বিগত সরকার আমলে দেশ থেকে অর্থপাচার ও মানি লন্ডারিং মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার সমতুল্য ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। পাচারকৃত অর্থের পুরোটাই নানা অবৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপার্জিত, যে কারণে তা স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের কোন সুযোগ ছিল না। বিগত সরকার আমলে যারা অবৈধ অর্থ উপার্জন ও পাচার করতেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন সরকার দলীয় সমর্থক। তারা সরকারের প্রচ্ছন্ন সহায়তায় অবৈধ অর্থ উপার্জন ও পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের সামান্য অংশই বিদেশে পাচার করা হয়। কারণ, অবৈধ অর্থ উপার্জন অনেকেই করে থাকেন। কিন্তু সবাই চাইলেই বিদেশে অর্থ পাচার করতে পারেন না। ফলে তারা অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ দেশের অভ্যন্তরে রেখে নানাভাবে তা ব্যবহারের চেষ্টা করেন।

বিগত সরকার আমলে অন্তত ১১টি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী নানাভাবে দেশের সম্পদ লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে। এদের পাচারকৃত অর্থের ভাগ পেতেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের লোকজন এমন অভিযোগও রয়েছে। যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর নিকটজন এসব শিল্পগোষ্ঠীর লুটকৃত টাকার ভাগ পেতেন তাই নানাভাবে আইনি সহায়তা দিয়ে এদের জন্য অর্থপাচার সহজীকরণ করে দেয়া হয়েছিল। বেশ কয়েকবার ১০ শতাংশ ট্যাক্স প্রদানের মাধ্যমে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। অথচ একই সময়ে বৈধ অর্থের মালিকদের ১৫ থেকে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত ট্যাক্স দিতে হতো। আন্দোলনের মাধ্যমে দেশ থেকে বিতাড়িত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তার একজন পিয়ন নাকি ৪০০ কোটি টাকার মালিক। তিনি হেলিকপ্টার ছাড়া চলাচল করেন না। সেই পিয়নের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল তা তিনি উল্লেখ করেননি।

স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগ যতবারই ক্ষমতায় এসেছে তারা দেশকে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত করেছেন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট যখন সরকার গঠন করে সে সময় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) তাদের এক প্রতিবেদনে দুর্নীতির অনুমিত ধারণা সূচকে বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করে। পরবর্তীতে আরো ৪ বছর অর্থাৎ বাংলাদেশ মোট বার দুর্নীতির ধারণা সূচকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে তার শীর্ষস্থান হারালেও দুর্নীতির ব্যাপকতা কমেছে এটা বলা যাবে না। প্রধমবার অর্থাৎ ২০০১ সালে টিআই এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে যখন দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয় তখন তৎকালীন আওয়ামী লীগ প্রচণ্ড সমালোচনায় মগ্ন হয়। কিন্তু তারা একবারও ভেবে দেখে না ২০০১ সালে দুর্নীতির যে সূচক প্রকাশ করা হয়েছিল তার ভিত্তি বছর ছিল ২০০০ সাল। সে সময় আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। কাজেই দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবার দায় বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীর উপর নয় আওয়ামী লীগের উপরই বর্তায়। আর দুর্নীতি কখনোই রাতারাতি সৃষ্টি হয় না। এর ধারাবাহিকতা থাকে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এখনো কোন সাফল্যের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের বুঝতে হবে, দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত এবং পরবর্তীতে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার কাজটি খুব একটা সহজ নয়। আর যেসব দেশে অর্থপাচার হয়ে যায় তারা সে অর্থ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ফেরৎ দিতে সম্মত হয় না। সম্পদ একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে তা পুনরুদ্ধার করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। বিশ্বে এমন দেশ আছে যারা পরিকল্পিতভাবে বিদেশি নাগরিকদের তাদের দেশে অর্থ নিয়ে আসার জন্য প্রলুব্ধ করে। যেমন, মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোম প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের অর্থ তাদের দেশে নিয়ে যাবার জন্য প্রলুব্ধ করে। এটা তাদের রাষ্ট্রীয় নীতি।

অর্থপাচার এবং মানিলন্ডারিংয়ের মধ্যে সুম্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু অনেকেই অর্থপাচার এবং মানিলন্ডারিংকে একই অর্থে ব্যবহার করে থাকেন, যা মোটেও ঠিক নয়। অর্থপাচার হচ্ছে নিজ দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তর করা। পাচারকৃত অর্থ বৈধভাবে উপার্জিত হতে পারে আবার অবৈধভাবে উপার্জিতও হতে পারে। কিন্তু সমস্যাটি হচ্ছে অর্থ ভিন্ন দেশে স্থানান্তরের আগে বৈধ কর্তৃপক্ষের অনুমতি গ্রহণ করা হয় না। কালো টাকা এবং অপ্রদর্শিত অর্থের মধ্যেও ভিন্নতা রয়েছে। আমাদের দেশে এ পর্যন্ত যতবারই বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরৎ আনার সুযোগ দেয়া হয়েছে তা করা হয়েছে অপ্রদর্শিত অর্থের ক্ষেত্রে, কালো টাকার ক্ষেত্রে নয়। কালো টাকা বলতে আমরা সে অর্থকে বুঝি যা অবৈধভাবে উপার্জিত এবং দেশের ট্যাক্স নেটওয়ার্কের বাইরে থাকে। যেমন কেউ যদি অস্ত্র বিক্রি, মাদক বিক্রি বা ডাকাতির মাধ্যমে অর্থোপার্জন করেন তাহলে সে অর্থকে কালো টাকা বা ব্লাক মানি বলা যেতে পারে। আবার কেউ যদি বৈধভাবে উপার্জিত অর্থের উপর প্রযোজ্য কর প্রদান না করে নিজ জিম্মায় রেখে ব্যবহার অথবা বিদেশে পাচার করেন তাহলে সে অর্থকে অপ্রদর্শিত অর্থ বলা যেতে পারে। কালো টাকা এবং অপ্রদর্শিত অর্থ অর্জন উভয় প্রচলিত আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবার দাবি রাখে।

অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ অর্থপাচার ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে আইনি সংস্কার সাধন করতে যাচ্ছে। প্রচলিত আইনে কারো বিরুদ্ধে অর্থপাচার এবং মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ উত্থাপিত হলে সরকারকে প্রমাণ করতে হয় তিন উত্থাপিত অভিযোগে দোষি। কিন্তু এভাবে একজন অপরাধীকে চিহ্নিত করা বেশ কঠিন। কারণ যারা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন এবং পাচারকার্যে যুক্ত তারা এমন সব কৌশলে কাজগুলো করেন যা চিহ্নিত করা বেশ কঠিন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেই প্রমাণ করতে হয় অভিযুক্ত ব্যক্তি সত্যি অর্থপাচার এবং মানি লন্ডারিংয়ের জন্য দায়ী কিনা। আইনের এ ধারা পটরিবর্তন করা হচ্ছে। পরিবর্তিত আইনে যার বিরুদ্ধে অর্থপাচার এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ উত্থাপিত হবে তাকেই প্রমাণ করতে হবে তিনি নির্দোষ। একই সঙ্গে প্রসাবিত আইনে এমন একটি ধারা সংযোজ করা যেতে পারে যে, কারো বিরুদ্ধে অর্থপাচার এবং মানি লন্ডারিংয়ের সুস্পষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হলে তার সমুদয় সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দ করা হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেন তাহলে জব্দকৃত সম্পত্তি ফেরৎ দেয়া হবে। আর নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারলে সম্পত্তি স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দ করা হবে।

বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝেই অর্থপাচার এবং মানিলন্ডারিং নিয়ে এমন কিছু তথ্য প্রকাশ করে যা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। যেমন বাংলাদেশের একজন বিতির্কত অর্থনীতিবিদ কিছুদিন আগে তথ্য প্রকাশ করেন, স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ কোটি টাকাব বিদেশে পাচার হয়েছে। তার অর্থ হচ্ছে প্রতিবছর গড়ে ২ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। অথচ ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর অন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে ৬৪ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়। এখন আমরা কার দেয়া তথ্য বিশ্বাস করবো? বিশ্বে প্রতি বছর কি পরিমাণ অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধ করা হয় তা নিয়েও মতান্তর রয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেছেন, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী যে মানি লন্ডারিং হয় তার পরিমাণ বিশ্ব জিডিপি’র ২ থেকে ৫ শতাংশের সমান। অথেীর পরিমাণে যা ৮৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার থেকে ২ লাখ কোটি মার্কিন ডলার। এটাও অনুমান নির্ভর তথ্য। কারণ যারা অবৈধ অর্থ উপার্জন,পাচার এবং মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধ কর্মে যুক্ত থাকেন তারা কখনোই তাদের উপার্জনের সূত্র, উপার্জিত অর্থের পরিমাণ কারো নিকট প্রকাশ করেন না। বিশ্বে এখনো পর্যন্ত এমন কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি যারা কালো টাকা, পাচারকৃত অর্থ এবং মানি লন্ডারিংকৃত অর্থের হিসাব সংরক্ষণ করে।

আমাদের দেশে অনেকের মধ্যেই অর্থ পাচার এবং মানি লন্ডারিং নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। তারা মনে করেন, অর্থপাচার এবং মানিলন্ডারিং একই বিষয়। কিন্তু আসলে তা নয়। অর্থ পাচার মানি লন্ডারিংয়ের একটি কৌশল মাত্র। আরো অনেকভাবে মানিলন্ডারিং হতে পারে। মানিলন্ডারিং দেশের অভ্যন্তরেও হতে পারে। আবার বিদেশেও হতে পারে। অনেকেই মনে করেন, মানি লন্ডারিং শব্দটি এসেছে ‘লন্ডি’ শব্দ থেকে। ময়লা কাপড় লন্ড্রিতে দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। ঠিক একইভাবে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ বা অপ্রদর্শিত অর্থকে বৈধতা দেয়া হয়।

অর্থপাচার এবং মানি লন্ডারিং বিশ্বব্যাপী এক জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এমন কোন দেশ নেই যেখানে অর্থপাচার এবং মানি লন্ডারিং হয় না। অর্থপাচার রোধ করা কোন একক দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। বিভিন্ন দেশ যদি এ ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয় যে, তারা কোন বিদেশি নাগরিকের আনা অবৈধ অর্থ তাদের দেশে স্থান দেবে না তাহলেই শুধু অর্থপাচার বন্ধ করা সম্ভব হবে। জাতিসঙ্ঘের আওতাভুক্ত দেশগুলো একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, তারা কোন বিদেশি নাগরিককে প্রকাশ্য ঘোষণাদান এবং নিজ দেশের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া নগদ অর্থে সম্পদ ক্রয়ের অনুমতি দেবে না তাহলে এ সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে।

তারচেয়েও বড় কথা হচ্ছে মানুষ কিন্তু অর্থ পাচারের জন্য দুর্নীতি করে না। দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ নিজ দেশে প্রশ্নহীনভাবে ব্যবহারের সুযোগ না থাকার কারণেই তারা সে অর্থ বিদেশে পাচার করে থাকেন। অর্থপাচার এবং মানি লন্ডারিং বন্ধ করতে হলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তীণ সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। যারা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ-সম্পদ অর্জন করবেন তাদের সমুদয় সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে হবে। সম্পদহীন মানুষের জাগতিক শক্তি লোপ পায়। কাজেই অবৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ ব্যবহার ও ভোগের সুযোগ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।

লেখক : সাবেক ব্যাংকার।