বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থায় নানা ধরনের অসঙ্গতি এবং অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রায়ই অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (ডব্লিউটিও) প্রণীত বাণিজ্য নীতিমালা সব দেশ একইভাবে পরিপালন করছে না। ফলে বাণিজ্য ব্যবস্থায় এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ১৯৯৫ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী উদার বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। উদার বাণিজ্যনীতি অনুসরণের উদ্দেশ্য হচ্ছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের অভাব চলাচল নিশ্চিত করা। সংরক্ষণবাদি অর্থনীতিতে পক্ষভুক্ত বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব স্বার্থ এবং সুবিধা মতো বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক নীতিমালা অনুসরণ করতে পারে। কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কোন দেশ চাইলেই অন্য দেশের পণ্য সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় এমন কোন উদ্যোগ নিতে পারে না। মুক্তবাজার অর্থনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের সর্বত্র তুলনামূলক কম মূল্যে পণ্য ও সেবা ভোক্তার নিকট পৌঁছে দেয়া। কিন্তু প্রথম থেকেই ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন পুঁজিবাদি দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করে চলেছে। উন্নয়নশীল এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এটা নিয়ে প্রতিবাদ জানালেও কোন লাভ হয়নি।
শুরু থেকেই ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন তাদের বাণিজ্যনীতি এমনভাবে সাজিয়েছে যা পুঁজিবাদি দেশের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যই নিবেদিত। মুক্তবাজার অর্থনীতির মূল বক্তব্য হচ্ছে পণ্য ও সেবা পরিবহনের ক্ষেত্রে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকা চলবে না। পণ্যের চাহিদার প্রেক্ষিতে যোগান নিশ্চিত করা হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির মাধ্যমে পণ্য চলাচল নিশ্চিত করা হলেও পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে যে উপকরণটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে সেই মানব চলাচল নির্বিঘ্ন করা হয়নি। পুঁজিবাদি এবং উন্নত দেশগুলো জানে মানুষের অবাধ চলাচলের সুযোগ দেয়া হলে সেটা তাদের স্বার্থ পরিপন্থী হবে।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে অভিবাসন করবে। তাই তারা মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বললেও মানব চলাচলের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের ব্যাপারে উদাসীন। পুঁজিবাদি দেশগুলো জানে, তারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে পণ্য ও সেবা উৎপাদন করবে তার সঙ্গে দরিদ্র দেশের পণ্য গুনগত মান ও মূল্য বিবেচনায় প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। তাই তারা পণ্যের অবাধ চলাচলের উপরই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সামরিক এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলো ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন প্রণীত মুক্তবাজার অর্থনীতি বা বাণিজ্য নীতি সঠিকভাবে পরিপালন করে না। তারা নানাভাবে স্বল্পোন্নত দেশের পণ্য ও সেবার অবাধ প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে।
গতবছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্তত ১০০টি দেশের রপ্তানি পণ্যের উপর বাড়তি শুল্কারোপ করে। এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী মারাত্মক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যেসব দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ভারসাম্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিকূলে রয়েছে সেসব দেশের আমদানি পণ্যের উপর বিভিন্ন পরিমাণে পাল্টা শুল্কারোপ করা হয়। বিশ্বে এমন অনেক দেশ আছে যাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। যেমন, বাংলাদেশের কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। একক দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। আর অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান সবার শীর্ষে। নব্বই দশক থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য মূলত তৈরি পোশাকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক জাত সামগ্রী রপ্তানির মাধ্যমে। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এতটা এগিয়ে আছে কেন? বাংলাদেশি পণ্য কি অবাধ প্রতিযোগিতা সক্ষমতার কারণেই এ দু’টি অঞ্চলে এমন ভালো অবস্থানে রয়েছে?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা প্রদান করে থাকে। একই সঙ্গে শুল্ক ছাড় দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে জেনারালাইড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) সুবিধ দিয়ে আসছে। জিএসপি সুবিধার আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের আমদানিকারকগণ বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে। ভিয়েতনামের পণ্য আমদানির জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের আমদানিকারকদের ন্যূনতম সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হয়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের আমদানিকারকদের কোন শুল্ক পরিশোধ করতে হয় না। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৪৮ শতাংশই যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা প্রদান করতো। কোটা সুবিধার আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য বাংলাদেশ থেকে আমদানি করতো। ২০০৫ সালে বিশ্বব্যাপী মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু হবার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেয়া কোটা সুবিধা বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে জিএসপি সুবিধা প্রদান করে আসছিল। কিন্তু পরবর্তীতে শ্রম আইন লঙ্ঘন এবং আরো কিছু অভিযোগের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে। অভিযোগ উত্থাপিত হলেই তা অপরাধে পর্যবসিত হয় না। কাউকে কোন অভিযোগে দোষি করতে হলে প্রশ্নাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে হয়ে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতেই বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত করেছে। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। কারণ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণের মতো ক্ষমতা রাখে না। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সক্ষমতা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে। সংস্থাটি আসলে দরিদ্র দেশের স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত নয়। তারা পুঁজিবাদি দেশগুলোর স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যস্ত। ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন বাণিজ্য সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কতটা অসহায় তার চিত্র ফুটে উঠেছে সংস্থা প্রধানের বক্তব্যে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন’র (ডব্লিউটিও) প্রধান এনগোজি ওকোনজো ইওয়েলা সম্প্রতি বলেছেন, অভিন্ন নিয়ম না থাকলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ‘বিশৃঙ্খলায়’ নিমজ্জিত হতে পারে। রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং দ্রুতি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সংস্থাটির ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। ডব্লিউটিও প্রধান হয়তো সরাসরি কোন দেশের নাম উল্লেখ করেননি কিন্তু তার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের আমদানি পণ্যের উপর যে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে তিনি তাতে সন্তুষ্ট হননি। সমস্যা এখানেই। শক্তিশালী দেশের গৃহীত কোন ব্যবস্থার ব্যাপারে ডব্লিউটিও বা এ ধরনের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কোন পদক্ষেপ নিতে পারে না। কিন্তু দুর্বল দেশের ব্যাপারে তারা তারা কঠোর। এ অবস্থা আমরা জাতিসঙ্ঘের ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষ করি। জাতিসঙ্ঘ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার সমর্থিত ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না। ইসরাইল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করলে কোন অসুবিধা হয় না। কিন্তু কোন মুসলিম দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার উদ্যোগ নিলে জাতিসঙ্ঘ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কার্পণ্য করে না।
বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা গঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন দেশের পণ্য রপ্তানি সহজীকরণের উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এখনো উন্নত দেশগুলো স্বল্পোন্নত দেশের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দুর্বলতার কারণে স্বল্পোন্নত এবং উন্নীয়নশীল দেশগুলো তাদের বাণিজ্য সহজীকরণ করতে পারছে না। মার্কিন য্ক্তুরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের আমদানি পণ্যের উপর বাড়তি শুল্কারোপ করলেও ডব্লিউটিও সে ব্যাপারে কোন আপত্তি উত্থাপন করতে পারেনি। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালত বিষয়টি নিয়ে তাদের আপত্তি জানিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালত যদি বাড়তি শুল্কারোপের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে রায় দিতে পারে তাহলে ডব্লিউটিও কেন নিশ্চুপ ছিল? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু অর্থায়ন থেকে নিজেদের সরিয়ে এনেছে। কিন্তু কোন সংস্থাই এ ব্যাপারে আপত্তি জানায়নি। এটাই বাস্তবতা। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাই বলি আর অন্য কোন সংস্থাই হোক তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা এমন শক্তিধর দেশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা রাখে না।
আগামীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজীকরণ করতে হলে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। জাতিসঙ্ঘের আওতায় বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার জন্য একটি সার্বজনিন আইন প্রণয়ন করতে হবে। অর্থাৎ উন্নত হোক আর অনুন্নত হোক সব দেশকেই এ আইন মেনে চলতে হবে। এমন একটি আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে যেখানে উন্নত দেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে উচ্চ হারে শুল্ক প্রদান করতে হবে। আর তুলনামূলক অনুন্নত এবং দরিদ্র দেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাপক হারে শুল্ক ছাড় দিতে হবে। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে কোন দেশ পণ্য আমদানি করতে চাইলে যদি ৫০ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হয় তাহলে বাংলাদেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পণ্য আমদানি করতে চাইলে হয়তো ১০ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হবে। এ ধরনের একটি শুল্ক নীতি প্রণয়ন করা গেলে উন্নয়নশীল দেশগুলো বাণিজ্য ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার এবং তুলনামূলক সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি রপ্তানি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিজস্ব সূত্র থেকে ৩০ শতাংশ বা তার বেশি কাঁচামাল ব্যবহার করে তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আরো কিছুটা শুল্ক ছাড় দেয়া যেতে পারে। স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারের শর্তারোপিত হলে প্রতিটি স্বল্পোন্নত দেশ চেষ্টা করবে কিভাবে স্থানীয় কাঁচামালের যোগান বৃদ্ধি করা যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন্ন দেশ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার আইনকে ফাঁকি দেবার উদ্দেশ্যে নানা কৌশল ব্যবহার করে থাকে। বিশেষ করে তারা শুল্ক ছাড় দিলেও নানা ধরনের অশুল্ক বাধা সৃষ্টি করে একটি দেশের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি ভুক্তভোগী দেশ। বাংলাদেশ চীন এবং ভারত থেকে তার বেশির ভাগ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করে থাকে। কিন্তু চীন এবং বিশেষ করে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। এর পেছনে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা। ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহে। কিন্তু ভারত নানা ধরনের অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা আরোপ করে রাখার ফলে সেই সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে রপ্তানি পণ্যের ভিন্নতার অভাব। চীন বাংলাদেশকে বাণিজ্য ক্ষেত্রে নানা ধরনের সুবিধা প্রদান করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশি পণ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে চীনে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। এর পেছনে মূল ভূমিকা পালন করছে দু’দেশের রপ্তানি পণ্যের সমতা। বাংলাদেশ ও চীন একই নেচারের পণ্য রপ্তানি করে থাকে।
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানি পণ্য হচ্ছে তৈরি পোশাক। মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। চীনও তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। চীন আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে রয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি ভলিউম বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। চীন তুলনামূলক কম মূল্যে স্থানীয় বাজারে তৈরি পোশাক যোগান দিতে পারছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের মূল্য চীনের তৈরি পোশাকের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। রপ্তানি পণ্য যদি উদ্দীষ্ট গন্তব্যে চাহিদা সৃষ্টি এবং তুলনামূলক কমমূল্যে পণ্যের যোগান নিশ্চিত করতে না পারে তা হলে সে বাজার দখল করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। বাংলাদেশি তৈরি পোশাক সঙ্গত কারণেই চীনের বাজার দখল করতে পারছে না। আগামীতেও পারবে না। বাংলাদেশ যদি রপ্তানি পণ্য নিয়ে চীনের বাজারে স্থান করে নিতে চায় তাহলে তাকে এমন সব পণ্য রপ্তানি করতে হবে যা চীনে পাওয়া যায় না।
এ বছরই বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার কথা রয়েছে। তবে সরকার ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উর্ত্তীণের সময় তিন বছর বৃদ্ধি জন্য জাতিসঙ্ঘের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিকট অনুরোধ জানিয়েছে। রপ্তানি বাণিজ্যকে যদি পরিকল্পিতভাবে ঢেলে সাজানো না যায় তাহলে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উর্ত্তীণের সময়সীমা তিনবছর বাড়ালেও কোনো লাভ হবে না।