॥ সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা ॥
অনেক ত্যাগ কুরবানীর বিনিময়ে আমাদের অর্জিত স্বাধীনতার সুফল এখনো আমরা পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি। আমাদের জাতীয় জীবনে বড় বড় অর্জন থাকলেও রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে আমরা সেসব ধরে রাখতে পারিনি। ফলে স্বাধীনতার অন্যতম স্বপ্ন উদার গণতন্ত্র অনেকটা অধরাই রয়ে গেছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে সুস্থ্যধারার রাজনীতির চর্চার পরিবর্তে দুর্বৃত্তায়ন স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলো। প্রায় ১৬ বছরের অপশাসন-দুঃশাসনে আইন ও সাংবিধানিক শাসনের পরিবর্তে অবৈধ পেশীশক্তি, অনাচার সর্বোপরি সীমালঙ্ঘন সে স্থান দখল কর নিয়েছিলো। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছিলো লাঠিয়াল বাহিনী, বাজিকর ও অসৎপ্রবণদের নিয়ন্ত্রণে। দেশের রাজনীতিতে মেধা ও মনন চর্চার পরিবর্তে ‘নির্মূল’, ‘প্রতিরোধ’, ‘প্রতিহত করণ’ ও ‘চামড়া তোলা’র রাজনীতি শুরু হয়েছিলো। একই সাথে যুগপৎভাবে যুক্ত হয়েছিলো চামড়া বাঁচানোর রাজনীতি। রাজনীতি সেবামূলক কাজ হলেও একশ্রেণীর রাজনীতিকের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণেই নিজেদের আত্মরক্ষা ও চামড়া বাঁচানোই রাজনীতির প্রধান উপজীব্য হয়েছিলো। সে সময় মাঝে মাঝেই শোনা গেছে, ‘ক্ষমতায় না থাকলে কারো পিঠের চামড়া থাকবে না’। গণমানুষের কল্যাণের কথা বলে যখন রাজনীতি ক্ষমতা ও চামড়া বাঁচানোর অনুসঙ্গ হয়ে ওঠে, তখন সে রাজনীতি আর কোনভাবেই গণমুখী থাকে না বরং গণবিরোধী হয়ে ওঠে। যেমনটা হয়েছিলো আওয়ামী বাকশালী আমলের নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে।
এমন বাস্তবতায় আমাদের দেশের রাজনীতি নিকট অতীতে সংহতির পরিবর্তে বিভক্তি, ঘৃণা ও বিদ্বেষের পর্যায়ে পৌঁছেছিলো। সঙ্গত কারণেই রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বোধ-বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণেই প্রতিপক্ষের ওপর জুলুম-নির্যাতন, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য এমনকি নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যারকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে অবলীলায়। ফলে দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো পতিত স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে। সে সময় মূলত দেশে গণতন্ত্রের নামে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করা হয়। শাসকগোষ্ঠী মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশকে এক মাফিয়াতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করে। আন্তর্জাতিক বিশ্বের উদ্বেগও পরিস্থিতির সে সময়ের ভয়াবহতার কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন ভিসানীতি কার্যকরের ঘোষণা দেওয়ার পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি হলেও গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বলতে যা বোঝায় তা ছিলো প্রায় পুরোটাই অনুপস্থিত।
মূলত, আধুনিক বিশ্ব গণতান্ত্রিক বিশ্ব। গণতন্ত্রে ভিন্নমতের কারণে মানুষ হত্যা তো দূরের কথা অশ্রদ্ধা দেখানোরও কোন সুযোগ নেই। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নিয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্ন ব্যাখ্যা করলেও এর কোন অভিন্ন সংজ্ঞা এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। তবে গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় রবার্ট ডাল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পলিয়ার্কি: পার্টিসিপেশন অ্যান্ড অপজিশন’-এ একটি অতি প্রাণবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন। রবার্ট ডালের মতে, গণতন্ত্র বা বহুজনের শাসনব্যবস্থার কতগুলো মৌলিক উপাদান রয়েছে। সেগুলো হলো, সরকারে সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত কর্মকর্তা থাকা; নিয়মিত, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন; সব পূর্ণবয়স্কের ভোটাধিকার এবং নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা; সরকার বা কোনো একক গোষ্ঠীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এমন উৎসের বিকল্প থেকে তথ্য পাওয়ার সুযোগ এবং সংগঠনের স্বাধীনতা। ডালের এ সংজ্ঞা বা বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও গুণাগুণ বিচারে এগুলোই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মানদ-। কিন্তু আমাদের দেশে যে ধরনের গণতন্ত্র চালু আছে তা ডালের সংজ্ঞার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয় বরং তার পুরোপুরি বিপরীত। সঙ্গত কারণেই আমরা একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বৈশি^ক প্রতিযোগিতায় অনেকটাই পিছিয়ে।
এ বিষয়ে বুয়েটিয়ান আবরার হত্যার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। শহীদ আবরারের অপরাধ ছিলো তিনি একটি বিষয় নিয়ে তার উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। এটি তার সাংবিধানিক অধিকার। হয়তো তার উপলব্ধিটা কারো কারো কাছে পছন্দ হয়নি। কারো অভিব্যক্তি অপছন্দ করাও ব্যক্তির নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। কোন অভিব্যক্তির প্রতিঅভিব্যক্তি প্রকাশের অধিকার সকলের রয়েছে। কিন্তু সে অভিব্যক্তিতে যদি পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়, তাহলে তা আর অভিব্যক্তি থাকে না বরং তা দানবীয় ও পাশবিক কর্ম হিসেবেই বিবেচ্য হয়। আইন ও সংবিধান এভাবে মানুষ হত্যার লাইসেন্স কাউকে দেয়নি। যদিও এ অশুভ প্রবণতা খুব একটা অভিনব নয় বরং বেশ আগেই থেকেই প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ পিটিয়ে হত্যার রাজনীতি আমাদের দেশে শুরু হয়েছে। কিন্তু এসব হত্যাকা-ের বিচার হচ্ছে না বরং ক্ষেত্রবিশেষে এসব হন্তারকরা পুরস্কৃতই হয়েছে।
আমাদের দেশ সাংবিধানিকভাবেই গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই ও প্রাণশক্তিই হচ্ছে বাকস্বাধীনতা। আমাদের সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘Freedom of thought and conscience is guaranteed.’ অর্থাৎ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। ৩৯(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘The right of every citizen to freedom of speech and expression are guaranteed.’ অর্থাৎ ‘প্রত্যেক নাগরিকের বাক-ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের নিশ্চয়তা দান করা হইল’। তাই যেকোন বিষয় নিজস্ব মতামত প্রকাশ তার সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার। কারণ, আমাদের সংবিধান সকল শ্রেণীর নাগরিকের জন্য সমঅধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। কিন্তু রাষ্ট্র নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। যা আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
মূলত, বাকস্বাধীনতা হচ্ছে ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের; নির্ভয়ে, কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছাড়াই, অনুমোদন গ্রহণের বাধ্যতা ব্যতিরেকে নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার স্বীকৃত মূলনীতি। ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ (freedom of expression) শব্দপুঞ্জটিকেও কখনও কখনও বাকস্বাধীনতার স্থলে ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ি অভিব্যক্তির স্বাধীন প্রকাশকে শনাক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ‘প্রত্যেকের অধিকার আছে নিজের মতামত এবং অভিব্যক্তি প্রকাশ করার। এ অধিকারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে নিজের স্বাধীনচেতায় কোনো বাধা ব্যতীত অটল থাকা; বিশ্বের যে কোনো মাধ্যম থেকে যে কোনো তথ্য অর্জন করা বা অন্য কোথাও সে তথ্য বা চিন্তা মৌখিক, লিখিত, চিত্রকলা অথবা অন্য কোনো মাধ্যম দ্বারা জ্ঞাপন করার অধিকার’।
ভিন্নমত গণতন্ত্রের অন্যতম অনুসঙ্গ ও জীবনী শক্তি। আমাদের দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও ভিন্নমত পোষণ সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হলেও শুধু ভিন্নমত প্রকাশের কারণেই বিরোধীদের ওপর সরকারের ব্যাপক দলন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে নিকট অতীতে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবী মামলা, হয়রানীমূলক গ্রেফতার এবং কথিত রিমান্ডের নামে নির্মম ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে। মূলত, আমাদের দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সমাজের সব ক্ষেত্রেই পরমত সহিষ্ণুতার অভাবেই ভিন্নমত প্রকাশ বা সরকার বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোন মতামত প্রকাশকে ইতিবাচক মনে করা হয় না। আসলে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার অভাব, সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের কার্যকর শক্তি হয়ে ওঠার ব্যর্থতা এবং নাগরিক সমাজের নিষ্ক্রিয়তা ও পলায়নপর মনোভাব এবং রাজনীতির প্রান্তিকতাই এজন্য প্রধানত দায়ী। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই এ অশুভ বৃত্ত থেকে আমরা কোনোভাবেই বেড়িয়ে আসতে পারছি না বরং দিন যতই যাচ্ছে অবস্থার আরও অবনতিই হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন আশাবাদের সৃষ্টি হলেও আশাহত হওয়ার মত অনুষঙ্গও বিদ্যমান।
এক সময় শুধুমাত্র ভিন্নমত বা রাজনৈতিক মত পার্থক্যের কারণে মানুষ পিটিয়ে হত্যা ঘটনাকে বরাবরই ধিক্কার জানানো হলেও সার্বিক পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দূতাবাস থেকেও এমন সব নিন্দনীয় ঘটনার নিন্দা জানানো হলেও সংশ্লিষ্টদের টনক নড়তে দেখা যায়নি। অথচ তদানীন্তন সরকার সরকার বরাবরই দাবি করেছে যে, তারা সারাবিশ্বে নিজেদেরকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এতোকিছুর পরও তদানীন্তন সরকার প্রধান তো শান্তির জন্য ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ পুরস্কারও লাভ করেছিলেন। কিন্তু এসব অর্জনের সাথে আমাদের দেশের বাস্তবতার কোন মিল ছিলো না। বস্তুত, নিজেদের আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই রাজনীতিতে একেবারে প্রান্তিকতায় ঠেলে দেয়া হয়েছিলো। ভিন্নমতের প্রতি পরিকল্পিতভাবে ঘৃণা ছড়ানো ও দলন-পীড়নের কারণে আমাদের দেশের রাজনীতি এতটা প্রান্তিকতায় নেমে এসেছে। ভিন্ন মতালম্বীদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মনে না করে একেবারে জানপ্রাণের শত্রু মনে করা হচ্ছে।
মূলত, পরমত সহনশীলতা গণতন্ত্রের মূল উপাদান। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের কতিপয় অধিকার সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র কোনো অজুহাতেই এ দায়িত্ব উপেক্ষা করতে পারে না। প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক ৩ ধরনের অধিকার ভোগ করবে-১. সামাজিক অধিকার, ২. রাজনৈতিক অধিকার এবং ৩. অর্থনৈতিক অধিকার। নিম্নে নাগরিক অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হলো :
সামাজিক অধিকার : জীবন ধারণের অধিকার. ২. ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার, ৩. মতপ্রকাশের অধিকার, ৪. সভা-সমাবেশ করার অধিকার, ৫. সম্পত্তি ভোগের অধিকার, ৬. ধর্মীয় অধিকার, ৭. আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, ৮. চুক্তির অধিকার, ৯. ভাষার অধিকার, ১০. পরিবার গঠনের অধিকার ও ১১. শিক্ষা লাভের অধিকার।
রাজনৈতিক অধিকার : ১. ভোটাধিকার, ২. প্রার্থী হওয়ার অধিকার, ৩. অভিযোগ পেশ করার অধিকার, ৪. সমালোচনার করার অধিকার, ৫. চাকুরী লাভের অধিকার ও ৬. বসবাসের অধিকার।
অর্থনৈতিক অধিকার : কাজের অধিকার, ২ উপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভের অধিকার, ৩. অবকাশ যাপনের অধিকার, ৪. সংঘ গঠনের অধিকার ও ৫. রাষ্ট্র প্রদত্ত প্রতিপালনের অধিকার ইত্যাদি।
গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র জনগণের শাসন, শাসক গোষ্ঠীর জবাবদিহিতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে সরকার মোটেই গুরুত্ব না দিয়ে তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্যই গণতান্ত্রিক সকল রীতিনীতি উপেক্ষা করছে। যা আমাদের জন্য রীতিমতো অশনি সংকেত। তাই সার্বিক দিক বিবেচনায় দেশ ফ্যাসিবাদী শাসনের দিকে ধাবিত হচ্ছে কি না সে প্রশ্নের কোন সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
মূলত, পুঁজিবাদ, সম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া মহাজনী মূলধনের চরম জাতীয়তাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল ও সন্ত্রাসমূলক প্রকাশই হচ্ছে ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ চরম জাতীয়তাবাদী, অযৌক্তিক ধর্ম ও বর্ণ বিদ্বেষ এবং উদ্দেশ্য সাধনে চরম বর্বরতার আদর্শ প্রচার করে। ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদের চরম সঙ্কটের পরিচয় বাহক। সম্রাজ্যবাদী যুগ হচ্ছে পুঁজিবাদের চরম যুগ। জাতীয় ক্ষেত্রে পুঁজিবাদের বিকাশ যখন নিঃশেষিত, তখন পুঁজিবাদ নিজের শোষণমূলক ব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্য সম্রাজ্যবাদী চরিত্র গ্রহণ করে।
ফ্যাসিবাদের মূলনীতি : ক. প্রথমত, ফ্যাসিবাদ গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল নয়। মূলত ফ্যাসিবাদ ছোট, মধ্যম, বড় এবং সর্বোচ্চ নেতা যা আদেশ করবেন, তাই রাষ্ট্রের আদেশ বলে নির্বিবাদে মেনে নিতে হবে।
খ. ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রেও অবিশ্বাস করে না।
গ. ফ্যাসিবাদে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বতন্ত্র স্বীকৃত হয় না। ফ্যাসিবাদের মূলমন্ত্র হলো সবকিছুই রাষ্ট্রের আওতাভুক্ত, কোনো কিছুই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয় বরং কোনো কিছুই রাষ্ট্রের বাইরে নয়।
ঘ. ফ্যাসিবাদ শান্তি কামনা করে না বরং নিয়ত সংগ্রামে লিপ্ত থাকার অনুপ্রেরণা যোগায়। মুসোলিনির মতে, মহিলাদের নিকট যেমন মাতৃত্ব, পুরুষদের নিকট তেমন যুদ্ধ-বিগ্রহ।
ঙ. ফ্যাসিবাদে একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং দলীয় নেতা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে আসীন হন। একদল ও একনেতা সরকারের এবং সমাজের সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন।
চ. ফ্যাসিবাদে এলিট শ্রেণীর শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্বাস করা হয় যে, পৃথিবীতে কিছু ব্যক্তি শাসন করতে এবং শাসিত হওয়ার জন্য জন্মগ্রহণ করে।
আমাদের সংবিধানে বহুদলীয় গণতন্ত্র স্বীকৃত হলেও পতিত ফ্যাসিবাদী আমলে এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়নি। বিশেষ করে ভিন্নমতের ওপর দলন-পীড়ন সেদিকেই অঙ্গলী নির্দেশ করে। ভিন্নমত গণতন্ত্রেরই সৌন্দর্য। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই সে সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি বরং আমাদের দেশের গণতন্ত্র এখন প্রান্তিকতায় নেমে এসেছে। ফলে দেশে ফ্যাসিবাদ ও নৈরাজ্যবাদ স্থায়িত্ব পায় কি না সে আতঙ্কে ভুগছেন দেশের আত্মসচেতন মানুষ।
দেশে অবাধ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার অভাবেই দেশে বারবার রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে না এমন অভিযোগ এখন শুধু অভ্যন্তরীণ বৃত্তেই সীমাবদ্ধ নেই বরং তা দেশের গ-ি পেড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিম-লে স্থান করে নিয়েছিলো। এমন বাস্তবতায় দেশের মানুষ আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রীতিমত শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি সে সময় আন্তর্জাতিক বিশে^ও আমরা ছিলাম প্রায় বন্ধুহীন। মার্কিন ভিসানীতি কার্যকরের মাধ্যমে সে কথা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠে। কিন্তু জুলাই বিপ্লব আমাদের জাতীয় জীবনে নতুন আশাদের সৃষ্টি করেছিলো।
মনে করা হয়েছিলো জুলাই বিপ্লবোত্তর দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা অবারিত হবে। কিন্তু বিপ্লবের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন বিতর্কমুক্ত করা যায় না বরং ব্যাপক কারচুপীর অভিযোগ উঠেছে ছাত্র-জনতার ‘রক্তে অর্জিত’ এ নির্বাচনে। এমনকি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অভিযোগে অভিযুক্ত এ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারও এখন স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার ছিন্দ্রপথ খুঁজতে শুরু করছে বলেই দৃশ্যত মনে করা হচ্ছে। যা আমাদের স্বাধীনতা ও জুলাই বিপ্লবের চেতনার সাথে একেবারেই সঙ্গতিহীন। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই ক্ষমতাসীনদের এ অশুভ বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। অন্যথায় জাতি আমাদেরকে ক্ষমা করবে না।
www.syedmasud.com