বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে আজও ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ বলা হয়। দু’দেশের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা নেই, সীমান্তে কোনো সামরিক উত্তেজনাও দৃশ্যমান নয়। তবুও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের আচরণ ক্রমেই এমন রূপ নিচ্ছে, যেন বাংলাদেশ কোনো প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র। রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এনে তিরস্কার, বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণায় নিয়োজিত ভারতীয় মিডিয়া, বিজেপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের উদ্ধত ও অসম্মানজনক বক্তব্য, এমনকি খেলাধুলার মতো নিরপেক্ষ ক্ষেত্রেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপমানÑসব মিলিয়ে ভারতের মনোভাব আজ আর লুকানোর মতো নেই। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের ‘মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য’ বিস্তারের কৌশল অনুসরণ করে আসছে। সামরিক শক্তি ব্যবহারের চেয়ে তারা বেশি গুরুত্ব দেয় জনমত নিয়ন্ত্রণ, মিডিয়া ম্যানিপুলেশন, সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ মতবিন্যাস প্রভাবিত করার ওপর। ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পাকিস্তান এ বাস্তবতার সবচেয়ে পুরোনো শিকার। এখন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, বাংলাদেশও সে একই ছকের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কাগজে-কলমে বড়ো কোনো সংকট বা দূরত্ব নেই। এরপরও দিল্লির আচরণে এমনই এক ঔদ্ধত্য দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণ কূটনৈতিক রীতিনীতি বা কোনো শিষ্টাচারের আওতায় আর পড়ছে না। সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের দায় অস্বীকার, বাণিজ্য ও পানি বণ্টনে একতরফা সুবিধা আদায়-এসব তো অনেক বছরের নজির হয়ে আছেই। নতুন করে যা যুক্ত হয়েছে, তা হলো বাংলাদেশের জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে আঘাত হানা এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, এ আগ্রাসনের বড় অংশই সামরিক বা অর্থনৈতিক নয়; এটি মূলত ‘বয়ান যুদ্ধ’। ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশকে ক্রমাগত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আঁতুড়ঘর কিংবা মৌলবাদী শক্তির উত্থানস্থল হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। প্রতিটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের রূপ দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে।
এ কৌশলের লক্ষ্য একটাই আর তাহলো বাংলাদেশকে মানসিকভাবে কোণঠাসা করে রাখা। একটি দেশকে সামরিকভাবে দমিয়ে রাখা কঠিন, কিন্তু যদি তার নাগরিকদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে ফেলা যায়, যদি বিশ্বমঞ্চে তাকে ক্রমাগত অভিযুক্তের আসনে বসানো যায়, তবে সে দেশ নিজের অবস্থান রক্ষা করতেই ব্যস্ত থাকবে, পাল্টা আক্রমণের শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে না। এ বাস্তবতা নতুন নয়। ভারত বহু বছর ধরেই পাকিস্তানের ক্ষেত্রে একই কৌশল প্রয়োগ করে আসছে-প্রতিটি ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব, কাল্পনিক শত্রু চরিত্র সৃষ্টি, বলিউডে ‘ভিলেন’ হিসেবে একটি পুরো জাতিকে উপস্থাপন, কূটনৈতিক সম্পর্ককে জনমত ব্যবস্থাপনার অস্ত্র বানানো- এগুলো আমরা অনেকদিন ধরেই ভারতকে প্রয়োগ করতে দেখছি। পার্থক্য কেবল, বাংলাদেশকে এতদিন তারা এই তালিকার বাইরে রেখেছিল। এখন আর রাখছে না।
বাংলাদেশের প্রতি ভারতের বিদ্বেষ সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সামনে আসে ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। আইপিএল ২০২৬ শুরুর আগেই বিসিসিআইয়ের নির্দেশে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনা দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। এটি কোনো ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নয়, এটি কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজির কৌশলগত বদলও নয়-এটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা, যার উদ্দেশ্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আত্মসম্মান, জনমত ও মানসিক স্বাধীনতাকে লক্ষ্যবস্তু করা। মোস্তাফিজকে কেকেআর কিনেছিল ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে। কিন্তু সে চুক্তিকে কয়েক মাসের মধ্যেই বাতিল করা হলো শুধুমাত্র “চারপাশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক কিছু ইস্যু ও বিতর্কের কারণে”। বলা হচ্ছে, উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের তৈরি করা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিসিসিআই নাকি এভাবেই সামাল দিতে চেয়েছে। প্রশ্ন হলোÑএই ‘ইস্যু ও বিতর্ক’ কী? এগুলো তো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক উসকানি ও মিডিয়া ম্যানিপুলেশনের ফল। এর দায় কেন একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটার বহন করবে?
এখানেই এ ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হয়। মোস্তাফিজের অপরাধ কোনো ক্রিকেটীয় ব্যর্থতা নয়, বরং তিনি একজন বাংলাদেশি-এ পরিচয়ই তার সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ার পর থেকেই ভারতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো যেভাবে মাঠ গরম করেছে, সেটি ছিল ভয়াবহ। বিজেপি নেতা কৌস্তভ বাগচী থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় নেতার হুমকি, আইপিএল বয়কটের ডাক, এমনকি ফ্র্যাঞ্চাইজির সহ-স্বত্বাধিকারী শাহরুখ খান পর্যন্ত আক্রমণের শিকার হয়েছেন। সব মিলিয়ে একটি সুসংগঠিত চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, বিসিসিআই এ চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। তারা বলতে পারত, খেলাধুলা রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তারা বলতে পারত, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু তারা করল উল্টোটাÑএকজন চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়কে বাদ দিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বৈধতা দিল। ভারতের এ সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ আসন্ন টি-টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচগুলো খেলতে চায়নি এ যুক্তিতে যে, এক মোস্তাফিজকে যে ভারত নিরাপত্তা দিতে পারেনি; তারা গোটা একটি টিমকে কীভাবে নিরাপত্তা দেবে? কিন্তু আইসিসি বাংলাদেশের এ আপত্তিতে আমলে নেয়নি। বরং তারা ভারতের পক্ষেই রায় দিয়েছে যার ফলশ্রুতিতে অন্তত এবার বাংলাদেশ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো।
খেলার জগৎ থেকে আবার আসা যাক অন্যান্য বিষয়ে। বাংলাদেশকে ঘিরে গত দেড় বছর ধরেই ভারতীয় মিডিয়ায় নোংরা অপপ্রচার অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসের শুরু থেকে এ অপপ্রচার যেন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারতীয় কিছু মিডিয়া দাবি করছে, বাংলাদেশে হিন্দুদের কাছ থেকে নাকি ইউনূস প্রশাসন জিজিয়া কর আদায় করছে। একটি ভিডিওতে দেখলাম বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ভিনা সিক্রিও এ প্রোপাগান্ডায় অংশ নিচ্ছেন। অথচ এর মতো জঘন্য মিথ্যাচার দ্বিতীয়টি নেই। নরসিংদীর একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ভুইফোঁড় অনেকগুলো মিডিয়াও এ কাজে অংশ নিচ্ছে। যে কেউ ইন্টারনেটে গিয়ে সার্চ করলে এ সংক্রান্ত তথ্য পেয়ে যাবেন। এ অপপ্রচারে সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরির মতো পরিচিত এজেন্টরাও অংশ নিচ্ছেন। তার এক্স একাউন্টে তিনি দাবি করেছেন, মুসলিম ব্রাদারহুডের একটি শাখা হিসেবে বাংলাদেশে কর্মরত জামায়াতে ইসলামী গত বছরের আগস্ট থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দুদের কাছ থেকে জিজিয়া কর সংগ্রহ করছেন।
আর জামায়াতের জিজিয়া কর আদায়ের এ প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার সমর্থন দিচ্ছেন বলেও তিনি দাবি করেছেন। এমনকী মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও এ কার্যক্রমকে সমর্থন দিচ্ছে। তার মতে, বাংলাদেশকে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রক্সি ওয়ারের একটি ক্ষেত্র বানানোর জন্যই পরিকল্পিতভাবে এ পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমার কাছে দুটো চ্যালেঞ্জ বড়ো হয়ে দেখা দিচ্ছে। একটি হলো, জনগণের বড়ো অংশ এগুলো নিয়ে সচেতন নয়; অথবা তারা বিষয়টিকে খুব বেশি একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত, হয়তো সে কারণেই যেভাবে শক্তভাবে এগুলোর প্রতিবাদ বা নিন্দা করা উচিত তা করা হচ্ছে না। বিভিন্ন টিভি ইন্টারভিউতে স্বতন্ত্রভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি যার যার মতো করে জবাব দিচ্ছেন। কিন্তু সরকার বা জামায়াতের কোনো প্রতিবাদ এখনো চোখে পড়েনি।
আর আরেকটি চ্যালেঞ্জ সামনে ধরা দেবে। তাহলো, এ অপপ্রচারের পরিণতি নিয়ে আমরা সচেতন নই। চারদলীয় জোট সরকার- যার প্রধান শরীক ছিল বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার দু’মাসের মধ্যে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়। এর আওতায় কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে অতিরঞ্জন করা হয়। কিন্তু দিন শেষে জোট সরকার এর দায় থেকে বাঁচতে পারেনি। প্রোপাগান্ডাকে তাই হালকা করে নেয়ার সুযোগ নেই। আরেকটি হলো তাত্ত্বিক আলোচনা। জিজিয়া কর কি জিনিস? কখন এটি আদায় করা যায়? জামায়াত বা কোনো একটি রাজনৈতিক দল আদৌ এটি আদায় করতে পারে কিনা? কিংবা বর্তমান বিশ্বে জিজিয়া করের কনসেপ্টটা ভ্যালিড কিনা? এরকম প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর ইসলামপন্থীরা দিতে পারেনি, পারছে না। ফলে, এ প্রোপাগান্ডা যদি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বা ঘরোয়াভাবে কেউ বিশ্বাস করে ফেলে; তাহলে উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর না জানার কারণে তারা পুরো বিষয়টি নিয়ে মিসকনসেপশনে পড়ে যেতে পারে; যা সার্বিকভাবে সামাজিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। আর এ অপপ্রচার আগামী নির্বাচন বা নির্বাচনকেন্দ্রিক হস্তক্ষেপের পথ সুগম করবে বলেই আমার ধারণা।
প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশ তো ভারতের সঙ্গে কোনো স্টেট অব ওয়ারে নেই। সীমান্তে কোনো সামরিক উত্তেজনা নেই। যে বর্ডার কিলিং হয়, সেটিও হয় একতরফাভাবে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে। তবু কেন ভারত আজ এত ক্ষিপ্ত? এর পেছনে কি কেবল শেখ হাসিনার পতনের ক্ষোভ কাজ করছে? সম্ভবত উত্তরটি এত সহজও নয়। মূল কারণ আরো গভীরে। বাংলাদেশের এ প্রজন্ম আর আগের মতো ভারতঘেঁষা মনোভাব পোষণ করছে না। শহীদ ওসমান হাদীর জানাজায় লাখো মানুষের কণ্ঠে ভারতবিরোধী শ্লোগান, স্টেডিয়ামে খেলার সময় গগনবিদারী প্রতিবাদী ধ্বনি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের প্রতিক্রিয়াÑএসবই ভারতকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তারা বুঝে গেছে, বাংলাদেশে আর ‘ঘরজামাই’ কায়দায় কাজ করা যাবে না। দল দালালি কিংবা গোপন আঁতাত করেও জনমতকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে না।
এ পরিবর্তিত বাস্তবতা ভারতকে শংকিত করেছে। কারণ বাংলাদেশ কেবল ভৌগোলিক প্রতিবেশী নয়; এটি একটি উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তি, যার জনসংখ্যাগত কাঠামো, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে বড় ভূমিকা রাখে। এ দেশ যদি মানসিকভাবে স্বাধীন হয়ে ওঠে, তাহলে ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের বয়ানই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সুশীল সমাজের ভূমিকা হয়ে উঠছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়ে গেছি। আমাদের তথাকথিত সিভিল সোসাইটি হয় দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে আবদ্ধ, নয়তো আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর এজেন্ডায় পরিচালিত। তারা রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সংগঠিতভাবে দাঁড়ানোর মতো একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।
ভারত যেহেতু আক্রমণাত্মকভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নেমেছেÑখেলোয়াড়দের চুক্তিবদ্ধ করে বাদ দেওয়া থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশকে ঘিরে নানা ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন’ কাহিনী ছড়িয়ে দেওয়া পর্যন্তÑতাই আমাদেরও আর নিরব ও নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ নেই। ভারতের প্রতিটি সাজানো প্রোপাগান্ডার জবাব তথ্য, গবেষণা, যুক্তি ও নৈতিক অবস্থান দিয়ে দিতে হবে। সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য, গণমাধ্যমে বিকৃত উপস্থাপনÑপ্রতিটি বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানের ডকুমেন্টেশন ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এগুলো কেবল সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়; এজন্য দরকার একটি শক্তিশালী, বাংলাদেশপন্থী সুশীল সমাজ।
এমন বাস্তবতায় আমাদের বাংলাদেশপন্থী একটি সিভিল সোসাইটি চাই যারা হবেন এমনই এক শক্তি, যারা রাজনৈতিক দলনিরপেক্ষ হয়ে কেবল দেশের স্বার্থের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, সাংবাদিক, লেখক, আইনজীবী, কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সমন্বয়ে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, যারা নিয়মিতভাবে ভারতের মিথ্যাচারের জবাব দেবে, আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মানসিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে। পুরনো লেজুড়বৃত্তিক সুশীলতা নয়; বরং বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি নতুন ধরণের সুশীল সমাজ-যারা রাজনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ। পাশাপাশি, সীমান্তে নিহতদের নাম-পরিচয়, ঘটনার তারিখ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে আর্কাইভ তৈরি করতে হবে। সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগের মাঠপর্যায়ের সত্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। বলিউডের ভিলেন নির্মাণের বিরুদ্ধে আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক উৎপাদন বাড়াতে হবে। শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি কালচারাল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু করেছিলেন, আমাদেরকে তা আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দেশের বিরুদ্ধে প্রতিবেশি দেশের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এরকম অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনার কোনো বিকল্প নেই।