ইয়াসিন মাহমুদ

বিগত ১৭ বছর আওয়ামী দুঃশাসনের কবল থেকে মানুষ মুক্তির জন্য পথ খুঁজেছে হন্যে হয়ে। অবশেষে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের হাত থেকে রক্ষা পায় দেশ ও দেশের মানুষ। দেশের মানুষ কেন আওয়ামী লীগের হাত থেকে মুক্তি চেয়েছিল? কী ঘটেছিল আওয়ামী শাসনামলে?

তৎকালীন মঈনুদ্দীনÑফখরুদ্দীন সরকারের পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে ২০০৯ সালে। বলা যায় এটা ছিল একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ইলেকশন। ক্ষমতায় আসার পরপরই আওয়ামী লীগ পিলখানায় দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে। এর মাধ্যমে শুরু হয় তাদের ক্ষমতার অপরাজনীতি। তারপর বিরোধী দলের নেতাÑকর্মীদের প্রতি শুরু করে অত্যাচারের কষাঘাত হানতে। জামায়াতÑবিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাÑকর্মীরা ছিল টার্গেটে। জেল-জুলুম, রিমাণ্ড, গুম, খুন ছিল নিত্যদিনের রুটিন ওয়ার্ক। যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে। জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদেরকে অন্যায়ভাবে ফাঁসিতে ঝুলায়। যুদ্ধাপরাধের এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক প্রশ্নÑজিজ্ঞাসা রয়েছে এখনও। এটা যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এই বিচার প্রক্রিয়ার পুরোটায় গোয়েবসলীয় অবস্থা। অনেকটা সাজানো নাটক। বিবাদীর স্বাক্ষীকে পর্যন্ত গুম করেছিল সরকার। অনেককে জোর করে সরকারের পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। সেই মঞ্চের কর্মসূচিকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে জনজাগরণের দাবি বলে প্রচার করা হয়েছিল মিডিয়ায়। এই মঞ্চ পরিচালিত হতো সম্পূর্ণ সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায়। সরকারের অ্যাসাইনমেন্টগুলো শুধু বাস্তবায়ন করতো ইমরান সরকার ও তার সহযোগীরা। সময়ের কি নির্মম পরিহাস ডা. ইমরান এইচ সরকার ও লাকী খাতুনেরা কেউ আর নেই শাহবাগে কিংবা দেশের মাটিতে। আওয়ামী লীগ সরকার দ্বারা কেবলই তারা ব্যবহৃত হয়েছে । দেশ ও মানুষের উন্নয়নে কোনো ভূমিকা নেই এই ইমরান এইচ সরকারদের। অথচ সরকারের তোষামোদী মিডিয়াগুলো ইমরান এইচ সরকারকে বানিয়ে ছিল তরুণদের আইকন। দেশ নায়ক। প্রিন্ট মিডিয়া খুললেই কভার স্টোরি করা হতো তার ছবি দিয়ে। ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় ছিল বুলেটিন নিউজ। গুটিকয়েক মানুষের সমাগমকে বানানো হতো জনস্রোত। এভাবে মিডিয়া সন্ত্রাস চলতো সর্বক্ষণ। কী দিন ছিল আহ-হা! আজ আর কেউ ভুলেও ইমরান এইচ সরকারদের নাম নিতে চায় না।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জামায়াত নেতা কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী মিন্টু, বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড অন্যায়ভাবে কার্যকর করে। জেলে আটকরত অবস্থায় বিনা চিকিৎসায় ও নানা নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেন বিশ্ব বরেণ্য ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মাওলানা এ কে এম ইউসুফ, অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা আব্দুস সোবহান, অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল খালেক মন্ডল প্রমুখ।

তাদেরকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাদেরকে এদেশের দেশপ্রেমিক মানুষ কখনোই ভুলবে না। তারা থাকবে ইতিহাসে। তারা থাকবে মানুষের চেতনায়-প্রেরণায়। আর আওয়ামী সরকার ও তার প্রেতাত্মাদের প্রতি মানুষের ঘৃণা থাকবে চিরকাল।

বিরোধী দলের নেতাÑকর্মীদেরকে মানুষই মনে করা হতো না আওয়ামী জাহিলিয়াতের শাসনামলে। ছিল না তাদের কোনো অধিকার। তাদের ঘরÑবাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভাঙচুর করা, লুটপাট ও দখলের উৎসব চলতো সব সময়। ছিল না রাজনৈতিক সভাÑ সমাবেশের অনুমতি। এ যেন স্বাধীন দেশের পরাধীনতার শৃঙ্খল।

শাপলা চত্বরে রাতে আঁধারে হত্যা করা হয় নিরীহÑনিরস্ত্র আলেম সমাজকে। বিভিন্ন জায়গায় অভিযানের নামে ক্রসফায়ারে গণহারে মানুষ হত্যার উৎসব করতো আওয়ামী প্রশাসন।

চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, ইভটিজিং, অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি, মাদক ও চোরাচালানের উৎসবে মেতে থাকতো আওয়ামী লীগের নেতাÑকর্মীরা। কত নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষ তাদের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন; জীবন বিলিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই।

ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধকে ধ্বংসের পাঁয়তারা ছিল সব সময়। ওয়াজ মাহফিলে বাধা ও ১৪৪ ধারা জারি করা, দাড়িÑটুপিওয়ালা ব্যক্তি ও পর্দানশীন নারীদেরকে নানাভাবে হয়রানি করা হতো। আলেম ওলামাদেরকে নির্যাতন ও হত্যা করা হতো দিদারসে। ধর্মদ্রোহী ও নাস্তিকদের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ছিল সরকারের প্রশ্রয় ও বাড়তি সুবিধা প্রদান। ফলে তারা আল্লাহ, রাসূল ও ইসলামকে নিয়ে কটূক্তিতে মজে থাকতো সব সময়। কুরআনÑহাদীস ও ইসলামী সাহিত্যকে জিহাদী বই হিসেবে অপপ্রচার করে এদেশের তৌহিদী জনতাকে নানাভাবে নির্যাতন করা হতো। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদরাসা শিক্ষার্থীদেরকে ভর্তিতে বাধা প্রদান, ধর্মীয় মূল্যবোধ পরিপন্থী শিক্ষানীতি প্রণয়ন, মূর্তি ও ভাস্কর্যের নামে ইসলামের অবমাননার কর্মসূচি ছিল নিয়মিত। ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখলও বন্ধ করা ছিল খায়েশের অভিপ্রায় মাত্র।

সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর ভাঙচুর, দখল, সংখ্যালঘু নারীদেরকে ধর্ষণ, হেনেস্তা, প্রতিমা ভাঙচুরসহ নানাভাবে হয়রানি করতো আওয়ামী লীগের নেতাÑকর্মীরা। প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারে দায় চাপানো হতো বিএনপিÑজামায়াতের নেতাÑকর্মীদের ওপর। এবং মিডিয়ায় প্রচার করা হত বিএনপিÑজামায়াতের হাতে এদেশের সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নয়। এভাবে জঘন্য মিথ্যাচার করা হতো।

সরকারের সমালোচনা করে নিউজ করলে সেই সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম সরকারের টার্গেটে পরিণত হতো। সরকার তার অনুগত মিডিয়া হাউজ ও সাংবাদিকদেরকে বিভিন্ন সুযোগÑসুবিধা দিতো। অন্যদিকে ভিন্নমতের মিডিয়া ও সংবাদকর্মীরা ছিল ব্ল্যাক লিস্টে। এমনকি অনেক মিডিয়া হাউজের লাইসেন্স বাতিল, সংবাদকর্মীকে জেলে আটক করা ও হত্যা করার মতো নৃশংসতা ঘটেছে অহরহ।

ব্যাংকিং সেক্টরে অবাধ লুটপাট, অর্থ পাচার, শিক্ষা-চিকিৎসাসহ প্রতিটি সেক্টরকে চরম দুর্নীতির আখড়াখানায় পরিণত করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। ভারতীয় আধিপত্যের কাছে নতজানু হয়ে দেশবিরোধী যুক্তি করে দেশকে ভারতের সেবাদাসে পরিণত করা হয়েছে। যা একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক কখনো মেনে নিতে পারে না।

আয়নাঘর। বিগত ১৭ বছর পুরো বাংলাদেশটায় ছিল আয়নাঘর। সরকারের পক্ষে সাফাই না গাইলে তিনি সরকারের চক্ষুশূলে পরিণত হতেন। মানুষের প্রতি কী অমানবিক আচরণ করা হতো ভাবা যায়! একজন মানুষকে বিনাদোষে গুম করা হতো। তাকে কোথায় রাখা হয়েছে তা বলা হতো না। তার স্বজনেরাও জানতেন না তার প্রিয়জন কোথায় আছে। আর স্বয়ং শেখ হাসিনা নিজেই এমন অপকর্মে সম্পৃক্ত থাকতেন। নেতৃত্ব দিতেন। এইসব নৃশংস অপকর্ম করে উল্লাস করতেন। বিনা কারণে একজন মানুষের প্রতি এমন বর্বরতা ভাবা যায়। এ যেন আইয়ামে জাহেলিয়াতকেও হার মানায়। অবশ্য, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের বদৌলতে গুম হওয়া কিছু ব্যক্তিরা তাদের স্বজনের কাছে ফিরছেন। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে। ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, হাফেজ জাকির হুসাইন, আল মুকাদ্দাস, ওয়ালী উল্লাহসহ এখনো অনেকে ফিরে আসেননি। তারা কোথায় আছেন, কিভাবে আছেন তার কোনো হদিস কেউ দিতে পারেননি আজো।

দীর্ঘ সংগ্রামÑআর রক্তের বিনিময়ে আওয়ামী জাহেলিয়াতের অপশাসন থেকে বাংলাদেশ আপাতত মুক্ত হয়েছে। মুক্ত হয়েছে এদেশের মানুষ। জনগণ অন্তত ভোট দেবার একটা পরিবেশ পেতে যাচ্ছে। তাদের নাগরিক মতামত পেশের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। অবশ্য, জুলাই বিপ্লবের পর যে ধরনের ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশ পাবার কথা ছিল সেটা এখনো হয়ে ওঠেনি। এখনও প্রশাসনের ভেতরেÑবাইরে আওয়ামী ফ্যাসিস্টের প্রেতাত্মারা নেতৃত্বে রয়েছেন।

আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এয়োদশ সংসদ নির্বাচন। এবারই সুযোগ সুশাসন প্রতিষ্ঠার। জনগণের সরকার গঠনের মোক্ষম সময়। আর এর ব্যত্যয় ঘটলে বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্যাকাশের কালো মেঘ দূর হতে বহু সময় গড়িয়ে যাবে।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে ছাত্রÑজনতা জীবন দিয়েছেন একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রত্যাশায়। একটি ইনসাফের বাংলাদেশ কায়েমের স্বপ্ন নিয়ে। যদি জনগণকে তাদের ভোট প্রয়োগের সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ না দেয়া হয়। যদি পেশিশক্তির আধিপত্যকে দমনো না যায়। তাহলে শেখ হাসিনার বিদায় কিংবা আওয়ামী লীগকে পতনের মাধ্যমে এদেশের মানুষ যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন সে স্বপ্ন অধরা রয়ে যাবে।

লেখক: কবি ও গবেষক