মুন্সী আবু আহনাফ
রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্যতার উৎস হল, জনগণ। যে রাজনীতির প্রতি জনগণের সমর্থন নেই, আজ হোক কিংবা কাল, তাঁদেরকে রাজনীতির ময়দান থেকে বিদায় নিতে হবে। কনফুসিয়াস বলেছেন, যে শাসক জনগণের আস্থা হারায় সে সব কিছুই হারায়। নিজামূল মূলক বলেন, যে রাষ্ট্রে আদালত থাকে ও জনগণ আদালত ভিত্তিক শাসন পায়, জনগণ সেই রাষ্ট্রকে আজীবন টিকিয়ে রাখে। মাকিয়াভ্যালি বলেন, যে রাজপুত্র জনগণের শত্রুতা অর্জন করে, সে কখনোই নিরাপদ নয়। এই তিন জন ভিন্ন ভিন্ন সময়ের তিনটি অঞ্চলের ও তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতার চিন্তক হলেও তাঁদের কথা কিন্তু একই, বৈধতার ভিত্তি হলো জনগণ বা জনরায় অথবা গণভোট। এই তিন চিন্তাবিদ একে অপরকে পড়েননি। তবুও তারা ভিন্ন দরজা দিয়ে একই সত্যে উপনীত হয়েছেন। ইতিহাসে দেখা গেছে, জনগণের প্রবল ইচ্ছা আর সাহসের কাছে বড় বড় স্বৈরশাসক নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বা পদত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া বিশ্বের এমন উল্লেখযোগ্য কিছু স্বৈরশাসকরা হলেন: ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা (বাংলাদেশ, ২০২৪), হোসনি মুবারক (মিশর, ২০১১), বেন আলী (তিউনিসিয়া, ২০১১), ফের্দিনান্দ মার্কোস (ফিলিপাইন, ১৯৮৬), স্বৈরাচার এরশাদ (বাংলাদেশ, ১৯৯০), শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী (ইরান, ১৯৭৯), ওমর আল-বশির (সুদান, ২০১৯), সলোবোদান মিলোসেভিচ (সার্বিয়া, ২০০০), গোটাবায়া রাজাপাকসে (শ্রীলঙ্কা, ২০২২), ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ (ইউক্রেন, ২০১৪)। এই স্বৈরশাসকদের পতনগুলো প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন যেকোনো সুসংগঠিত সামরিক শক্তির চেয়েও বেশি শক্তিশালী হতে পারে।
এবার আসি বাংলাদেশে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন কেবল একটি রাজনৈতিক দাবি নয়, বরং এটি ছাত্র-জনতার বিপ্লবের আকাক্সক্ষাকে একটি আইনি ও নৈতিক কাঠামো দেওয়ার প্রধান মাধ্যম। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি যাচাইয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই ভোটের ফলাফল যা গত ১৩ ফেব্রুয়ারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। গেজেটে জানানো হয়, প্রথম গেজেটের হিসেব অনুযায়ী ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন, ‘না’ ভোটের সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন। হ্যাঁ এবং না ভোট মিলে সর্বমোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩ জন। এর মধ্যে বাতিল হয়েছিল ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭ জন।
গণভোট বা জনমতের প্রতিফলনের আলোকে এটি কেন বাস্তবায়ন জরুরি, তার প্রধান কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো: ১. গণআকাক্সক্ষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য গণভোট বাস্তবায়ন জরুরি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কোনো নির্দিষ্ট দল নয়, বরং সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিল। এই বিশাল জনমতের প্রতিফলন হচ্ছে ‘জুলাই সনদ’। গণভোটের মাধ্যমে যে রায় জনগণ দিয়েছে (ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ), তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এই সনদের বিকল্প নেই। এটি বাস্তবায়িত না হলে জনগণের এই মহান ত্যাগ কেবল একটি ‘ক্ষমতা বদল’ হিসেবেই থেকে যাবে। আর বারবার ফ্যাসিবাদ ফিরে ফিরে আসার ক্ষেত্র তৈরি হবে। ২. রাষ্ট্রীয় সংস্কারের রাস্তা তৈরি হবে। জুলাই সনদে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। প্রচলিত শাসনব্যবস্থায় যে স্বৈরতান্ত্রিক ফাঁকফোকর ছিল, তা বন্ধ করতে হলে: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এই সংস্কারগুলো ছাড়া আবার কোনো গণভোট বা নির্বাচন দিলেও তাতে পুরোনো (ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো) অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ৩. শহীদ ও আহতদের রক্তের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে জুলাই সদন বা গণভোট বাস্তবায়ন জরুরি। আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন এবং যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ। জুলাই সনদ মূলত সেই লক্ষ্যগুলোকে দলিলায়ন করে। এটি বাস্তবায়ন করা শহীদদের স্বপ্নের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একমাত্র পথ। ৪. ভবিষ্যৎ স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধের কবচ হলো বর্তমান গণভোট বাস্তবায়ন। গণভোটের অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল জনগণ আর কখনো একনায়কতন্ত্র চায় না। জুলাই সনদ এমন সব আইনি ও রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলে, যা ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তিকে বা দলকে রাষ্ট্রের উপরে স্থান নেওয়ার সুযোগ দেবে না। এটি রাষ্ট্র এবং জনগণের মধ্যে একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’ (Social Contract) হিসেবে কাজ করবে। ৫. জাতীয় ঐক্য ও সংহতি চাবি হলো গণভোট বাস্তবায়ন, তা না হলে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হতে পারে। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে নানা বিভাজন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। জুলাই সনদ সব পক্ষের জন্য একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। এই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-দল নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার পাবে। এক কথায় যদি বলি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন মানে হলো, আন্দোলনের চেতনাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা এবং রাষ্ট্রকে এমনভাবে মেরামত করা যেন কোনো অপশক্তি বা ফ্যাসিস্ট চক্র আর কখনো জনগণের ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা বা মানবাধিকার কেড়ে নিতে না পারে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে ধারণ করে যে ‘জুলাই সনদ’ বা সংস্কারের রূপরেখা তৈরি হয়েছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো। এটি মূলত রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে মেরামত করার একটি পদ্ধতি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হলে এর প্রধান দিকগুলো বিস্তারিতভাবে জানা প্রয়োজন: ১. রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার (Structural Reform)। বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণ একজন ব্যক্তিকে স্বৈরশাসক হতে সাহায্য করে। জুলাই সনদের লক্ষ্য হলো; ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা: প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির একক ক্ষমতা কমিয়ে সংসদ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য (Checks and Balances) তৈরি করা। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ: আইনসভায় একক আধিপত্য কমাতে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের প্রবর্তন নিয়ে আলোচনা। ২. বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। একটি দেশে যদি বিচার বিভাগ স্বাধীন না থাকে, তবে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পায় না। সনদের মূল দাবি হলো: বিচারক নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। একটি স্বাধীন সচিবালয় তৈরি করা যা আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে না। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন। ৩. নির্বাচন ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানের জন্য গণভোট বাস্তবায়ন করা দরকার। গণভোট বা সাধারণ নির্বাচন যেন স্বচ্ছ হয়, সেজন্য জুলাই সনদ নিম্নোক্ত প্রস্তাব দেয়, তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার: নির্বাচনের সময় একটি নিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থাকে সংবিধানে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা। শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন: কমিশনকে এমন ক্ষমতা দেওয়া যেন তারা যেকোনো প্রভাবমুক্ত হয়ে ভোট গ্রহণ করতে পারে।
৪. বৈষম্য নিরসন ও নাগরিক অধিকার। জুলাই অভ্যুত্থানের স্লোগানই ছিল “বৈষম্যবিরোধী”। এই সনদের বিস্তারিত অংশে রয়েছে; সংবিধানের সংস্কার: সংবিধানের যে ধারাগুলো নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেয় (যেমন: ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার), সেগুলো সংশোধন করা। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র: সংখ্যালঘু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকারের পূর্ণ সাংবিধানিক নিশ্চয়তা।
কেন এটি এখনই বাস্তবায়ন জরুরি? ফ্যাসিবাদ পুনরুত্থান রোধ করার লক্ষ্যে। যদি আইনি কাঠামো পরিবর্তন না করা হয়, তবে পরবর্তী যেকোনো নির্বাচিত সরকার আবার পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক পথে হাঁটার সুযোগ পাবে। ফ্যাসিবাদী অপশাসনের কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে তা দূর করার জন্য গণভোট বাস্তবায়ন জরুরি। সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করলে পুলিশ, প্রশাসন ও আদালতের ওপর মানুষের বিশ্বাস ফিরে আসবে। রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়। পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে এই সনদ শক্তিশালী ভিত্তি দেয়। তাই বলা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে একটি ‘নীরব গণভোট’ হিসেবে দেখা হয়। মানুষ রাস্তায় নেমে তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে যে তারা বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন মানে হলো সেই মৌখিক ম্যান্ডেটকে একটি লিখিত সংবিধানে রূপান্তর করা। গণভোটকে অস্বীকার করার কারণে বিশ্বের অনেক দেশে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় সংকট তৈরি হয়: বিশ্বের ইতিহাসে গণভোট (Referendum) বা জনমতের সরাসরি প্রতিফলনকে অবজ্ঞা করার ফলে বিশ্বের অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। যখন কোনো সরকার জনগণের সরাসরি রায়কে অমান্য করে বা তা বাস্তবায়নে বিলম্ব করে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে এবং অস্থিরতা তৈরি হয়। নিচে এমন কিছু দেশের উদাহরণ ও ক্ষতির ধরন তুলে ধরা হলো; ১. গ্রিস (২০১৫): গ্রিসে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয় গণভোট বাস্তবায়ন না করার কারণে। ২০১৫ সালে গ্রিসের অর্থনৈতিক সংকটের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেওয়া কঠিন শর্ত (Austerity measures) গ্রহণ করা হবে কি না, তা নিয়ে গণভোট হয়। গ্রিসের ৬১% মানুষ এই শর্তের বিপক্ষে ভোট দেয়। কিন্তু তৎকালীন সরকার জনমত উপেক্ষা করে প্রায় একই ধরনের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়। এর ফলে দেশটিতে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি তীব্র অনাস্থা তৈরি হয় এবং গ্রিসের অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে মন্দার কবলে থাকে। ২. কলম্বিয়া (২০১৬): কলম্বিয়ায় শান্তি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয় গণভোট বাস্তবায়ন না করার কারণে। ফার্ক (FARC) বিদ্রোহীদের সাথে শান্তি চুক্তির বিষয়ে ২০১৬ সালে কলম্বিয়ায় গণভোট হয়। সামান্য ব্যবধানে জনগণ চুক্তির বিপক্ষে ভোট দেয়। সরকার তাৎক্ষণিকভাবে তা বাস্তবায়ন না করে কিছুটা পরিবর্তন করে কার্যকর করে। এতে সমাজে মেরুকরণ (Polarization) বাড়ে এবং শান্তি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক বিদ্রোহী আবার সশস্ত্র পথে ফিরে যায়, যা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ৩. ভেনিজুয়েলা (২০১৭): ভেনিজুয়েলায় সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয় গণভোট বাস্তবায়ন না করার কারণে। ২০১৭ সালে ভেনিজুয়েলার বিরোধী দলগুলো প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে একটি অনানুষ্ঠানিক গণভোটের আয়োজন করে। লাখ লাখ মানুষ এতে অংশ নিয়ে মাদুরোর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মত দেয়। কিন্তু সরকার এই জনমতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে এবং বিতর্কিত ‘Constituent Assembly’ গঠন করে। এর ফলে ভেনিজুয়েলায় ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আসে এবং দেশটি ইতিহাসের ভয়াবহতম মুদ্রাস্ফীতি ও মানবিক সংকটে নিমজ্জিত হয়। ৪. থাইল্যান্ড: বারবার রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয় গণভোট বাস্তবায়ন না করায়। থাইল্যান্ডে একাধিকবার গণভোট বা নির্বাচনের ম্যান্ডেটকে সামরিক বাহিনী বা এলিট শ্রেণি দ্বারা উপেক্ষা করা হয়েছে। ২০০৬ এবং ২০১৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে জনমতের চেয়ে সামরিক শক্তির প্রাধান্য বেশি ছিল। এর ফলে দেশটিতে দীর্ঘ ১৫-২০ বছর ধরে কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি। বারবার অভ্যুত্থানের ফলে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে এবং পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫. সুদান ও মিয়ানমার: গৃহযুদ্ধ ও জান্তা শাসনের ক্ষেত্র তৈরি হয় গণভোট উপেক্ষা করার কারণে। সুদান এবং মিয়ানমারে বারবার সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা বা গণভোটের প্রতিফলনকে অবজ্ঞা করে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে রেখেছে। এই দেশগুলো এখন বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারে জনমতের অবজ্ঞা দেশটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ৬. ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস : ২০০৫ সালে একটি নতুন ইউরোপীয় সংবিধান গ্রহণের প্রস্তাব এই দুটি দেশে গণভোটের মাধ্যমে বিপুল ব্যবধানে প্রত্যাখ্যাত হয়। তবে সরকার সরাসরি সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন না করলেও ২০০৭ সালে প্রায় একই রকম বিষয়বস্তু নিয়ে লিসবন চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা কার্যত গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। ৭. আয়ারল্যান্ড : গণভোটে আইরিশ জনগণ ২০০১ সালে নাইস চুক্তি এবং ২০০৮ সালে লিসবন চুক্তি গণভোটে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ৮. স্কটল্যান্ড : স্কটল্যান্ডে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে গণভোটে ৫১.৬ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার সেই ফলাফলকে অগ্রাহ্য করে এবং আইনটি বাতিল করে দেয়। ৯. স্পেন : ২০১৭ সালে স্পেন এবং কাতালোনিয়ার গণভোটেও এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে। কাতালোনিয়া বহুদিন ধরেই স্পেন থেকে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিল। সেই উদ্দেশ্যেই গণভোটের আয়োজন করা হয়। গণভোটে ৯২ শতাংশ ভোট ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে থাকা সত্ত্বেও সরকার সেই ভোট কার্যকর করেনি। ১০. ইরাক : ইরাকের কুর্দি অঞ্চল বহু বছর ধরেই স্বাধীনতার দাবি করছিল এবং সেখানে একটা গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ৯২ শতাংশ গণভোটের পক্ষে ছিল। ১১. নর্থ মেসিডোনিয়া : এছাড়াও নর্থ মেসিডোনিয়া নাম পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে দেশটিতে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল ২০১৮ সালে। ভোটের ফলাফল ৯১ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আসলেও সেই ফলাফল অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। ১২. কলম্বিয়া : ২০১৬ সালের কলম্বিয়ার ঐতিহাসিক গণভোটে ভোটাররা সরকার এবং ফার্ক বিদ্রোহীদের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তিটি অল্প ব্যবধানে (৫০.২% ‘না’ বনাম ৪৯.৮% ‘হ্যাঁ’) প্রত্যাখ্যান করেছিল, যা পুরো বিশ্বকে হতবাক করেছিল। ৫২ বছরের পুরোনো সশস্ত্র সংঘর্ষ অবসানের এই চুক্তিটি সাবেক প্রেসিডেন্ট আলভারো উরিবের বিরোধিতার মুখে পড়ে। ১৩. হাঙ্গেরি : ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর হাঙ্গেরিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাধ্যতামূলক শরণার্থী পুনর্বাসন কোটার বিরুদ্ধে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওর্বান এবং তার সরকার এই ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করেছিল।
বিশ্বের এই উদাহরণগুলো থেকে বোঝা যায় যে, বিশ্বের বহু দেশে গণভোট বা রেফারেন্ডাম হয়েছে। যখন জনগণের একটি বিশাল অংশ (বিশেষ করে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে) পরিবর্তনের ম্যান্ডেট দেয়, তখন তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করলে রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। যেমন: প্রতি-বিপ্লবের ঝুঁকি থেকে যায়। পুরোনো ফ্যাসিবাদী শক্তি আবার ফিরে আসার সুযোগ পায়। আইনি বৈধতার সংকট তৈরি হলে সরকার বা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের নৈতিক সমর্থন হারিয়ে যায়। অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেখা দিতে পারে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, যার কারণে বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যেতে পারে। কোনো দেশের সরকার যখন “জনগণ কী চায়” তা জেনেও তা বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ করে, তখন সেই রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কাঠামোগতভাবে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।