জসিম উদ্দিন মনছুরি
আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির মাঠ জমজমাট হয়ে উঠেছে। গত ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছে রাজনৈতিক দলসমূহ। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ঢাকা থেকে ১০ দলীয় জোটের প্রচারণা শুরু করেন ডা. শফিকুর রহমান। তাছাড়া দেশের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একযোগে বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও সমর্থকেরা নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন।আগামী নির্বাচনকে ঘিরে শুরু হয়েছে আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির বন্যা। বিএনপি ইতোমধ্যে ৩১ দফা সম্বলিত নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও ২০ জানুয়ারি নিজেদের পলিসি সামিট ২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের ‘পলিসি সামিট ২০২৬’ এ দলটির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষা-স্বাস্থ্যখাত সংক্রান্ত নীতিগত লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
ঘোষিত নীতির মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থায় সংস্কারের ঘোষণা দিয়ে বর্তমান হার থেকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ট্যাক্স ১৯ শতাংশ এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।জামায়াতের পলিসি সামিটে ২০২৬-এ ভারতসহ বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। জামায়াতের বিদেশ বিভাগের এক দায়িত্বশীল নেতা জানান, সকাল থেকেই বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়াও চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, মালদ্বীপ, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কাসহ প্রায় ৩০টি দেশের প্রতিনিধি সামিটে যোগ দিয়েছেন।
‘নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’-এর জন্য নীতিগত রূপরেখা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলটির এ রূপরেখা ঘোষণা কয়া হয়। রাজধানীর একটি হোটেলে জামায়াত আয়োজিত পলিসি সামিট ২০২৬-এ রূপরেখা উপস্থাপন করেন দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমান। ‘পলিসি সামিট ২০২৬’ এ যেসব বিষয় থাকছে সেগুলো হলো: দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, ট্যাক্স ও ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) বর্তমান হার থেকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ট্যাক্স ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এছাড়াও স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু (এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা এক কার্ডে), আগামী ৩ বছরে সব শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ না বাড়ানো, বন্ধ কলকারখানা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে চালু এবং ১০% মালিকানা শ্রমিকদের প্রদান, ব্যবসা-বান্ধব পলিসি তৈরি, সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধার কথা বলা হয়েছে।শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়েও সামিটে বেশ কিছু কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে গ্রাজুয়েশন শেষে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সময়ে ৫ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে সর্বোচ্চ ২ বছর মেয়াদি মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ প্রদান (কর্জে হাসানা), মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষা ঋণ, প্রতিবছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষা ঋণ, গরীবের মেধাবী সন্তানও যেন হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজে পড়তে পারে সে সুযোগ তৈরি, ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনোমিকস কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্ত বড় কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে। এছাড়াও সব নিয়োগ হবে মেধাভিত্তিক।স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে পলিসি সামিটে বলা হয়, ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক ও ৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত, ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তাকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা হবে। তরুণদের জন্য পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টের জন্য নতুন মন্ত্রণালয় গঠন, ৫ বছরে ১০ মিলিয়ন তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ, প্রতিটি উপজেলায় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন, প্রতিটি জেলায় ‘ জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে ৫ বছরে ৫ মিলিয়ন জব এক্সেস নিশ্চিত করা, নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লক্ষ উদ্যোক্তা তৈরি, ১.৫ মিলিয়ন ফ্রিল্যান্সার তৈরি এবং স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযোগী স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু।
আইসিটি ও ভিশন ২০৪০ এর বিষয়ে পলিসি সামিটেও বেশ কিছু বিষয় জানানো হয়েছে। যার মধ্যে আইসিটি সেক্টর উন্নয়নে ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা, ২০৩০ সালের মধ্যে ২ মিলিয়ন আইসিটি জব সৃষ্টি ও প্লেসমেন্ট, ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল রপ্তানির জন্য ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন, আইসিটি সেক্টর থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়, আইসিটি খাতে সরকারের ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় সাশ্রয়, শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য। রেমিট্যান্স সংক্রান্ত বিষয়ে বলা হয়, দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে ৫-৭ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি করা, অর্থনৈতিক রেমিট্যান্সের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশী প্রফেশনাল, গবেষক, শিক্ষকদের দেশে নিয়ে আসা হবে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ হিসেবে।
অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন ক্ষমতায় গেলে দেশের চার কোটি পরিবারকে ফ্যালিলি কার্ড দেওয়া হবে। পরিবারের প্রধান নারীকে এ কার্ড দেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাদি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, এর মাধ্যমে মাসিক ভিত্তিতে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হবে। এছাড়া দেওয়া হবে খাদ্যসামগ্রী। তিনি আরও বলেন, বিদেশ গমনেচ্ছুদের জন্য বহুমাত্রিক দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি শিক্ষা আধুনিকায়ন করা হবে; বিভিন্ন দেশের ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হবে। ‘দ্য প্ল্যান, ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে তরুণদের কথা শোনেন তারেক রহমান। তরুণদের উদ্দেশে নিজেও দিকনির্দেশনা দেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত তরুণরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত সাধারণ শিক্ষার্থী।এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু করেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
বিএনপি’র উল্লেখযোগ্য আশ্বাসের মধ্যে রয়েছে ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড এবং ৫০লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড প্রদান করা হবে।তিনি বলেন, ‘এ কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের মহিলা সদস্য মাসিক ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পাবেন।’ খাদ্য সহায়তার তালিকায় থাকবে-২৫ কেজি চাল, ৫ কেজি ডাল, ২ লিটার সরিষার তেল, মসুর ডাল ও লবণ। এছাড়া ‘দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোকে স্থায়ী সহায়তার আওতায় আনতেই এই উদ্যোগ নেয়া হবে।’
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এত টাকা আসবে কোত্থেকে? যেখানে আমাদের গত বছরের জাতীয় বাজেট ছিল ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। সব মন্ত্রণালয় মিলিয়ে এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তন্মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সামগ্রিকভাবে বড় ধরনের বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে প্রায় ৩৯,৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এছাড়া, জনসাধারণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্যশস্য বিতরণ ও মজুদ বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছিলো।গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকি বাবদ ২৫ হাজার কোটি টাকা চেয়েছিলো কৃষি মন্ত্রণালয় যা চলতি অর্থবছরে পাওয়া ভর্তুকির চেয়ে ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। কৃষি ও খাদ্য সম্পর্কিত বরাদ্দ: ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতে ৩৯,৬২০ কোটি টাকা। (কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মিলিয়ে) প্রস্তাব করা হয়, যা গত বছরের তুলনায় ৩.৫৫% বেশি।খাদ্য মন্ত্রণালয় ২৯,৫৪১.৯২ হাজার কোটি টাকা। যা মূল বাজেটের ২.১৭%
কৃষি মন্ত্রণালয় ২৭,২২৪.০০ হাজার কোটি টাকা যা মূল বাজেটের ২.০০%।খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮ হাজার ৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এ বাবদ বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় আটটি প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্প মিলে এসব অর্থ ছাড় করা হয়। এছাড়া ৫০ লক্ষ কৃষককে কৃষিকার্ড প্রদান করা হবে।
কৃষি কার্ডের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ,বিএনপি ঘোষিত কৃষি খাতের পরিকল্পনায় মূলত “কৃষক কার্ড”-এর মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ, স্বল্প মূল্যে সার-বীজ-কীটনাশক, এবং আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির সুবিধাসহ ১০টি বিশেষ সুবিধার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও, ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি, কৃষি বীমা, নদী পুনরুদ্ধার করে সেচ সুবিধা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার রয়েছে ।
৫০ লক্ষ কৃষি কার্ডের বিপরীতেকে দিতে হবে প্রতিমাসে ১০০০কোটি টাকা। ১২ মাসে ১২০০০ কোটি টাকা। অথচ কৃষিমন্ত্রণালয়ের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকি বাবদ ২৫ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়-যা চলতি অর্থবছরে পাওয়া ভর্তুকির চেয়ে ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।
আমাদের গতবছরের বাজেট ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, সেখানে নাকি তারা ৪ কোটি মানুষকে ২০০০ অথবা ২৫০০ টাকা করে দিবে। ২০০০ টাকা করে দিলে বছরে ৯৬ হাজার কোটি আর ২৫০০টাকা করে দিলে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা লাগবে। কিন্তু কথা হলো যেখানে খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির বাজেট ৪৫৩১.৯০ কোটি টাকা সেখানে ১লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা কোত্থেকে দিবে, যেটা এই একই ধরনের প্রকল্পের ২৬৪৭%। তাহলে কি বাকি সব প্রকল্প বন্ধ করে শুধু ফ্যামিলি কার্ডই দিবে?আর ফ্যামিলি কার্ডে ১লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা এবং কৃষক কার্ডে দিবে ১২০০০ কোটি টাকা। এসব অনেক কল্পনার টাকা কোত্থেকে আসবে? সেই সাথে ৪ কোটি কার্ড তৈরি করার জন্য কমপক্ষে ৯০০ টাকা করে ধরলে ৩৬০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। তাও আবার ব্যাপক সময় সাপেক্ষ। এই কার্ডের শুধুমাত্র একটি সুবিধাই পাওয়া যাবে। অন্যদিকে ৫০ লক্ষ কৃষক কার্ডের নির্মাণ খরচ হবে ৪৫০ কোটি টাকা। এত টাকা কোত্থেকে আসবে, কিভাবে আসবে তার সম্পূর্ণ রূপরেখা উল্লেখ করা হয়নি। কৃষি কার্ডের জন্য শুধুমাত্র কৃষি সুবিধা।
অন্যদিকে ফ্যামিলি গার্ডের জন্য শুধু ফ্যামিলি সুবিধা এভাবে যদি কার্ড করতেই থাকে তাহলে প্রতিটি সুবিধার জন্য প্রতিটি কার্ড এত এত হবে যা অলিক কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ইউনিক কার্ড বা সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ডে যেসব সুবিধা রয়েছে বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের বিপরীতে ম্যাজিক হিসেবে অনলি ওয়ান কার্ড ধরা হচ্ছে।জামায়াতের ওয়ান কার্ড, শুধু সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি না, বরং সব কিছুকে একসূত্রে নিয়ে আসছে। হাজার হাজার কার্ড সিস্টেম করে রাষ্ট্রের অর্থ নষ্ট করার চেয়ে একটি কার্ড করলে কি কি উপকার হতে পারে, কি কি বিষয় এক কার্ডে যুক্ত করা সম্ভব দেখা যাক : ১. জাতীয় পরিচয়পত্র (Core Identity)- NID হবে Master Identity- বায়োমেট্রিক (ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ছবি, চোখের আইরিশ)- ডেমোগ্রাফিক ডেটা (নাম, DOB, ঠিকানা)
-ভেরিফিকেশন অথরিটি: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ২. ট্যাক্স আইডি / TIN- NID →TIN অটো লিংক- আলাদা কার্ড বা কাগজ প্রয়োজন নেই। -আয়কর ফাইলিং, রিটার্ন, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন সহজ- অথরিটি: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ৩. ড্রাইভিং লাইসেন্স- নতুন করে ছবি/ফিঙ্গারপ্রিন্ট লাগবে না- ঘওউ ডেটাবেস থেকেই বায়োমেট্রিক ভেরিফাই- শুধু চোখের টেস্ট + ড্রাইভিং টেস্ট- অথরিটি: বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি। ৪. পাসপোর্ট- ঘওউ থাকলে পুনরায় ছবি ও বায়োমেট্রিকের প্রয়োজন নেই- শুধু লাইভ ফেস ম্যাচ + সিকিউরিটি চেক- সময়, খরচ ও ভোগান্তি কমবে- অথরিটি: পাসপোর্ট অধিদপ্তর। ৫. পরিবহন / ট্রান্সপোর্ট কার্ড- Metro Rail, BRT, Bus, Ferry- NID-based Smart Card- Rapid Pass -এর বিকল্প বা আপগ্রেড ভার্সন- ভাড়া, সাবসিডি, স্টুডেন্ট/সিনিয়র ডিসকাউন্ট অটো ৬. স্বাস্থ্য পরিচয় (Health ID)- সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল হিস্ট্রি-ই-প্রেসক্রিপশন- স্বাস্থ্য বীমা / সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা- অথরিটি: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ৭. ব্যাংকিং ও KYC- একবার KYC → সব ব্যাংক/মোবাইল ফাইন্যান্স- একাউন্ট খুলতে কাগজপত্র প্রায় শূন্য- Fraud ও ভুয়া একাউন্ট কমবে
- অথরিটি: বাংলাদেশ ব্যাংক ৮. সামাজিক সুরক্ষা ও ভাতা- বয়স্ক ভাতা- বিধবা ভাতা- প্রতিবন্ধী ভাতা- ডুপ্লিকেট/ভুয়া সুবিধাভোগী বন্ধ।
৯. শিক্ষা ID- SSC–HSC–University এক আইডিতে- সার্টিফিকেট ভেরিফিকেশন- স্কলারশিপ, স্টুডেন্ট লোন- অথরিটি: শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ১০. ভোটার ই-গভর্নেন্স- ডিজিটাল সেবা লগইন (Gov ID)- ভূমি রেকর্ড- ট্রেড লাইসেন্স- কোর্ট নোটিশ / মামলা ট্র্যাকিং
১১. Employment & Pension ID- চাকরি ইতিহাস-পেনশন ও রিটায়ারমেন্ট হিসাব ১২. Police & Criminal Record- আদালত অনুমতি ছাড়া ওপেন নয়- ভেরিফিকেশন সহজ- ভুয়া কেস কমবে
- গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা- ডেটা প্রাইভেসি আইন বাধ্যতামূলক- NID ≠ সব ডেটা ওপেন নয় Role-based access)- অফলাইন বিকল্প রাখতে হবে- নাগরিকের Consent-based Data Sharing এছাড়াও আরো নানান সুবিধা আছে। একটা কার্ড, একটা নাম্বার - যার সাথে সবকিছু এঙ্গেজ থাকবে। কিন্তু অর্থোরিটি ভিন ভিন্ন। সুরক্ষাও সর্বোচ্চ। বিএনপি’র ঘোষিত ৩১ দফায় বিশ্লেষকদের মতে নতুনত্বের কিছু নেই। যদিও বিএনপি’র তরফ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের এই রূপরেখা জিয়াউর রহমান ঘোষিত ‘১৯- দফা’, বেগম খালেদা জিয়া ঘোষিত বিএনপি’র ‘ভিশন-২০৩০’ এর আলোকে এবং তারেক রহমানের ঘোষিত ২৭ দফা কর্মসূচির সংশোধিত ও সম্প্রসারিত রূপে প্রণয়ন করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডে যে বয়ান দাঁড় করা হয়েছে তা যেন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মত। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সোশ্যাল সিকিউরিটি গার্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায় একটিমাত্র কার্ডে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। যা রাষ্ট্রের খরচ ও ভোগান্তি কমাবে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে দরিদ্র শ্রেণির লোকদেরকে প্রতিনিয়ত এক হাজার টাকা পেতে কম করে ৫০০ টাকা খরচ করতে হয়। অন্যদিকে এ কার্ডের দীর্ঘসূত্রিতা ভোগান্তি বাড়াবে বই কমবে না।উদাহরণস্বরূপ বলা যায় নির্বাচন কমিশন ২০০৮ সাল থেকে এই পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ লোকের স্মার্ট কার্ড দিতে পারেননি। আশা করি অলীক কল্পনার কার্ডগুলি পরিহার করে জনগণকে বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করবে রাজনৈতিক দলসমূহ। এবার দেখার বিষয় জনগণ কি প্রতিটি সেবার জন্য একটি করে কার্ড নিবে? নাকি একই কার্ডে সকল সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করবে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট।