মাহবুবুল হক

সমাজে দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি কথা চালু আছে, তা হল, সৎব্যক্তিরা সাধারণত যোগ্য হন না। সাহসী হন না। রিস্ক নেন না। বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন না। সে কারণে সমাজে ইসলামী জীবনব্যবস্থা সঞ্চারিত বা প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে না। তাঁরা সাধারণত আবেগপ্রবণ হন। কিছুটা এক রোখাও হন। নিজে যেটা বুঝেন, সেটা কে সঠিক বিবেচনা করেন। অন্যের যুক্তি পরামর্শ ও উপদেশকে খুব একটা মূল্যায়ন করেন না। তাঁদের মোটামুটি বড় মূলধন হলো আল্লাহ ভরসা। মহান আল্লাহর ওপর তাদের পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা শতভাগ। তারা কতগুলি থিমের পর জীবন পরিচালনা করে থাকেন। যেমন, এলাহি ভরসা, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন, জীবনে মন্দ কিছু ঘটে গেলে তাঁরা অনুমান করেন নিশ্চয়ই কোথাও কোনো ত্রুটি হয়ে গেছে। কোথাও ভুল ভ্রান্তি হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে তাঁরা নানাভাবে অনেক সান্ত্বনাও খুঁজে পান। যেমন তাঁরা বলে থাকেন, আল্লাহর রহমতে অল্পতে বিপদ-আপদ কেটে গেছে। আরো বড় কিছু তো হওয়ার আশঙ্কা ছিল, হয়নি, আল্লাহ ক্ষমা করেছেন। তাঁরা খুব ধৈর্যশীল হন। বিপদ, আপদ, মুসিবতকে তাঁরা রহমত বা নেয়ামত হিসেবে গ্রহণ করেন। অসুখ-বিসুখ দুঃখ-যন্ত্রণার সময় তারা যা বলেন, তা হল, ‘হে আল্লাহ আপনি আমাদেরকে অসুস্থতার নেয়ামত দান করেছেন, এখন যদি আপনি ভালো মনে করেন, তাহলে আমাদের ওপর সুস্থতার নেয়ামত দান করেন। তাঁরা নবী ও রসূলদেরকে শ্রেষ্ঠতম মানুষ মনে করে থাকেন। অসুস্থতার সময় তাঁরা আইয়ুব (আ:) কথা স্মরণ করে থাকেন। কষ্ট ও বিপদের সময় ইউনুস (আ:) কে মনে করে থাকেন এবং আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি বলে থাকেন, ‘হে আল্লাহ, হে পরওয়ারদেগার, আমাদের ওপর আপনি তো অনেক রহমত ও নেয়ামত নাযিল করেছেন, আমরা তো এখনো আইয়ুব (আ:) এর মত বা ইউনুস (আ:) এর মত দুঃখ কষ্ট পাইনি। হে আল্লাহ আমরা ধৈর্যধারণ করছি। আপনি আরো বেশি বেশি ধৈর্যধারণ করার শক্তি, সাহস ও সামর্থ্য দান করুন’।

কিছু হারিয়ে গেলে বা ধন সম্পদ নষ্ট হলে তারা বলে থাকেন, ‘হে আল্লাহ আপনার জিনিস আপনি নিয়ে গেছেন। আপনি আমানত হিসেবে সেটা আমার কাছে রাখতে দিয়েছিলেন, আমি সেটা রাখতে পারিনি, এই দোষটা, ত্রুটিটা বা ভুলটা আমার । আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন’।

তাঁরা বড় কিছু স্বপ্ন দেখেন না। তাঁদের জীবনে বড় বড় আশা-ভরসাও থাকে না। বড় বড় পরিকল্পনাও থাকেনা। তাঁরা যখন যেভাবে থাকেন, সে অবস্থার ওপর পুরোপুরিভাবে রাজি ও খুশি থাকেন। সে সময়ে তাঁরা মুখে মুখে বলেন, আলহামদুলিল্লাহ আলা কুল্লে হাল। সবকিছুকে তাঁরা খুব সহজ ও সরলভাবে মেনে নেন বা মেনে নিতে পারেন।

অযাচিতভাবে যখন তাঁরা জীবনের কুরুক্ষেত্রে উন্নতি অর্জন করেন, যেমন ক্ষেত-খামারে যদি অধিক পরিমাণে শস্য লাভ করেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে যদি আশাতীতভাবে উন্নতি অর্জন করেন, তাহলে অন্যদের মতো তাঁরা তখন উৎফুল্ল হন না। সে সময় তারা অহংকার করেন না। গর্ব করেন না। গৌরব বোধ করেন না বরং পূর্বের চেয়ে বিনয়ী ও দরদী হয়ে ওঠেন। সব বিষয়ে তাঁরা শোকর ও সবর অবলম্বন করেন।

আমাদের দেশের ইসলামপন্থী মানুষদের যাপিত জীবনের একটা সাধারণ আংশিক চিত্র এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কারণটা হলো আমাদের বয়সেরই বিশিষ্ট বন্ধু প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, লেখক, চিন্তাবিদ, গবেষক ও উদ্যোক্তা মোহাম্মদ জহুরুল ইসলাম ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। (ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)। মানবজাতির চিরন্তন খবরটা পেয়ে চার্টার্ড একাউনটেন্ট এনামুল হক চৌধুরীর সাথে উত্তরার যে বোনের বাসায় তিনি মেহমান হয়েছিলেন, সেখানে যাওয়ার পথে আমরা দু’জন যে আলাপ করেছি, তার সাথে মিল রেখে উপর্যুক্ত আলোচনার সূচনা করে ফেললাম।

জহুর ভাই স্বাস্থ্যগত কারণে ঢাকা থেকে কানাডার টরেন্টোতে বহুবছর যাবৎ অবস্থান করছিলেন। এবার এসেছিলেন নিজের গ্রামীণ এলাকায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রতিষ্ঠানকে উন্নতভাবে গড়ে তুলতে। ঢাকায় রওয়ানা হওয়ার পূর্বে আমার সাথে কথা হয়েছিলো। তিনি অক্টোবরের মধ্যেই দেশে যাবেন এবং আমাকে একটা অদ্ভুত দাওয়াত দিয়েছিলেন। সেটা হলো তাঁর গ্রামের বাড়িতে আমরা মিয়া-বিবি অনেকদিনের জন্য মেহমান হবো। গ্রামে তিনি যা করছেন বা পরিকল্পনা করছেন তা যেন আমরা স্বচক্ষে দেখে যাই। মাঝে মাঝে সেখানে আমাদের অন্যান্য বন্ধুরাও আসবে, আমরা একসাথে বসে আলাপ-আলোচনা করে প্রজেক্টগুলো যাতে সুন্দরভাবে অগ্রসর হতে পারে, বাস্তব রূপ লাভ করতে পারে, যে বিষয়ে পরামর্শ করবো।

কেন যেন আমার মন বলছিলো, তাঁর দু’টো সাক্ষাৎকার নিয়ে রাখি। লন্ডনের মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, আমাদের স্নেহের ছোট ভাই ‘মানব টিভি’র স্বত্তাধিকারী সাঈদ চৌধুরীকে বিষয়টা খুলে বললাম। সাঈদ চৌধুরী রিহার্সেল হিসেবে তড়িঘড়ি একটা ভার্চুয়াল লাইভ সাক্ষাৎকার প্রচার করে ফেললো। তাঁর গলার স্বর বহুদিন থেকেই আড়ষ্ট। কিন্তু মোটামুটি ভালই বলেছেন। সাঈদ চৌধুরী খুশী হলেন। বললেন, এতো ধরনের জ্ঞানের কথা এভাবে ‘এক্সটেমপর’ বলার মতো লোক এর আগে আমি পাইনি। বন্ধু-বান্ধবসহ আরও একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার পরিকল্পনা ছিলো। কিন্তু তার আগেই তিনি ঢাকায় চলে গেলেন। তাঁর চলে যাওয়াটা আমার কাছে খুব অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কারণ তিনি বহু দিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।

আমার কথার নানা প্রসঙ্গ তুলে বন্ধু চৌধুরী এই লেখার সূত্রটা ধরে দিয়েছিলেন। বললেন, শুরুতে আমরা যে আলোচনা করেছিলাম তার সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী মানুষ ছিলেন জহুরুল ইসলাম। সাধারণ সৎ মানুষরা সাহসী হন না, প্রতিবাদী হন না, সংগঠক হন না, শিক্ষিত- মার্জিত-সংস্কৃতিমান হন না। কোনরকমভাবে যাপিত জীবন অতিবাহিত করতে চান। কিন্তু তিনি ছিলেন, এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর একই অংগে ছিলো নানারূপ। যখন যেখানে ছিলেন সেখানেই মহান আল্লার সাচ্চা প্রতিনিধি হিসাবে তিনি তাঁর দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করার সর্বাধিক চেষ্টা বরাবর অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর সামনে যে সমস্ত সমস্যা আসতো, সব সময়ই সমাধান করার জন্য উঠে পড়ে লাগতেন। এ বিষয়ে তিনি বন্ধুদের সহযোগিতা কামনা করতেন।

এক এক বন্ধুর কাছে এক এক সমস্যার সমাধানের জন্য আর্থিক ও নৈতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতেন। ঢাকা শহরে আসার পূর্বে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ রেজাল্ট নিয়ে অনার্স-মাস্টার্স করে এসেছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ধরে রাখতে চেয়েছিলো। কিন্তু তিনি সেখানে আবদ্ধ হতে চাননি। বিশ্বমুখী হতে চেয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্নের ক্যানভাসটি ছিলো অনেক বড়। তিনি তথাকথিত জাতীয়তাবাদী ছিলেন না। ছিলেন আন্তর্জাতিক। খুব ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন না। কিন্তু ভেবেছিলেন কিছু কাজ করতে হলে তো প্রচুর টাকা-পয়সার প্রয়োজন হয়। সে কারণেই চার্টার্ড একাউনটেন্ট হতে চাইলেন। বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই নিষেধ করেছিলেন। তাঁর যে ধরনের ডিগ্রি ছিলো যেকোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে পারতেন। করেন নি। চার্টার্ড একাউনটেন্ট হবার জন্য যা যা করার দরকার ছিলো নতুন করে তা’ আবার শুরু করেছিলেন। এরপরের ইতিহাস অনেকটাই আমার জানা থাকলেও এই বয়সে স্মৃতির ওপর খুব বেশি ভরসা করতে পারছি না। তাঁর এক স্মরণ সভায় বিআইআইটির মহা পরিচালক ড. এম আবদুল আজিজ খুব গুছিয়ে-গাছিয়ে সুন্দর করে কিছু কথা বলেছিলেন। সেখান থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি :

তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদ জহুরুল ইসলাম ছিলেন দেশের ইসলামিক অর্থনীতি, ব্যাংকিং, উন্নয়ননীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি গবেষণার একজন পথিকৃৎ। ইসলামী অর্থনীতি ও চিন্তাচর্চায় তাঁর অনন্য অবদান রয়েছে। দেশে ইসলামিক অর্থনীতি গবেষণা বিস্তারে তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রদূত। লেখালেখি ও গবেষণায় তাঁর জীবন ছিল সমৃদ্ধ। মুসলিম সমাজকে এগিয়ে নেয়ার জন্য তাঁর দূরদৃষ্টি, নিষ্ঠা ও শ্রেষ্ঠত্ব ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও স্থায়ী অনুপ্রেরণার অসাধারণ উৎস হয়ে থাকবে, বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে তাঁর অবদান জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। চিন্তা ও জ্ঞান সংস্কারে নিবেদিত একটি থিংক ট্যাঙ্ক বিআইআইটি’র অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এর গবেষণা, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, ইসলামায়ন অব নলেজ আন্দোলন এবং সভ্যতার আন্তঃসংলাপ প্রতিষ্ঠায় অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

মোহাম্মদ জহুরুল ইসলামের শিক্ষা ও কর্মজীবন ছিল অসাধারণ সব সাফল্যে ভরপুর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর বাংলাদেশে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন শীর্ষ সরকারি প্রতিষ্ঠানে ফাইনান্স ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন এবং আইসিএবি-এর অধীনে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরো প্রতিষ্ঠা (১৯৭৬) ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ইসলামিক ব্যাংক- ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (১৯৮৩) প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অর্থ পরিচালক এবং ঢাকা ইলেক্ট্রেসিটি সাপ্লাই সেন্টার (ডেসা), উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজউকের ফিন্যান্স ডিরেক্টরসহ অনেকগুলো জাতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।

তিনি অর্থনীতি, ব্যাকিং, ফাইন্যান্স, সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক ১৩টিরও বেশি বই ও বহু প্রবন্ধ রচনা করেছেন। বিশ্বখ্যাত এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ইসলামিক ইকোনোমিক্স-এ তাঁর ‘ইনফ্রাস্ট্রাক্চার ডেভেলপমেন্ট অফ মুসলিম কান্ট্রিজ’ শীর্ষক গবেষণা নিবন্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, নেপাল, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে গবেষণা, সেমিনার ও আন্তর্জাতিক সংলাপে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটরস প্রোগ্রাম-এ অংশগ্রহণ করেন। সামাজিক সংগঠক ও শান্তি-উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি এশিয়ান মুসলিম অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (আমান)-এর বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে দেশময় ছড়িয়ে দিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিক্ষা, গবেষণা ও মানুষের জীবনমানের অগ্রগতিতে তিনি সর্বদা ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। তিনি কোনো দল বা গোষ্ঠীর ছিলেন না, ছিলেন পুরো জাতির ও উম্মাহর সম্পদ।

তিনি কানাডায় স্থায়ী হওয়ার পর সেখানকার কমিউনিটি সেবায় যুক্ত ছিলেন, যার স্বীকৃতিস্বরূপ অন্টারিও ভলেন্টেয়ার সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড ২০১৩ লাভ করেন। সিরাজগঞ্জে নিজ এলাকায় আশফাক -আজিজ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, জোবায়দা মসজিদ, আশফাক-অজিজ রিসার্চ সেন্টার, আশফাক-আজিজ ইসলামিক একাডেমী, আশফাক-আজিজ এতিমখানা ও শিক্ষা কেন্দ্র, মফিজ উদ্দীন সরকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এছাড়া আমার জানা মতে টরেন্টোর নজরুল একাডেমীসহ সেখানকার শিশু কিশোরদের জন্য বই রচনা ও প্রকাশসহ বিভিন্ন প্রজেক্টের সূচনা করেছিলেন। জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান প্রতিষ্ঠিত(১৯৯৬) ঢাকার সাংস্কৃতিক থিংক ট্যান্ক সেন্টার ফর ন্যাশনাল কালচার (সিএনসি)-এর অন্যতম ট্রাস্টি ছিলেন তিনি। শেষ জীবনে ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য। শুধু বুদ্ধি, পরামর্শ ও উপদেশ দিয়ে তিনি নির্বিকার ছিলেন না বরং প্রতিষ্ঠানটিকে সবল, সজীব ও প্রাণবন্ত রাখার জন্য নিয়মিতভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন। সিএনসি তাঁকে ‘শাহ আব্দুল হান্নান পদক’ প্রদান করে কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছে।

লেখার শুরুর শেষ দিকে এদেশের গণমানুষের চিন্তা-চেতনা, বোধ-বিশ্বাস ও মননের কথা আমরা দু’বন্ধু যেতে যেতে আলাপ করছিলাম। সৎ মানুষদের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে মোটামুটিভাবে ফুটে ওঠেছিলো। বিস্তারিতভাবে আলাপের বিন্যাস সেখানে উদ্ভাসিত হয়নি। কিন্তু সৎলোকেরা যে দুনিয়াদারীতে পারঙ্গম হয়না বা হতে চায়না এ বিষয়টি খোলাপাতার মতো স্পষ্ট হয়েছে।

সৎ মানুষরা যত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন এবং সে বিষয়ে যত হৃষ্টপুষ্ট হন, ততই তাঁরা নিজেদেরকে ঘর ও মসজিদমুখী করে তোলেন। সেটা আমাদের জন্য প্লাস পয়েন্ট নয়। অবশ্যই মাইনাস পয়েন্ট। কারো দূরারোগ্য অসুখ হলে সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু কর্মক্ষমতা থাকলে সারাজীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়গুলি ছড়িয়ে দেওয়া বিশেষভাবে প্রয়োজন। সে মনোবাঞ্ছা তো একজন প্রবীণ মানুষের থাকতেই হবে। না হলে তো সমাজ অগ্রসর হতে পারবে না।

বিদগ্ধ বয়স্করা প্রবীণসঙ্গ গড়ে তোলেন। এতে তরুণ ও মধ্যবয়সী উদ্যমী লোকদের থেকে প্রবীণরা বিচ্যুত হয়ে পড়েন। নতুন ধ্যান-ধারণা তাঁদের মধ্যে বিকশিত হয় না। বক্ষ্যমান বিদগ্ধ মানুষটি ছিলেন এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম একজন । তাঁর ‘লাইফ স্টাইল’ থেকে আমরা খুব উজ্জ্বলভাবে দেখছি তিনি নবী, রাসুল ও সাহাবাদের অনুকরণ ও অনুসরণ করেছেন। আবার বর্তমান জীবনের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাফল্যের সিঁড়িগুলো অবলোকন করেছেন এবং নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে বিশ্ব নাগরিকের জীবনে যাতে শান্তি ও স্বস্থি ফিরে আসে সে চেষ্টাও করেছেন। কখনও নিজের চিন্তা-ভাবনা, জ্ঞান-গবেষণাকে আড়ষ্ট করেন নি। একঘেয়েমি জীবন তাঁর ছিলো না। কোথায় কার কী অভাব ছিলো, কোথায় কোন মানুষটি যোগ্য ও সৎ, কোথায় কোন মানুষটি নানারকম উদ্যোগ নিয়ে হাঁপিয়ে ওঠেছেন, সেসব তিনি শুধু পরখ করছেন এমন নয়, সরাসরি সহযোগিতাও করেছেন। ক্রেডিট-ডেবিটটা তাঁর ভালো জানা ছিলো। সরল হওয়ার কারণে তাঁর সজিবতা কখনও ম্লান হয়নি। সবসময় সন্ধ্যা তারার মতো উজ্জ্বল ছিলেন।

বার্ধক্যকে জয় করে বা পাশ কাটিয়ে জীবনকে কিভাবে প্রাণবন্ত করতে হয় সে বিজ্ঞান ও কৌশল তিনি ভালোভাবে রপ্ত করেছিলেন। আশ-পাশের সবাইকে উদ্দীপ্ত হওয়ার আহ্বান জানাতেন। জীবনের জাগরণ দেখতে চাইতেন। প্রতিটি মানুষের জীবন সুখময় হোক, শান্তিময় হোক, স্বস্থিময় হোক, সবাইকে নিয়ে সবাই আমোদিত ও আনন্দিত থাকুক, ধর্ম-বর্ণ-মতবাদ-আদর্শ নির্বিশেষে সকলে বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তার বন্ধনে সমাসীন থাকুক, এটাই ছিলো তাঁর আরাধ্য।

আমার ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ। যে মানুষটি ছিলেন, পরম করুণাময়, দয়াময় মহান আল্লাহর একনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক বান্দা। তাঁর নিজের করার যা কিছু ছিলো, মহান রবের অনুগ্রহে তা’ তিনি করতে পেরেছেন। আমাদের দেশের ওপর কাঠামোতে এ ধরনের কমপ্লিট মানুষ খুব একটা পাওয়া যায় না। মহান আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতবাসী করেন, আন্তরিকভাবে এই কামনাই আমাদের।

লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংগঠক।