॥ ইকবাল হোসেন ॥
রাত প্রায় দুইটা। এক মাস আগের ঘটনা। নিস্তব্ধ কমলাপুর রেলস্টেশনের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছি। দূরে একটি ট্রেন থেমে আছে, চাকা ঘর্ষণের মৃদু শব্দে ভাঙছে নীরবতা। হঠাৎ চোখে পড়ে এক মা-তাঁর শিশুকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছেন। মাথার নিচে ছেঁড়া ব্যাগ, গায়ে মলিন চাদর। পাশে দুটি শিশু, অর্ধনগ্ন ও ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। দৃশ্যটি কোনো সিনেমার নয়, কোনো ফটোগ্রাফির আয়োজনও নয়- এটাই তাদের প্রতিদিনের জীবন। এই নিঃশব্দ রাত, এই ঠান্ডা প্ল্যাটফর্ম, এই শিশুর নিঃশ্বাস-সবই যেন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে, “তোমরা কি এখনো জেগে আছ?”
শহরের অলিতে-গলিতে, ফুটপাথে, ব্রিজের নিচে হাজারো মানুষ প্রতিদিন রাত কাটায় খোলা আকাশের নিচে। তাদের নেই ছাদ, নেই বিছানা, নেই নিশ্চিন্ততার স্বপ্ন। চায়ের দোকানে দাঁড়ালেই শোনা যায় কাঁপা কণ্ঠ-“তিনদিন ভাত খাইনি।” কেউ পাউরুটি চায়, কেউ সামান্য সাহায্য, আর আমরা মুখ ফিরিয়ে নিই। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি গরিবের হাহাকার শুনে চুপ করে থাকতে। অভ্যস্ত হয়ে গেছি “গরিব” শব্দটিকে পাশ কাটিয়ে যেতে। সিনেমায় কান্না আমাদের ছুঁয়ে যায়, কিন্তু বাস্তব কান্না আমাদের অস্পর্শই থাকে। এই নিশ্চুপতা কি আমাদের বিবেকের মৃত্যু নয়?
কাগজে কল্যাণ, বাস্তবে বঞ্চনা : বাংলাদেশে প্রতিবছর দরিদ্রদের কল্যাণে বরাদ্দ হয় হাজার কোটি টাকা। সরকারি ফাইল ভর্তি থাকে সুন্দর সব শব্দে-ভিজিএফ, ভিজিডি, বয়স্কভাতা, গৃহনির্মাণ প্রকল্প, আশ্রয়ণ। কাগজে-কলমে সবই নির্ভুল। কিন্তু বাস্তবে? বাস্তবে সেই বরাদ্দ পৌঁছে না প্রকৃত প্রাপকের হাতে। গুদাম থেকে চাল হারিয়ে যায়, ঘর চলে যায় প্রভাবশালীর নামে, তালিকা থেকে বাদ পড়ে প্রকৃত দরিদ্র। মাঝপথে জন্ম নেয় কিছু “অদৃশ্য সুবিধাভোগী”-যারা জনগণের প্রাপ্যটুকু নিজের পকেটে ভরে নেয়। এই অর্থনৈতিক দুর্নীতি শুধু টাকা চুরি নয়; এটি একটি নৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়।
এক ভিক্ষুক এক সময় বলেছিলেন, “স্যার, আমাগো বাঁচার লাইগা কেউ নাই। মরে গেলেও কাফনের কাপড় পাই না।” তাঁর চোখে রাগ ছিল না, ছিল নিঃশেষ হতাশা। সেই দৃষ্টিতে লুকানো ছিল একটি জাতির বিবেকের উদাসীনতা।
সমাজের অদৃশ্য দেয়াল : আমরা যারা রেস্টুরেন্টে বসে খাই, ঈদে নতুন জামা কিনি, আমরা কল্পনাও করি না-কেউ না খেয়ে ঘুমায়, কেউ চিকিৎসা ছাড়া ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়, কেউ ফুটপাথে সন্তান জন্ম দেয়। এই জীবন আমরা দেখি না, কারণ দেখতে চাই না। কারণ দেখতে গেলে বিবেক জেগে উঠতে পারে, অস্বস্তি হতে পারে। তাই আমরা চোখ ফিরিয়ে নিই, যেন না দেখলেই দায়ও নেই।
আজ এক কাপ চায়ের দাম যত, এক জীবনের মূল্য যেন তার চেয়েও কম। আমরা প্রশ্ন তুলি না-কেন গরিবের বরাদ্দ গরিব পায় না? কেন চাল কালোবাজারে বিক্রি হয়? কেন গৃহহীন না হয়েও কেউ সরকারি ঘর পায়, আর প্রকৃত গৃহহীন পড়ে থাকে রাস্তায়? এসব প্রশ্ন সমাজকে অস্বস্তিতে ফেলে, তাই প্রশ্ন তোলা হয় না। অথচ প্রশ্নই তো জাগরণের শুরু, আর জাগরণই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
দারিদ্র্য কোনো অভিশাপ নয় : দারিদ্র্য কোনো দুর্ভাগ্য বা অভিশাপ নয়, এটি এক ব্যবস্থার ব্যর্থতা। আমাদের কৃষক, শ্রমিক, রিকশাওয়ালা অলস নয়; তারা দিনরাত ঘাম ঝরায়। কিন্তু তারপরও কেন তারা না খেয়ে থাকে? কেন তাদের শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে? কেন তাদের মা-বোনেরা চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারায়? এর উত্তর আমরা সবাই জানি, কিন্তু মুখে আনি না-কারণ মুখে আনলে দায় নিতে হয়।
রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের হয়, তবে প্রতিটি নাগরিকের খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের নিশ্চয়তা থাকা উচিত। সংবিধান সে প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু বাস্তবতা সেই প্রতিশ্রুতিকে অপমান করে। প্রভাবশালী কিছু মানুষ গরিবের ঘরে আলো পৌঁছাতে দিতে চায় না কারণ তাতে তাদের “সুবিধার” আলো ম্লান হয়।
ফুটপাথের মানুষও রাষ্ট্রের নাগরিক : ফুটপাথে যিনি ঘুমান, রেলস্টেশনে যিনি আশ্রয় নেন-তিনি শুধু “ছিন্নমূল” নন; তিনি এই রাষ্ট্রের নাগরিক। তাঁরও অধিকার আছে খাবার, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, মর্যাদার। কিন্তু আমরা তাকে মানুষ হিসেবে দেখি না; দেখি ‘বস্তির লোক’, ‘ভিক্ষুক’, ‘বোঝা’। সমাজের এই অদৃশ্য শ্রেণিবিভাগই আমাদের মানবিকতা কেড়ে নিচ্ছে।
আমরা চাই এমন এক বাংলাদেশ-যেখানে রেলস্টেশন হবে যাত্রার স্থান, বাসস্থান নয়; ফুটপাথ হবে হেঁটে চলার পথ, কারও বিছানা নয়। যেখানে মানুষ ‘গরিব’ বলে অপমানিত হবে না, বরং প্রতিটি নাগরিক পাবে সম্মান, খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়।
আমরা চাই সরকারি বরাদ্দ প্রকৃত প্রাপকের হাতে পৌঁছাক, দুর্নীতির চোরা বালিতে হারিয়ে না যাক মানবতার বীজ। এমন এক সমাজ চাই, যেখানে দুর্নীতিবাজ লজ্জিত হবে, আর গরিব হবে গর্বিত-কারণ সে পরিশ্রম করে বাঁচে, অন্যের প্রাপ্য কেড়ে নেয় না।
জাগো মানবতা, জাগো বিবেক : এই দেশ আমাদের সবার- শুধু ধনী, ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী কারও একার নয়। ‘সব’ শব্দের মধ্যে আছে সেই মা, যিনি রেলস্টেশনে ঘুমান; আছে সেই শিশু, যে ফুটপাথে ধুলোয় গড়াগড়ি খায়; আছে সেই বৃদ্ধ, যিনি হাসপাতালের বারান্দায় মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকেন। তাদের কথা না ভাবলে, একদিন ইতিহাস আমাদের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।
আজ যদি না জাগে বিবেক, কাল হয়তো সময় থাকবে না। আমাদের ঘুম ভাঙাতে এখন আর শব্দ নয়, প্রয়োজন একটিই-মানবতা। রেলস্টেশনের মায়ের চোখের ঘুম আমাদের রাষ্ট্রের আয়না। সেখানে আমরা দেখতে পাই-কীভাবে ফুটপাথ শুধু পথ নয়, হয়ে গেছে বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়। যদি আমরা এখনো নীরব থাকি, তবে একদিন এই নীরবতাই আমাদের কবর হয়ে উঠবে।
লেখক : সংবাদকর্মী।