মুসফিকা আন্জুম নাবা

হিজাব শুধু আমাদের দেশে নয় বরং সারাবিশ্বেই বহুল আলোচিত বিষয়। কারণ, ইসলামবিরোধী তথাকথিত প্রগতিবাদী শক্তি হিজাবকে সব সময় নিজেদের প্রতিপক্ষ বানিয়েছে। মূলত, হিজাব ইসলামী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির স্মারক। মুসলিম নারীরা নিজেদের শালীনতা ও সম্ভ্রম সুরক্ষার অত্যাবশ্যকীয় বিধান হিসাবে হিজাব পরিধান করে থাকেন। যা পবিত্র কালামে পাকে অত্যাবশ্যকীয় করা হয়েছে।

বস্তুত, হিজাব আরবি শব্দ। যার অর্থ আবৃত করা, ঢেকে রাখা। মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে হিজাব তথা পর্দা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে এটি মুসলিম নারীদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বা ফরজ বিধান। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কালামে হাকীমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘(হে নারীগণ!) তোমরা ঘরের মধ্যে অবস্থান করবে, অজ্ঞতার যুগের নারীদের মত নিজেদের প্রদর্শন করবে না। আর নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে, যাকাত আদায় করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে।’ (সূরা আহযাব: আয়াত ৩৩) পবিত্র কালামে হাকীমের অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মু’মিনা নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবেনা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। মুসলিম নারীদের শালীনতা ও সম্ভ্রম রক্ষায় উদ্দেশ্য মাথায় রেখে এ বিধান আরোপিত হয়েছে। মূলত, প্রত্যেক নারীর উপর হিজাব ফরজ বা অত্যাবশ্যকীয় করা হয়েছে। ফলে হিজাব প্রত্যেক নারীর জন্য শুধু অত্যাবশ্যকীয় নয় বরং মৌলিক অধিকারের আওতাভুক্ত। হিজাব পরিধানের মাধ্যমে ইসলামী নিদের্শনায় নারীকে স্বাধীনতার নিরাপত্তারও আশ্রয় দেয়। হিজাব পরে নারীরা বাইরের মানুষকে অশুভ দৃষ্টি ও ফেৎনা থেকে হিফাজত করে।

আধুনিকতার ঝড় যেখানে নারীদের অনাবৃত চলাফেরায় অভ্যস্ত করে, এর বিপরীতে হিজাব বা পর্দা মানুষকে অশুভ শক্তির প্ররোচনা ও কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখে সুরক্ষা দেয়। আর নারীদের নিরাপত্তা ও পুরুষের চারিত্রিক পরিশুদ্ধতার জন্যই নারীদের ওপর হিজাব তথা পর্দার বিধান দেয়া হয়েছে। পর্দা শুধু মুসলিম নারীদের জন্য নয় বরং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির অংশ। ভারতীয় উপমহাদেশে মহিলাদের চলাফেরা এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও সংবিধিবদ্ধ করতে পর্দার অভ্যাস প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান ছিল এবং ইসলামের আগমনের সাথে সাথে এটি আরো ভালোভাবে সমাজে প্রচলিত হয়েছিল। ১৯ শতকে পর্দা হিন্দু অভিজাতদের মধ্যে ঐতিহ্য ও প্রথাগত হয়ে ওঠেছিল। এখনো উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের মধ্যে পর্দা বা শালীন পোশাক ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। যা তাদের আভিজাত্যের স্মারক ও সংস্কৃতির অংশ হিসাবে গণ্য।

পর্দা সাধারণত দু’টি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। যেমন: মহিলাদের শারীরিক বিচ্ছিন্নতা এবং শরীরকে আবৃত করার প্রয়োজনীয়তা যাতে মহিলারা তাদের ত্বকের লাবণ্য রক্ষা এবং রূপ-সৌন্দর্যকে গোপন করতে পারেন। এভাবেই পর্দা প্রথা বিশ্বাস, বিনয়, আত্ম-সুরক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। আধুনিক নারীবাদ এবং তথাকথিত প্রগতিবাদীরা হিজাব বা পর্দা প্রথা এক টুকরো কাপড় হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু এটি শুধু পোশাকের আবরণ নয় বরং সমগ্রিক জীবনব্যবস্থা একটি আর্দশের প্রতিফলন এবং শিষ্ঠাচারের পরিক্রমা এবং শ্লীলতা, আত্মমর্যাদা ও শুদ্ধতার রক্ষার অন্যতম অনুসঙ্গ, যা নৈতিক চরিত্রের সংরক্ষক হিসেবে কাজ করে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তথাকথিত নারীবাদীরা ইসলামের এ মৌলিক ও অত্যাবশ্যকীয় বরাবরই। তথাকথিত নারী প্রগতি, নারী মুক্তি, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে হিজাববিহীন খোলামেলা চলাফেরার সমাজে অবক্ষয়কে পরিকল্পিতভাবে উস্কে দেয়া হচ্ছে। সর্বোপরি একজন নারী যখন বেপর্দায় চলাফেরা করে; তা শুধু নারীর জন্যই ক্ষতিকর নয় বরং তা পুরুষের জন্যও ক্ষতিকর। বেপর্দা হয়ে চলাফেরায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে নারীর ওপর। আর তা থেকে যুবসমাজ চারিত্রিক অবক্ষয়ে জড়িয়ে পড়ে। যা কোন দেশ, জাতি ও সমাজের জন্যই মোটেই সুখকর নয়।

নারীবাদের এ খোলামেলা কালচার লজ্জাহীন একটি সমাজ ব্যবস্থায় ধাবিত করছে। হিজাবের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা প্রসারে বলা হচ্ছে, হিজাব সেকেলে ব্যবস্থা, যা সভ্যতা, উন্নয়ন ও প্রগতির অন্তরায়। এর মাধ্যমে মুসলিম নারীরা গৃহবন্দি সংস্কৃতি পালন করছে। পশ্চিমা নারীবাদের দীক্ষায় গ্রহণেই নারীদের মুক্তি এমন কথা প্রতিনিয়ত শোনা যায়। কিন্তু পশ্চিমের উন্মুক্ত সমাজ, সংস্কৃতি কী বিষময় পরিণাম ডেকে এনেছে তা বলাই বাহুল্য। পশ্চিমের এ নারীবাদ যে কথা বলার মাধ্যমে সীমাবদ্ধ বিষয়টি এমন নয় বরং প্রতিনিয়ত হিজাব পরিহিত নারী বিভিন্নভাবে হেনস্তার শিকার হন।

আমাদের দেশ মুসলিম প্রধান হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামের অপরিহার্য বিধান পর্দা বা হিজাব নিয়ে অহেতুক বিতর্ক শুরু হয়েছে। তথাকথিত সভ্যতার ধ্বজাধারী নারীবাদী ও আধুনিকতাবাদীরা পর্দা ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সমাজ-সংস্কৃতির অংশ নয় বলে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে চলেছে। ফলাফল হিসেবে বিভিন্ন লোকালয়ে বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্দানশীন মেয়েরা নানাভাবে নাজেহাল ও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। অথচ হিজাব নিয়ে নানাবিধ বিতর্কের প্রেক্ষাপটে হিজাব ও বোরকা পরা নারীর সাংবিধানিক অধিকার বলে মন্তব্য করেছেন আমাদের দেশের উচ্চ আদালত। কিন্তু তারপরও দেশে হিজাব বিরোধী ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি। ফলে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বহু শিক্ষার্থীকে হিজাব পরার জন্য ঠাট্টা, বিদ্রুপের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এমন খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এমনকি হিজাব ব্যবহার করার কারণে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থী বেত্রাঘাতের শিকার হওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু নিকট অতীতেই আমাদের দেশে হিজাব বা পর্দা নিয়ে কোন বিতর্ক ছিল না বরং সকল শিক্ষার্থীই নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবেই পালন করেছেন। এখনো আমরা লক্ষ্য করি হিন্দু পুরুষ শিক্ষার্থীরা ইচ্ছা হলে গলায় কাঠের মালা পড়তে পারে। বিবাহিত হিন্দু মেয়েদের শাখা-সিঁদুর পড়তেও কোন বাধা নেই। খ্রীষ্টান শিক্ষার্থীরা তাদের ধর্মীয় আদর্শ মতে গলায় ক্রুস ঝোলাতেও কোন ভাবেই বাধা দেয়া হয় না। আর বৌদ্ধ ধর্মপ্রাণ শিক্ষার্থীদের গেরুয়া পোশাক পড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে দেখা যায়। তারা কোন ভাবেই বাধাপ্রাপ্ত হন না। ব্যতিক্রম শুরু ইসলামী আদর্শের স্মারক ‘হিজাব’।

মূলত, একটি মহল এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ-অনুভূতি, বোধ-বিশ্বাস, তাহজীব-তমুদ্দনকে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করছেন। আর এরাই হিজাবসহ ইসলামী আদর্শের স্মারকগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। ফলে হিজাব, দাড়ি-টুপি ও ইসলামী আখলাক-সুরতকে নানাভাবে নাজেহাল করা হচ্ছে। আর এ অপকর্মের মাধ্যমে অশুভ শক্তি একদিকে ধর্ম অবমাননা করছে; অপর দিকে করছে রাষ্ট্রীয় সংবিধানের অমর্যাদা। দেশের সর্বোচ্চ আদালতকেও করা হচ্ছে অশ্রদ্ধা। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে হিজাবের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হিজাব বিরোধী তৎপরতা বেগবান হয়েছে। অস্টিয়া কিছুদিন আগে হিজাব নিষিদ্ধ করেছে। এটা ব্যক্তি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার চরম অবমাননা। হিজাব বা পর্দা মানে কোনো অবরোধ নয়, নয় চার দেয়ালে বন্দি থাকা। তাদের ধ্যান ধরণা হিজাবী নারীরা নির্ভরশীল, নির্যাতিত ও বিদ্রোহের অনুপযুক্ত। হিজাব প্রথা কখনোই নারীকে বন্দি বা নির্যাতিত করেনি বরং সকলের নিকট সম্মানিত করেছে; একই সাথে দান করেছে উচ্চ মর্যাদাও।

সাম্প্রতিক বিশ্বে বহু নজির রয়েছে যেখানে মুসলিম নারীরা ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রেখে জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন প্রভৃতি অঙ্গনে অসাধারণ কৃতিত্ব প্রকাশ করেছে। এমনকি প্রতিবাদ সংগ্রামেও অংশগ্রহণ ছিল। প্রকৃতপক্ষে হিজাব বির্তকের মূল অনুঘটক হলো ইসলাম ফোবিয়া। এখান থেকেই যত অপতৎপরতার উৎপত্তি। হিজাব মুসলিম নারীদের স্বতন্ত্র পরিচয় করে দিয়েছে। কারণ মুসলিম সংস্কৃতি ব্যতিত অন্য সমাজে পর্দা প্রথা বিশেষ করে খ্রিষ্টান ও ইহুদি সমাজে এটি কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ। খোলা রাখা, কাপড় সরিয়ে রাখা ও স্বাধীনতার ধারণার মধ্যে যে সম্পর্ক তা পশ্চিমা নারী ও মুসলিম সমাজে নারীর মধ্যে বড় ফারাক তৈরি করেছে। এ ফারাকই আধুনিতার কালো থাবা থেকে রক্ষা করে চলেছে। মনে রাখা দরকার অত্যাচার যখন বাড়ে তখন মানুষ তার শিখড়ের সন্ধান করে সে তার আত্মপরিচয়ে জন্য উন্মুক্ত হয়। নানা বাধা-প্রতিকূলতার মাঝে মানুষ নিজের ধর্ম সংস্কৃতি আকড়ে ধরে। আর হিজাবই বেপরোয়া, লাগামহীন জীবনযাপনকে নিরুৎসাহিত করে।

তাই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন, অনুশীলন ও ধর্মীয় আদর্শ প্রচার প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। আর ‘হিজাব’ ইসলামে অপরিহার্য তথা ফরজ বিধান। আমরা আশা করবো সরকার বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ দেশের ধর্মীয় সংস্কৃতির অনুসরণ, সাংবিধানকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবেন। একই সাথে অপরাধীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় ইসলাম বিরোধী শক্তির অপতৎপরতা কখনোই বন্ধ হবে না। আর মনে রাখতে হবে হিজাব আমার অহংকার; সর্বোপরি অধিকারও। হিজাব কোনো শেকল না বরং পোষাক, আচরণের বিশুদ্ধ জীবন গঠনের আইকন।

মনে রাখতে হবে হিজাব শেকল নয় বরং সভ্যতা ও প্রকৃতির প্রাণশক্তি। যারা হিজাবকে সভ্যতা ও প্রগতির অন্তরায় মনে করেন, তারা অবশ্যই মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত। বস্তত, হিজাব হচ্ছে সভ্যতা, উন্নয়ন, অগ্রগতি ও প্রগতির শক্তিশালী বাহন। তাই আমাদের মত মুসলিম প্রধান দেশে হিজাব বিরোধী যেকোন অপতৎপরতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় ইসলামবিরোধী শক্তির অপতৎপরতা বন্ধ করা যাবে না।

লেখক : শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজ, জয়পুরহাট।