বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘মুদ্রানীতি ও ব্যাংকের সম্পৃক্ততা’ শীর্ষক এক সেমিনারে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হার ও নিম্ন সুদ হারের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বক্তাগণ বলেন,সুদের উচ্চ হার অথবা নিম্নহার উভয়ই ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য খারাপ। কারণ সুদ হার কমে গেলে ব্যাংকের মুনাফার পরিমাণ কমে যায়। আবার সুদ হার বৃদ্ধি পেলে ঋণ খারাপ হয়ে যাবার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আকন্দ মোহাম্মদ বলেন, মুদ্রানীতি এককভাবে কাজ করে না। এটাকে রাজস্ব নীতি,বাণিজ্য নীতি এবং মুদ্রানীতির সঙ্গে সমন্বিত হয়ে কাজ করতে হয়। সুদের হার কম-বেশি উভয়ই ব্যাংকের জন্য খারাপ। তিনি আরো বলেন,মূল্যস্ফীতির হার যদি ৫ শতাংশ হয় তাহলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৮ শতাংশ হতে পারে।

সেমিনারে অংশগ্রহণকারি আলোচকগণ ব্যাংক ঋণের সুদের হার হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে কথা বলেছেন কিন্তু এ মুহূর্তে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উপায় নিয়ে কিছু বলেননি। অথচ এ মুহূর্তে ব্যাংক ঋণের সুদের হার হ্রাস করে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ফসল নির্বাচিত নতুন সরকার তার নির্বাচনী ইস্তেহারে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি’র আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব মোতাবেক, বাংলাদেশের জিডিপি’র আকার হচ্ছে ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা। জিডিপি’র আকার আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নীত করার কাজটি সহজ সাধ্য নয়। এ জন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার এবং পরিমাণ ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। কিন্তু সেটা কতটা সম্ভব তা নিয়ে আমাদের কোন চিন্তা-ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগর হার জিডিপি’র অন্তত ৪০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। কিন্তু ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ তো বাড়ছেই না বরং দিন দিন কমে যাচ্ছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে পাবলিক সেক্টর ও প্রাইভেট সেক্টর মিলিয়ে মোট বিনিয়োগ হয়েছিল ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রাইভেট বা ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ১২ লাখ ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এটা মোট জিডিপি’র ২২ দশমিক শুন্য তিন শতাংশ।

গত এক দশকের মধ্যে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ আর কখনোই এতটা কম হয়নি। এর আগে ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে জিডিপি’র অনুপাতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হয়েছিল ২২ দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, গত ৪ বছর ধরে জিডিপি’র অনুপাতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার ছিল জিডিপি’র সাড়ে ২৪ শতাংশ। এখন তা ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। একই ভাবে সার্বিক বিনিয়োগের হার নেমে এসেছে জিডিপি’র ৩২ শতাংশ থেকে ২৮ শতাংশে। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে ব্যক্তিখাতে ঋণদানের প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। গত ২০ বছরের মধ্যে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি আর কখনোই এতটা কম হয়নি। বাংলাদেশের উদ্যোক্তাগণ সব সময়ই বিনিয়োগযোগ্য তহবিল সঙ্কটে ভুগে থাকেন। তারা বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক ঋণের উপর নির্ভর করেন। তাই ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধির উপর ভিত্তি করে সার্বিক বিনিয়োগ চিত্র সম্পর্কে ধারণা নেয়া যায়।

ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের এ নিম্নমুখি যাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইলে একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, এটা মূলত চতুর্মুখি আক্রমণের ফল। তিনি বলেন, প্রথমত অন্তর্বর্তীকালিন সরকার কতদিন দায়িত্বে থাকবেন তা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল। সঠিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণ সম্ভব হবে কিনা এসব নিয়ে স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগহারিদের মধ্যে আশঙ্কা বিরাজ করছিল। দ্বিতীয়ত, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দীর্ঘ দিন ধরে বহাল থাকার কারণে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ছিল উচ্চ পর্যায়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও এর ফলে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বিনিয়োগকারিরা নতুন করে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত ছিলেন। তৃতীয়ত, ব্যবসায়ের খরচ কমানোর জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। চতুর্থত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বর্ধিত শুল্ক নীতির কারণে বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। মূলত এসব কারণে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে শুধু ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগই নয় পুরো অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। করোনা উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল ঠিক তখনই শুরু হয় ইউক্রেন যুদ্ধ। সেই সময় বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন ভেঙ্গে পড়ে। প্রতিটি পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো অর্থনীতিতেও মূল্যস্ফীতির হার বিগত ৪০ বছরের রেকর্ড অতিক্রম করে ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়। সেই অবস্থায় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা(ফেড) সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে। প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ হ্রাসের ঝুঁকি নিয়ে ফেড বারবার পলিসি রেট( সিডিউল ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের সময় যে সুদ চার্জ করা হয়) বাড়াতে থাকে। পলিসি রেট বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা অর্থনীতির একটি স্বীকৃত নীতি। কারণ পলিসি রেট বৃদ্ধি পেলে সিডিউল ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তা ও সাধারণ ঋণ গ্রহীতাদের প্রদত্ত ঋণের উপর আগের তুলনায় বর্ধিত হারে সুদ চার্জ করে। এতে ঋণ গ্রহণের চাহিদা কমে যায়। মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধি করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে এবং তারা সফল হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের(ব্যাংক গ্রাহক পর্যায়ে ঋণদানের ক্ষেত্রে যে সুদ চার্জ করে) সুদের হার বৃদ্ধি হতে দেয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক দিন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার ৯শতাংশে ফিক্সড করে রাখে। এতে ব্যাংকগুলো সাধারণভাবে ঋণ সংকোচন নীতি গ্রহণ করে। তারা উদ্যোক্তা এবং সাধারণ ঋণ গ্রহীতাদের ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহিত করে। কিন্তু সরকারের আশির্বাদপুষ্ট বৃহৎ ব্যবসায়িরা অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণের নামে হাতিয়ে নেয়। এ অর্থ বাজারে চলে আসে। ফলে বাজারে অর্থের যোগান বেড়ে যায়। সে সময় এক মুদ্রানীতিতে প্রাইভেট সেক্টরে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ একই সময়ে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি ব্যাপকভাবে কমেছিল। শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমেছিল ১৪ শতাংশ করে। তার অর্থ হচ্ছে শিল্প স্থাপনের নামে যে ঋণ নেয়া হয়েছে তা উদ্দিষ্ট কাজে ব্যবহৃত হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধি করে এবং ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদ হার প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে অনেক বিলম্বে। ইতিমধ্যেই প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে,ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। স্থানীয় শিল্প-কারখানায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। অভ্যন্তরীণভাবে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার উৎপাদন কমে যাবার কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কাক্সিক্ষত মাত্রায় কমছে না। বর্ধিত পলিসি রেট দীর্ঘায়িত করা হলে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে আমরা এখন সে অবস্থাই প্রত্যক্ষ করছি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বাংলাদেশ ব্যাংক আরো একটি উদ্দেশ্যমূলক ভুল করেছে তাহলো, মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১১০ টাকায় ফিক্সড করে রাখা। স্থানীয় মুদ্রা বাজার অস্থিতিশীলতা দেখা দেবে এ অজুহাতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১১০ টাকায় ফিক্সড করে রাখা হয়েছিল। এর ফলে বাজারে মার্কিন ডলারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। কার্ব মার্কেটে প্রতি মার্কিন ডলার ১২০ থেকে ১২২ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। প্রবাসী বাংলাদেশীরা হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স দেশে পাঠাতে থাকে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

অন্তর্বর্তী সরকার আমলে পর্যায়ক্রমে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বাজার ভিত্তিক করা হয়েছে। এখন প্রায়শই বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশী টাকার বিনিময় হারের ক্ষেত্রে তেজি ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশীরা ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে প্রেরণ করেছে। মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ফিক্সড করে রাখা হলে প্রবাসী আয় এভাবে কখনোই বৃদ্ধি পেতো না। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পাবার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণও ক্রমাগত বাড়ছে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আওয়ামী লীগ আমলে সরকার সমর্থক ব্যবসায়ি গোষ্ঠীকে তুলনামূলক কম মূল্যে মার্কিন ডলারে সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ফিক্সড করে রেখেছিল। এতে দেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

এ মুহূর্তে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট কমানো প্রয়োজন। পলিসি রেট কমানো হলে উদ্যোক্তাগণ তুলনামূলক কম সুদে ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। এতে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গতিশীলতা সৃষ্টি হবে। পলিসি রেট বৃদ্ধির মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সাময়িক কৌশল হতে পারে, দীর্ঘ মেয়াদি নয়। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি যতটা কার্যকর তার চেয়ে বেশি দরকার হচ্ছে পণ্য পরিবহন খাতে বিদ্যমান অরাজকতা দূরীকরণ করা। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে, সরকার সমর্থক ব্যবসায়ি সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেয়া। সরকার কি তা করতে পারবে?

লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।