসলামি রাষ্ট্রের সরকারকর্তৃক যাকাত, সদকা, ওশর ইত্যাদি উসুল করার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি। চার. ইসলামের দিকে ধাবিত করার জন্য যাকাত দেওয়া। পাঁচ. নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের বিনিময়ে স্বাধীন হওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ দাস-দাসী। ছয়. পর্যাপ্ত পরিমাণ মাল না থাকার দরুণ ঋণ পরিশোধে অক্ষম ঋণী ব্যক্তি। সাত. যোদ্ধা, যারা যুদ্ধের অস্ত্র যোগাতে অক্ষম অথবা টাকার কারণে হজের কাজ পূর্ণ করতে অক্ষম বা ইলম হাসিল ও দ্বীনি দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত গরিব মানুষ। আট. সফর অবস্থায় অভাবগ্রস্ত মানুষ।
যাকাত কোথায় কোথায় খরচ করা যায়? : কোনো ধনী ব্যক্তি যদি তার যাকাতের টাকা দিয়ে কোনো গরিবকে শিক্ষা অর্জন ও তাবলিগ ইত্যাদি দ্বীনি কাজে পাঠায়- তাহলে তার যাকাত আদায় হয়ে যাবে। অনেক আলেম বলেন, এসব ক্ষেত্রে বরং সে দ্বিগুণ সওয়াবের অধিকারী হবে। উল্লেখ্য, বর্ণিত খাতগুলোর মধ্যে যাকাত ইত্যাদি উসুলে নিয়োজিত ব্যক্তি ছাড়া সব ধরনের লোক গরিব হওয়ার কারণেই যাকাত খাওয়ার উপযুক্ত। আর গরিবকে শর্তহীনভাবে যাকাতের অর্থ দেওয়া জরুরি এবং সম্পূর্ণ মালিক বানিয়ে দেওয়া যাকাত আদায়ের পূর্বশর্ত। অতএব কাউকে যাকাতের টাকা দিয়ে কোনো কাজের জন্য বাধ্য করা উচিত নয়। বরং শর্ত করাও শরিয়তসম্মত নয়। (বাদায়েউস সানায়ে: ২/৪৫; ফাতহুল কাদির: ২/২০৫)
যাকাতের টাকা পাওয়ার উপযুক্ত কোনো গরিবকে বিনা শর্তে ও বিনা স্বার্থে মালিক বানিয়ে দেওয়া- যাকাত আদায় হওয়ার জরুরি শর্ত। (তাবয়িনুল হাকায়েক: ১/৩০০) শরিয়তের বিধানমতে যাকাতের উপযোগী গরিব-অসহায় ব্যক্তিকে যাকাতের টাকার নিঃশর্তে মালিক বানিয়ে দেওয়া যাকাত আদায়ের পূর্বশর্ত। মালিক বানানো ছাড়া জাকাতের টাকা ব্যয় করা হলে জাকাত আদায় হবে না এবং ব্যয়কারী গোনাহগার ও দায়ী হবে। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১৮৮; মাজমাউল আনহুর: ১/৩২৮)
নিজের ঊর্ধ্বতন যথা বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি ও তাদের বরাবর উপরে এবং অধঃস্তন যথা ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি ও তাদের বরাবর নীচে কাউকে যাকাত দেওয়া যাবে না। স্বামী-স্ত্রী একে-অপরকে দিতে পারবে না। (ফাতহুল কাদির: ২/২০৮) নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হলে ভাই-বোন, চাচা, মামা, ফুফু, খালা ও তাদের সন্তানদেরকে যাকাতের টাকা দিতে পারবে। (ফাতহুল কাদির : ২/২০৯, রদ্দুল মুহতার: ২/৩৪২) মেয়ের জামাই ও ভগ্নিপতিকে যাকাত দেওয়া যাবে, যদি সে যাকাতের উপযুক্ত হয়। (রদ্দুল মুহতার ২/৩৪৬) যাকাতের টাকা দিয়ে ক্রয়কৃত জিনিষ পরবর্তিতে নিজে নিসাবের মালিক হয়ে যাওয়ার পরও নিজে ব্যবহার করতে পারবে। (ফাতহুল কাদির: ২/২০৫)
দোকান, কারখানা বা বাড়ির কর্মচারী যদি গরিব ও যাকাত নেওয়ার উপযুক্ত হয়, তাহলে তাদের নিঃস্বার্থ যাকাত দেওয়া যায়েয হবে, অন্যথায় যায়েয হবে না। তবে তাদের যাকাত দেওয়ার কারণে তাদের প্রাপ্য নিয়মিত পারিশ্রমিকের মধ্যে কোনো ব্যাঘাত যেন সৃষ্টি না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ যাকাত দ্বারা কারো হক আদায় করা যায় না। বেতন যেহেতু চাকরিজীবীর প্রাপ্য হক, তাই যাকাত দ্বারা বেতনের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হবে না। (মুলতাকাল আবহুর: ১/২৮৪, ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম: ৬/২৪৫)
লেখক : সদস্য সচিব, জার্নালিস্ট কমিউনিটি অব বাংলাদেশ।