জুলাই বিপ্লব ও জুলাই জাতীয় সনদ আমাদের জাতীয় জীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জন। এটিকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা বললে অত্যুক্তি হবার কথা নয়। কারণ, এ বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ ও জাতির ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা স্বৈরতান্ত্রিক, ফ্যাসিবাদী ও মাফিয়াতান্ত্রিক অপশাসন-দুঃশাসন থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি। কিন্তু বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর ফ্যাসিবাদী বৃত্তে ফিরে যাওয়ার নেতিবাচক ও অশুভ মানসিকতা থেকেই আমাদের জুলাই বিপ্লব ও জুলাই জাতীয় সনদ কালের গর্ভের হারিয়ে যেতে চলেছে। ছাত্র-জনতার এ ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ ও ফ্যাসিবাদ এবং স্বৈরাচারমুক্তি একই সাথে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতায় আসার পথ সুগম করলেও তারা এখন নিজেদের জন্মপরিচয় ভুলে গিয়ে দেশকে আবার নৈরাজ্য ও অরাজকতার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। যা তাদের জন্যই হবে আত্মঘাতি।

মূলত, জুলাই বিপ্লব পরবর্তীতে বিপ্লবী ছাত্র-জনতার অভিপ্রায়ে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিলো। সে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক সংস্কারের জন্য ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে। এসব অধ্যাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচনের আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেও ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি সরকার সবকিছু ভুলে যেতে বসেছে। সে বিস্মৃতির জাঁতাকলে পিষ্ট হতে চলেছে আমাদের জুলাই কেন্দ্রীক সকল অর্জন। এমনকি তারা গণভোটের মাধ্যমে আসা গণরায়ও অস্বীকার করতে শুরু করেছেন। সে ধারাবাহিকাতায় অন্তর্বর্তী সরকারের জারিকৃত ১৩৩ অধ্যাদেশের মধ্যে ১২টি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন না করে ল্যাপস, ৩টি বাতিল, ১৩টি পর্যালোচনা, ৭৪টি পাশ এবং ৩১টি সংশোধন সাপেক্ষে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। মূলত, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়ক অধ্যাদেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোই পরিকল্পিতভাবে ল্যাপস, বাতিল, পর্যালোচনা ও সংশোধন সাপেক্ষে উপস্থাপনের মত সাংঘর্ষিক ও স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। দেশের শীর্ষ আইনজীবীরা জানাচ্ছেন, যে ৭৪টি অধ্যাদেশ সরাসরি পাশ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে সে সবের তেমন কোন গুরুত্ব নেই। জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার এসব করার প্রস্তাব করলেও এগুলোর কোন নৈতিক ও আইনগত ভিত্তি নেই। তাই এসব করা সরকারের জন্য মোটেই সমিচীন নয় বরং সরকারের উচিত স্টেক হোল্ডারদের সাথে আলোচনা করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা।

উল্লেখ্য, সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক গণভোট অধ্যাদেশ অটো বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। যা একক বা আংশিকভাবে করার কোন সুযোগ নেই। আইনবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ধারা ৬ এবং নির্বাচন কমিশন ঘোষিত গণভোট তফসিল ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। একই সাথে নির্বাচনী তফসিল, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ৬নং ধারা এবং গণভোট অধ্যাদেশের সিডিউলে উল্লেখিত ৩০ বিষয়ে ঐক্যমত রয়েছে। সঙ্গত কারণেই একটির সাথে আরেকটি আলাদা করার কোন সুযোগ নেই বরং এগুলো অবিভক্ত ও অবিভাজ্য। তাই এসবের অংশ বিশেষ গণভোট বাতিল করার সুযোগ নেই বরং যা সবকিছু করতে হবে পুরো প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই; আংশিকভাবে নয়। প্রসঙ্গত, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ধারা ৬ মোতাবেক নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গণভোট সংগঠনের পক্ষে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। তাই গণভোট অধ্যাদেশ উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই।

সরকারি প্রস্তাবনা মোতাবেক গুম ও মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ, হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, গুম ও মানবাধিকারের সাথে সরকারের সংবেদনশীল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন জড়িত। তাই এ অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে, যা জুলাই চেতনার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

সরকারের পক্ষে দুর্নীতি দমন অধ্যাদেশও বাতিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের জারিকৃত অধ্যাদেশ অনুযায়ি দুর্নীতি দমন কমিশনের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এ অধ্যাদেশ বাতিল বা ল্যাপস হলেও সরকারের অনুগ্রহভাজনরাই কমিশনে নিয়োগ পাবেন। তাদের পক্ষে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না বরং সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠান সরকারের আজ্ঞাবাহী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

দেশের উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশও সরকার আইনগত ভিত্তি দিতে চায় না। এতে দেশের বিচার বিভাগ আবারও সরকারি দলের প্রভাবের বৃত্তেই বৃত্তাবদ্ধ থাকবে। একই সাথে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশও সরকার রাখতে চাচ্ছে না বরং একটি সংশোধনীর মাধ্যমে এ অধ্যাদেশকে অকার্যকর করার সকল ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশের সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ‘সরকার উপযুক্ত মনে করলে সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে’। ফলে সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয়ও পুরোপুরি নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। সরকার ব্যাংক রেগুলেশন অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধন করে অর্থপাচারকারী ও ঋণ খেলাপীদের দায়মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যা দেশকে আবার অতীতের অশুভ বৃত্তেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

বস্তুত, জুলাই অভ্যুত্থান; জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ছাত্র-জনগণের অভ্যুত্থান, জুলাই বিপ্লব ও জেন-জি বিপ্লব নামেও পরিচিত; যা ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত একটি গণঅভ্যুত্থান। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শুরুতে শুরু হওয়া এ অভ্যুত্থানটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। এটিকে বিশ্বের প্রথম সফল জেন-জি বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, এবং এর নেতৃত্ব দিয়েছিল স্টুডেন্টস এগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য ৩০% আসন সংরক্ষিত বিতর্কিত সরকারি চাকরির কোটা পুনর্বহাল করার পর এটি কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়। তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী বিক্ষোভকারীদের ‘রাজাকারদের নাতি-পুঁতি’ হিসেবে উল্লেখ করার পর প্রতিবাদ আরও তীব্রতা পায়। ফলে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী স্লোগান ও বিক্ষোভ শুরু হয় । এরপরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং শাসক দল আওয়ামী লীগের কর্মীরা বিক্ষোভকারীদের উপর দমন-পীড়ন চালায়, ফলে প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো ‘ছাত্র, সাংবাদিক এবং পথচারীদের’ মৃত্যুর জন্য সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংস প্রতিক্রিয়াকে দায়ী করেছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য ।

জুলাই বিপ্লবের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এ সরকার স্বৈরাচারি আমলে ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের জন্য কতিপয় সংস্কার কমিশন গঠন করে। কমিশনগুলো সকল স্টেক হোল্ডালদের সাথে কথা বলে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করে এবং সে সনদের সাংবিধানিক ভিত্তি দেওয়ার জন্য গণভোট অনুষ্ঠান করা হয়। গণভোটে জনগণ জুলাই সনদের পক্ষে রায় প্রদান করে। বস্তুত, জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক সনদ, যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐকমত্যভিত্তিক গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রস্তাবসমূহ রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং বাংলাদেশের ২৫টি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করে। এ সনদে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংস্কার সংক্রান্ত বিভিন্ন অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটিকে সংবিধান সংস্কার হিসেবেও অভিহিত করা হয়।

জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয় এবং সে সুপারিশসমূহ বিবেচনায় নেওয়ার উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাত সদস্যের জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়; কমিশন ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। কমিশন তিন দফায় মোট ৭২ দিন রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে আলোচনা চালায়। কমিশনের পক্ষ থেকে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। প্রথম পর্যায়ের আলোচনায় উত্থাপিত ১৬৬টি বিষয়ের মধ্যে ৬৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়; পরবর্তী পর্যায়ে আরও আলোচনার মাধ্যমে কয়েকটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়-এই ধাপভিত্তিক আলোচনার সময়সূচি ও সারাংশ জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সনদে মোট ২৮টি প্রতিশ্রুতি আছে।

২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশ করার ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটি। তবে পরবর্তীকালে সরকারের পক্ষ থেকে এটি প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেয়া হলে, তারা সেটি স্থগিত করে। এ সময় তারা সরকারকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এটি প্রকাশের আহ্বান জানান।

২০২৫ সালের ৬ জুন জাতির উদ্দেশ্য দেওয়া এক ভাষণে তদানীন্তন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জানান, ২০২৫ সালে জুলাই মাসের সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ‘জুলাই সনদ’ প্রস্তুত করে জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে। ২৮ জুলাই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ জানান, জুলাই সনদের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এটির ভাষা এবং পটভূমি পর্যালোচনার জন্য রাজনৈতিক দলসমূহের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। ৪ আগস্ট থেকে সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে দলসমূহের সঙ্গে কমিশনের আলোচনা শুরু হয়। মতামতের ভিত্তিতে সমন্বিত খসড়া প্রস্তুত করা হয় এবং ১১ সেপ্টেম্বর খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়। পরে ১৪ অক্টোবর দলসমূহের কাছে চূড়ান্ত অনুলিপি পাঠানো হয়; ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে বাস্তবায়ন রূপরেখা নিয়ে আলাপ চলতে থাকে। বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে সনদে স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়। বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি এ সনদে স্বাক্ষর করে এবং গণভোটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সহ দলের শীর্ষনেতারা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট প্রদানের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু সরকার গঠনের পর তারা সে অবস্থান থেকে সরে এসে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রীতিমত ভঙ্গ করতে চলেছে। এদিকে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলগুলো গণরায়ের পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে। ফলে জুলাই বিপ্লব ও জুলাই সনদ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল এখন মুখোমুখি অবস্থানে। ফলে দেশে আবারো রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বস্তুত, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের মূল রূপরেখা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী শিবিরের অনড় অবস্থান দেশকে এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনবিদরা। এক দিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির আইনি ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার খোঁড়া যুক্তি, অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর রাজপথের আন্দোলনের হুমকি-এমন মুখোমুখি অবস্থানে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে।

মূলত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত জনবিস্ফোরণ। ফলে এ পরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডকে কেবল প্রচলিত সংবিধানের সীমাবদ্ধ ফ্রেমওয়ার্কে বিচার করলে জুলাই সনদের মূল চেতনা অধরাই থেকে যাবে। বিশেষ করে, উচ্চ আদালতে গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে রিট এবং সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে বিএনপির আপত্তির ফলে যে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা রাষ্ট্র সংস্কারের গতিকে মন্থর করে দিচ্ছে। আসলে জুলাই সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং এটি ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয়া এক নতুন সামাজিক চুক্তির প্রতিফলন। এ সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব এবং দীর্ঘসূত্রতা জনমনে সংশয় ও অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলছে। আইনবিদরা মনে করছেন, সময় মতো এ সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারলে দেশ এক ভয়াবহ শাসনতান্ত্রিক শূন্যতায় পড়তে পারে, যা প্রকারান্তরে বিপ্লবের অর্জনকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে চিন্তা করলে জুলাই সনদকে বোঝা সম্ভব নয়। কারণ, জুলাই বিপ্লবের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়েছিল, সংবিধানে তার কোনো উল্লেখ ছিল না। মূলত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থেকেই উপদেষ্টা পরিষদের ধারণাটি এসেছে, যা বিচারপতি খাইরুল হক বাতিল করে দিয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে-অন্তর্বর্তী সরকার তবে কিসের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল? এর উত্তর হলো এ সরকার বাংলাদেশের লিখিত সংবিধানের ঊর্ধ্বে জনগণের ‘সার্বভৌম কর্তৃত্বের’ ভিত্তিতে গঠিত হয়েছে। তারা আরো মনে করেন, ‘জনগণের এ সার্বভৌম ম্যান্ডেটের ফলে সরকার কিছু অনন্য ক্ষমতা লাভ করেছে। যার মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র, গণপ্রজাতন্ত্র এবং নাগরিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র সংস্কারের দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ সে বিশেষ ক্ষমতা বলেই গৃহীত হয়েছিল।’

বিপ্লবের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে মনে রাখা উচিত, বিপ্লব কখনো সংবিধান মেনে হয় না; বরং সংবিধানের গণ্ডি ভেঙে বা বাইরে গিয়েই বিপ্লব ঘটে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ঠিক তা-ই হয়েছে। অনেকে একে কেবল কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফল হিসেবে দেখতে চান, কিন্তু আসলে বিষয়টি তেমন হালকা ছিলো না। মূলত দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের অন্যায়, অবিচার ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকেই এই মহাবিপ্লব ত্বরান্বিত হয়েছে।

গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে করা রিটের সমালোচনা করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘এটি কার্যত পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আচরণেরই প্রতিফলন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে আওয়ামী লীগ সরকার যে জাতীয় ইস্যুগুলো এড়িয়ে যেতে চাইত, সেগুলো সমাধানের পথ বন্ধ করতে পরিকল্পিতভাবে আদালতের দ্বারস্থ হতো। সরাসরি পদে নেই নিজেদের মতাদর্শের অনুসারী আইনজীবীদের দিয়ে রিট করিয়ে তারা সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করত। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও একই কায়দায় বাতিল করা হয়েছিল। সর্বশেষ কোটা আন্দোলনের সময়ও আদালতের দোহাই দিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ানো হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

মূলত, বর্তমান পরিস্থিতিতে জুলাই সনদ বা গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে ক্ষমতাসীনদের ভেতরে কিছু কৌশলগত বিতর্ক বা দ্বিমত দেখা দিতে পারে, যা একটি বড় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের জন্য অস্বাভাবিক নয়। তবে দিন শেষে দেশ ও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণের প্রশ্নে বিএনপি ইতিবাচক অবস্থানেই ফিরে আসবে। কারণ, বিএনপির রাজনীতির মূল চালিকাশক্তিই হলো জনস্বার্থ। সাময়িক কোনো আইনি জটিলতা বা মতপার্থক্য থাকলেও, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও জনগণের চূড়ান্ত অভিপ্রায়কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্র সংস্কারের এ মহাযজ্ঞে বিএনপি শেষ পর্যন্ত সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে বলেই দেশের সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মুনিরের বক্তব্য হলো, ‘জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিএনপি এখন যেভাবে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে, তা ঐতিহাসিকভাবে সাংঘর্ষিক। কারণ, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই দেশে প্রথম প্রচলিত সংবিধানের ঊর্ধ্বে গিয়ে গণভোটের প্রবর্তন করেছিলেন। এমনকি জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী যে বিশেষ আদেশে বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়েছেন, সেটিও বিদ্যমান সংবিধানের আক্ষরিক কাঠামোতে ছিল না। তাই আমাদের বারবার মনে রাখতে হবে, এ গণভোট রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নাগরিকদের সরাসরি অভিপ্রায় ব্যক্ত করার সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক সুযোগ।’

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘আমাদের মতো পরোক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কেবল প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত থাকে, যা নীতিনির্ধারণে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণকে সঙ্কুচিত করে। রাষ্ট্র শাসনের মৌলিক নীতিনির্ধারণে গণভোট একটি অপরিহার্য পদ্ধতি। ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গত ৫০ বছরে বিশ্বে প্রায় ২ হাজার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ৬০০টিরও বেশি ছিল সংবিধান সংশোধন বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে। ফলে এটি প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিপূরক হিসেবেই কাজ করে।’

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘গণভোটের সুস্পষ্ট ফলাফলের পর জনগণের সম্মিলিত অভিপ্রায় নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। যারা গণতান্ত্রিক রীতিনীতি সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার করেন, সে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জনসমর্থিত সংস্কারকে উপেক্ষা করে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারেন না। এটি করা হবে গণতান্ত্রিক আদর্শের চরম লঙ্ঘন। জনগণ যেমন বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে দেখতে চায়, তেমনি একটি শক্তিশালী সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের বাস্তবায়নও তাদের প্রত্যাশা।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘গণভোটের আগে বিএনপি এ প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানিয়েছিল এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিল। এখন যদি দলটি গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করে, তবে জাতি এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কটের মুখে পড়বে।’

সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, সরকার গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল করে নিজেদের মত করে রাষ্ট্র সংস্কার করতে চাইছে। জুলাই সনদের যেসব ধারা তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক সেসব রেখে বাদবাকীগুলো বাতিল করার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। মূলত, বর্তমান সরকার গণভোট সহ কিছু অধ্যাদেশ বাতিল করে আবারো দেশকে স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী বৃত্তে ফিরিয়ে নিতে চায়। কিন্তু তা হয়তো তাদের জন্য কোন ভাবেই সম্ভব হবে না। তারা নিকট অতীতে কেয়ারটেকার সরকারের বাস্তবতা উপেক্ষা করার চেষ্টা করলেও অনেক চড়া মূল্য দেয়ার পর তা মানতে এবং সাংবিধানিক রূপ দিতে বাধ্য হয়েছিলো। আসলে সরকারের পক্ষে জুলাই সনদ উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই। শুধুই সময়ের অপেক্ষা।

www.syedmasud.com