ভারতে গরু কুরবানি, গরু জবাই ও গরুর গোশত ভক্ষণ নিয়ে মুসলমানদের ওপর ক্ষমতাসীন সরকারের অত্যাচার অবিচার তুঙ্গে উঠেছে। জানা গেছে যে, এতদিন তাদের অত্যাচার গরুকেন্দ্রিক থাকলেও এখন এর সাথে মহিষও যুক্ত হয়েছে। গণমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী ভারতের ২৮টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ২০টি অঙ্গরাজ্যেই গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং গরু জবাইকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতাসীন হবার পর এ রাজ্যটিও তাদের উপরোক্ত নীতির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং গরুর সাথে মহিষ জবাইও নিষিদ্ধ হয়েছে। শুধু গরু বা মহিষ জবাই নয়, বাড়িতে ফ্রিজে গোশত রাখার অপরাধেও মুসলিম পরিবারসমূহের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে। দিল্লিতে এমন একটি পরিবারের ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং পুলিশের নির্যাতনে তাদের মধ্যে সত্তোরোর্ধ এক বৃদ্ধ মুসলমান নিহত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের ন্যায় বাংলাভাষী মুসলমানদের বাড়িঘর দোকানপাটে হামলা করে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। তাদের জায়গা সম্পত্তি কেড়ে নেয়া হচ্ছে।
ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের খড়গ ব্যবহার করে তাদের বাড়িঘর থেকে বের করে সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। সেখানে মুসলিম মেয়েদের নিরাপত্তা সাংঘাতিকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বুলডোজার দিয়ে মসজিদ ও মাদরাসা ভবন ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়ার সচিত্র ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। মসজিদে নামাযরত মুসল্লিদের শুধু পেটানোই হচ্ছে না, তারা যাতে নামায পড়তে না পারেন সেজন্য বিজেপি ও আরএসএসএর যুবকরা নামাযের সময় মসজিদের মধ্যে ব্যান্ডপার্টি নিয়ে উচ্চস্বরে গান-বাজনা করছে এবং কোথায়ও মসজিদকে মন্দির ঘোষণা করে পূজা-অর্চনা শুরু করেছে। তাদের এমন অতি সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডে ভারতের প্রায় ২১ কোটি মুসলমান শঙ্কিত, উঠতি বয়সি মুসলিম ছেলেমেয়েরা আতঙ্কিত। হিন্দুরা মুসলিম মেয়েদের ধর্ষণের অঘোষিত লাইসেন্স পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত। ঘরে প্রত্যাবর্তন (ঘর ওয়াফেজি) কর্মসূচির আওতায় মুসলমানদের জবরদস্তি ধর্মান্তরিত করার জঘন্য কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। তাদের ‘জয়শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত মুসলিম দুনিয়ায় এসব অত্যাচারের কোনো প্রচারণা নেই। তবে পাকিস্তান ও ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রধানদ্বয় সম্প্রতি এর বিরুদ্ধে কিছুটা মুখ খুলেছেন এবং তারা ধন্যবাদ প্রাপ্য হয়েছেন।
এখন গরু কুরবানিতে ফিরে যাই। গরু কুরবানি নিয়ে প্রাচীন বাংলা ও সিলেটে দুটি প্রাসিদ্ধ ঘটনা ঘটেছিল। সিলেটের রাজা গৌড় গোবিন্দের আমলে ঐ অঞ্চলটি ছিল হিন্দু প্রধান এবং সেখানে গরু জবাই ও কুরবানি নিষিদ্ধ ছিল। রাজা গৌড় গবিন্দ একজন ধর্মীয় তান্ত্রিকও ছিলেন। তার রাজত্বে সুরমান নদীর তীরে টুটলিকর এলাকায় একটি মুসলিম পরিবার বসবাস করতেন। ঐ পরিবারের প্রধান বুরহানউদ্দিন ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি মান্নত করলেন যে, তাকে যদি আল্লাহ একটি সন্তান দেন তাহলে তিনি এ কটি গরু কুরবানি করবেন। আল্লাহর কৃপায় যথাসময়ে তার একটি ছেলে সন্তান জন্মলাভ করে এবং তিনি প্রতিশ্রুতি মতো ছেলের আকিকাতে একটি গরু কুরবানি করেন। ঘটনাচক্রে এ গরুর একটি টুকরো গোশত কোনো মানুষ অথবা পাখি রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে নিয়ে আসে। রাজা তা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন এবং তার গোয়েন্দাদের দিয়ে বুরহান উদ্দিনের তথ্য সংগ্রহ করেন। গৌড় গবিন্দ বুরহান উদ্দিনের এ অপরাধের শাস্তি হিসেবে তার নবজাতক শিশু সন্তানটিকে হত্যা করেন এবং বুরহান উদ্দিনের ডান হাত কেটে দেন। এ মর্মান্তিক খবরটি দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহের নিকট তার ভাতিজা সিকান্দর খানের মাধ্যমে পৌঁছে। সুলতান ফিরোজ শাহ এ অপরাধের প্রতিকারার্থে গৌড় গবিন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং তার প্রধান সেনাপতি সৈয়দ নাসিরুদ্দীনকে সসৈন্যে সিলেট প্রেরণ করেন। সেনাপতি নাসিরুদ্দিন ও সুলতান ফিরোজ শাহের সেনাবাহিনী গৌড় গবিন্দের সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং তিন তিনবার যুদ্ধে তার বাহিনী গৌড় গবিন্দের উন্নততর রণকৌশলের কাছে পরাজিত হন। এ সময়ে খ্যাতনামা ইসলামী দায়ী হযরত শাহজালাল (র.) তার ৩৬০ জন সহচর নিয়ে বাংলার পথে ছিলেন। সুলতান তার সহযোগিতা কামনা করেন এবং তিনিও তার সহচরদের সহযোগিতায় গৌড় গবিন্দকে পরাজিত করেন। তার সাততালার রাজপ্রাসাদ ধুলার সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। সিলেট শহরের গবিন্দ টিলায় এই ধ্বংসাবশেষ এখনো কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। আবার সুরমা নদীর তীরে কীনস ব্রিজ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে বুরহানুদ্দিন (র.)-এর মাজার রয়েছে। এ মাজারে তাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনের মাঝখানে তাদের শিশুপুত্রের কবরটি একটি বর্বর অত্যাচারের স্মৃতি বহন করে।
১১৭৮ সালে বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে রাজত্ব করতেন বল্লাল সেন নামক সেনবংশীয় একজন শাসক। তার রাজত্বে গরু কুরবানি নিষিদ্ধ ছিল। সেখানে বাবা আদম নামে আরব থেকে একজন মুসলিম দায়ী ও সাধক বসবাস করতেন। তিনি রাজার নিষেধ অমান্য করে একটি গরু কুরবানি করেন। কথিত আছে যে, এ গরুর একটি টুকরো গোশত একটি চিল রাজপ্রাসাদের ভেতরে নিয়ে খাচ্ছিল। বল্লাল সেন এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পাইক পেয়াদাসহ বাবা আদমের বাড়িতে গিয়ে হাজির হন এবং তাকে হত্যা করেন। হত্যাকাণ্ডের রক্তে রঞ্জিত রাজা তার শরীর পরিষ্কার করার জন্য নদীতে নামেন এবং এ সময় রাজ কবুতর উড়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে যায়। বলাবাহুল্য, ঐ সময় কবুতর বার্তাবাহকের কাজ করতো এবং আগমন ও নির্গমনের বিশেষ তাৎপর্য ছিল যা রাজা ও রাজপরিবার জানতেন। কবুতরের প্রত্যাবর্তনে রাজপরিবারের মেয়েরা ধরে নেন যে, রাজা নিহত হয়েছেন এবং তার শোকে তারা সবাই আত্মাহুতি দেন। রাজাও প্রাসাদে ফিরে এ অবস্থা দেখে নিজেও আত্মহত্যা করেন। বাবা আদমের হত্যার জেরধরে ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাংলা আক্রমণ করে সেন বংশের সর্বশেষ রাজা লক্ষণ সেনকে হটিয়ে এই অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে যে, মাত্র ১৭ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে বখতিয়ার খিলজী বাংলা জয় করেন এবং লক্ষণ সেন ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে নৌকাযোগে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান।
মুসলিম শাসনামলে শুধু বাংলা নয়, সমগ্র ভারতবর্ষে দু’একটি পকেট ছাড়া কোথাও গরু কুরবানি নিয়ে বাড়াবাড়ি হয়নি। তবে ১৭৯৩ সালে লর্ড চার্লস কর্নওয়ালিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল থাকাকালে সূর্যাস্ত আইন জারি করে সকল মুসলিম জমিদারদের কাছ থেকে জমিদারি কেড়ে নিয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে হিন্দুদের হাতে তা ন্যাস্ত করেন। এ হিন্দু জমিদাররা তাদের নিজ নিজ এলাকায় গরু কুরবানি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তাদের বসতবাড়ি, কাচারী প্রভৃতি এলাকায় মুসলমান প্রজাদের জুতা পায়ে, ছাতা মাথায় অথবা পাল্কি চড়ে যাতায়াত নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। তাদের এ অত্যাচারে অতিষ্ঠ মুসলমানরা গরুর পরিবর্তে ছাগল বা বকরি কুরবানি করতেন এবং এভাবে কুরবানির ঈদ বকরা ঈদ নামেও অভিহিত হয়ে পড়েছিল। হিন্দুদের প্রচারণা ও তাদের সংস্কৃতির প্রভাবে অনেক ধার্মিক মুসলমানের পরিবারেও দেখা গেছে যে, তারা ঘরের বেড়া ও মেঝে পরিষ্কারের কাজে মাটির সাথে গোবর মিশিয়ে তা দিয়ে প্রলেপ দিতেন এবং গোবরকে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী মনে করতেন। নাপাক বস্তু দিয়ে গৃহ পবিত্রের সুন্দর নমুনা।
হিন্দু বা সনাতন ধর্মে বেদ এবং গীতা উভয়েই অত্যন্ত পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। তবে তাদের গঠন, উৎস এবং দর্শনে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বেদ হলো এই ধর্মের মূল ভিত্তি ও জ্ঞানের উৎসব। গীতা হলো বেদের সারমর্ম বা নির্যাস। তাদের বিশ্বাস সৃষ্টির প্রথমদিকে ভগবান বেদের জ্ঞান ব্রহ্মকে দান করেছিলেন। ব্রহ্মা এ জ্ঞান নারদমনিকে দান করেন। নারদ এটা তার শিষ্য ব্যাসদেবকে দান করেন। ব্যাসদেব সংরক্ষণের উদ্দেশে তা লিপিবদ্ধ করে রাখেন। আবার বিকৃতও হয়ে না যায়। তিনি এটাকে ভাগ করে তার চার শিষ্যকে দক্ষ করে তুলেন এবং এ চার শিষ্যকে অধ্যাপক করে প্রচার করেন। কিন্তু এ বেদের ভাষা এতই কঠিন ছিল যে, সাধারণ মানুষ তাকে একান্তই দুর্ভোগধ্য মনে করতেন। তাই তিনি আবার এই বেদকে ১০৮টি উপনিষদে বিভক্ত করেন। এই ১০৮টি উপনিষদ একটি অত্যন্ত বড় গ্রন্থ ভাণ্ডার ছিল যা মানুষের পক্ষে পড়া কঠিন ছিল। এই কারণে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই উপনিষদের দলিত মথিত নির্যাসকে কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে দান করেন যা ছিল শ্রীভগবত গীতা নামে পরিচিত।
প্রাচীনকালে বেদের মন্ত্রগুলো লিখিত ছিল না। গুরুরা শিষ্যদের মুখে মুখে শোনাতেন। এজন্য এ বেদ শ্রুতি নামে অভিহিত ছিল। বেদ শব্দের অর্থ জ্ঞান; সংস্কৃত বিদ ধাতু থেকে এর উৎপত্তি। বেদ চার প্রকার : (১) সামবেদÑ এতে গীত, সঙ্গীত ও সুরের মাধ্যমে উপাসনা করার মন্ত্রগুলোর উল্লেখ আছে, (২) যজুর্বেদ: এতে বিভিন্ন যজ্ঞের পদ্ধতি, আচার-অনুষ্ঠান ও নিয়ম-কানুন সংক্রান্ত মন্ত্রগুলোর উল্লেখ আছে, (৩) ঋক বেদ : বেদের আদি ও বৃহত্তম অংশ। এতে দেবতাদের স্তুতি-প্রার্থনা এবং প্রকৃতিবিষয়ক বিভিন্ন মন্ত্র রয়েছে, (৪) অথর্ববেদ : এতে চিকিৎসা, সমাজনীতি, ধর্ম, বিভিন্ন প্রাকৃতিক নিয়মাবলী এবং গৃহস্থ জীবন সংক্রান্ত মন্ত্র ও স্তোস্ত্র রয়েছে। সাধারণভাবে যদিও সকল ধরনের বেদ অথবা ভগবত গীতা এর প্রত্যেকটিই হিন্দু ব্রাহ্মণদের অধিকারভুক্ত, তাও বিশেষ করে যাজক ব্রাহ্মণদের, অথর্ব বেদের একটি নিষিদ্ধ চ্যাপ্টার আছে যা কেউই পড়তে বা স্পর্শ কতে পারেন না। সাধারণ মানুষের জন্য তো ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন শাস্তিযোগ্য অপরাধ, এই অপরাধে অপরাধী হলে তার জন্য রোরক নামক নরক অবধারিত।
বলছিলাম অথর্ব বেদের কথা। এর নিষিদ্ধ চ্যাপ্টারের ধর্ম অধ্যায়ে সনাতনপন্থীদের জন্য একটি নির্দেশনা আছে; বেদের ভাষায় এটি হচ্ছে :
‘অস্য ইল্ললে মিত্রাবরুন্যে রাজা : তস্মাৎ তানি দিব্যানি পুনস্তং দুধ্য:
হবয়ামী মিলং কবর ইল্ল লাং
অল্লো রহসুলো মহম্মদরকং
বরস্য অল্লো অল্লামো ইল্লল্লতি ইল্লাল্লাহ।’
অর্থাৎ ‘ঠিক সে সময়ে যখন ধর্মে বিকৃতি আসবে, মানুষ উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়বে তখন আরবের মরুতে একজন রাজার আবির্ভাব হবে। তিনি একেশ্বরবাদ প্রচার করবেন। তার নাম হবে মোহাম্মদ। তিনি নিজেকে আল্লাহর রসূল দাবি করবেন। তোমরা তার প্রতি অনুগত হবে এবং তাকে অনুসরণ করবে।’ পরিহাসের কথা হচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুরা এ বেদ বাক্য অনুসরণ করা তো দূরের কথা, তা পড়া, জানা ও অনুসরণ করা নিজেদের জন্য নিষিদ্ধ করে রেখেছে।
শাস্ত্র অনুযায়ী এক সময় অমৃত লাভের ইচ্ছায় দেবতা ও অসুর কর্তৃক সমুদ্র মন্থনকালে পাঁচটি গাভী উত্থিত হয়েছিল। তাদের নাম সুরভী, নন্দা, সুভদ্রা, সুশীলা ও বহুলা। মহর্ষি জমদাগ্নী ভবদ্বাজ বশিষ্ট, অশিত ও গৌতম মনিকে তখন এ গাভী সমর্পণ করা হয়েছিল। সনাতনপন্থীদের ধারণা অনুযায়ী সারা বিশ্বে যত গো বংশ আছে তারা পঞ্চ গাভীরই সন্তান।
শ্রীকৃষ্ণ গো ব্রাহ্মণ হিতায়ন। হিন্দুদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গো ও ব্রাহ্মণদের হিতকারী। তাই তিনি গোকূলে আবির্ভূত হন এবং গোলক ধামে থাকেন। গাভীদের আনন্দ দানের জন্য তার আরেক নাম গোবিন্দ, গাভী পালনের জন্য তার নাম গোপাল। গাভী তাদের মাতা। পূজনীয়। ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত তাদের গো মাতা প্রণাম মন্ত্র হচ্ছে :
‘তাং ধেনু শিরসা বন্দে ভূত ভব্যস্য মাতরম
নিরটং গকুলং যত্র শ্বাসং মুচিত নির্ভরম’ অর্থাৎ যিনি সমস্ত চরাচর জগতকে ব্যাপ্ত করে রেখেছেন এবং ভূত ভবিষ্যতের জননী সেই গোমাতাকে আমি নত মস্তকে প্রণাম করি।
তাৎপর্য : গোমাতা মহালক্ষ্মীর মূল এবং সমৃদ্ধির প্রাতীক। বলা হয় গোমাতা যেখানে বসে শ্বাস নেন সে স্থানের কল্যাণ ও শোভা বৃদ্ধি পায়। গোমাতার চরণে প্রণাম করলে ভক্তি ও মানসিক শান্তি লাভ হয়।
পঞ্চপিতা সপ্তমাতা
হিন্দুরা পঞ্চ পিতা ও সপ্ত মাতায় বিশ্বাসী। তাদের পাঁচজন পিতা হচ্ছে : (১) জন্মদাতা, (২) ভয়ত্রাতা, (৩) কন্যাদাতা, (৪) অন্নদাতা ও (৫) দীক্ষাদাতা। পক্ষান্তরে সপ্তমাতা হচ্ছে : (১) জন্মদাত্রী, (২) গুরুপত্নী, (৩) ব্রাহ্মণী (ব্রাহ্মণপত্নী), (৪) রানী মা, (৫) ধাত্রী, (৬) গাভী ও (৭) ধরিত্রি বা পৃথিবী।
দুর্বোধ্য পরস্পর বিরোধিতা
সনাতন ধর্মের একটি বিষয় আমি গভীরভাবে অধ্যয়ন করছি। সেটা হচ্ছে গোমাতার স্থান তাদের জন্মদাত্রী মার উপরে উঠে আসলো কিভাবে? আবার তার জবাই ও কুরবানির প্রতি তাদের ক্ষিপ্রতার কারণ কি যা তাদের প্রতিবেশী মুসলমানদের প্রতি হিংস্র প্রাণীর মতো সহিংস করে তুলছে। তারা গরুর চামড়ার তৈরি জুতা পরে, এ চামড়াজাত অন্য পণ্য ব্যবহার করে। ভারত মহিষ ও গরুর গোশত রফতানি করে গড়ে প্রতিবছর ৩৪.১৭৭ কোটি টাকা আয় করে। এই অংক দেশটির পাকা ও কাঁচা (ব্লু হাইড) চামড়া রফতানি বাবত প্রাাপ্ত অর্থের অতিরিক্ত। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির এ বিষয়ের একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি গোমাতার ধারণাটিকে হাস্যকর অভিহিত করে বলেছেন যে, গরু কখনো মানুষের মা হতে পারে না। গরু একটি পশু, এই পশুর বাচ্চা কিভাবে মানুষ হয়? যারা গরুকে মাতা বলেন, তিনি তাদের পশু বলে অভিহিত করেন। তার মতে গোমূত্র পান, গোবর খাওয়ার বিধান ধর্মের কোথাও নেই। যারা তা কেরন তার নিজ মায়ের পেশাব-পায়খানা খেয়ে তো মাতৃভক্তির দৃষ্টান্ত দেখান না? তিনি আরো বলেন, গরুর গোশত একটি উপাদেয় খাদ্য, প্রোটিনের উৎস। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সকল দেশের মানুষ খায়, আমিও খাই। যারা এর বিরোধিতা করেন এবং এর নামে মুসলিম ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার করেন তারা নরপশু।
হিন্দুশাস্ত্রে গরু ছাড়া অন্যান্য মায়েদের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা মাত্রা লক্ষণীয় নয়, জন্মধাত্রী মায়ের প্রণাম মন্ত্রে জন্মভূমিকে এনে তাকে খাটো করা হয়েছে। যেমনÑ ‘ভূমে গরিয়সী মাতা সাঘাৎ উমতর পিতা জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী, গর্ভ ধারনং পষ্যভাং, পিতুমাতা বিশ্বস্ত সর্বদেব সরুপায় স্তর্ম্মেমাত্র নমঃ নমঃ’ একইভাবে পিতার প্রণাম মন্ত্রও উল্লেখ করার মতো। এই মন্ত্রে পিতার স্থান মায়ের ওপরে। যেমনÑ
‘পিতা ধর্ম, পিতা স্বর্গ, পিতাহি পরমং তপঃ
পিতরি পিতিমাপন্নে পিয়ন্তে সর্বদেবতা’
ভারতের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটি। এর মধ্যে ২০ কোটি হচ্ছে মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃস্টান, শিখহলো ১০ কোটি। বাকি ১১০ কোটি ভারতীয়দের মধ্যে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণের সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি (৫%)। এ উচ্চবর্ণের ধর্মান্ধ ব্রাহ্মণরা সাধারণ হিন্দুদের বিপদগামী করে তাদের দেশেরই মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এর অবসান হওয়া দরকার। জাতিসংঘ, ওআইসি ও বিশ্ব মুসলিম লীগের সদস্য দেশগুলো এই ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস।