মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলী আগ্রাসী বাহিনী ন্যক্কারজনক হামলার কারণে ইরানের সঙ্গে এ দু’টি দেশের মধ্যে সর্বাত্মক প্রথাগত যুদ্ধ শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল, এ যুদ্ধ হয়তো ক্ষণস্থায়ী হবে। কারণ মার্কিন-ইসরাইল বাহিনীর লক্ষ্য ছিল ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করা। তারা ভেবেছিল,খামেনিকে হত্যা করা গেলেই ইরানের জনগণ রাস্তায় নেমে আসবে ইরানি শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর জন্য। তারা তাদের বশংবদ এবং আজ্ঞাবাহি সরকারকে ইরানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসিয়ে উদ্দেশ্য সাধন করতে পারবে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সে আশা হতাশায় পরিণত হয়েছে। ইরানকে এত সহজে কাবু করা যাবে না এটা তারা ভাবতে পারেনি। এ যুদ্ধে জড়িত হয়ে ইসরাইলকে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেকেও ক্ষতির দায় নিতে হচ্ছে।

ইরান ঘোষণা করেছে, মধ্যপ্রচ্যের যেসব মুসলিম দেশ এ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে ইরানের বিরোধিতা করবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের বাহিনীকে সহায়তা করবে তাদের উপরও হামলা চালানো হবে। আগে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যতবার সংঘাত দেখা দিয়েছে ইরান কখনোই কোন মুসলিম দেশের ওপর আক্রমণ করেনি। ইরানি ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণে ইরানের জনগণকে সরকার বিরোধী করে তোলা যায়নি বরং তারা আগের চেয়ে আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ এবং মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। ইরান চাচ্ছে এই যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদি হোক। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে যুদ্ধ শীঘ্রই শেষ হোক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলকে এক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন।

মার্কিন-ইসরাইল যৌথ বাহিনী ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্র যে উদ্দেশ্য সাধন করতে চেয়েছিল আপতত তা হচ্ছে না। যুদ্ধের গতি যেভাবে প্রবাহিত হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে এ যুুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদি হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল তাদের উদ্দেশ্য সাধন করতে না পারলেও তারা বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে সক্ষম হয়েছে। করোনা উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল তখন শুরু হয় ইউক্রেন যুদ্ধ। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বিপর্যস্ত হয়। জ¦ালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ¦ালানি তেল সাধারণত ৬০ থেকে ৬৫ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণ প্রতি ব্যারেল জ¦ালানি তেলের মূল্য ১৩৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ¦ালানি তেলের মূল্য অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ¦ালানি তেল ৬৫ মার্কিন ডলারে বিক্রি হচ্ছিল। যুদ্ধের কারণে জ¦ালানি তেলের মূল্য ইতিমধ্যেই ১০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করে গেছে। জ¦ালানি বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, যুদ্ধ যদি ৬ মাস স্থায়ী হয় তাহলে জ¦ালানি তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ১৫০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করে যেতে পারে। বাংলাদেশে গ্যাস পাওয়া গেলেও জ¦ালানি তেল পাওয়া যায় না। জ¦ালানি তেলের জন্য আমাদের বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়।

ইরান-মার্কিন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। পণ্য রপ্তানি আয় কমে যাবে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বাংলাদেশি পণ্য আমদানি করে থাকে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের ক্ষেত্রে জনশক্তি রপ্তানি খাত বিশেষ অবদান রাখছে। পণ্য রপ্তানি খাত এখনো সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করলেও উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ কাঁচামাল,ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে চলে যায়। কিন্তু জনশক্তি রপ্তানি খাতে যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় তার প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ স্ফিত হবার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে প্রবাসী আয়। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১১০ টাকায় নির্ধারণ করে রাখার ফলে প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স দেশে প্রেরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। কারণ সেই সময় কার্ব মার্কেটে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ থেকে ১২৩ টাকা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার পর্যায়ক্রমে বাজারভিত্তিক করার ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা হুন্ডির পরিবর্তে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণ করতে থাকে। ফলে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আহরণ করতে সক্ষম হয়। চলতি অর্থবছরেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল উল্লেখ করার মতো। প্রতি মাসে গড়ে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে বছর শেষে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩৫/৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হতে পারে। কিন্তু শঙ্কা সৃষ্ট হয়েছে ইরান-মার্কিন সংঘাতের কারণে। যুদ্ধের কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিপাকে পড়েছে। অনেকেই ছুটিতে দেশে বেড়াতে এসে এখন যুদ্ধের কারণে বিদেশে গিয়ে কর্মস্থলে যোগদান করতে পারছেন না। গত ১১ মার্চ পর্যন্ত সময়ে হযরত শাহজালাল বিমান বন্দর থেকে ৩৯১ টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। একটি সূত্র মতে, যুদ্ধের কারণে ৭০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির প্রধান গন্তব্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচের ৬টি মুসলিম দেশ। কিন্তু এসব দেশে এখন যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে তারা নতুন করে কোন জনশক্তি আমদানি করছে না। উপরন্তু আগে থেকে যারা কর্মরত আছে তাদের ছাঁটাই করার পরিকল্পনা করছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে খাত সবচেয়ে অবহেলিত অবস্থায় বিকশিত হচ্ছে তা হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানি খাত। এ খাতে যারা ব্যবসায়রত আছেন তাদের একটি বড় অংশই নানাভাবে বিদেশগামীদের সঙ্গে প্রতারণা করে থাকেন। আশেপাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির ব্যয় সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বিগত শতাব্দীর সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে। কিন্তু এ খাতটি এখনো সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বিগত সরকার আমলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে জি-টু-জি পদ্ধতিতে জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সরকার সমর্থকগোষ্ঠী নানাভাবে এ উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য জনশক্তি রপ্তানি খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ খাতের সমস্যাও বেশি। সীমিত সংখ্যক গন্তব্যের ওপর জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রম অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অর্থনীতিবিদ এবং জনশক্তি রপ্তানি বিশেষজ্ঞগণ ইতিপূর্বে একাধিকবার জনশক্তি রপ্তানি গন্তব্য বাড়ানোর জন্য পরামর্শ দিলেও তা কার্যকর করা হয়নি। বাংলাদেশ থেকে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বিদেশে কর্মসংস্থান করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি রয়েছে সৌদি আরবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ৫৩ দশমিক ৯২ শতাংশই সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাংলাদেশি। ওমানে রয়েছে ১৫ দশমিক ৮১ শতাংশ বাংলাদেশি। মালয়েশিয়ায় রয়েছে ৪ দশমিক ৪১ শতাংশ বাংলাদেশি। মধ্যপ্রচ্যের দেশগুলোতে সাধারণত শ্রমিকের মজুরির হার তুলনামূলকভাবে কম। ইউরোপের উন্নত দেশে মজুরির হার অনেক বেশি। কিন্তু এসব দেশে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির হার তুলনামূলকভাবে কম। উন্নত দেশগুলোতে প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ জনবলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ মূলত অদক্ষ এবং অপ্রশিক্ষিত জনশক্তি রপ্তানি করে থাকে। ২০২৩ সালে প্রবাসে অবস্থান এবং কর্মরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ৭১ দশমিক ৫৯ শতাংশই ছিল স্বল্পদক্ষ শ্রমিক। আসলে এরা অদক্ষ শ্রমিক। দক্ষ শ্রমিকের হার ছিল ২২ দশমিক ২২ শতাংশ। পোশাজীবীর হার ছিল শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ। দক্ষ এবং পেশাজীবী বিদেশে প্রেরণ করা গেলে এই খাতের আয় অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব হতো।

ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাত নিশ্চিতভাবেই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। যারা ছুটিতে দেশে এসেছেন তারা নির্ধারিত সময় পর কর্মস্থলে যোগদান না করতে পারলে চাকরিচ্যুৎ হবার আশঙ্কা থাকবে। নতুন করে জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রমে মন্থরতা দেখা দেবে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গমনের জন্য ছাড়পত্র গ্রহণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসের প্রথম ১০ দিনে মোট ৪৬ হাজার ৭৪৪জন বিদেশে গমনের জন্য ছাড়পত্র নিয়েছিল। এবছর একই সময়ে বিদেশ গমনের জন্য ছাড়পত্র গ্রহণ করেছে মাত্র ২১ হাজার ১২ জন। আগে বাংলাদেশ থেকে মোট ১৬৮টি দেশে জনশক্তি রপ্তানি করা হলেও গত বছর ১৪১টি দেশে জনশক্তি রপ্তানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ জনশক্তি রপ্তানি করা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ৫টি মুসলিম দেশে। বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য হচ্ছে সৌদি আরব। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের শ্রম বাজার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ যদি প্রত্যাশিত মাত্রায় জনশক্তি রপ্তানি করতে না পারে তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পরবে।

সরকারি পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান জনশক্তি রপ্তানি বাজার ধরে রাখার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানির জন্য সম্ভাবনাময় নতুন নতুন গন্তব্য খুঁজে বের করতে হবে। একই বাংলাদেশ থেকে পেশাজীবী, যেমন, ডাক্তার, প্রকৌশলী ইত্যাদি পেশার জনবল রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে। কোনভাবেই জনশক্তি রপ্তানি খাতকে বিপর্যস্ত হতে দেয়া যাবে না। জনশক্তি রপ্তানি খাত শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে তা নয় এই খাত একই সঙ্গে বেকার সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।