গণভোট কোনো সাধারণ রাজনৈতিক আয়োজন নয়। এটি রাষ্ট্রের আত্মজিজ্ঞাসা। এটি অতীতের সঙ্গে হিসাব মেটানোর এবং ভবিষ্যতের দিকে হাঁটার একসঙ্গে উচ্চারণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটি হলো ‘foundational political moment’-রাষ্ট্রের ভিত্তি নতুন করে নির্ধারণের সময়। এমন মুহূর্তে নিরপেক্ষতা বলে কিছু থাকে না। থাকে অবস্থান।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়ান লিন্জ কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন-পরবর্তী সময়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘Transitions are moments when silence itself becomes a political act.’ অর্থাৎ উত্তরণের সময় চুপ থাকাও একটি রাজনৈতিক অবস্থান।
ইতিহাস বলে, গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের পর যে গণভোট হয়, তা নিরপেক্ষ কোনো শূন্যস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে না। সরকার তখন নিরপেক্ষ রেফারি নয়। সরকার তখন পরিবর্তনের বাহক। ফ্রান্সে দ্য গলের গণভোট। চিলিতে পিনোশে-পরবর্তী প্লেবিসাইট।দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেত সংখ্যালঘু শাসন ভাঙার গণভোট। পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্র-পরবর্তী রেফারেন্ডাম। সবখানেই এক ছবিÑপরিবর্তনের পক্ষে রাষ্ট্র দাঁড়িয়েছে। কারণ গণভোটের প্রশ্নটি তখন হয় একটাই-পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরব, না নতুন পথে যাব? বাংলাদেশ আজ ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে।
এই বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকার যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচার চালায়, সেটি কোনো পক্ষপাত নয়। এটি রাজনৈতিক দায়। এটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব। যারা আজ প্রশ্ন তুলছেÑ“সরকার কেন হ্যাঁ’র পক্ষে?” তাদের পরিচয় নতুন নয়। তারাই একসময় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর ছিল। তারাই নির্বাচনহীন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ‘স্থিতিশীলতা’র গল্প শুনিয়েছিল।তারাই বলেছিল, গণতন্ত্র বিলাসিতা। আজ তারা হঠাৎ করে গণভোটের নিরপেক্ষতার কথা বলে। এই কপটতা জনগণ বোঝে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যাডাম প্রেজওর্সকি বলেন, ‘Authoritarian elites often reinvent themselves as neutral guardians once they lose power..’ ক্ষমতা হারালে কর্তৃত্ববাদীরাই হঠাৎ করে নিরপেক্ষতার ভাষা আবিষ্কার করে।
গণভোটকে কেন্দ্র করে যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, সেটি কৃত্রিম নয়। এটি গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের বহিঃপ্রকাশ। একদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারা স্পষ্ট করে ‘হ্যাঁ’ বলছে। অন্যদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাতীয় পার্টি। তারা স্পষ্ট করে ‘না’ বলছে।
এই রেখাটি কেবল দলীয় নয়। এটি দৃষ্টিভঙ্গির রেখা। এটি অতীত বনাম ভবিষ্যৎ।
জামায়াতের আমীর ডা.শফিকুর রহমান যখন বলেন-যারা গত ৫৪ বছরের পচে যাওয়া রাজনীতি চান না, যারা আমূল পরিবর্তন চান, তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন-তিনি আসলে একটি নৈতিক বিভাজনের কথা বলছেন। তিনি আসলে একটি কাঠামোগত সত্য উচ্চারণ করছেন। উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান আরও স্পষ্ট। তিনি বলেন, পরাজিত শক্তিই গণভোটে ‘হ্যাঁ’র বিপক্ষে। এই বক্তব্যে বিতর্ক আছে। কিন্তু সত্যও আছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, এখানে ‘হ্যাঁ’ ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে reformist vote আর ‘না’ হয়ে উঠছে status quo vote ।
তুলনামূলক রাজনীতির ভাষায় বললে, এমন মেরুকরণ সাধারণত দেখা যায় “post- authoritarian transition ”-এর সময়। কর্তৃত্ববাদী শাসন শেষ হলে সমাজ দুই ভাগে ভাগ হয়। এক পক্ষ চায় কাঠামোগত সংস্কার। আরেক পক্ষ চায় পরিচিত ব্যবস্থায় ফিরে যেতে। এখানে ‘হ্যাঁ’ হয়ে ওঠে সংস্কারের প্রতীক। ‘না’ হয়ে ওঠে স্থিতাবস্থার প্রতীক।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে-বিএনপি কোথায়? জামায়াত মাঠে। এনসিপি মাঠে। আওয়ামী লীগ মাঠে। জাতীয় পার্টি মাঠে। কিন্তু বিএনপি নীরব। তারেক রহমান সারা দেশে জনসভা করেছেন। তিনি নির্বাচন নিয়ে বলেছেন। সংগ্রাম নিয়ে বলেছেন। কিন্তু গণভোট নিয়ে নীরব থেকেছেন। এই নীরবতা কি কৌশল? নাকি সংকট? রাজনৈতিক ট্রানজিশনের সময় বড় দলগুলো অনেক সময় ‘constructive ambiguity ’ বেছে নেয়। গঠনমূলক অস্পষ্টতা। সব দরজা খোলা রাখা। সব ভোটব্যাংক ধরে রাখার চেষ্টা। লাতিন আমেরিকা থেকে পূর্ব ইউরোপÑএই কৌশল আমরা বহুবার দেখেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি কতটা কার্যকর? কারণ গণভোটে নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়। নীরবতা নিজেই একটি অবস্থান।
জনগণ প্রশ্ন করছে-জামায়াত ও এনসিপি যখন ‘হ্যাঁ’ বলে মাঠে, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি যখন ‘না’ বলে মাঠে, তখন বিএনপির নীরবতা মানে কী? দলটি কি সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না? নাকি সিদ্ধান্ত প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থমাস ক্যারোথার্স লিখেছেন, “Ambiguity during foundational moments is often read as lack of commitment to democratic reform.” অর্থাৎ একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নীরবতা সংস্কারের প্রতি অনাস্থার সংকেত হিসেবেই ধরা পড়ে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের চোখে এই নীরবতা আরও জটিল। পশ্চিমা নীতিনির্ধারকরা গণভোটকে দেখেন রাজনৈতিক স্পষ্টতার মুহূর্ত হিসেবে। এখানে তারা জানতে চান-কে পরিবর্তনের পক্ষে? কে সংস্কারের পক্ষে? একটি প্রধান রাজনৈতিক দল যদি নীরব থাকে, তারা এটিকে আস্থার সংকেত হিসেবে দেখে না। তারা দেখে অনিশ্চয়তা হিসেবে। আর অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ আনে না। অনিশ্চয়তা কূটনৈতিক সমর্থন আনে না। অনিশ্চয়তা গণতান্ত্রিক উত্তরণকে দুর্বল করে।
আজ ‘হ্যাঁ’ ভোট কি নৈতিকভাবে সংস্কারপন্থী হয়ে উঠছে? আর ‘না’ ভোট কি স্থিতাবস্থাপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে? বাস্তবতা হলো-রাজনীতি কেবল নৈতিক শ্রেণিবিন্যাসে চলে না। কিন্তু প্রতীকী রাজনীতিতে প্রতীকই শক্তিশালী।
আজ ‘না’ ভোটের পাশে দাঁড়িয়েছে নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। তাহলে বিএনপি যদি সিদ্ধান্ত না নেয়, লাভটা কার হবে? লাভ হবে সেই শক্তির, যারা ‘না’ বলছে। কারণ বিভ্রান্ত ভোটার সাধারণত পরিবর্তনের পক্ষে ঝুঁকি নিতে চায় না। নীরবতা শেষ পর্যন্ত স্থিতাবস্থাকেই শক্তিশালী করে। মনে রাখা দরকার,এই বাস্তবতায় নীরবতা কোনো শূন্যস্থান তৈরি করে না। নীরবতা একটি পক্ষকে সুবিধা দেয়।
বিএনপির সামনে তিনটি পথ। ‘হ্যাঁ’ বলা। ‘না’ বলা। অথবা ভোটারদের ওপর সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেওয়া। তৃতীয় পথটি সবচেয়ে আরামদায়ক। কিন্তু সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ইতিহাস নীরব দলকে মনে রাখে না। ইতিহাস মনে রাখে অবস্থান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘In moments of rupture, undecided voters tend to default to familiarity’ অর্থাৎ সিদ্ধান্তহীন ভোটার শেষ পর্যন্ত পরিচিত ব্যবস্থাকেই বেছে নেয়। ফলে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার রাজনৈতিক লাভ যায় ‘না’ পক্ষের ঘরেই।
গণভোটের প্রশ্নটি সহজ। আপনি কি পুরোনো ব্যবস্থার সংস্কার চান, না চান না? এই প্রশ্নে চুপ থাকা যায়। কিন্তু চুপ থাকার মূল্য আছে। গণভোট তাই কেবল ভোটের প্রশ্ন নয়। এটি রাজনৈতিক চরিত্রের প্রশ্ন। ঐতিহাসিক দায়িত্বের প্রশ্ন। ইতিহাসে যারা অবস্থান নেয়, তারাই স্মরণীয় হয়। যারা দ্বিধায় থাকে, তারা ফুটনোট হয়ে যায়।
বাংলাদেশ এখন সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে। এই সময় চুপ থাকা যায়। কিন্তু চুপ থাকার মূল্য আছে। গণভোট সেই মূল্যই নির্ধারণ করবে। এ পরীক্ষায় কে পাশ করবে, আর কে ইতিহাসের পাতায় অস্পষ্ট হয়ে যাবে-সেটি সময়ই বলে দেবে।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।