অক্টোবরে গাজা শান্তি চুক্তি কার্যকর হলেও আগ্রাসী ইসরাইলের নির্মম হামলার কারণে সেখানে কার্যত শান্তি ফিরে আসেনি। তারা বারবার চুক্তি লঙ্ঘন করে গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে। শান্তি চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায় কবে কিভাবে শুরু হবে তা নিয়ে ছিল প্রশ্ন। এমন প্রেক্ষাপটে সবার দৃষ্টি ছিল বছর শেষে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে। এ সফরের আউটকাম নিয়ে বিশ্লেষকরা অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু এ সফর ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর সাথে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফ্লোরিডায় বৈঠকের খবরে তেমন কোন অগ্রগতির বার্তা পাওয়া যায়নি। বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন তারা। যদিও ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গাজায় শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে ‘খুব দ্রুত’ পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি আশাবাদী। ফ্লোরিডায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প এ কথা বলেন। তবে অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ইসরাইল বারবার লঙ্ঘন করলেও তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন তিনি। তাঁর দাবি, ইসরাইল ‘যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে।
অবাক করা কথাই বটে। ট্রাম্পের এ বক্তব্যে কার্যত অনেকেই হতাশ। কারণ এটা বাস্তব চিত্র নয়। তার এক চোখা নীতির বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের। এর ফলে স্বাধীন ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অগ্রগতি তাই চোখে পড়ার মতো নয়। অন্য দিকে গাজায় মানবিক ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় কয়েকটি সাহায্য সংস্থার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইসরাইল। যা শান্তি স্থাপনে অন্তরায়।
দু’বছর ধরে চলার পর গাজায় যুদ্ধ অবসানে বিশ্বব্যাপী তো বটেই বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে একটি স্বস্তির ভাব এসেছিল। যুদ্ধ বলা হলেও তা ছিল কার্যত ইসরাইলীদের হাতে নির্বিচারে মানুষ হত্যা, বিশেষত গাজবাসী ও নারী শিশুকে নির্বিচারে হত্যা। আধুনিক ইতিহাসে যার কোন নজির নেই। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অবশেষে বিশ্ব জনমতের চাপে ২০ দফা শান্তি চুক্তির মাধ্যমে গত ১০ অক্টোবর এ যুদ্ধের আপাত অবসান ঘটাতে সক্ষম হন। গাজা চুক্তির সময় কিন্তু কোন কোন বিশ্লেষক বলেছিলেন ঘটনার এখানেই শেষ ভাবা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এ বিষয়ে আরো পরিস্কার করে বললে যুদ্ধ বিরতির বিষয়ে ইসরাইলের ট্র্যাক রেকর্ড মোটেই ভাল নয়।
গাজায় যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প প্রস্তাবিত ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের কথা বলা হয়েছে। আর কী কী বলেছেন ট্রাম্প? বৈঠকের পর নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ইসরাইল ‘পরিকল্পনাটি শতভাগ মেনে চলেছে’। যদিও গাজায় ইসরাইলী সেনাবাহিনী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গাজা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে হামাস ও ইসরাইলের কত দ্রুত অগ্রসর হওয়া উচিত এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব। তবে নিরস্ত্রীকরণ অবশ্যই হতে হবে।’ হামাস সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (হামাস) যদি তাদের প্রতিশ্রুতিমতো অস্ত্র সমর্পণ না করে, তাহলে তাদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে।’ ট্রাম্প আরও বলেন, গাজায় পুনর্গঠন কার্যক্রম ‘খুব শিগগির শুরু হতে পারে’। গাজা শান্তি পরিকল্পনাটি গত অক্টোবরে কার্যকর হয়। পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে বিধ্বস্ত এ ভূখণ্ডে একটি টেকনোক্রেটিক সরকার গঠন করা, হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং ইসরাইলী সেনাদের প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। এরপর গাজার পুনর্গঠন শুরু হবে। তবে সমালোচকদের মতে, নেতানিয়াহু এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে পারেন এবং ইসরাইলী সেনাদের প্রত্যাহারের আগে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের জন্য চাপ দিতে পারেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগও করা রয়েছে, তিনি ফিলিস্তিনীদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে আগ্রহী নন।
হামাসের কর্মকর্তারা বলেছেন, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অগ্রগতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ হওয়া উচিত। হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরাইলী সেনাবাহিনীর অভিযানে অন্তত ৪১৪ জন ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন। গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী ইসরাইলী সেনাবাহিনী বলেছে, তারা কেবল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাব হিসেবেই গুলী চালিয়েছে। একই সময়ে তিনজন ইসরাইলী সেনা নিহত হওয়ার জন্য তারা হামাসকে দায়ী করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ভিন্ন কোনো স্থাপনা ব্যবহার করছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর আরও হামলা চালাবে। গত জুন মাসে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়ে গেছে। তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আশা করি তারা আবার তা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে না। কারণ, যদি তারা সেটা করে, তাহলে সে কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো উপায় থাকবে না।’ তবে সমালোচকরা বলছেন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে দেরি করতে পারেন এবং ইসরাইলী সেনা প্রত্যাহার করার আগেই হামাসকে নিরস্ত্র করতে চাপ দিতে পারেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিনীদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তরিকভাবে আলোচনায় বসতে চান না বলেও অভিযোগ আছে।
হামাস কী বলছে? হামাস কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ অবশ্যই একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অগ্রগতির পাশাপাশিই হতে হবে। হামাসের সশস্ত্র শাখা ‘ইজ্জেদিন আল-কাসাম ব্রিগেড’ সোমবার এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছে, ইসরাইলের দখলদারিত্ব বজায় থাকা অবস্থায় তারা অস্ত্র ছাড়বে না। তবে পশ্চিম তীর ও সেখানে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের কিছুটা মতভেদ দেখা গেছে। ট্রাম্প বলেন, “আমরা পশ্চিম তীর নিয়ে ১০০ ভাগ একমত নই, তবে আমরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাব।”
এদিকে গাজায় সাহায্য সংস্থার উপর ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞার ‘ভয়াবহ’ পরিণতি হবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় কাজ করা সাহায্য গোষ্ঠীর জন্য তাদের নতুন নিয়ম মেনে চলতে ব্যর্থ হওয়ায় ইসরাইল ত্রাণ সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) সহ তিন ডজনেরও বেশি মানবিক সংস্থার কার্যক্রম স্থগিত করবে বলে জানিয়েছে। গাজায় স্বাস্থ্যখাতকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এমএসএফ বলেছে যে ইসরাইলের সিদ্ধান্ত ছিটমহলে তাদের কাজের উপর বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলবে, যেখানে তারা প্রায় ২০ শতাংশ হাসপাতালের শয্যা পরিচালনায় সহায়তা দিচ্ছে, সহায়তা দিচ্ছে চিকিৎসা কার্যক্রমেও। সংস্থাটি তার কর্মীদের সম্পর্কে ইসরাইলের অভিযোগও অস্বীকার করেছে। গাজায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা এবং পরে ইসরাইলী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পুনরায় প্রবেশে অস্বীকৃতি জানানো ব্রিটিশ চিকিৎসক ডাঃ জেমস স্মিথ আল জাজিরাকে বলেছেন যে সাহায্য সংস্থাগুলীর উপর “নির্মম” নিষেধাজ্ঞা “ইতিমধ্যেই ভয়াবহ” হয়ে ওঠা মানবিক সংকটকে “আরও ভয়াবহ” করে তুলবে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলের হামলায় কমপক্ষে ৭১,২৬৬ জন ফিলিস্তিনী নিহত এবং ১,৭১,২২২ জন আহত হয়েছেন। ৭ অক্টোবর, ২০২৩ সালের হামাসের হামলায় ইসরাইলে মোট ১,১৩৯ জন নিহত এবং ২৫০ জনকে বন্দী করা হয়েছিল। শান্তি চুক্তির আওতায় তাদেরকে মুক্তি দিয়েছে হামাস এবং লাশও হস্তান্তর করেছে।
এখন কী হচ্ছে? এখনো ইসরাইলী হামলা অব্যাহত রয়েছে। তার প্রমাণ ২৪ ডিসেম্বর জাবালিয়া, গাজা সিটি ও খান ইউনিস, রাফাহ এলাকার বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালায় দখলদার বাহিনী। এতে কয়েকজন হতাহত হন। ইয়েলো লাইন এমনকি সেনা প্রত্যাহার করা এলাকাতে এসব হামলা হয়েছে বলে দাবি গাজা কর্তৃপক্ষের। চিকিৎসা সূত্রের বরাত দিয়ে ওয়াফা সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, খান ইউনিসের কাছে গুলীবিদ্ধ হয়ে তিনজন আহত হয়েছেন। গাজার মধ্যাঞ্চলীয় মাগাজি শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলী বাহিনীর হামলায় এক শিশুকে গুলীবিদ্ধ হয়েছে। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানায়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলী বাহিনী ৮৭৫ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান অভিযোগ করে বলেছেন, ইসরাইল ইচ্ছাকৃতভাবে গাজায় মানবিক সহায়তা আটকে দিচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, তুরস্ক শান্তির পক্ষে, কিন্তু অন্যায়ের সঙ্গে আপস করবে না। এদিকে বুধবার আঙ্কারায় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে বৈঠক করেছে হামাসের প্রতিনিধিদল। বৈঠকে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ ও মানবিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়। শান্তি প্রক্রিয়ার যুক্ত থাকা তুরস্কের এই বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে সব কিছু চুক্তি মতো চলছে না।
ইসরাইল বার বার যুদ্ধ বিরতি থেকে ফিরে এসছে। গত বছর মার্চেও ইসরাইল যুদ্ধ বিরতি থেকে ফিরে আসে। এবারও তাই হয়েছে। গাজায় ইসরাইলী হামলা এখনো চলমান। ক্ষুধার্ত গাজাবাসীর জন্য ত্রাণ সাহায্যও অপ্রতুল। শান্তি চুক্তি হলো, ইসরাইলী জিম্মিরা মুক্তি পেল কিন্তু গাজাবাসী ধ্বংসের হাত থেকে মুক্তি পেল না।
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বৈঠকে কম অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে গাজায় যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে সেখানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সহজ হবে না। বেশ কিছু বাধা এখনও রয়ে গেছে, এগুলো দু’বছর স্থায়ী একটি যুদ্ধের পর শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনায় এগুলো বড় বাধা। এখন এক্ষেত্রে প্রধান প্রশ্নগুলো হল হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরাইলী সেনাদের সরিয়ে নেওয়া ও ফিলিস্তিনী ছিটমহলটির ভবিষ্যৎ শাসক কারা হবে। এসব প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু তাদের বক্তব্যে আশার আলো তেমনটা দেখাতে পারছেন না। ফলে শান্তি চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায়ের শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎও হতাশায় নিমজ্জিত। এ থেকে বের হওয়ার পথ কী হবে সেটাই এখন বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।