আসাদুজ্জামান খান মুকুল
বাংলাদেশের ছয়টি ঋতু, প্রতিটিই নিজস্ব বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। তার মধ্যে হেমন্ত ঋতু যেন একটু বেশি বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয় এবং বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড়ভাবে জড়িত। শরতের শুভ্রতা ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকলে হেমন্ত আসে। তখন মাঠে থাকে ধানের সোনালি ঢেউ, সর্ষে ফুলের হলুদ হাসি, শিশিরভেজা ঘাসের ওপর সূর্যের আলো ঝলমল করে ওঠা- সব মিলিয়ে এক দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ নিয়ে হেমন্ত ঋতু গঠিত। শরতের বিদায়ের পরেই এ ঋতুর আগমন, আর হেমন্তের পরে আসে শীত। শীতের আগমনী বার্তা জানান দেয় এ ঋতুর হাত ধরেই। ইতিহাস মতে সম্রাট আকবর হেমন্তকেই বছরের প্রথম মাস বা খাজনা আদায়ের মাস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
বর্ষার শেষদিকে আমন ধান রোপণ শুরু হলে শরতের পুরো সময়ে তা বেড়ে সতেজ ও সবুজ হয়ে ওঠে। হেমন্তের প্রথম থেকেই ধানের শীষ বা তোর বেরিয়ে কয়েকদিন পর থেকেই পাকা শুরু করে হলুদ রূপ ধারণ করে। শুরু হয় কৃষকের ধান কাটার প্রস্তুতি। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে হেমন্তের ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই নবান্ন উৎসবেরও সূচনা হয়। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, নবান্নের মিষ্টি গন্ধ নাকে এলেই মনটা কেমন যেন উদ্বেলিত হয়ে উঠত, আজও নবান্নের গন্ধে তাই সেই একই অনুভব জাগে।
হেমন্তের শুরুতে কৃষকেরা ধান কাটা ও মাড়াইয়ের যন্ত্রপাতি সাজাতে থাকেন, মহিলারা বাড়ির আঙ্গিনা পরিষ্কার করেন- সবার মাঝেই একরকম ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। মাঠে ধানের সোনালি রঙ ছড়িয়ে পড়ে, সোনালি ধানের হাসিতে কৃষকের মন আনন্দে ভরে ওঠে।
প্রস্তুতির পর মাঠে মাঠে শুরু হয় ধান কাটার ধুম। কাঁচি হাতে কৃষকেরা মাঠে ধান কেটে বাড়িতে আনেন, মাড়াইয়ের পর কৃষাণিরা রৌদ্রে শুকিয়ে গোলায় ভরেন। পাশাপাশি হাসি, গান, ঝাকঝমক, শোরগোল। সব মিলিয়ে গ্রামের জীবন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ধান কাটার সময় কৃষকের মুখে যে তৃপ্তির হাসি দেখি, তা দেখলে মনে হয় প্রকৃতি তার পরিশ্রমের উপযুক্ত মূল্য যেন হাতে তুলে দিয়েছে। হেমন্তের রূপে মুগ্ধ হয়ে কবি জীবনানন্দ দাশ অনেক কবিতা লিখেছেন। তিনি হেমন্তের অঘ্রাণ নিয়ে লেখেন-
“অঘ্রাণ এসেছে আজ পৃথিবীর বনে
সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে
হেমন্ত এসেছে তবু।”
যা সত্যিই আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে দেয়।
হেমন্ত নববধূর মতো ঘোমটা পরে থাকলেও তার রূপে মোহিত বাংলার মানুষ। ধান কাটার ধুম শেষ হলে শুরু হয় ধান মাড়াই। গাদাগাদা ধান মাড়াইয়ের সুবাস চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। আর একটি কৃষিভিত্তিক কবিতায় দেখতে পাই-
“ধান কাটা মাঠে হাসে, গেয়ে ওঠে কৃষাণ,
সোনার ফসল ঘরে তোলে মাটির সন্তান।”
এ পঙক্তিতে কৃষকের পরিশ্রম এবং আনন্দের মিলন চিত্রিত হয়েছে। ধানের সোনালি রঙ এবং শ্রমের আনন্দ যেন একে অপরকে পরিপূরক করে।
ধান মাড়াই শেষ হলে ঘরে ঘরে শুরু হয় পিঠা-পায়েস তৈরির ধুম। উঠোনে ধোঁয়া ওঠে চুলায়, পাশে বাচ্চারা পাটিসাপটা বা চিতই পিঠার জন্য অপেক্ষা করে। এ পিঠা-পায়েসের সময়টায় আত্মীয়-স্বজনের ভিড় আর সম্মিলিত হাসির শব্দ- সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় আবেশ সৃষ্টি হয়। এ উৎসবের দিনগুলোই তো আমাদের শিকড়কে ধরে রাখে। সবাই মিলিত হয়- হাসি, গান, আলাপে পুরো গ্রামে যেন এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে।
হেমন্তের বিকেলও আলাদা এক সৌন্দর্য নিয়ে আসে। আকাশে লালচে আভা, নদীর ধারে উড়ে বেড়ায় বকের সারি, মাঠে সর্ষে ফুলে হলুদ রঙ, আর থরে থরে ফুটে থাকা গন্ধরাজ, মল্লিকা, শিউলি, কামিনী, হিমঝুরি, দেবকাঞ্চন ও রাজঅশোক- সব মিলিয়ে গ্রামবাংলাকে রঙিন এক স্বপ্নদৃশ্যে রূপান্তরিত করে। সূর্যের আলো সর্ষে ফুলের মাঠে পড়লে পুরো দৃশ্য যেন এক উজ্জ্বল স্বর্ণালী আভায় ভেসে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হেমন্তের প্রাচুর্য ও কৃষিজীবনের সুখচিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন এই পঙক্তিতে-
“ধরার আঁচল ভরে দিলে প্রচুর সোনার ধানে,
দিগঙ্গনার অঙ্গন আজ পূর্ণ তোমার দানে।”
এখানে কবি হেমন্তের প্রাচুর্য ও বাংলার কৃষকের আনন্দময় জীবনের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন। ধানভরা মাঠ যেন ধরার আঁচল পূর্ণ করে তুলেছে, প্রকৃতি যেন উদার মাতার মতো তার সন্তানদের অন্নে পরিপূর্ণ করেছে।
আরেক স্থানে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
“আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচর,
জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে শব্দহীন, গতিহীন স্তব্ধতা উদার-
রয়েছ পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।”
এখানে কবি হেমন্তের নিস্তব্ধতা, প্রশান্তি ও সৌন্দর্যকে গভীরভাবে চিত্রিত করেছেন। ফসলভরা মাঠ, আলো-ছায়ার খেলা এবং প্রকৃতির স্থিরতার মধ্যে তিনি এক মহিমান্বিত শান্তি অনুভব করেছেন। এটি হেমন্তের নীরব সৌন্দর্য ও প্রকৃতির পরিপূর্ণতার অনুপম প্রতিচ্ছবি।
কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্রানের সওগাত’ কবিতায়ও হেমন্তের ধানভরা মাঠের গন্ধে বাংলার উৎসবমুখরতার কথা উঠে এসেছে-
“ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণীর সওগাত?
নবীন ধানের অগ্রানে আজি অগ্রান হল মা’ৎ।”
অর্থাৎ অগ্রহায়ণ যেন নতুন ধানের সুবাসে ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়ে এনেছে, যার ফলে মাটির বুক ভরে উঠেছে ফসলের আনন্দে।
রাতে আকাশে ঝলমলে তারা, বাতাসে হালকা শীত, দূরের বাঁশির সুরে মনে হয় প্রকৃতি নিজেই গান গাইছে হেমন্তের তৃপ্তির। তাই হেমন্ত কেবল একটি ঋতু নয়, এটি বাংলার আত্মার ঋতু। সত্যি বলতে, হেমন্তের এ স্নিগ্ধ ও শান্ত রূপ দেখলে মনটা যেন এক পরম শান্তি খুঁজে পায়- শহরের কোলাহল থেকে দূরে এক নিবিড় নিস্তব্ধতা। শিশিরভেজা ঘাস, ধানের সুবাস, পিঠার মিষ্টি, সর্ষে ফুলের মাঠে পড়া সূর্যের নরম আলো- সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিজেই বলে-
“এই আমার হেমন্ত, মাটির ঘ্রাণে ভরা,
মানুষের হাসিতে উজ্জীবিত।”
হেমন্ত ঋতু প্রকৃতিতে সমৃদ্ধ যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতিতেও এক চিরন্তন মাধুর্যের ঋতু।
লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।