একটি সমাজ বা রাষ্ট্র হঠাৎ করেই সহিংস হয়ে ওঠে না; বরং এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত অবিচার, জুলুম, বৈষম্য এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিশোধস্পৃহা জন্ম নেয়। মানুষ জন্মগতভাবে অপরাধী নয়, বরং তার চারপাশের সামাজিক বাস্তবতাই তাকে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং সুযোগের অভাব একজন মানুষকে বিপথগামী করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। যখন রাষ্ট্র বা সমাজ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় তখন ব্যক্তিগত অপরাধ ধীরে ধীরে সামাজিক সমস্যায় রূপ নেয়। অথাৎ যখন অপরাধীরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যায় তখন সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে পড়ে- ‘‘অপরাধ করলেও শাস্তি পেতে হয় না’’। এই মানসিকতা আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ কমিয়ে দেয় এবং অনেককে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে প্ররোচিত করে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এগুলো আমাদের ভঙ্গুর সামাজিক কাঠামোরই বহি:প্রকাশ। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল কঠোর আইন যথেষ্ট নয়; বরং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধের মূলে থাকা কারণগুলো দূর করা জরুরি।

বর্তমানে সমাজে অসহিষ্ণুতা, অস্থিরতা ও সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও প্রাণঘাতী সংঘর্ষ ঘটছে। সম্পর্কের অবনতি, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামাজিক অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনিতে প্রায় ২১ জন নিহত হয়েছেন যা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার দুর্বলতা ইঙ্গিত দেয়। আগের শাসনামলে গুম, খুন ও অপহরণের অভিযোগ নিয়মিতভাবে আলোচনায় ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; বরং ভিন্ন রূপে তা অব্যাহত রয়েছে। এর একটি করুণ দৃষ্টান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের ঘটনা। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় যা কোনোভাবেই সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পিবিআই ২৮ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করেছে যা আদালত গ্রহণ করেছেন। তবে প্রকৃত অপরাধী শনাক্তের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা অত্যন্ত জরুরি- যাতে কোনো নিরপরাধ শিক্ষার্থী জুলুমের শিকার না হয়। এর ও আগে বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সহপাঠীর হাতে সহপাঠী হত্যার ঘটনা প্রমাণ করে শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লে তার মানবিক উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। অথচ শিক্ষাকে জাতির মেরুদন্ড বলা হয়। যে জাতি মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে না, সে জাতি কখনোই এগিয়ে যেতে পারে না। শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নেয়, এটি মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং নৈতিকতারও শিক্ষা দেয়। কিন্তু যখন নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন সমাজের রুন্দ্রে রুন্দ্রে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মেধাবীরাও জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। অথচ পরিবারগুলো বুকভরা আশা নিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সে স্বপ্ন যখন ভেঙে যায় তখন অভিভাবকদের বুকফাটা কান্না ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার এবং নৈতিক শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত জরুরি।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নৃশংস হত্যাকাণ্ড এখন প্রায় নিয়মিত সংবাদের শিরোনাম। প্রতিনিয়ত একের পর এক ঘটনা যেন আগের ঘটনাকে মুছে দিয়ে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। সমাজ যেন ধীরে ধীরে সহিংসতার এক অস্বাভাবিক বাস্তবতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা পরিস্থিতি ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তোলে। ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নড়াইলের বড়কুলা গ্রামে সংঘর্ষে বাবা-ছেলেসহ তিনজন নিহত হন। চট্রগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়; পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। ৫ মার্চ নওগাঁর আত্রাইয়ে স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যার পর আত্ম্হত্যা করেন এক যুবক। ১৯ মার্চ রাজধানীর ভাটারায় মাত্র ১৩ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধের জেরে এক নিরাপত্তা প্রহরীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিনে, খুলনার লবণচরা থানার কৃষ্ণনগর ঠিকরাবাদ এলাকায় বিয়ে ও পরকীয়াজনিত বিরোধে একটি বাড়িতে ঢুকে একই পরিবারের চারজনকে গুলী করে হত্যা করা হয়। এর আগে পাবনার ঈশ্বরদীতে দাদি ও নাতনীর নির্মম হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা খুন হন। নরসিংদীতে সম্ভ্রম রক্ষায় এক কিশোরীকেও জীবন দিতে হয়েছে। এসব ঘটনা এখন আর আগের মতো সমাজকে নাড়িয়ে দেয় না। বরং একই ধরনের নৃশংসতা বারবার দেখতে আমাদের বিবেক যেন ভোঁতা হয়ে পড়ছে। হত্যা, খুন ও ধর্ষণের পরিসংখ্যানও ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন-যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। রাজনৈতিক সহিংসতাও কমেনি। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মিরপুরে প্রকাশ্যে গুলী করে বিএনপি নেতা গোলাম কিবরিয়াকে হত্যা করা হয়। একই বছরের ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে গুলীতে নিহত হন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদী। এসব ঘটনা জনমনে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। মানুষ এখন শুধু ঘটনার খবর পড়ে না-নিজের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত হয়ে ওঠে। তবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কেবল আমাদের দেশের একক বাস্তবতা নয়; বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একসময় একই ধরনের সহিংসতার চিত্র ছিল। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ১৯৮০ ও ১৯৯০ এর দশকে অবৈধ মাদক ব্যবসায়, গেরিলা সংঘাত এবং রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে দেশটি বিশ্বের অন্যতম সহিংস রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শান্তিচুক্তি, কার্যকর বিচারব্যবস্থা এবং কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে তারা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং কমিউনিটি ভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে যুবসমাজকে সহিংসতা থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। বিশেষ করে মেডেলিন শহরে এই পরিবর্তন দৃশ্যমান। কলম্বিয়ার এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়-শুধু আইন প্রয়োগ করে সহিংসতা দমন করা যায় না। ন্যায়বিচার, সামাজিক উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা একসঙ্গে কাজ করলে একটি সহিংস সমাজকেও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল ও মানবিক সমাজে রূপান্তর করা সম্ভব।

মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা জীব বলা হয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই ধারণা যেন ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। আমরা এমন সব নৃশংস কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছি যা কল্পনাকেও হার মানায়। আরশের মালিক যদি আমাদের গোপন অপরাধগুলো উন্মোচিত করে দিতেন, তবে হয়তো বহু ক্ষেত্রেই দেখা যেত-মানুষের চরিত্র জঙ্গলের হিংস্র প্রাণীর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে উঠেছে। তুচ্ছ কারণে হত্যা আজ যেন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও উসকানি। একসময় পরিবার ও সমাজ মানুষকে আগলে রাখত: বড়দের শাসন ও ছোটদের প্রতি স্নেহ ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এখন সেই বন্ধন অনেকটাই শিথিল হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যক্তি ক্রমেই বিচ্ছিন্ন ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, যা সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগ। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা যেমন অপরিহার্য, তেমনি নৈতিক শিক্ষার প্রসার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মাদক নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়। তবেই সমাজে ন্যায়, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ফিরে আসবে। তবে কেবল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই যথেষ্ট নয়! রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করতে পারে, কিন্তু আদর্শ মানুষ তৈরি করতে পারে না। আদর্শ মানুষ গড়ে ওঠে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নৈতিক ধর্মীয় অনুশাসনের সমন্বয়ে। যে সমাজে মূল্যবোধ দৃঢ় থাকে, সেখানে হিংস্রতা সহজে শেকড় গেড়ে বসতে পারে না। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার ওপর- বিশেষ করে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। কারণ এই মূল্যবোধই পারে একটি অধ:পতিত সমাজকে ধীরে ধীরে আলোকিত ও মানবিক সমাজে রূপান্তরিত করতে।

লেখক : প্রাবন্ধিক।