দুর্বল; নৈতিক, আদর্শ ও লক্ষ্যহীন শিক্ষা কোন জাতির জন্য ইতিবাচক বা কল্যাণকর হয় না। মূলত, আধুনিক শিক্ষার সাথে নৈতিক ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয়ই দেশ ও জাতিকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় যে, স্বাধীনতার ৫ দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এক্ষেত্রে আমরা অনেক পশ্চাদপদ। আধুনিক, নৈতিক ও প্রযুক্তিগত শিক্ষাকে ভিত্তি করে বিশ্বের অপরাপর জাতিরাষ্ট্র যখন সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে তখন এক্ষেত্রে পশ্চাদপদতা আমাদের জাতিসত্তাকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দিচ্ছে।
সাধারণ অর্থে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে ব্যক্তির মূল্যবোধকে জাগ্রত করাই প্রকৃত শিক্ষা। আর ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলা হয়। বাংলা শিক্ষা শব্দটি এসেছে ‘শাস’ ধাতু থেকে। যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দান। অন্যদিকে শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘এডুকেশন’ এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘এডুকেয়ার’ বা ‘এডুকাতুম’ থেকে। যার অর্থ বের করে আনা অর্থাৎ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাইরে বের করে নিয়ে আসা বা বিকশিত করা। বস্তুত, সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের অন্যতম মাধ্যম শিক্ষা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের শিক্ষা কাক্সিক্ষত মানের হয়ে ওঠেনি। ফলে আমরা যেকোন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় খুব একটা সুবিধা করতে পারছি না। আর আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালগুলো আন্তর্জাতিক র্যাংকিং-এ মোটেই সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দৈন্যদশা প্রমাণ করে।
দার্শনিক-পণ্ডিতরা শিক্ষার সংজ্ঞা দিয়েছেন বিভিন্নভাব। তাদের সব কথার সমন্বয় করলে শিক্ষার একটি সার্বিকচিত্র ফুটে ওঠে। দার্শনিক সক্রেটিসের ভাষায়, ‘শিক্ষা হল মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ।’ এরিস্টটল বলেন, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হল শিক্ষা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘শিক্ষা হল তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।’কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষা এসব উদ্দেশ্য সাধনে খুব একটা সফল হয়নি। মূলত, গতানুগতিক ও সেকেলে ধারার শিক্ষা আমাদের জাতিস্বত্ত্বাকে হীনবল করে ফেলেছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিশ্বমানের না করেই আগামী দু’দশকের মধ্যে বাংলাদেশ একটি উন্নত অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিতি পেতে আগ্রহী এবং এ ব্যাপারে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বিগত পতিত সরকারের পক্ষ থেকে। তবে চ্যালেঞ্জটা যে মোটেই সহজসাধ্য ও আয়েশী হবে না তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। মূলত, উন্নত অর্থনীতির দেশ হতে হলে দু’দশক সময়কালের মধ্যে জিডিপি নিয়ে যেতে হবে ১২ হাজার ডলারে। তবে আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশের সফলতা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হলেও কাক্সিক্ষত লক্ষ্য মোটেই মসৃণ নয়। এর অন্যতম কারণই হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে মাত্রারিক্ত পশ্চাদপদতা। অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও কুসংস্কারও এজন্য কম দায়ি নয়। আর এ অশুভ বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যত কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
যে দেশ যত উন্নত সে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিও ততই মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর পরেই আসে শিক্ষার কথা। কারণ, উন্নত ও মানসম্পন্ন শিক্ষা ছাড়া কোন জাতির পক্ষেই নতুন শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা অনেক স্বপ্নের কথা বললেও উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের দুর্বলতা রীতিমত চোখে পড়ার মত। মূলত, আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে জিডিপির হার বৃদ্ধির জন্য আমাদের করণীয় ও চ্যালেঞ্জগুলো জানা প্রয়োজন। শিক্ষা খাতের অভিজ্ঞতার আলোকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে উচ্চশিক্ষার অবদানের ব্যাপারে চুলচেরা বিশ্লেষণ হওয়ার দরকার। বাংলাদেশ বর্তমানে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে রূপান্তরিত হয়েছে শিল্প এবং সেবাচালিত একটি অর্থনীতিতে। অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের আহামরি কোন অর্জন নেই।
বিশ্বব্যাংকের চলতি বছরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে বলা হয়েছে, একটি শিশু ১৮ বছর বয়সে সাধারণত ১১ বছর মেয়াদি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করে (প্রথম শ্রেণি থেকে একাদশ শ্রেণি)। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা শেখার মান বিবেচনায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ৬.৫ বছরের সমতুল্য। অর্থাৎ শিক্ষায় আন্তর্জাতিক মানে বাংলাদেশ অন্তত ৪.৫ বছর পিছিয়ে। সে ক্ষেত্রে দেশের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সপ্তম শ্রেণির সমান, যা শিক্ষার গুণগত দুর্বলতার বড় প্রমাণ।
সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রাথমিক পর্যায়ের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী পাঠ্যবই ঠিকভাবে পড়তে পারে না। মাধ্যমিক পাস করেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আমাদের শিক্ষার্থীরা সাড়ে চার বছরের শিখন ঘাটতিতে রয়েছে। বিশ্ব র্যাংকিং-এ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো জায়গা করে নিতে পারছে না। দেশে ১৭ বছর ধরে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চললেও সৃজনশীল ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে তলানিতে। এমনকি দেশে যত বেকার, এর ১৩ শতাংশই স্নাতক।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ২০২২ সালে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, শিক্ষার গুণগত মান কমে যাওয়া দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত ও নাইজেরিয়া এবং বেড়েছে পেরু, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের। প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ ভিয়েতনামের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন না করা, শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক পাঠদান প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকায় শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মোট বিশ্ববিদ্যালয় ১৭২টি। এর মধ্যে সরকারি ৫৬টি আর বেসরকারি ১১৬টি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) প্রকাশিত ২০২৫ সালের বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং অনুযায়ী, বিশ্বের সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানই স্থান পায়নি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৫’-এ সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই।
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলেও শিক্ষার মানের একটা চিত্র বেরিয়ে আসে। ওই শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান ইউনিটে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের ৯৪ শতাংশ অকৃতকার্য। কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটেও ৯০ শতাংশের বেশি ভর্তিচ্ছু ফেল করেছেন। এ দু’ইউনিটের পরীক্ষায় এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়া এক লাখ ২১ হাজার শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের ২০২২ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বাংলায় ও ৩৯ শতাংশ গণিতে শ্রেণি বিবেচনায় প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করেছে। পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে বাংলায় এ হার ৫০ ও গণিতে ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষা শেষে মাতৃভাষা বাংলায়ই অর্ধেক শিক্ষার্থী দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন বিভাগের সর্বশেষ ২০২৩ সালের প্রতিবেদনেও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে অবস্থা খারাপ। একই শ্রেণিতে গণিতে ৪৩ শতাংশের অবস্থা খারাপ। অষ্টম শ্রেণিতে ইংরেজিতে ২৮ শতাংশ মোটামুটি ভালো, অন্যরা নানা স্তরে রয়েছে। ওই শ্রেণিতে গণিতে ৩৬ শতাংশ মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একজন স্নাতকের সনদকে সিঙ্গাপুরে ফাউন্ডেশন কোর্সের সমমান ধরা হয়েছে। অথচ গুণে-মানে দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাবির ওই স্নাতক দেশটির একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। পেশাজীবীদের এমপ্লয়মেন্ট পাসের জন্য সিঙ্গাপুরে ৪০ নম্বর নির্ধারিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ নম্বর রয়েছে শিক্ষাগত যোগ্যতায়। ওই স্নাতকের এমপ্লয়মেন্ট পাস নবায়নের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাজ্যের মান অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি স্নাতক সমমানের। আর বিশ্ববিদ্যালয়টির স্নাতক ডিগ্রি ফাউন্ডেশন কোর্সের সমমানের। এ কারণে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় তিনি কোনো নম্বর পাননি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত স্নাতক সনদকে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ ‘ডিপ্লোমা’ হিসেবে গণ্য করছে। অনেক দেশেই এখন বাংলাদেশের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিকে স্নাতক মানের ধরা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, দেশে ২০০৯ সালে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু হয়েছিল। যদিও ২০২৩ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হয়, তবে এক বছরের ব্যবধানে তা বাতিল হয়ে যায়। সৃজনশীল পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছিল এ ধারণা নিয়ে যে, আমাদের শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে অনেক বেশি সৃজনশীল হবে। কিন্তু ২০২২ সালের বৈশ্বিক সৃজনশীল ইনডেক্সে ১৩৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১২৯তম অবস্থানে রয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সূচকেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। ২০২২ সালে ইউএনডিপি এবং মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম নলেজ ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে ১৫৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২০তম। জাতিসংঘের সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অরগানাইজেশনের প্রকাশিত ২০২১ সালের বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে ১৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৬ নম্বরে। উদ্ভাবন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার নিচে আছে বাংলাদেশ।
প্রাপ্ত্য তথ্যমতে, একসময় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মেডিক্যাল শিক্ষায় বাংলাদেশের সুনাম থাকলেও তা আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিক্যাল এডুকেশন (ডব্লিউএফএমই) বিশ্বের মেডিক্যাল শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সংস্থাটির অনুমোদন পায়নি। এতে বিশ্বের অনেক দেশে বাংলাদেশের এমবিবিএস ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে এর প্রভাব পড়েছে বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের বাংলাদেশে এমবিবিএস ভর্তির ক্ষেত্রে। আগে আমাদের পার্শ্ববর্তী নেপাল, ভুটান ও ভারতের কাশ্মীর থেকে অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে এমবিবিএস পড়তে এলেও এখন তেমন আসছেন না।
চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের করুণ চিত্র উঠে আসে, যা বাংলাদেশের শিক্ষার মানেরই বহিঃপ্রকাশ। জরিপ অনুসারে, দেশে যত বেকার আছেন, তাঁদের মধ্যে সাড়ে ১৩ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী। ৭.১৩ শতাংশ বেকার উচ্চ মাধ্যমিক পাস। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন বেকারের একজন ব্যক্তি স্নাতক ডিগ্রিধারী বা উচ্চ মাধ্যমিক সনদধারী।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, কোরিয়া, শ্রীলঙ্কাসহ বেশ কয়েকটি দেশের শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশগুলো তাদের বর্তমান শিক্ষাক্রমে জোর দিচ্ছে বাণিজ্য (অর্থনীতি), বিজ্ঞান (জীববিজ্ঞান), কারিগরি শিক্ষা উন্নয়ন (টিইডি), কৃষি ও বাস্তব দক্ষতা উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোয়। আর প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা বাড়াতে দেশগুলো নজর দিয়েছে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানোর ওপর। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ধরা হয় ফিনল্যান্ডের বর্তমান ব্যবস্থাকে। বছরে দেশটির একজন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে অন্তত ৭৪ বার পরীক্ষা বা মূল্যায়ন করা হয়। যদিও সে মূল্যায়ন আমাদের দেশের গতানুগতিক পরীক্ষা নয়। কিন্তু এগুলোর কোনো কিছুতেই নজর নেই আমাদের নীতিনির্ধারকদের।
শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্ভাবনী শক্তি সৃষ্টি করা। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে বড় ধরনের ব্যর্থতা। মূলত, আমাদের তরুণ প্রজন্মকে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে সজ্জিত করতে পারলে উৎপাদনশীলতা উন্নত করার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার সুযোগের দার উন্মোচিত হবে। এমতাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরির ব্যবস্থা নেয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অদ্যাবধি প্রয়োজনীয় যোগত্যাসম্পন্ন নাগরিক তৈরি করতে পারেনি বা পারছে না। যা হচ্ছে তা খুবই গতানুগতিক। একই সময়ে ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে সহযোগী উদ্ভাবনমূলক গবেষণা মূলত অনুপস্থিত থাকায় বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিযোগিতামূলক র্যাংকিংয়ে ক্ষুণ্ন ও অবনত হচ্ছে। এমতাবস্থায় উচ্চশিক্ষার চ্যালেঞ্জ, সমস্যা ও সম্ভবনা চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর সমাধান করার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। কিন্তু লক্ষ্যহীন রাজনীতির কারণে আমরা এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছি।
আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষাদান পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠদানে শিক্ষার্থীরা কোর্সের উপকরণগুলো সত্যিকারভাবে শিখছে কিনা এবং অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগে দক্ষতা অর্জন করছে কিনা, সে বিষয়ে মনোযোগ না দিয়ে শুধু তাদের কোর্সের উপকরণ সম্পর্কিত জ্ঞান বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। যা শিখনের ক্ষেত্র খুব একটা ইতিবাচক হয় না। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ফলাফল ভালো করার কৌশল রপ্ত করে এবং মুখস্ত ও আবৃত্তি কৌশলগুলো শিখতে অনুপ্রাণিত হয়। শেখার মূল্যায়ন পরিচালিত হয় মূলত লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে। প্রশ্নের সঠিক উত্তর না দেয়ার কারণগুলো পর্যালোচনা করা হয় না এবং কোর্স শিক্ষক গ্রেড প্রদানের মাধ্যমে ছাত্রের মূল্যায়ন করে থাকেন। এ পদ্ধতিতে কর্মজীবনে তারা চিন্তা করার, সমস্যা সমাধান এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। যা আমাদের জাতীয় শিক্ষার বড় ধরনের দুর্বলতা।
উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং ভালো আর্থ-সংবেদনশীল দক্ষতার সংমিশ্রণে শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ ব্যবস্থা সৃষ্টি করা। আর তা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে এসে আরও বিস্তৃত সামাজিক এবং নাগরিক জীবনের জন্য প্রস্তুত হবে এবং নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে পারবে। বর্তমানে বিশ্বের প্রথম শ্রেণি ও স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা এবং ছাত্রকেন্দ্রিক শেখার মডেলগুলো শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রবর্তন এবং তা বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগ শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষাদান পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা এবং শেখার আধুনিকীকরণের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে।
অপরদিকে পাঠ্যক্রমও সময়ের প্রয়োজনে অনেক বিকশিত হয়েছে এবং আরও গতিশীল প্রকৃতির হয়ে উঠেছে। পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়েছে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীদের এবং সমাজের চাহিদা পূরণের জন্য। প্রচলিত পাঠ্যক্রম শিক্ষককেন্দ্রিক এবং এটি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন জীবন সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করার জন্য প্রস্তুত করে না। সনাতন পাঠ্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বিষয়কেন্দ্রিক। যা একবিংশ শতাব্দীতে এসে পুরোপুরি উপযোগিতা হারিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখন নতুন করে ভাববার সময় এসেছে।
মূলত, সনাতনী পাঠ্যক্রম সংরক্ষিত প্রকৃত জ্ঞানের একটি অঙ্গ, যা শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠানো হয় এবং মুখস্ত, আবৃতি ও ড্রিলের মাধ্যমে তারা তা আয়ত্ত করে। অন্যদিকে আধুনিক পাঠ্যক্রম বিষয় এবং জীবনকেন্দ্রিক উভয় সংমিশ্রণে প্রস্তুত করা হয়। এটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন অংশীদারদের মতামতের ভিত্তিতে মানসম্পন্ন শিক্ষা দেয়ার জন্য একটি পরিমাপযোগ্য পরিকল্পনা এবং কাঠামো সরবরাহ করে।
উন্নত ও মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য শিক্ষকদের ভূমিকার বিষয়টি অনস্বীকার্য। কারণ,একজন শিক্ষকই পারেন নিজের মেধা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞা, নিয়মানুবর্তিতা, অভিজ্ঞা ও কলাকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সুপ্তপ্রতিভার বিকাশ ঘটাতে। শিক্ষক শিক্ষাক্রমের বিকাশ, বাস্তবায়ন ও সংশোধন করতে অগ্রসৈনিকের ভূমিকা পালন করে থাকেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্যের পথে চলার জন্য এ প্রমাণভিত্তি পাঠ্যক্রমটি একটি রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করে। কোনো কোর্সে ছাত্রদের অগ্রগতি মূল্যায়ন পদ্ধতিগুলোও এখন ভিন্ন। বর্তমানে চার ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি রয়েছে-ডায়াগনস্টিক, ফরম্যাটিভ, বেঞ্চমার্ক (অন্তর্র্বর্তীকালীন) এবং সামেটিভ। এসব মূল্যায়ন পদ্ধতির উদ্দেশ্য আলাদা, তবে একত্রিতভাবে এসব পদ্ধতি শিক্ষার্থীর একাডেমিক মূল্যায়নে কাজ করে। কাজেই এ শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ মডেলগুলো আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং শিক্ষার্থীর একাডেমিক কর্মক্ষমতা মূল্যায়নের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষকদের অবশ্যই জানা এবং জেনে তা প্রয়োগ করা দরকার। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে বড় ধরনের দুর্বলতা। ফলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ঔপনিবেশিক বৃত্ত থেকে এখনো বেড়িয়ে আসতে পারেনি। তাই আমাদের শিক্ষার অভিযাত্রা এখনও অনিশ্চিত গন্তব্যেই রয়ে গেছে।
সার্বিক দিক বিবেচনায় আমাদের দেশের উচ্চস্তর সহ সকল ক্ষেত্রে শিক্ষার মান ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং গবেষণা ক্রমান্বয়ে গুরুত্ব হারাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে গবষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগও নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। মূলত, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীন শিক্ষা জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে। ফলে জাতি হিসেবে আমাদের গন্তব্য হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত। এমতাবস্থায় দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এবং সুশিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল জাতি গড়তে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। অন্যথায় আমাদের জাতীয় শিক্ষার গন্তব্য অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
www.syedmasud.com