মুসফিকা আন্জুম নাবা
বস্তুত, আমাদের জাতীয় ইস্যুতে নারীবাদ (Feminism) নতুনভাবে মঞ্চায়িত হতে শুরু করেছে। আর নারীবাদ হলো এমন একটি মতাদর্শ, আন্দোলন যা নারী পুরুষের সমান অধিকার, নারীদের অর্থ উপাজনের পূর্ণ স্বাধীনতা দান সহ নারী সংক্রান্ত বহু অধিকার নিশ্চিতকরণে কাজ করে। যেমন, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি। ফেমিনিজমের নামে নারী উন্নয়নের কথা বললেও প্রকৃত পক্ষে তথাকথিত নারী স্বাধীনতা ইউরোপীয় সমাজে কী বিষময় পরিণাম ডেকে এনেছে তা বলাই বাহুল্য। মুক্ত সমাজ, মুক্ত মানুষ, মুক্ত অর্থনীতি ইত্যাদি পশ্চিমা পুঁজিবাদী জীবনদর্শনের মূলমন্ত্র হলেও, কথিত মুক্ত সমাজের মুক্ত জীবনের ধারণা নারীকে মুক্তি দেয়নি বরং বহুগুণে বেড়েছে তাদের উপর অত্যাচার আর নির্যাতনের পরিমাণ। ইউরোপে মধ্যযুগ থেকে এবং বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত নারী ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ।
তারা ভোটাধিকার, অর্থনৈতিকসহ অনেক মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হতো। ঊনবিংশ শতকে শিল্প বিপ্লবের সময় পাশ্চাত্যে বড় বড় কলকারখানার তৈরি হয়। এ সময় পুঁজিবাদীরা কম মজুরির এমন শ্রমিক খুঁজতে থাকে যারা উচ্চাভিলাষী হবে না ও যাদের নিয়ে ঝামেলাও হবে কম। এজন্য নারীদের সামনে স্বাধীনতার শ্লোগান দেয়া হল যাতে তারা এতে প্রতারিত হয়ে ঘর থেকে বের হন এবং কলকারখানায় কম বেতনে কাজ করেন। বাস্তবতা হলো ফ্রিডম বা স্বাধীনতার কথা বলে, পশ্চিমা সমাজ মানুষকে ঠেলে দিয়েছে স্বেচ্ছাচারী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন এক জীবনের দিকে। এ জীবনব্যবস্থায় মানুষের নেই কারো কাছে কোন জবাবদিহিতা। বরং রয়েছে লাগামহীন ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারীতার সুযোগ। ফলে নারী হয়েছে নিরেট ভোগ্যপণ্য ও মুনাফা হাসিলের উপকরণ মাত্র। ফিল্ম, ফ্যাশন ও ব্লু ইন্ডাস্ট্রিতে নারীদের কাজ করিয়ে তাদের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে। অতীত যুগে মানুষকে পাচার করে দাস বানানো হত। কিন্তু বর্তমান যুগেও ইউরোপ-আমেরিকায় মেয়েদের পাচার করা হচ্ছে।
আর ব্যক্তি স্বাধীনতার চূড়ান্ত অপপ্রয়োগে সমাজে বাড়ছে খুন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও পারিবারিক সহিংসতাসহ সকল প্রকার নারী নির্যাতন। এছাড়া, লাগামহীন স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোও শুধুমাত্র লাভবান হবার জন্য নারীকে দিয়ে বিজ্ঞাপন, মুভি ও নারী অধিকারের নামে নারী শোষণের নিত্য নতুন পথ তৈরি করছে। এসবের মধ্যদিয়ে অস্ত্র, মাদক ও মানুষ পাচার রমরমা ব্যবসা চলছে। ওয়েলস, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর গড়ে হাজার হাজার নারীরা ধর্ষণ, কর্মস্থলে মারধোর, যৌন-নির্যাতন এবং এমনকি হত্যাকান্ড শিকার হন। এসবের প্রভাবে ব্যক্তিগত জীবনে হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। পাশ্চাত্যের বিপথগামী সংস্কৃতিতে নারী নির্যাতন মানবজাতির ইতিহাসে নজিরবিহীন। পরিণতিতে বন্ধ্যাত্ব, অ্যানোরেক্সিয়া, বুলেমিয়া, যৌন-রোগ, পরিবার প্রথা বিলুপ্ত, নারী-নির্যাতন বৃদ্ধি, পারিবারিক সহিংসতা, বার্ধক্যে আশ্রয়হীন জীবন-যাপন, মাদক সেবন বৃদ্ধি, অ্যালকোহল সেবন, জনসংখ্যা হ্রাস সহ পশ্চিমা বিশ্ব নানা মুখী সমস্যায় জর্জরিত। নারী নির্যাতনের সমাধান হিসাবে পশ্চিমা বিশ্ব সমস্ত পৃথিবীব্যাপী স্বাধীনতার ধ্যানধারণাকে জোরের সাথে প্রচার করলেও, প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার মিথ্যা শ্লোগানে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পশ্চিমের নারীরা হয়েছে এক অভিনব দাসত্বের শিকার। বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা, হলিউড মুভি, নামি-দামি ফ্যাশন ম্যাগাজিন কিংবা চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপনের সাহায্যে তারা মুসলিম বিশ্বেও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করছে তাদের মুক্ত-স্বাধীন নারীদের।
তাদের ইলেক্ট্রনিক আর প্রিন্ট মিডিয়াতে আধুনিকা নারীদের দেখলে মনে হয় জীবনের সবক্ষেত্রেই তারা প্রচণ্ড রকম স্বাধীন। কিন্তু পশ্চিমাদের সমাজচিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। মিডিয়ার পক্ষপাতের (Preference) কারণে প্রকৃত সত্য খুব কমই উঠে আসে। মিডিয়ার প্রোপাগান্ডার খপ্পরে আমাদের দেশের নারীরাও এগুলোতে আকৃষ্ট। আমাদের দেশের উচ্চ শ্রেণীসহ অনেক সাহিত্যিক ব্যক্তিবর্গ সেক্যুলারিজম এ বিশ্বাসী হওয়ার কারণে বাংলাদেশে পশ্চিমা মতাদর্শ প্রচার প্রসার করছে। তাদের চিন্তাধারাকে উন্নত বাস্তববাদী হিসেবে সবার সামনে উপস্থাপন করার পাঁয়তারা চলে। পশ্চিমী তাণ্ডবে আমাদের দেশের রংক্ষণশীল মেয়েরা প্রতিনিয়ত হিজাব বা নিকাব নিয়ে হেনস্তা ও বিভিন্নমুখী সমস্যায় পড়তে হয়। ফেমিনস্টরা লিবারালিজমের কথা বললেও তারা চরমমাত্রায় Dogmatic এবং Fanatic Iiliberal। তাদের স্বভাব যে কোনো উপায়ে বিরুদ্ধ মতের টুঁটি চেপে ধরতে চায়। জোর করে মানুষকে তাদের মত গ্রহণ করতে বাধ্য করার প্রবণতা রয়েছে। পশ্চিমা নারীবাদ ত্রাতার ভূমিকায় নেমে বারবার হিজাবকে আক্রমণ করে। আসলে, পর্দা একজন মুসলিম নারীর ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রাচীনকালে হিন্দু সমাজেও পর্দা বা আব্রু প্রথা সমাজে আভিজাত্য ও সামাজিক শালীনতা বলে গণ্য হতো। পর্দা অর্থ অবরোধ নয়, নয় চার দেয়ালে বন্দি থাকা। তার প্রমাণ, আলজেরীয়ায় হিজাবই প্রতিরোধ আন্দোলনের সময় জুলুমের বিরুদ্ধে আজাদির প্রতীক হয়েছিল। ইসলাম পরবর্তী মুসলিম নারীরা তার উন্নত রুচিবোধ, ব্যক্তিত্ব, কর্ম গুণে, দয়াশীলতা ইতিহাসে অসংখ্য নজির স্থাপন করেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন, ধর্মীয় ও সৃজনশীল সৃষ্টি সহ প্রত্যেক ক্ষেত্রে মুসলিম নারীর বিচরণ ছিল ঈষর্ণীয়। পর্দা বা আব্রুর মধ্য থেকেই তাদের এ অসাধারণ কৃতিত্ব প্রকাশ পেয়েছে। আবার ইসলামের অন্ধ বিরোধীতা করে করে বলা হয়, এখানে নারীর মর্যাদার হানি হয়। কিন্তু নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে, ইসলামই নারীকে অমর্যাদা- লাঞ্ছনা, অভিশাপের অতল গভীর থেকে টেনে তুলে সম্মান, শ্রদ্ধা ও মান মর্যাদার উচ্চ শিখরে সমাচীন করে দিয়েছে।
পাশাপাশি সকল অশ্লীলতার পথ রুদ্ধ করার জন্যই আল্লাহ তায়ালা পর্দা প্রথার ব্যবস্থা করেছেন। পর্দা অবাধ মেলামেশা বন্ধ করে আপন আপন কর্মক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকতে উদ্বুধ্য করে। ইসলামিক রীতিনীতিই নারী পুরুষের মাঝে ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। ইসলাম নারীকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী করেছে। পৃথিবীর অন্যকোনো ধর্মে এতো মর্যাদা দেয়া হয়নি। ইতিহাসের পাতা ঘাটলে সারা বিশ্বে নারীদের অবস্থা যে অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। তা সহজেই অনুমেয়। গ্রীক, রোম সভ্যতা কিংবা খৃষ্টিয় ইউরোপ সব যুগেই নারী হেয় ও লাঞ্ছিত ছিল। বাইবেলে তো নারী জাতিকে শয়তানের দালাল বলে অ্যাখায়িত করেছে। ফলে নারী সমাজকে সকল দিক দিয়ে চরম নির্যাতন ভোগ করতে হতো। আর্থিক দিক দিয়ে সম্পূর্ণ অসহায় রাখা হয়েছিল। অপরদিকে প্রাচীন ভারতেও নারী জাতি ঘৃণা, লাঞ্ছনা ও পাপের প্রতিমূর্ত ছিল। তৎকালীন হিন্দু সমাজ সতীদাহের মতো নিকৃষ্ট প্রথার প্রর্বতন করেন। যখন অন্যান্য নারীরা আর্থিকভাবে বঞ্চিত হয়ে পরাধীন হয়েছিল। তখন মুসলিম নারীরা সম্পত্তিতে অধিকার ও আর্থিক সঙ্গতির কারণে সম্মানজনক অবস্থা ছিল। ইসলামী শরিয়াহর ভিত্তিতে নারী উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদে অংশীদার হওয়ার কারণে পরাধীনতা ও স্বামীর উপর নির্ভরশীলতা সহনীয় ও সম্মাজনক করেছে। অন্যদিকে নারীদের ইজ্জত-আব্রু রক্ষা ও যাবতীয় দায়িত্বভারও পুরুষকেই দিয়েছে।
মূলত, লিবারেলিজম, সেকুলারিজম, মেটেরিয়ালিজম, ক্যাপিটালিজম ও কমুনিজম এর যৌথ প্রডাকশান হলো ফেমিনিজম। তারা নারী মুক্তির নামের নারীদেরই গলায় শেকল পরার মিশনে নেমেছে। নারীবাদ দ¦ারা আমাদের দেশের নারীরা প্রভাবিত হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। আমাদের দেশে নারীদের মাঝে জ্ঞান চর্চা ও সচেতনতার অভাব থাকায় সহজেই এসবের শিকার হন। অন্যদিকে আমাদের দেশে এখনও শিক্ষা, যৌতুকসহ নানান বিষয়ে বৈষম্য কিংবা নিযার্তনের শিকার হন। দেশে কর্মক্ষেত্র সহ বিভিন্ন পর্যায়ে হেনস্তার হতে হয়। এসব বন্ধে দেশে আইনিব্যবস্থার উন্নতি অপরিহার্য। অপরাধীকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চায় গুরুত্বারোপ সহ নারী অগ্রগতির জন্য বহুমুখী গবেষণা প্রয়োজন। যুগ সমস্যার সমাধানে ইসলামের সৃষ্টিশীলতার প্রয়োগ না করলে সামাজিক মূল্যবোধ তলানিতে ঠেকবে। প্রকৃতিবিরুদ্ধ ধ্যানধারণা পোষণ ও জীবনযাপনের কারণে নারীবাদ প্রভাবিত নারীরা অধিক হারে মানসিক রোগ ও জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে থাকে।
মুসলিম নারীদের উচিত তাদের সংস্কৃতি ও সুরুচির প্রভাবে সামাজিক জীবন সঞ্জীবিত ও আলোকিত করে তোলা। জীবনকে সুন্দর ও মনোরম করাই নারীত্বের পরিচয়। বহু আগে থেকে নারী মুক্তির আড়ালে মুসলিম আত্মপরিচয় গায়েব করার ষড়ষন্ত্র চলছে। কেননা, একটা সমাজ ধ্বংস করতে হলে দরকার হয় তার আর্দশ। যেমন, তার ধর্ম ও সংস্কৃতিকে মোকাবিলা করা। বিশেষ করে সমাজের উৎস মায়ের জাতি হয় প্রতিপক্ষের আক্রমণের শিকার। নারীকে ধ্বংস করা মানে সমাজ ও সংস্কৃতি বিধব্বংস করা।
লেখক : শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজ, জয়পুরহাট।