গত ৩ জানুয়ারি মধ্যরাতে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে বোমা হামলা ও বিশেষ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে বিচারের মুখোমুখি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ট্রাম্প একে ‘অসাধারণ’ সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেন। কিন্তু এ ঘটনাকে স্বাভাবিক মনে করছেন না বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্বর লঙ্ঘন বলেই বিবেচনা করছেন।
যদিও মার্কিন সমর্থিত ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেত্রী নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার ক্ষণ এসে গেছে।’ তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধীদের প্রার্থী এদমুন্দো গনসালেস উরুতিয়াকে ‘অবিলম্বে’ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে কি না-তা নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। মাদুরোর বামপন্থি সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ফ্রান্স সতর্ক করে বলেছে, ভেনিজুয়েলার সংকটের কোনো সমাধান বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
এএফপি সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোর আনুমানিক ২টার দিকে কারাকাসবাসী বিস্ফোরণের শব্দ ও সামরিক হেলিকপ্টারের গর্জনে ঘুম ভাঙে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বিমান হামলায় একটি বড় সামরিক ঘাঁটি ও একটি বিমানঘাঁটিসহ একাধিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়। এ বোমা হামলা ছিল ৬৩ বছর বয়সী মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার একটি বৃহত্তর অভিযানের অংশ। সেখানে তিনি মাদক পাচারসংক্রান্ত অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হবেন। ট্রাম্প জানান, প্রথমে হেলিকপ্টারে করে মাদুরোকে উদ্ধার করা হয় এবং বর্তমানে তাকে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীর উভচর আক্রমণ জাহাজ ‘আইও জিমা’-তে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে তাকে নিউইয়র্কে পাঠানো হবে।
২০১৩ সালে হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসা মাদুরো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে আসছিলেন। ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রে মাদকজনিত মৃত্যুর জন্য ভেনিজুয়েলা দায়ী এ কারণেই এ অভিযান ‘ন্যায্য’। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও একাধিক ইউরোপীয় দেশ আগে থেকেই মাদুরোর বৈধতা স্বীকার করে না। তাদের দাবি, তিনি ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন কারচুপি করেছেন। তবে ট্রাম্প মাচাদো ক্ষমতায় আসবেন কি না সে বিষয়ে কিছু বলেন নি।
ভেনিজুয়েলার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র আবাসিক এলাকাতেও হামলা চালিয়েছে এবং তারা ‘বৃহৎ সামরিক মোতায়েন’ ঘোষণা করেছে। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনিজুয়েলাকে ঘিরে সামরিক তৎপরতার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেছেন: অবৈধ অভিবাসন, মাদক পাচার ও তেল শিল্প তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ভেনিজুয়েলার তেল খাতে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো সক্রিয়। তিনি প্রকাশ্যে সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানাননি, যদিও শনিবার জানান, গত সপ্তাহেই তিনি মাদুরোর সঙ্গে কথা বলে তাকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসন বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও গ্যাং সদস্য পাঠাচ্ছে। এ নিয়ে ভেনিজুয়েলার ওপর নানারকম চাপ প্রয়োগের পর মার্কিন এই অভিযানের ঘটনা ঘটল। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটকের পর ‘আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি’ করার জন্য নিউইয়র্কে নিয়ে আসা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার-এ-লাগোসে দেয়া সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তাদের এখন নিউইয়র্কে নিয়ে আসা হচ্ছে। সেখানে তারা আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি হবেন। ইতোমধ্যেই মার্কিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে সোপর্দও করেছে।
মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনিজুয়েলার অবকাঠামো মেরামত করতে এবং ‘দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করতে’ যাবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ভেনিজুয়েলার ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেলসি রদ্রিগেজ এখনো দেশে আছেন এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হয়েছেন, যা বার্তা দিচ্ছে মাদুরোর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা ক্ষমতায় রয়েছেন।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান কিভাবে পরিচালিত হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেই। ভেনিজুয়েলার ভেতর থেকে পাওয়া ভিডিওতে বড় বিস্ফোরণ দেখা গেছে এবং রাজধানী কারাকাসের বাসিন্দারা বিমান ও বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন বলে জানিয়েছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে এবং হেলিকপ্টারগুলোকে দল বেধে উড়তে দেখা গেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা সিবিএস নিউজকে বলেছেন, হামলার নির্দেশ দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তারা আরো জানিয়েছেন, নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট ‘ডেল্টা ফোর্স’। তবে এ বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ভেনিজুয়েলা সরকার নিশ্চিত করেছে, কারাকাসে হামলা হয়েছে এবং মিরান্ডা, লা গুয়াইরা ও আরাগুয়া রাজ্যেও হামলার খবর দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, নিকোলাস মাদুরো বামপন্থী নেতা হুগো শাভেজ এবং তার ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনিজুয়েলার (পিএসইউভি) অধীনে প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠেন। মাদুরো, যিনি একসময় বাসচালক ও শ্রমিক নেতা ছিলেন, শাভেজের উত্তরসূরি হিসেবে ২০১৩ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় রয়েছেন। ২৬ বছরে শাভেজ ও মাদুরোর ক্ষমতায় থাকার সময় তাদের দল জাতীয় পরিষদ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
২০২৪ সালে মাদুরোকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। যদিও বিরোধী দলের সংগৃহীত ভোটের হিসাব বলছে, তাদের প্রার্থী এডমুন্ডো গনসালেস বিপুল ব্যবধানে জিতেছিলেন। গনসালেস মূল বিরোধী নেতা মারিয়া করিনা মাচাদোর স্থলাভিষিক্ত হন, যিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। অক্টোবরে মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয় ‘স্বৈরশাসন থেকে গণতন্ত্রে ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের সংগ্রামের জন্য’। ডিসেম্বরে তিনি মাসের পর মাস লুকিয়ে থাকার পর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নরওয়ের রাজধানী অসলোতে গিয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেন।
ট্রাম্প নিকোলাস মাদুরোকে দোষারোপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে শত-সহস্র ভেনিজুয়েলান অভিবাসীর আগমনের জন্য। ২০১৩ সাল থেকে প্রায় আট মিলিয়ন ভেনিজুয়েলান অর্থনৈতিক সঙ্কট ও দমন-পীড়ন থেকে পালিয়ে গেছে বলে ধারণা। প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, মাদুরো ‘তার কারাগার ও মানসিক হাসপাতাল খালি করে’ বন্দীদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছেন। ট্রাম্প মাদক প্রবাহ, বিশেষ করে ফেন্টানিল ও কোকেন রোধে মনোযোগ দিয়েছেন। তিনি দু’টি ভেনিজুয়েলান অপরাধী গোষ্ঠী- ট্রেন দে আরাগুয়া ও কার্টেল দে লস সোলেসকে বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন, পরেরটি মাদুরোর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, কার্টেল দে লস সোলেস কোনো সংগঠিত গোষ্ঠী নয়, বরং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বোঝাতে ব্যবহৃত একটি শব্দ, যারা কোকেন পরিবহনে সহায়তা করেছে। এর আগে ট্রাম্প মাদুরোকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ করেন এবং তার সরকারকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেন।
অবশ্য এর প্রত্যুত্তরে মাদুরো জোর দিয়ে বলেন, তিনি কোনো কার্টেলের নেতা নন। তিনি পাল্টা অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এবং ভেনিজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ দখল করতে। মাদকবিরোধী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক মাদক পাচারে ভেনিজুয়েলার ভূমিকা তুলনামূলকভাবে ছোট। দেশটি মূলত একটি ট্রানজিট পয়েন্ট, যার মাধ্যমে অন্যত্র উৎপাদিত মাদক চোরাচালান হয়। এর প্রতিবেশী কলম্বিয়া বিশ্বের বৃহত্তম কোকেন উৎপাদক, তবে এর বেশিভাগই অন্য পথে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায়, ভেনিজুয়েলার মাধ্যমে নয়। মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিইএ) ২০২০ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো কোকেনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথে আসে, আর ক্যারিবিয়ান দিয়ে আসে খুব সামান্য অংশ। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক হামলাগুলো ক্যারিবিয়ানে চালানো হয়েছিল, সাম্প্রতিক হামলাগুলো প্রশান্ত মহাসাগরে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প মার্কিন সামরিক নেতাদের বলেছেন, লক্ষ্যবস্তু করা নৌকাগুলোতে ‘সাদা গুঁড়ার ব্যাগ স্তূপ করে রাখা হয়েছে, যা মূলত ফেন্টানিল এবং অন্যান্য মাদক’।
গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মাদুরো সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। প্রথমেই ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে ধরিয়ে দেয়ার তথ্যের জন্য ঘোষিত পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ করে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক বহনের অভিযোগে অভিযুক্ত নৌযানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা শুরু করে। এরপর থেকে ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে এমন নৌযানের ওপর ৩০টির বেশি হামলা হয়েছে, যেখানে ১১০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তারা একটি ‘অ-আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সঙ্ঘাতে’ জড়িত, যেখানে অভিযুক্ত মাদক পাচারকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অনিয়মিত যুদ্ধ চালাচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব হামলা ‘বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু’র বিরুদ্ধে নয়। ২ সেপ্টেম্বর চালানো প্রথম হামলাটি বিশেষভাবে সমালোচিত হয়েছে, কারণ সেখানে একবার নয়, দু’বার হামলা হয়েছিল; প্রথম হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা দ্বিতীয় হামলায় নিহত হন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর বলেছেন, সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানটি শান্তিকালে বেসামরিকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত হামলার মধ্যে পড়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় হোয়াইট হাউস বলেছে, তারা সশস্ত্র সঙ্ঘাতের আইন মেনে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্রকে কার্টেল থেকে রক্ষা করতে, যারা ‘আমাদের তীরে বিষ নিয়ে আসছে... আমেরিকানদের জীবন ধ্বংস করছে’। অক্টোবরে ট্রাম্প বলেন, তিনি সিআইএকে ভেনিজুয়েলার ভেতরে গোপন অভিযান চালানোর অনুমতি দিয়েছেন। তিনি আরো হুমকি দেন স্থলভাগে হামলার, যাদের তিনি ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ বলে বর্ণনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানে ১৫ হাজার সেনা এবং একাধিক বিমানবাহী রণতরী, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ও উভচর আক্রমণ জাহাজ মোতায়েন করেছে। এ বহরের মধ্যে রয়েছে ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড, বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী। ১০ ডিসেম্বর ভেনিজুয়েলার উপকূল থেকে একটি তেলবাহী জাহাজ দখলের আগে মার্কিন হেলিকপ্টারগুলো এই রণতরী থেকে উড্ডয়ন করে বলে জানা যায়। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ওই জাহাজটি ‘ভেনিজুয়েলা ও ইরান থেকে নিষিদ্ধ তেল পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল’। ভেনিজুয়েলা এই পদক্ষেপকে ‘আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা’ বলে অভিহিত করেছে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার উপকূলীয় এলাকায় আরো দু’টি তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
মাদুরো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে ট্রাম্প প্রশাসন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ দখল করতে পারে। তিনি ট্রাম্পের একটি মন্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যে মন্তব্য তিনি করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার উপকূল থেকে প্রথম তেলবাহী জাহাজ দখল করার পর। সাংবাদিকরা যখন জাহাজ ও এর তেলের কী হবে জানতে চান, ট্রাম্প বলেন, ‘আমার ধারণা আমরা তেল রেখে দেবো।’ তবে মার্কিন কর্মকর্তারা পূর্বে অস্বীকার করেছেন যে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল দেশের অপ্রচলিত তেল সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
ভেনিজুয়েলার বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে এবং তেল খাতের আয় সরকারি বাজেটের অর্ধেকের বেশি অর্থায়ন করে। তবে এর রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগের অভাব এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভেনিজুয়েলা বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের মাত্র ০.৮ ভাগ উৎপাদন করেছে। বর্তমানে দেশটি দৈনিক প্রায় নয় লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করে এবং এর সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো চীন।
ভেনিজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া অ্যাডেলা ফ্লোরেসকে তুলে আনার প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশ ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মিত্ররা তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। স্পেন শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া ইরান, কলম্বিয়া, কিউবা, রাশিয়া, স্পেন, জার্মানি, ইটালী, বেলজিয়াম, ত্রিনিদাদ টোবাকো, ইন্দোনেশিয়া বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা এ ঘটনাকে অনাধিকার ও কোন স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের মারাত্মক লঙ্ঘন বলে দাবি করেছেন। একই সাথে মার্কিন ডেমোক্রেট সিনেটররাও এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এ বিষয়ে ডেমোক্রেট সিনেটর ব্রায়ান শ্যাটজ বলেছেন, ভেনিজুয়েলায় যুদ্ধে যাওয়ার মতো কোনো জাতীয় স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের নেই। সিনেটর রুবেন গালেগো লিখেছেন, এ যুদ্ধ বেআইনি এক বছরেরও কম সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘বিশ্ব পুলিশ’ থেকে ‘বিশ্বের বুলি’তে পরিণত হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া অ্যাডেলা ফ্লোরেসকে তুলে আনার পক্ষে যত কথায় বলুক না কেন বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ তা কোন ভাবেই যৌক্তিক ও আইনসিদ্ধ মনে করছেন না। এমকি জাতি সংঘ মহাসচিব এন্তেনিও গুতেরেসও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাই বিষয়টির একটি শান্তিপূর্ণ ও স্বীকৃত পন্থায় সমাধান হওয়ার উচিত বলে মনে করেন বিশ্বের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ। অন্যথায় বিশ্বশান্তি হুমকীর মুখে পড়তে পারে।
www.syedmasud.com