আসিফ আরসালান

সমগ্র বিশ্বকে প্রকম্পিত করেছে ইরানে আমেরিকা ও ইসরাইলের বর্বরোচিত মধ্যযুগীয় হামলা। এ বিষয়েই লিখবো। কিন্তু এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের একটি চাঞ্চল্যকর প্রেস কনফারেন্স দেখলাম। এ সম্পর্কে দুটি কথা না বললেই নয়। ডা. তাহের বলেছেন, ‘গতকাল আমরা একটা রাজসাক্ষী পেয়েছি। সে রাজসাক্ষীর নাম হচ্ছে সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রিজওয়ানা। তিনি সাংবাদিকের সঙ্গে এটা প্রকাশ করেছেন, যারা তাঁর ভাষায় নারীদের উপযুক্ত অধিকারকে নিশ্চিত করতে পারেনি, তারা বিরোধী দলে থাকলেও আমরা কিন্তু তাদের মূলধারায় বা প্রধান শক্তি হিসেবে আসতে দিইনি। তখনই বোঝা যায়, যে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা এসেছে, সেটাকে উনি নিজেই স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন।’ তিনি আরো বলেন, এ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উনার সঙ্গে আর কারা জড়িত ছিল? পুরো গভর্নমেন্ট ছিল, নাকি গভর্নমেন্টের একটি অংশ ছিল, যারা নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে এবং তাদের ডিজাইন অনুসারে সেখানে ডিসি, এসপি, ইউএনও, ওসি, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ইত্যাদি নিয়োগ করে, আইনশৃক্সক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকদের নিয়োগ করে তারা সেই তাদেরই কাক্সিক্ষত সংখ্যা, সে সংখ্যায় একটি দলকে জেতানোর জন্য তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। জাতির কাছে এটা স্পষ্ট করতে হবে।’

খলিলুর রহমানকে লন্ডন ষড়যন্ত্রের হোতা বলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, ‘সেখান থেকে তিনি সরকারকে মোটিভেট করে, ষড়যন্ত্র করে বর্তমানে যাঁরা সরকারে আছেন, তাঁদের সুবিধা দেওয়ার জন্যই অব্যাহতভাবে কাজ করেছেন এবং সেই কাজের পুরস্কারও লাভ করেছেন।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছিলেন এবং তাঁকে সরকার থেকে বের করে দিতে বলেছিলেন বলে উল্লেখ করেন তাহের। তারপরও ‘বিতর্কিত ব্যক্তিকে’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। সরকারের উপদেষ্টারা বিএনপিকে জেতানোর জন্য কী ধরনের ষড়যন্ত্র করেছেন, তা সামনে আসা দরকার বলে জানান তাহের।

প্রিয় পাঠক, ড. তাহেরের সাংবাদিক সম্মেলনের উদ্ধৃতি অনেক লম্বা হয়ে গেলো। কিন্তু উপায় ছিলো না। এটি করতেই হলো। এ ইলেকশন যে ফেয়ার এবং নিরপেক্ষ হয়নি এবং ব্যালট পেপার ইঞ্জিনিয়ারিং করে যে নির্বাচনের ফলাফল বিরাটভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে সে বিষয়টি ফলাফল ঘোষণার রাত থেকে এখন পর্যন্ত মানুষের মনকে ক্ষুব্ধ করছে। খোদ জামায়াতের আমীরকেই পরাজিত করার চক্রান্ত হয়েছিলা। তবে জনগণ এবং জামায়াতের কর্মীরা সংঘবদ্ধভাবে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলার ফলে ঐ ষড়যন্ত্র বানচাল করা সম্ভব হয়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল প্রাক্তন এমপি মিয়া গোলাম পারওয়ারকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ব্যালট ট্যাম্পারিংয়ের সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণ হলো মোহাম্মদপুরে আল্লামা মামুনুল হকের আসন এবং শাহজাহানপুরে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারির আসন। রাত সাড়ে ৭টা/৮টা পর্যন্ত গণনায় কয়েক হাজার ভোটে মামুনুল হক এগিয়ে ছিলেন। তারপর অকস্মাৎ ঐ আসনের ভোটের ফলাফল ঘোষণা বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৪ ঘণ্টা পর হঠাৎ করে এক সাথে খবর প্রচার করা হয় এবং বলা হয় যে, ঐ আসনে মামুনুল হককে পরাজিত করে ববি হাজ্জাজকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।

একই কাণ্ড ঘটানো হয়েছে শাহজাহানপুর খিলগাঁওয়ে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারির আসনে। এখানে মির্জা আব্বাসের লোকজন নাসির উদ্দিনের লোকজনের ওপর রীতিমতো বল প্রয়োগ করে। তারা জোর করে পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয় এবং আব্বাসের লোকজন ব্যালট পেপারে সীল মেরে মেরে ব্যালট বাক্স ভরায়। নাসির উদ্দিন পাটোয়ারি বলেছেন যে, মির্জা আব্বাসের শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে তিনিও পাল্টা শক্তি প্রয়োগ করতে পারতেন। এর ফলে সেখানে রক্তপাত হতো। তবে ১১ দলীয় জোটের হাইকমান্ড থেকে (হাইকমান্ড বলতে তিনি জামায়াতকে বুঝিয়েছেন) তাকে বলা হয়েছিলো কোনো রকম সংঘর্ষে না যেতে।

আসলে জনগণ ভোট দিতে আসায় বাধাপ্রাপ্ত হননি। আইনশৃক্সক্ষলা বাহিনী বিশেষ করে সেনা বাহিনীর ভূমিকা নিরপেক্ষ ছিলো। কিন্তু যেটি ঘটেছে সেটিকে ভোট ডাকাতি না বলে ব্যালট পেপারে ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। টেলিভিশনে এবং ইউটিউবে দেখানো হয়েছে, কিভাবে বিভিন্ন কেন্দ্রের রেজাল্ট শীটের ওপর কাটাকাটি করা হয়েছে। ব্যালট ট্যাম্পারিংয়ে অসংখ্য প্রামাণিক দলিল ইলেকশন কমিশন অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে। আমরা সেগুলোর বিস্তারিত তালিকায় গেলাম না। ইলেকশন কমিশন সেগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা না করে তাড়াহুড়ো করে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেছে। কারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে সমগ্র নির্বাচনের ফলাফল ভিন্ন রকম হতো। তবে জামায়াতের আমীর ত্রুটিপূর্ণ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং হলেও ফলাফল মেনে নিয়েছেন। কারণ তিনি আশংকা করেছিলেন যে, ফলাফল মেনে না নিলে রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতো যেটি গণতন্ত্রের পথযাত্রায় বিঘ্ন সৃষ্টি করতো।

ফিরে আসছি মূল আলোচনায়, অর্থাৎ ইরানের ওপর ইহুদি-মার্কিন হামলায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এ দুটি দেশের হামলার পর আজ শুক্রবার ৭দিন পার হয়ে গেছে। প্রতিদিনের বিস্তারিত খবর বাংলাদেশের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় আসছে। তাই সেগুলোতে আর গেলাম না। এখন প্রশ্ন হলো, এই যুদ্ধের শেষ কোথায়?

ইসরাইল, বিশেষ করে আমেরিকা যে কেনো প্রতিবার ইসরাইলের প্রধান মুরুব্বী হয় সেটি বোঝা দরকার। তারা মুখে বলে যে, এ যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য ৩টি। একটি হলো, ইরানের সামরিক শক্তি সম্পূর্ণ চূর্ণ করা। আরেকটি হলো, ইরানের পারমাণিবক শক্তি হওয়ার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা। আর সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ন্যক্কারজনক উদ্দেশ্য হলো, রেজিম চেঞ্জ। অর্থাৎ ইরানের ইসলামী বিপ্লবী সরকার উৎখাত করা।

আমেরিকার কথার মধ্যে কোনো সংগতি নেই। গত জুন মাসে ১২ দিনের যে যুদ্ধ হয় সেখানে আমেরিকা বলেছিলো যে, তারা ইরানে পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে। আর এবার হামলার দিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন যে, ইরান পারমাণবিক বোমার অধিকারী হওয়ার দরজার কাছে পৌঁছে গিয়েছিলো। এবার প্রথম দুই দিনের আঘাতে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ মিসমার করা হয়েছে। আর এখন তাদের মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন উৎপাদন ক্ষমতা চূরমার করে দেওয়া হবে। কিন্তু আসল কথাটি বলে দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো ইরান। ইরানকে নিঃশেষ করতে পারলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, সমগ্র পৃথিবীতে ইসরাইল নিষ্কণ্টক হবে। এ জন্য এবার আমেরিকার সাথে মিলে তারা যে হামলা শুরু করেছে তার চূড়ান্ত টার্গেট হলো রাষ্ট্র হিসাবে ইরানকে নিশ্চিহ্ন করা। বিজয়ী হওয়ার পর তারা ইরানকে অন্তত ৪ ভাগে ভাগ করবে।

তবে যুদ্ধ চলার সপ্তম দিনে ওয়াশিংটনের কপালে ভাঁজ পড়েছে। তারা দেখছে, তাদের হিসাবে কোথায় যেনো একটা বড় ভূল হচ্ছে। তারা ২/৩ দিনের মধ্যেই যেখানে ইরানকে পদানত করতে পারবে ভেবেছিলো সেখানে যতই দিন যাচ্ছে ততই তারা দেখতে পাচ্ছে যে, ইরানের রেজিম চেঞ্জও অতো সহজ নয়, আবার ইরানকে পদানত করাও অতো সহজ নয়। ইরানকে পদানত করা তো দূরের কথা, এখন ইরান সেই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ৮/৯টি দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। আমেরিকা আরো ভেবেছিলো যে, ইরানে সাঁড়াশি হামলা চালালে ইরানের জনগণ তাদের বর্তমান শাসকদের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যাবে এবং বাংলাদেশের মতো গণঅভ্যুত্থান করে ইসলামী বিপ্লবী সরকারকে হটিয়ে দিয়ে নিজেদের সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু হিতে বিপরীত হচ্ছে। সুপ্রীম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে লাখ লাখ ইরানী ক্রন্দনরত অবস্থায় বুক চাপড়ে রাজপথে নেমে আসেন। মাথার ওপর জঙ্গি বিমানের বোমাবর্ষণ এবং ক্ষেপণাস্ত্রের বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে তারা মাতম শুরু করেন। প্রতিবেশি পাকিস্তানেও হাজার হাজার মানুষ মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করেন। পুলিশের গুলিবর্ষণে পাকস্তিানেও ৯ জন মানুষ নিহত হন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও স্বীকার করেছেন যে এখনো ইরানের হাতে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত যুদ্ধ থামবে না। আর ইরানও বলছে, যুদ্ধ তারাই শুরু করেছে। এখন যুদ্ধ বন্ধের দায়ও তাদের।

ইহুদি-মার্কিন যুদ্ধবাজরা এখন দেখছেন যে, শুধমাত্র আকাশ যুদ্ধ করে ইরানকে পদানত করা সম্ভব নয়। সেটি করতে হলে প্রয়োজন স্থল বাহিনী নামানো। ইরানের মতো বিশাল আয়তনের (১৬ লাখ ৪৮ হাজার বর্গকিলো মিটার বা ৬ লাখ ৩৬ হাজার বর্গমাইল) একটি দেশ যার আবার অধিকাংশই পর্বত শঙ্কুল এবং মরুভূমিতে তপ্ত, সেখানে মার্কিনী বা ইসরাইলী স্থল বাহিনী নামালে তারা সেখানে আটকে পড়বে। লিবিয়ার মতো ক্ষুদ্র জনসংখ্যা (৬০ লাখ) ইরানের নয়। ইরানের জনসংখ্যা ১০ কোটি। এ ১০ কোটি মানুষের মধ্যে কিছু অংশ হয়তো বর্তমান সরকার বিরোধী হতে পারে। কিন্তু মার্কিনী হামলার পর ইরাকের ১০ কোটি জনগণই এখন প্রচণ্ড মার্কিন বিরোধী। এই বিষয়টি আমেরিকাও বুঝতে পেরেছে। তাই তাদের সর্বশেষ চিন্তা হলো, কুর্দি বিদ্রোহীদেরকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে স্থলবাহিনী হিসাবে নামিয়ে দেওয়া। কিন্তু এই কাজটি বলা যতো সহজ করা ততো কঠিন নয়। পক্ষান্তরে ইরানের দমে যাওয়া তো দূরের কথা তারা এখন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পুত্র মুজতবা খামেনিকে সুপ্রীম লিডার নির্বাচিত করেছেন। এখন তার নেতৃত্বে ইরানীরা এই যুদ্ধকে আঞ্চলিক যুদ্ধ হিসাবে ছড়িয়ে দিতে চায়। সেজন্যই তারা এখন সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান প্রভৃতি দেশের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও মার্কিন দূতাবাসের ওপর হামলা শুরু করেছে। এ কলাম লেখার সময় খবর দেখলাম যে, কুয়েত, বাহরাইন এবং আরব আমিরাতের অন্তত ২০টি মার্কিন স্থাপনায় ইরান আঘাত হেনেছে। আরেক খবরে জানা গেলো, কাতারের একাধিক স্থানে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

যতই দিন যাবে ততই এ যুদ্ধ ইরানে সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিম এশিয়াতে ছড়িয়ে পড়বে। ইতোমধ্যেই ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ¦ালানি পরিবাহিত হয়। তবে চীনের জ¦ালানির ৮০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয় বলে চীনের ক্ষেত্রে ইরান ছাড় দিয়েছে। আর চীনও কঠোর ভাষায় মার্কিন হামলার নিন্দা করেছে।

মার্কিন বাহিনী, ইসরাইলী বাহিনী বা তাদের সহায়ক কোনো বাহিনী যদি ইরানে ঢুকে পড়ে তাহলে ইরান পরিণত হবে আফগানিস্তানে যেখানে সোভিয়েট ইউনিয়নের দখলদারিত্ব ছিলো ১০ বছর এবং আমেরিকার দখলদারিত্ব ছিলো ২০ বছর। ইরানে মার্কিন দখলদারিত্ব অত প্রলম্বিত হবে না বরং তারা সেখানে এমনভাবে আটকা পড়বে যেখান থেকে তারা জীবন্ত স্বদেশে ফিরতে পারবে না। পৌনে ৭ লাখ বর্গমাইলের (বাংলাদেশের ১২ গুণ আয়নতন) ১০ কোটি লোককে পদানত করা এক আকাশ কুসুম কল্পনা।

Email:[email protected]