আশরাফ আল দীন

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠান নিশ্চিত করার পরবর্তী সময়ে একটি “সর্বদলীয় জাতীয় সরকার” গঠনের প্রস্তাব করছি। আর মাত্র কয়েক দিনের মাথায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। এরিমধ্যে এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য শত্রুরা উঠে পড়ে লেগেছে। অথচ এ মুহূর্তে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।

এ নির্বাচনে দুটি প্রধান দল বিএনপি (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মুখোমুখি হয়ে লড়ছে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আগামী সরকার গঠনের জন্য। এ দুই বড় দলকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছে “নির্বাচনী সমঝোতার প্ল্যাটফর্ম”। সরকার গঠনের জন্য ন্যূনপক্ষে প্রয়োজনীয় ১৫১টি সিট পাওয়ার জন্যই এ সমঝোতা। মাত্র আঠারো মাস আগেও ‘বিএনপি-জামায়াত’ বা ‘জামায়াত-বিএনপি’ কথাটি একই সাথে উচ্চারিত হয়েছে বারবার, কারণ এ দুটি দল যুগপৎ আন্দোলন করছিল গণতন্ত্র ধ্বংসকারী স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে।

স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ায় এখন নির্বাচনের মাঠে তাদের অবস্থান মুখোমুখি। এটাই গণতন্ত্র; এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু আমার বরাবরই মনে হয়েছে, স্বৈরাচারের দেশী এবং বিদেশী মদদদাতাদের করাল গ্রাস ও নানামুখী ষড়যন্ত্র থেকে এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে হলে বিএনপি এবং জামায়াতকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে সমুন্নত রেখেই একে অপরের সহযোগী হয়ে সরকার গঠন করতে হবে। এক প্রকার ‘জাতীয় ঐক্যে’র মাধ্যমে দেশ শাসন করতে হবে; যেন দীর্ঘ মেয়াদে, অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে, শত্রুরা দেশ ও জাতির ক্ষতি করতে না পারে।

এ ধরনের চিন্তা থেকেই আমি সেদিন বিএনপির একজন সিনিয়র নেতাকে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলাম। যেন তিনি এই প্রস্তাব জনাব তারেক রহমানের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। প্রস্তাবটা হলোঃ সবগুলো দলকে নিয়ে বাংলাদেশে একটি জাতীয় সরকার গঠন করা। জাতীয় সরকারের ব্যাপারে আমীরে জামায়াত ইতোমধ্যেই স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, তারা নির্বাচনে জয়ী হলে সকলকে নিয়েই দেশ শাসন করবেন; সরকার পরিচালনা করবেন। অন্যদিকে, জনাব তারেক রহমানও প্রায় একইভাবে বলেছেন যে, নির্বাচনে জয়ী হলে যে সরকার গঠিত হবে সেটা হবে সকলের সরকার।

অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করার পর জনাব তারেক রহমান ১৭ বছর আগে দেশ ছেড়ে ছিলেন। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনে তিনি নিশ্চয়ই শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরী হিসেবে দেশের কল্যাণের ব্যাপারে অনেক স্বপ্ন দেখেছেন এবং পরিকল্পনা করেছেন। দেশে ফেরার পর যেভাবে তিনি ‘দেশের জন্য তাঁর একটি পরিকল্পনা আছে’ (I have a Plan) ঘোষণা দিয়ে আগাতে চাচ্ছেন সে পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য তাঁর প্রয়োজন হবে একদল সুশিক্ষিত, অনুপ্রাণিত ও নৈতিক মানে উন্নত কর্মী বাহিনীর। সমগ্র জাতি দেখতে পাচ্ছে যে, জামায়াতে ইসলামীর হাতে এ ধরনের একদল সুশৃংখল আত্মত্যাগী কর্মী বাহিনী আছে। বিএনপি এবং জামায়াত যদি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য হাত মেলায়, তাহলে এটি হবে একটি অপূর্ব সুযোগ যেখানে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা তাদের সকল স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বিএনপির অভিজ্ঞ কিছু প্রবীণ এবং বাছাই করা কিছু নবীন কর্মী এবং জামায়াতের বিশাল আত্মত্যাগী কর্মী বাহিনীকে নিয়ে দেশ গড়ার কাজে মনোযোগ দিতে পারে।

কারণ, যদি প্রশ্ন করা হয়: জনাব তারেক রহমানের ‘সুন্দর পরিকল্পনা’গুলো বাস্তবায়নের জন্য তার হাতে কি যথেষ্ট দুর্নীতিমুক্ত ও দায়িত্ববান কর্মী বাহিনী আছে? উত্তর হলো: না; হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া। বাস্তবতা হচ্ছে, ৫ই অগাস্ট ২৪-এর আগে পর্যন্ত যেসব চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অপকর্ম আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা করেছে, তারা পালিয়ে যাওয়ার পর সেগুলো অবলীলায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে বিএনপি, যুবদল এবং ছাত্রদলের অসংখ্য নেতা-কর্মীদের দ্বারা। অসংখ্য নেতা-কর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করার পরও পরিস্থিতি যথাযথভাবে আয়ত্তে আনা যায়নি। তাই উচিত হবে এ শূন্যস্থান জামায়াত-শিবিরের আদর্শবান এবং আত্মত্যাগী নেতা-কর্মীদের দিয়ে পূরণ করা। কারণ, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে পুনর্গঠন করে উন্নতির পথে নিয়ে যাওয়া। এখানে ব্যাপারটা কারো একা একা বাহবা নেওয়ার মতো বিষয় নয়। বাংলাদেশকে ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে-এটাই হলো মূল কথা।

রাজনীতিতে ও গণতন্ত্রে ভোট-যুদ্ধ কোন মতেই রক্তপাতের ও চিরস্থায়ী বিদ্বেষের যুদ্ধ নয়। এটি অত্যন্ত সাময়িক বিষয়। তাই, এখন যেমন শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে নিচের ধাপ পর্যন্ত যে ধরনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও দোষারোপের জোয়ার বইছে তা অত্যন্ত অস্থায়ী একটি ব্যাপার। রাজনীতিতে কোন বিষয় চিরস্থায়ী নয়! তাই বড় দুই দলের শীর্ষ নেতারা নিজেদের মধ্যে সহনশীলতার মাধ্যমে, ভোটের নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে একত্রে কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেই পারেন।

আমার বিশ্বাস এ কাজে, অর্থাৎ সর্বদলীয় জাতীয় সরকার গঠনের উদ্যোগে, নতুন প্রজন্ম এবং জেন-জি সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হবে। অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে এবং দেশ অনিশ্চিত ভয়ংকর বিপদ থেকে রক্ষা পাবে।

আসুন, আমরা অহিংসভাবে আনন্দঘন পরিবেশে একটি পরিচ্ছন্ন ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করি এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে একটি সর্বদলীয় জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার গঠন করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাই।

লেখক : প্রাবন্ধিক।