জান্নাতুল ফেরদাউস অহনা
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ একটি বিশ্বব্যাপী বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে শিক্ষার প্রকৃতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় শিক্ষা ছিল মানবিক উন্নয়ন, ব্যক্তিত্ব গঠন, সামাজিক সমতা ও নাগরিক দায়বদ্ধতার প্রধান ভিত্তি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই শিক্ষাই আজ ক্রমশ বাজারকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়Ñসব স্তরেই শিক্ষার উপর বাণিজ্যিক প্রভাব বাড়ছে, যা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের পেছনে কারণও রয়েছে। বিশ্বায়নের ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশগুলোকে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে উৎসাহিত করছে। অনেক সরকার শিক্ষায় বরাদ্দ কমিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাচ্ছে। এছাড়া, প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে নতুন নতুন পেশার সৃষ্টি হচ্ছে, যার জন্য বিশেষায়িত শিক্ষার চাহিদা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্রুত প্রসার লাভ করছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান মানসম্মত শিক্ষার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তাদের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থনৈতিক লাভ। ভর্তি ফি, রেজিস্ট্রেশন ফি, সেমিস্টার ফি, ল্যাব ফি, সফটওয়্যার ফিÑনানা ধরনের আর্থিক শিরোনাম তৈরি করে শিক্ষার্থীদের উপর বাড়ানো হচ্ছে অতিরিক্ত খরচের চাপ। ফলে শিক্ষার সুযোগ ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যরে ওপর।
শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের এই প্রবণতা শিক্ষার মানসিক চরিত্রকেও বদলে দিচ্ছে। পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা, প্রতিযোগিতার দৌড়, চাপের সংস্কৃতি-সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের চেয়ে পাশ করাইকে প্রধান লক্ষ্য মনে করছে। মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা, সহমর্মিতা, সাংস্কৃতিক বিকাশ-এসব জায়গা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্তরিক সম্পর্কের জায়গায় তৈরি হচ্ছে গ্রাহক-প্রদানকারীর মতো দূরত্ব।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রকে ভূমিকা নিতে হবে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানোন্নয়ন, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ-এসব পদক্ষেপ জরুরি। পাশাপাশি কোচিং ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষাসামগ্রীর অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ বন্ধ এবং আর্থিকভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
সমাজকেও বুঝতে হবে-শিক্ষা কোনও বাজারজাত পণ্য নয়। এটি মানবিক সভ্যতা, গণতান্ত্রিক চেতনা, বৈষম্যহীন সমাজ ও আলোকিত নাগরিক গঠনের ভিত্তি। বাণিজ্যিক চাপ কমিয়ে শিক্ষাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ফিরিয়ে না আনলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সমাজের অগ্রগতি থমকে যাবে।
শিক্ষা মানবিকতা, জ্ঞানচর্চা ও সমতার প্রতীক। সেই অবস্থান পুনরুদ্ধার করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
লেখক : শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।