মোহাম্মদ ইউনুছ
কালচার বা সংস্কৃতি হলো একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আচরণ, শিল্পকলা, ভাষা, রীতিনীতি ও জীবনযাত্রার সামগ্রিক রূপ। এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অর্জিত ও সঞ্চারিত হয়ে একটি জনগোষ্ঠীকে স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়। সংস্কৃতি মানুষের টিকে থাকার কৌশল এবং একটি সমাজের সামাজিক কাঠামোকেও সংজ্ঞায়িত করে। এটি কেবল নাচ-গান বা উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষ কীভাবে চিন্তা করে, কথা বলে, পোশাক পরে এবং একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে-সবকিছুই সংস্কৃতির অংশ।
সংস্কৃতি শব্দটি অনেক পুরোনো হলেও আমরা প্রতিনিয়ত এর ব্যবহার করি। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দেশ, ধর্ম কিংবা জাতি-প্রত্যেকেরই নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। যে যার মতো করে নিজের আচার-অনুষ্ঠান ও বিশ্বাস লালন বা পালন করলে তাতে কোনো সমস্যা তৈরি হয় না। সমস্যা সৃষ্টি হয় তখনই, যখন কোনো গোষ্ঠী তাদের বিশ্বাস বা সংস্কৃতি অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। নানা কৌশল, মিথ্যা বয়ান ও অসৎ উদ্দেশ্যে আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে যখন সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখনই সামাজিক সংঘাত ও সংকটের জন্ম হয়।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন (Cultural Aggression) বলতে বোঝায় এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে একটি শক্তিশালী বা প্রভাবশালী সংস্কৃতি অন্য একটি দুর্বল সংস্কৃতির ওপর নিজের প্রভাব চাপিয়ে দেয় কিংবা সেটিকে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করে। এই আগ্রাসন কখনো সরাসরি দখলদারত্বের মাধ্যমে, আবার কখনো পরোক্ষভাবে সংঘটিত হয়। গণমাধ্যম, শিক্ষাব্যবস্থা, ভোগ্যপণ্য সংস্কৃতি (Consumer Culture), প্রযুক্তি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব-এসবই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে এক দেশের সংস্কৃতি বা জীবনধারা অন্য দেশের শক্তি বা সংস্কৃতির চাপে বিকৃত, প্রভাবিত কিংবা ধ্বংস হয়ে যায়। সাধারণত মিডিয়া, বিনোদন, ফ্যাশন, ভাষা, শিক্ষা ও প্রযুক্তির মাধ্যমেই এই আগ্রাসন পরিচালিত হয়। সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নীতি-কৌশলের মাধ্যমেও এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-একসময় জ্ঞান, নৈতিকতা ও নেতৃত্বে অগ্রগামী মুসলিম বিশ্ব আজ নানামুখী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চাপে কোণঠাসা। মুসলিম শাসকদের একাংশের ভোগ-বিলাস, জ্ঞানচর্চায় অনীহা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এই দুরবস্থার জন্য দায়ী হলেও, এর সুযোগ নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী শক্তিগুলো একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক প্রভাবশালী মিডিয়া ও প্রচার মাধ্যমের বড় একটি অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে, যেখানে সত্য আড়াল করে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
এই প্রবণতা শুধু আন্তর্জাতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। এক শ্রেণীর মিডিয়া ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবী নিজেদের ‘প্রগতিশীল’ পরিচয়ের আড়ালে ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশাসনকে পশ্চাৎপদতা কিংবা চরমপন্থার সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করছে। দাড়ি-টুপি, মসজিদ, ইসলামী মাহফিল-এসব তাদের বয়ানে প্রায়শই নেতিবাচক অর্থ বহন করে। অথচ একই সঙ্গে নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক অনাচার ও উচ্ছৃঙ্খলতাকে আধুনিকতার মোড়কে বৈধতা দেওয়া হয়।
২০১৩ সালে নয়া দিগন্ত পত্রিকায় অগ্নিসংযোগ, আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ, দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার বন্ধ এবং দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক, প্রবীণ সাংবাদিক জনাব আবুল আসাদ ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলা মামলা, গ্রেপ্তার-নির্যাতনের ঘটনাগুলো এ দেশের গণমাধ্যম ইতিহাসে গুরুতর দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এসব ঘটনায় যে নৈতিক ও পেশাগত প্রতিবাদ প্রত্যাশিত ছিল, তা দেখা যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার নীরব বা প্রকাশ্য যুক্তিকরণ করা হয়েছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। মিডিয়ার এই দ্বিচারিতা আরও স্পষ্ট হয় সমাবেশ ও জনসমাগমের ক্ষেত্রে। অল্পসংখ্যক মানুষের কোনো কর্মসূচি হলে তা লাইভ সম্প্রচার ও ফলাও করে প্রচার পায়, অথচ লক্ষ লক্ষ মানুষের ইসলামী মাহফিল, ওয়াজ কিংবা ধর্মীয় সমাবেশ প্রায় সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত থাকে। এই বৈষম্যমূলক আচরণ সমাজে বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়িয়ে দেয়-যেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির কোনো গুরুত্ব নেই।
আজকের বাস্তবতায় বিড়ি, সিগারেট, মদ, গাঁজা ও নানা ধরনের নেশাকে ‘স্মার্টনেস’ ও আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বিপরীতে ধর্মীয় অনুশাসন মানাকে এক শ্রেণীর মিডিয়া ও মতপ্রভাবশালী মহল সন্দেহের চোখে দেখছে। কেউ নৈতিক জীবনযাপন করতে চাইলে তাকে সহজেই ‘উগ্র’ বা ‘জঙ্গি’ তকমা দেওয়া হয়, যা শুধু অন্যায় নয়-বরং সামাজিক বিভাজনকে উসকে দেয়।
ঘুষ, দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হলেও অনেকের কাছে তা বড় অপরাধ বলে বিবেচিত হয় না। অথচ ধর্ম পালন, নৈতিকতা চর্চা কিংবা বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করলেই এক শ্রেণীর কাছে সেটিই সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে এই দ্বিমুখী মানদণ্ড একটি সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সংস্কৃতির নামে পহেলা বৈশাখ কিংবা থার্টি ফার্স্ট নাইটের মতো আয়োজনকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে অশ্লীলতা ও উচ্ছৃঙ্খলতাই মুখ্য হয়ে ওঠে। এগুলোকে ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চললেও বাস্তবে এর অনেকটাই উপমহাদেশের বাইরের কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সংস্কৃতির অনুকরণ। নিজস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ উপেক্ষা করে অন্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ কখনোই টেকসই উন্নয়নের পথ দেখাতে পারে না।
মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি জাতিগত ঐক্যের ইতিহাসকেও আজ পরিকল্পিতভাবে বিভাজনের হাতিয়ারে পরিণত করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শকে একমাত্র দেশপ্রেমের মানদণ্ড হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। এর বাইরে গেলেই কাউকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। এটি ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের শামিল। মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিভাজনের প্রতীক নয়; এটি হওয়া উচিত জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি। একইভাবে ধর্মীয় পরিচয় বা শিক্ষাব্যবস্থা কাউকে দেশপ্রেমিক কিংবা অদেশপ্রেমিক বানানোর মাপকাঠি হতে পারে না।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দাড়ি-টুপি বা ইসলামী পরিচয় দেখলেই এখনো একশ্রেণীর মানুষ ‘রাজাকার’ তকমা সেঁটে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। যেন ইসলাম মানেই স্বাধীনতা বিরোধিতা-এই ভ্রান্ত ও অপমানজনক ধারণা পরিকল্পিতভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এ দেশের অসংখ্য আলেম, মাদ্রাসা শিক্ষক ও ধর্মপ্রাণ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। তাদের আত্মত্যাগ অস্বীকার করা জাতির ইতিহাস বিকৃত করার শামিল।
একইভাবে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ‘অনগ্রসর’, ‘অশিক্ষিত’ বা ‘কিছুই জানে না’-এই স্টেরিওটাইপ ছড়ানো এক ধরনের সাংস্কৃতিক বৈষম্য। অথচ মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বের হয়ে বহু মানুষ আজ শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, প্রশাসন, আইন ও সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। একটি শিক্ষাধারাকে সমষ্টিগতভাবে অবমূল্যায়ন করা মানে লাখো শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা।
এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে মূলত কাজ করছে সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ। একটি নির্দিষ্ট জীবনধারা, পোশাক ও চিন্তাকে আধুনিকতার মানদণ্ড বানিয়ে অন্য সব বিশ্বাস ও পরিচয়কে পশ্চাৎপদ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর ফলে সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সহনশীলতার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় মিডিয়া। চলচ্চিত্র, নাটক, টিভি, ওয়েব সিরিজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটি জাতির চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও অভ্যাস পরিবর্তন করা হয়। একইভাবে ফ্যাশন ব্র্যান্ড, ফাস্টফুড ও ভোগ্যপণ্যের মাধ্যমে জীবনাচরণের মৌলিক পরিবর্তন ঘটানো হয়। শিক্ষাব্যবস্থাও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। শিক্ষার মাধ্যমে উপনিবেশিক ধ্যানধারণা ছড়িয়ে পড়লে নাগরিক মানসিকতায় নতজানুতা ও আত্মপরিচয় সংকট তৈরি হয়। এতে বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির আধিপত্যে মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতি অবমূল্যায়িত হয়।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর প্রক্রিয়া। এটি কেবল বাহ্যিক প্রভাব নয়; বরং একটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভাষাগত আগ্রাসন, পোশাক ও জীবনধারার বিকৃতি, মিডিয়া ও বিনোদন জগতের ভূমিকা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পথ প্রশস্ত করছে। পরিবর্তিত খাদ্য সংস্কৃতিও আমাদের লোকজ খাদ্যাভ্যাসকে বিপন্ন করে তুলছে।
এর ফলে জাতীয় পরিচয়ের সংকট তৈরি হচ্ছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মূল্যবোধ ও আচার-আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। অনুকরণপ্রবণতা ও বিভ্রান্তি বাড়ছে। একই সঙ্গে জাতীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টির অবমূল্যায়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে। যখন একটি জাতি নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয় ভুলে যেতে শুরু করে, তখন জাতীয়তাবাদী চেতনা দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনীতিতে দেশপ্রেম ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা কমে যায়। রাষ্ট্রনায়কের বদলে জন্ম নেয় সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ। নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়ের ফলে রাজনীতি পরিণত হয় ক্ষমতার খেলায়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয় এবং একনায়কতন্ত্র বা ছদ্মগণতন্ত্রের উত্থান ঘটে।
অতএব, কালচারাল ফ্যাসিবাদ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সচেতন অবস্থান গ্রহণ করা জরুরি। ভিন্ন বিশ্বাস, ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান নিশ্চিত করাই একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজের ভিত্তি।
লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট।