মো: রিশাদ আহমেদ
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। ধান, মাছ, ডিম, সবজি-সব ক্ষেত্রেই উৎপাদনে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতিও রয়েছে। অথচ মাঠে শস্যভরা থাকলেও কোটি মানুষের হাঁড়ি আধা-ভরা। শিশু অপুষ্টিতে কাতর, শ্রমিক পেটের ভাত কমিয়ে দিন পার করছে। এ বৈপরীত্যই আজ জাতীয় প্রশ্ন-স্বয়ংসম্পূর্ণতার মাঝেও কেন ক্ষুধার্ত মুখ?
সরকারি তথ্য বলছে, চাল ও সবজির উৎপাদন জাতীয় চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে দেখা যায়, গ্রামীণ অঞ্চলের প্রায় ৩০ শতাংশ পরিবার প্রতিদিন তিনবেলা খাবার নিশ্চিত করতে পারে না। শহরের বস্তিবাসী বা দিনমজুরের অবস্থাও একই। UNICEF-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, পাঁচ বছরের নিচে ২৮ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির, আর ১০ শতাংশ মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। উৎপাদনের সাফল্যের পরও এ বাস্তবতা কেবল অস্বস্তিকর নয়, বরং গভীর সংকেত দেয়-সমস্যা আসলে অন্যত্র।
প্রথমত, আয়ের বৈষম্য ব্যাপক। বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো নিম্নআয়ের ফাঁদে আটকে। দ্বিতীয়ত, বাজারে অস্থিতিশীলতা ও মুদ্রাস্ফীতি দরিদ্রদের খাদ্য থেকে বঞ্চিত করছে। তৃতীয়ত, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতায় প্রতিবছর প্রচুর ফসল নষ্ট হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, যেখানে কৃষক ন্যায্যমূল্য পায় না, আর ভোক্তাকে বেশি দামে কিনতে হয়। সবশেষে, খাদ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্যের ঘাটতি মানুষকে পুষ্টির ঘাটতিতে ফেলছে। ফলে প্রাচুর্যের মাঝেই ক্ষুধা থেকে যাচ্ছে স্থায়ী বাস্তবতা।
এ অবস্থার সমাধান একক কোনো পদক্ষেপে সম্ভব নয়। সংরক্ষণ ও সরবরাহ চেইনের আধুনিকায়ন করতে হবে, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সমবায় ও ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কর্মসংস্থান বাড়ানো দরকার। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যভাতা, স্কুল মিল প্রোগ্রাম ও নগদ সহায়তা সম্প্রসারণ প্রয়োজন। একইসঙ্গে চালের পাশাপাশি ডাল, দুধ, ডিম, শাকসবজি ও মাছ উৎপাদন বাড়িয়ে পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করতে হবে।
বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনের সাফল্য নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। কিন্তু শস্যভরা মাঠের পাশে ক্ষুধার্ত শিশু জাতির জন্য এক নৈতিক ব্যর্থতা। ক্ষুধা শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। তাই এখনই উৎপাদন, বণ্টন ও পুষ্টি-তিন ক্ষেত্রেই বড় সংস্কার জরুরি। তাহলেই আমরা সত্যিকারের ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারব।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।